০৪. মহাদেবকে কামবশ করিতে ব্রহ্মার উদ্যোগ

চতুর্থ অধ্যায়  মহাদেবকে কামবশ করিতে ব্রহ্মার উদ্যোগ

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–ইতিপূর্বে বিধাতা মহাদেবের বাক্যে অবমানিত হইয়া যখন অন্তর্হিত হন, তদবধি চিন্তা কবিতে লাগিলেন;-রমণীতে অভিলাষ মাত্র দেখিয়া মহাদেব আমাকে নিন্দা করিলেন, তিনি নিজে মুনিগণের সমক্ষে দারপরিগ্রহ করিবেন কিরূপে? ১-২

আর তাহার হৃদয়-মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী যিনি, তাহার হৃদয়স্থিত যোগমার্গে অনাস্থা জন্মাইয়া তাহাকে ভুলাইতে পারিবেন, এমন রমণীই বা কে, যে তাহার জায়া হইবেন? ৩

কামও তাহাকে ভুলাইতে পারিবে না। তিনি অত্যন্ত যোগাসক্ত, স্ত্রীলোকের নামও ভালবাসেন না। ৪

মহেশ্বর দারপরিগ্রহ না করিলে আদি, মধ্য ও অন্তে সৃষ্টি হইবে কিরূপে? তাহা হইলে সৃষ্টিলোপ-নিবারণও অপরের সাধ্যাতীত। ৫

কোন কোন মহাবীর ভূতলে জন্মিবে, তাহাদের কাহার উপায়তঃ আমার বধ্য; কাহারাও উপায়তঃ বিষ্ণুর বধ্য, কাহারও বা উপায়তঃ মহাদেবের বধ্য। ৬

শম্ভু একান্ত বৈরাগ্যসম্পন্ন ও সংসাপরাঙ্মুখ হইলে সৃষ্টি চলিবে কিরূপে? ইনি ভিন্ন অপরে ইহার কৰ্ম্ম করিতে পারিবে না, ইহা নিশ্চয়। ৭।

লোক-পিতামহ লোকেশ ব্রহ্মা ইহা চিন্তা করত গগনমণ্ডলে অবস্থিত হইয়া পুনরায় ভূতলস্থিত দক্ষাদিকে অবলোকন করিলেন। ৮

তিনি মদনকে রতিসহচর ও আনন্দযুক্ত দেখিয়া পুনর্বার তথায় গমনপূর্বক পুষ্পশরকে সান্ত্বনা করত বলিলেন। ৯

হে মনোভব। এই রমণীকে সহচারিণী পাইয়া তোমার শোভা হইয়াছে; আর এই রমণীও তোমাকে পতিরূপে পাইয়া যোগ্যসমাগম প্রযুক্ত অত্যন্ত শোভা পাইতেছে। ১০

যেমন লক্ষ্মীযোগে নারায়ণ ও নারায়ণযোগে লক্ষ্মী, যেমন শশি-যোগে নিশা ও নিশা-যোগে শশী–সেইরূপ তোমরা উভয়েই পরস্পরে শোভিত এবং উৎকৃষ্ট দাম্পত্যভাবে অনুপ্রাণিত। অতএব তুমি জগতের কেতু (শ্রেষ্ঠ) এই জন্য তুমি বিশ্বকেতু নামে বিখ্যাত হইবে। ১১-১২

হে বৎস! তুমি জগতের হিতার্থে মহাদেবকে ভুলাও; তিনি যেন প্রীত-মনে দারপরিগ্রহ করেন। ১৩

নির্জন স্নিগ্ধ প্রদেশেই হউক, পৰ্বতেই হউক, আর নদীতেই হউক, ঈশ্বর যেখানে যেখানে যাইবেন তুমি এই রতিদেবীর সহিত তথায় তথায় গিয়া সেই বনিত-পরাঙ্মুখ সংযতচিত্ত হরকে ভুলাইবে। ১৪-১৫

তুমি ভিন্ন তাহাকে তুলাইতে পারে, এমন লোক কেহ নাই। ১৬

হে মনোভব! মহাদেবের রমণী-অনুরাগ সঞ্চার হইলে তোমারও শাপ মোচন হইবে। অতএব এই আত্মহিতকর কাৰ্য্য করিতে বিমুখ হইও না। ১৭

যদি মহেশ্বর অনুরাগ সহকারে কোন করভোরূ রমণীর প্রতি স্পৃহা করেন, তাহা হইলে তখন তিনি তৎকালিক ভাবের উপযোগী বলিয়া তোমাকে সম্মানিত করিবেন। ১৮

অতএব তুমি জগতের হিতার্থে মহাদেবকে ভুলাইতে যত্ন কর। আর তাহাকে ভুলাইয়া তুমি বিশ্বকেতু হও। ১৯

মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–মন্মথ পরমাত্মা ব্রহ্মার এই কথা শুনিয়া জগতের হিতজনক যথার্থ কথা তাহাকে বলিতে লাগিলেন;-প্রভো! আমি আপনার বচনানুসারে মহাদেবকে ভুলাইব। কিন্তু আমার প্রধান অস্ত্র রমণী; আপনি নির্জনে সৃজন করুন। ২০-২১

হে বিধাতঃ! আমি শম্ভুকে ভুলাইলে পর যিনি তাহার পরেও তাহাকে ভুলাইয়া রাখিতে পারিবেন, এইরূপ মনোরমা রমণী আমাকে বলিয়া দিন। ২২

যিনি তাঁহাকে ভুলাইয়া রাখিতে পারিবেন, বর্তমান সময়ে এরূপ রমণী আমি ত দেখিতে পাই না; অতএব আপনি তদ্বিষয়ে উপায় করুন। ২৩

কন্দর্প এই কথা বলিলে লোকপিতামহ ব্রহ্মা ভাবিতে লাগিলেন, কোন রমণী মহাদেবকে ভুলাইতে পারিবেন? ২৪

অনন্তর চিন্তাকুল বিধাতার দীর্ঘনিশ্বাস পড়িল; তাহা হইতে কুসুমসংহতি ভূষিত বসন্ত উৎপন্ন হইলেন। ২৫

বসন্ত অলিকুলসঙ্কুল মুকুলিত চুতাঙ্কুর, কিংশুক কুসুম ও কমলশ্রেণী ধারণ কত ফুল্লকুসুমিত তরুবরের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। ২৬

তাহার রক্তকমল সদৃশ বর্ণ, নলিনাভ লোচনযুগল, সন্ধ্যাকালীন পূর্ণ শশধরের ন্যায় মুখমণ্ডল, তাহার সুন্দর নাসিকা, শঙ্খসদৃশ চরণাবর্ত, কুন্তলজাল নীলকুঞ্চিত। তিনি অস্ত গমনোন্মুখ দিবাকরের ন্যায় উজ্জ্বল রক্তবর্ণ কুণ্ডল যুগলে ভূষিত। ২৭-২৮।

তাহার গতি মত্তমাতঙ্গের ন্যায়, বক্ষঃস্থল প্রশস্ত; তাহার নিস্তল পীবর দীর্ঘ ভুজযুগল, অকর্ম কঠিন করতলদ্বয়; তাহার ঊরু, কটি ও জঙ্ঘা সুবৃত্ত, গ্রীবা কম্বুসন্নিভ, স্কন্ধ উন্নত, জত্রুদেশ গূঢ় এবং মুখমণ্ডল পরিপূর্ণ। ২৯-৩০

সেই সৰ্বসুলক্ষণাক্রান্ত পূর্ণাবয়ব কুসুমাকর উৎপন্ন হইলে উত্তম সদ্গন্ধপূর্ণ বায়ু বহিতে লাগিল এবং তরুনিকর পুষ্পিত হইল। ৩১

মধুরস্বর কোকিলকুল শতশতবার পঞ্চমস্বরে গান করিতে লাগিল। আর সুনিৰ্ম্মল সরসীসলিলে কমলরাজি বিকশিত হইল। ৩২

সেই সুলক্ষণপূর্ণ বসন্ত সেইরূপে উৎপন্ন হইলেন দেখিয়া হিরণ্যগর্ভ মদনকে মধুর বচনে বলিলেন,–মন্মথ! এই ব্যক্তি তোমার পরম মিত্র ও সতত সহচর হইবে, আর তোমার কাৰ্যে সৰ্ব্বদাই আনুকূল্য করিবে। ৩৩-৩৪

বায়ু যেমন অগ্নির মিত্র বলিয়া সৰ্ব্বত্র তাহার উপকার করেন, সেইরূপ এই তোমার বন্ধু সৰ্ব্বদা তোমার অনুগমন করিবেন। ৩৫

বসতির অন্ত হেতু বলিয়া অর্থাৎ প্রবাসীকে প্রবাসে থাকিতে দেন না বলিয়া ইহার নাম হউক “বসন্ত”। তোমার অনুগমন এবং লোকরঞ্জনই ইহার কৰ্ম্ম। ৩৬।

বসন্তেই শৃঙ্গার এবং মলয় পবন বসন্তেরই উপকরণ। সমস্ত ভাব তোমার সতত বশবর্তী সুহৃদ হউক। ৩৭

আর এই সকল সুহৃদগণের সহিত তোমার যেমন সৌহার্দ, সেইরূপ বিব্বোকাদি হাব এবং চতুঃষষ্টি কলা রতির সহিত সৌহার্দ স্থাপন করুন। ৮

কাম তুমি বসন্ত প্রভৃতি এই সকল সহচর ও কথিত পরিজন-পরিবৃতা সহচরী এই রতি দেবীর সহিত মিলিত হও। ৩৯

মহাদেবকে মোহিত কর; এই সৃষ্টিকে চিরস্থায়িনী কর। তুমি সকল সহচরে পরিবৃত হইয়া ইচ্ছামত প্রদেশে গমন কর। আর যিনি হরকে ভুলাইতে পারিবেন, এইরূপ রমণী, যাহাতে হয়, আমি তাহা করিতেছি। ৪০

সুরজ্যেষ্ঠ ব্ৰহ্মা এই কথা বলিলে মদন আনন্দিত হইয়া পত্নী-সমভিব্যাহারে তদীয় চরণে প্রণিপাত করিলেন। ৪১

তখন মন্মথ, যেখানে শিব ছিলেন, দক্ষকে এবং সেই সমস্ত ব্ৰহ্মার মানস পুত্রদিগকে অভিবাদন করিয়া তথায় গমন করিলেন। ৪২

হে দ্বিজবরগণ! সেই মন্মথ, অন্যান্য অনুচর ও শৃঙ্গারাদি ভাবগণ সমভিব্যাহারে গমন করিলে পিতামহ দক্ষ ও মরীচি অত্রিপ্রভৃতি মুনিবরগণকে মধুর বচনে বলিয়াছিলেন। ৪৩

চতুর্থ অধ্যায় সম্যপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *