০৪. রামানুজ দর্শন

রামানুজ দর্শন / রামানুজদর্শন / রামানুজ-দর্শন

এই দর্শনে আর্হত মত খণ্ডিত হইয়াছে। রামানুজ কহেন আর্হত মত অতি অপ্রামাণিক ও অশ্রেদ্ধেয়, ওই মত গ্রহণে লোকের প্রবৃত্তি হইতে পারে না; যে হেতু উহাতে পঞ্চতত্ত্ব সপ্ততত্ত্ব ও নবতত্ত্বাদি নানা বিষয় প্রকটিত হইয়াছে; সুতরাং প্রথমতঃ সকল লোকের এই সন্দেহ উপস্থিত হয় যে, সপ্ততত্ত্ব কি পঞ্চতত্ত্ব কি নবতত্ত্ব কোন্‌ তত্ত্বের উপর নির্ভর করিব; পরে, অব্যবস্থিত মতাবলম্বনেরই বা আবশ্যকতা কি? এই বলিয়া সকলেই নিবৃত্ত হয়, না হইবে বা কেন? সন্দিগ্ধ বিষয়ে কোন্‌ ব্যক্তির প্রবৃত্তি জন্মিয়া থাকে? ফলতঃ আর্হতমত-প্রবর্ত্তক এই সমস্ত অব্যবস্থিত বিষয় কহিয়া আপনা অব্যবস্থিতচিত্তত্বমাত্র প্রদর্শন করিয়াছেন। আর্হত মতে লিখিত আছে যে দেহের পরিমাণানুরূপ জীবের পরিমাণ। কিন্তু ইহা কোন ক্রমেই বিবেচনাসিদ্ধ ও যুক্তিযুক্ত হইতে পারে না; দেখ দেহের পরিমাণানুরূপ জীবের পরিমাণ হইলে ঘটাদি জড় বস্তুর ন্যায় জীবও পরিমিত হইত, সুতরাং জীবেরও এককালে নানা দেশে থাকা অসম্ভব। কিন্তু শাস্ত্রে কথিত আছে যে, যোগীরা যোগবলে কায়ব্যূহ রচনা করিয়া একদাই নানা শরীরে অবস্থিতি করেন, ঐ মতে ইহা কোন ক্রমেই সম্ভবে না, কারণ যোগীরাও জীব, তাঁহাদিগেরই বা কি প্রকারে এককালে নানা শরীরে অবস্থিতি হইতে পারে। ধর্ম্মশাস্ত্রে কথিত আছে যে স্বকৃত কর্ম্ম বশতঃ মনুষ্যজীবকেও জন্মান্তরে গজ পিপীলিকাদি দেহ ধারণ করিতে হয়, ইহার বা কি প্রকারে সঙ্গত হইতে পারে; কারণ মনুষ্যদেহপরিমিত মনুষ্যজীব কখনই বৃহদ্‌গজশরীরকে ব্যাপিয়া থাকিতে পারে না এবং যেমত ক্ষুদ্র ভাণ্ডে জলাশয়স্থ সকল জলের ও কুটীরে করিবরের সমাবেশ হয় না, সেইরূপ অতি ক্ষুদ্র পিপীলিকাদেহে কোন ক্রমেই তাদৃশ মনুষ্যজীবের সমাবেশ হইতে পারে না।

এস্থলে এরূপ সম্ভাবনা করিও না যে, যেমন দীপের আলোক ক্ষুদ্র ও বৃহৎ উভয়ত্রই পরিমিত হইয়া থাকে, সেইরূপ জীবেরও সঙ্কোচ এবং বিকাসভাবে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সকল শরীরেই সমাবেশ হইতে পারে। দেহ তাহা হইলে জীব অনিত্য হইয়া উঠে, কারণ যাহার সঙ্কোচ-বিকাশভাব আছে তাহার বিকারও আছে, বিকারী হইলেই অনিত্য হয় ইহারও দৃষ্টান্ত দীপের আলোক। জীবের অনিত্যতাও স্বীকার করা যাইতে পারে না; কারণ জীব অনিত্য হইলে, কৃতপ্রণাশ ও অকৃতাভ্যাগম এই দুই দোষ ঘটিয়া উঠে। দেখ যে ব্যক্তি যে কর্ম্ম করিয়াছে তাহাকে অবশ্যই সেই কর্ম্মের ফল স্বরূপ সুখ বা দুঃখ ভোগ করিতে হয়, অভুক্তকর্ম্মের কোন কালেই বিনাশ হয় না। জীবাত্মা অনিত্য হইলে, তাহার বিনাশও স্বীকার করিতে হইবে। তাহা হইলেই জীবাত্মার স্বকৃতকর্ম্মের ভোগ না হইয়াই বিনাশ হইল। সুতরাং ভোক্তার অভাবে তাহার সেই কর্ম্মও অভুক্ত হইয়াই বিনষ্ট হইল। তাহা হইলেই কৃতপ্রণাশ দোষ ঘটিয়া উঠিল, যেহেতু অভুক্তকর্ম্মের প্রণাশকেই কৃতপ্রণাশ কহে। এবং যে ব্যক্তি পুণ্য কর্ম বা পাপ কর্ম্ম কিছুই করে নাই তাহাকে কখনই তত্তৎ কর্ম্মের ফলস্বরূপ সুখ বা দুঃখ কিছুই ভোগ করিতে হয় না। কিন্তু জীবাত্মার অনিত্যতা স্বীকার করিতে হইলে অকৃতকর্ম্মের ফলভোগরূপ অকৃতাভ্যাগম স্বীকার করিতে হয়। নতুবা এই মতে অভিনবজাত কুমারের সুখ বা দুঃখ কিছুই হইতে পারে না; কারণ তৎকালে তাহার পুণ্য কর্ম্ম বা পাপ কর্ম্ম কিছুই নাই। কিন্তু জীবাত্মার নিত্যতা স্বীকার করিলে এইরূপ দোষ ঘটে না; যেহেতু বাল্যাবস্থায় পূর্ব্বজন্মকৃত পুণ্য বা পাপের ফলস্বরূপ সুখ বা দুঃখের ভোগ করা ইহা জীবাত্মার নিত্যতামতে অনায়াসেই স্বীকার করা যাইতে পারে, অতএব জীব কখনই দেহপরিমিত নহে সন্দেহ নাই। এই রূপে যখন আর্হত মতের প্রধানভূত জীবপদার্থনির্ণয় দোষপূর্ণ ও ভ্রান্তিসঙ্কুল প্রতিপন্ন হইতেছে তখন ঐ দর্শনের অন্যত্র ভ্রম ও দোষ নাই ইহা কি প্রকারে সম্ভব হইতে পারে।

অদ্বৈতমতপ্রবর্ত্তক শঙ্করাচার্য্যের মতাবলম্বীরা কহেন একমাত্র ব্রহ্মই সত্য এবং শ্রুতিপ্রতিপাদ্য। জগৎপ্রপঞ্চ কিছুই সত্য নহে সকলই মিথ্যা। যেমত ভ্রমবশতঃ রজ্জুতে মিথ্যাসর্প কল্পিত হইয়া থাকে এবং রজ্জু বলিয়া নিশ্চয় হইলে ভ্রম নিবারণ হইয়া ঐ কল্পিত সর্পেরও নিবৃত্তি হয়, সেইরূপ অবিদ্যা দ্বারা ঐ অবিদ্যার নিবৃত্তি হইয়া জগৎপ্রপঞ্চেরও নিবৃত্তি হইবে। অবিদ্যা ভাব পদার্থ; কিন্তু সৎ বা অসৎ পদের বাচ্য হইতে পারে না বলিয়া উহাকে সদসদনির্ব্বচনীয় কহে, বিদ্যা অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞান হইলে ঐ অবিস্যার নিবৃত্তি হয়। কিন্তু এই বিষয়ে যে উপনিষদবাক্য ও অনুভব প্রমাণ রূপে অদ্বৈতমতাবলম্বীরা উদ্ধৃত করিয়াছেন তদ্দ্বারা উল্লিখিত ভাবস্বরূপ অবিদ্যা সিদ্ধ হইতে পারে না; কারণ শ্রুতিতে যে অনৃত শব্দ আছে, তাহার অর্থ সাংসারিক অল্পফলজনক কর্ম্ম, এবং যে মায়া শব্দ দৃষ্ট হইয়া থাকে, তাহার অর্থ বিচিত্রসৃষ্টিজনক ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতি। সুতরাং ঐ ঐ শ্রুতির দ্বারা অবিদ্যা সিদ্ধ হইল না। এবং “আমি জানিনা“ ঈদৃশ অনুভব দ্বারাও উক্ত ভাবরূপ অবিদ্যা সিদ্ধ হইতে পারে না, কারণ “আমি জানি না“ এই অনুভব দ্বারা জ্ঞানাভাবেরই বোধ হইয়া থাকে ভাবরূপ অবিদ্যার বোধ হয় না। আর উহাকে যুক্তিসিদ্ধ বলিয়াও অঙ্গীকার করা যাইতে পারে না; কারণ ব্রহ্ম জ্ঞানস্বরূপ, সুতরাং কি রূপে তাঁহাকে আশ্রয় করিয়া অবিদ্যারূপ অজ্ঞান থাকিবে; আলোককে আশ্রয় করিয়া কি অন্ধকার থাকিতে পারে? অতএব ভাবরূপ অবিদ্যা পদার্থ যে অলীক ও যুক্তিবিরুদ্ধ বিষয় উল্লিখিত হইয়াছে তখন উহা কোন মতেই বিজ্ঞজনের আদরণীয় ও গ্রাহ্য হইতে পারে না।

পদার্থ তিন প্রকার; চিৎ, অচিৎ ও ঈশ্বর। চিৎ জীবপদবাচ্য, ভোক্তা, অসঙ্কুচিত, অপরিচ্ছিন্ন, নির্ম্মল জ্ঞানস্বরূপ ও নিত্য, এবং অনাদি অবিদ্যা বেষ্টিত; ভগবদারাধনা ও তৎপদ প্রাপ্ত্যাদি জীবের স্বভাব। কেশাগ্রকে শত ভাগে বিভক্ত করিয়া তাহার একাংশকে পুনর্ব্বার শতাংশ করিলে যেমত সূক্ষ্ম হয়, জীব সেইরূপ সূক্ষ্ম। অচিৎ ভোগ্য ও দৃশ্যপদবাচ্য, অচেতনস্বরূপ, জড়াত্মক জগৎ, এবং ভোগ্যত্ব-বিকারাস্পদত্বাদিস্বভাবশালী। ঐ অচিৎ পদার্থ তিন প্রকার; ভোগ্য, ভোগোপকরণ ও ভোগায়তন। যাহাকে ভোগ করা যায়, তাহাকে ভোগ্য কহে, যেমন অন্ন পানীয়াদি; যাহার দ্বারা ভোগ করা যায়, তাহাকে ভোগাপকরণ কহে, যথা ভোজন-পাত্রাদি; এবং যাহাতে ভোগ করা যায় তাহাকে ভোগায়তন কহে, যথা শরীরাদি। ঈশ্বর সকলের নিয়ামক, হরি-পদবাচ্য, জগতের কর্ত্তা, উপাদান, সকলের অন্তর্যামী, এবং অপরিচ্ছিন্ন জ্ঞান, ঐশ্বর্য্য, বীর্য্য, শক্তি, তেজঃ প্রভৃতি গুণাস্পদতারূপ স্বভাবশালী। চিৎ অচিৎ সমুদায় বস্তুই তাঁহার শরীর স্বরূপ। এবং পুরুষোত্তম বাসুদেবাদি তাঁহার সংজ্ঞা। তিনি পরমকারুণিক এবং ভক্তবৎসল, উপাসকদিগকে যথোচিত ফল প্রদান করিবার আশয়ে লীলা বশতঃ পাঁচ প্রকার মূর্ত্তি ধারণ করেন। প্রথম অর্চ্চা অর্থাৎ প্রতিমাদি। দ্বিতীয় রামাদ্যবতারস্বরূপ বিভব। তৃতীয় “বাসুদেব, সংকর্ষণ, প্রদ্যুম্ন, ও অনিরুদ্ধ,” এই চারি সংজ্ঞাক্রান্ত ব্যূহ। চতুর্থ সূক্ষ্ম, ও সংপূর্ণ ষড়গুণ বাসুদেব নামক পরব্রহ্ম। পঞ্চম অন্তর্যামী সকল জীবের নিয়ন্তা। এই পাঁচ মূর্ত্তির মধ্যে পূর্ব্ব পূর্ব্বের উপাসনা দ্বারা পাপ ক্ষয় হইলে উত্তরোত্তরের উপাসনাতে অধিকার জন্মে। অভিগমন, উপাদান, ইজ্যা, স্বাধ্যায় ও যোগ-ভেদে ভগবানের উপাসনাও পাঁচ প্রকার। দেবমন্দিরের মার্জ্জন ও অনুলেপন প্রভৃতিকে অভিগমন কহে, এবং গন্ধ পুষ্পাদি পূজোপকরণের আয়োজনকে উপাদান, পূজাকে ইজ্যা, অর্থানুসন্ধান পূর্ব্বক মন্ত্রজপ ও স্ত্রোত্রপাঠ, নাম সংকীর্ত্তন ও তত্ত্বপ্রতিপাদক শাস্ত্রাভ্যাসকে স্বাধ্যায়, এবং দেবতানুসন্ধানকে যোগ কহে। এইরূপ উপাসনাকর্ম্মদ্বারা বিজ্ঞান লাভ হইলে করুণা সিন্ধু ভগবান স্বকীয় ভক্তগণকে নিত্যপদ প্রদান করেন; ওই পদপ্রাপ্তি হইলে ভগবানকে যথার্থ রূপে চিনিতে পারা যায় এবং পুনর্জন্মাদি কিছুই হয় না।

চিৎ ও অচিতের সহিত ঈশ্বরের ভেদ অভেদ ও ভেদাভেদ তিনই আছে। দেখ যেমত বিভিন্নস্বভাবশালী পশু ও মনুষ্যদিগের পরস্পর ভেদ আছে, সেইরূপ পূর্ব্বোক্ত স্বভাব ও স্বরূপের বৈলক্ষণ্য বশতঃ চিদচিতের সহিত ঈশ্বরেরও ভেদ স্বীকার করিতে হইবে। আর যেমন “আমি সুন্দর আমি স্থূল” ইত্যাদি ব্যবহারসিদ্ধ ভৌতিক শরীরের সহিত জীবাত্মার অভেদ দৃষ্ট হয়, সেইরূপ চিদচিৎ সকল বস্তুর সহিত ঈশ্বরের অভেদও আছে বলিতে হইবে। আর যেমন এক মাত্র মৃত্তিকাই বিভিন্ন ঘট ও শরাবাদি নানা রূপে অবস্থান করিতেছে বলিয়া ঘটের সহিত মৃত্তিকার ভেদাভেদ প্রতীত হইতেছে, সেই রূপ একমাত্র পরমেশ্বর চিদচিৎ নানা রূপে বিরাজমান আছেন বলিয়া চিদচিতের সহিত তাঁহার ভেদাভেদও আছে সন্দেহ নাই। যে হেতু ঈশ্বরের আকার স্বরূপ চিদচিতের পরস্পর ভেদ লইয়া এবং ঐ উভয়ের সহিত ঈশ্বরের শরীরাত্মভাবে অভেদ বশতঃ ভেদাভেদ ঘটিতেছে। দেখ যাহার অন্তর্যামী যে হয়, তাহাই তাহার শরীর বলিয়া পরিগণিত হয়, যথা ভৌতিক দেহের অন্তর্যামী জীব বলিয়া ভৌতিক দেহ জীবের শরীর, সেই রূপ জীবের অন্তর্যামী ঈশ্বর, সুতরাং জীব ঈশ্বরের শরীর বলিতে হইবে। অতএব যেমন “আমি সুন্দর আমি স্থূল” ইত্যাদি ব্যবহার দ্বারা ভৌতিক শরীরে জীবাত্মার শরীরাত্মভাবে অভেব প্রতীতি হয়, সেইরূপ তত্ত্বমসি শ্বেতকেতো অর্থাৎ হে শ্বেতকেতো তুমি ঈশ্বর, ” ইত্যাদি শ্রুতিতেও জীবাত্মা ও ঈশ্বরের শরীরাত্মভাবে অভেদ নির্দিষ্ট হইয়াছে, ফলতঃ তদ্দ্বারা বাস্তবিক অভেদ-প্রতীতি হয় না। অতএব এই শ্রুতি দ্বারা জীবাত্মা ও পরমাত্মার ঐক্য স্বীকার করা এবং জগৎপ্রপঞ্চকে মিথ্যা বলা যে কেবল মূঢ়তার কর্ম্ম তাহা আর বলিবার অপেক্ষা রাখে কি?

শ্রুতিতে যে স্থানে ঈশ্বরকে নির্গুণ কহিয়াছেন, তাহার তাৎপর্য্য, প্রাকৃত জনের ন্যায় রাগ দ্বেষাদি গুণ ঈশ্বরের নাই এই মাত্র। আর যে স্থলে পদার্থের নানাত্ব বিষয় নিষেধ করিয়াছেন তাহার তাৎপর্য্য এই যে, ঈশ্বর, চিৎ অচিৎ সমুদায় বস্তুর আত্মা, সুতরাং সকল বস্তুই ঈশ্বরাত্মক, ঈশ্বর হইতে পৃথগভূত পদার্থ নাই। এই সমস্ত তত্ত্বানুসন্ধান করিয়া রামানুজ শারীরিক সূত্রের ভাষ্য করিয়াছেন। বৌধায়নাচার্য্য মহোপনিষদের মতানুসারে শারীরিক সূত্রের এক বৃত্তি করেন, কিন্তু ঐ বৃত্তি নিতান্ত বিস্তৃত, এজন্য রামানুজ ঐ বৃত্তির মতানুসারে সংক্ষেপে ভাষ্য করিয়াছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *