০২. শাস্তি (ধারা ১৬-৩২)

শাস্তি (ধারা ১৬-৩২)
দ্বিতীয় অধ্যায়

ধারা-১৬ শাস্তির সংজ্ঞা

অপরাধের জন্য আইন দ্বারা নির্ধারিত প্রতিফলকে শাস্তি বলে।

বিশ্লেষণ

শাস্তির আরবী প্রতিশব্দ _____ যাহার বহুবচন _____। ইহাই শরীআতের পরিভাষা হিসাবে ব্যবহৃত। ‘অপরাধকৰ্মে লিপ্ত হওয়ার কারণে অপরাধীকে যে কষ্ট ভোগ করিতে হয় তাহাকে শাস্তি বলে।’, লিসানুল আরাব নামক আরবী ভাষার বিশ্বকোষে বলা হইয়াছে, ‘মানুষ যে খারাপ কাজ করে উহার প্রতিদানকে শাস্তি বলে।’

কাওয়াইদুল ফিকহ-এ বলা হইয়াছে, ‘অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধীকে প্রতিদান হিসাবে দুনিয়া বা আখেরাতে যে কষ্ট ভোগ করিতে হইবে তাঁহাকে শাস্তি বলে।’

আমাদের আলোচনা রাষ্ট্রের বিচার বিভাগীয় শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিবে।

ধারা-১৭ শাস্তির শ্রেণীবিভাগ

অপরাধের ধরন অনুযায়ী উহার শাস্তি নিম্নোক্ত তিন শ্রেণীতে বিভক্ত–(ক) হাদ্দ, (খ) কিয়াস ও দিয়াত এবং (গ) তাযীর।

ধারা-১৮ হদ্দএর সংজ্ঞা

হদ্দ হইল নির্ধারিত শাস্তি; ইহা কার্যকর করা বাধ্যতামূলক।

বিশ্লেষণ

হদ্দ শব্দের অর্থ বাধাদান বা প্রতিরোধ এবং এই শব্দ হইতেই দ্বাররক্ষী নিষ্পন্ন হইয়াছে। কারণ সে আগন্তুককে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিতে বাধা দেয়। হদ্দ এইজন্য কার্যকর করা হয় যে, মানুষ শাস্তির কথা বিবেচনা করিয়া অপরাধকর্ম হইতে বিরত থাকিবে। উপরোক্ত সংজ্ঞা হইতে প্ৰতীয়মান হয় যে, হদ্দের আওতাভুক্ত অপরাধের শাস্তি নস দ্বারা নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হইয়াছে। সমাজের সার্বিক নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনা করিয়া যে শাস্তি নির্ধারণ করা হইয়াছে সেইগুলি আল্লাহর অধিকার হিসাবে গণ্য হয়। হদ্দের আওতাভুক্ত অপরাধের দ্বারা সামগ্রিকভাবে সমাজ ক্ষতিগ্ৰন্ত হয় এবং শাস্তি কার্যকর করিলে সমাজ উপকৃত হয়। এইজন্য হািদকে আল্লাহর অধিকার (Public Right) বলা হইয়াছে।’

ধারা-১৯ হদ্দের আওতাভুক্ত অপরাধকৰ্মসমূহ

নিম্নোক্ত অপরাধকর্মসমূহ হদ্দের আওতাভুক্ত—

(ক) যেনা, (খ) চুরি, (গ) ডাকাতি, (ঘ) মদ্যপান, (ঙ) যেনার অপবাদ, (চ) রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও (ছ) ইরতিদাদ (ধৰ্মত্যাগ)।

(খ) যেসব অপরাধ কর্মের শাস্তি সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত কেবল সেইগুলিই হদ্দের আওতাভুক্ত হইবে।

ধারা-২০ অপরাধকর্ম প্ৰমাণে নসএর প্রয়োজনীয়তা

কোন কর্মে লিপ্ত হওয়াকে হয়েেদর আওতায় শাস্তিযোগ্য গণ্য করিতে হইলে উহার অনুকূলে নস থাকিতে হইবে, অন্যথায় সংশ্লিষ্ট কাজটি অপরাধও নহে এবং শাস্তিযোগ্যও নহে।

বিশ্লেষণ

যেসব অপরাধকে হিদের আওতাভুক্ত করা হইয়াছে সেইগুলি পর্যালোচনা করিলে উপরোক্ত নীতির বাস্তবতা প্রমাণিত হয়। কারণ হিদের তালিকাধীন প্রতিটি অপরাধের শাস্তির সমর্থনে হয় কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত অথবা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হাদীস বিদ্যমান রহিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ মিজোত আয়াত যেমাকে হারাম ঘোষণা করিয়াছে।

‘অবৈধ যৌন সংযোগের নিকটবর্তী হইও না, ইহা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পন্থা।’ (সূরা ইসরা : ৩২)।

নিম্নোক্ত আয়াত উহার শাস্তির ঘোষণা করিয়াছে :

‘যেনাকারিণী ও যেনাকার ইহাদের প্রত্যেককে এক শত কশাঘাত করিবে’ (সূরা নূর : ৩২)।

ধারা-২১ সন্দেহের কারণে হদ্দ রহিত হয়

অপরাধকর্মটি সন্দেহজনক হইলে হাম্মদ রহিত হইয়া যাইবে, তবে তাযীরের আওতায় শাস্তি হইতে পারে।

বিশ্লেষণ

যেমন কোন ব্যক্তি অপরাধের স্বীকারোক্তি করিয়া পুনরায় উহা প্ৰত্যাহার করিলে তাহার স্বীকারোক্তির মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হইয়া যায়। অথবা কোন ব্যক্তি তাহার ও অপর এক ব্যক্তির যৌথ মালিকানাধীন মাল চুরি করিল। আর চুরি তো বলা হয় অপরের মালিকানাধীন সম্পদ অলক্ষে হস্তগত করাকে। কিন্তু এখানে তো চোরাই মালের মধ্যে তাহার অংশ থাকারও সম্ভাবনা রহিয়াছে। মহানবী (সা) বলেন :

‘সন্দেহের ক্ষেত্রে হদ্দ রহিত কর।’।

মুয়ায ইবন জাবাল, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ ও উতবা ইবন আমের (রা) বলেন :

‘হদ্দ কার্যকর করা তোমার জন্য সংশয়পূর্ণ হইয়া গেলে উহা রহিত করিয়া দাও।‘

‘উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, সন্দেহ বিদ্যমান থাকিতে হদ্দ কার্যকর করার চাইতে উহা বাতিল করিয়া দেওয়াই আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়।’

ধারা-২২ কিয়াসএর সংজ্ঞা

কোন ব্যক্তিকে হত্যা বা আহত করার দায়ে হত্যাকারীকে বা আহতকারীকে পৰ্যায়ক্রমে হত্যা বা আহত করাকে ‘কিসাস’ বলে।’

বিশ্লেষণ

আরবী ____ শব্দের অর্থ কর্তন করা, উহা হইতে ____ (কিসাস) পরিভাষা গৃহীত হইয়াছে। ইহার অর্থ, অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে সমতা বা সাদৃশ্য বিধান।

অর্থাৎ অপরাধী কোন ব্যক্তির যেই পরিমাণ দৈহিক ক্ষতি সাধন করিয়াছে তাহারও সেই পরিমাণ দৈহিক ক্ষতি সাধনই হইতেছে কিসাস। অপরাধী তাহাকে হত্যা করিলে প্রতিশোধ স্বরূপ সেও মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হইবে এবং যখম করিয়া থাকিলে প্রতিশোধ স্বরূপ তাহাকেও যখম করা হইবে।

ধারা২৩ কিয়াসের ভিত্তি

কুরআন ও প্রামাণ্য হাদীসের ভিত্তিতেই কেবল কিয়াস কার্যকর করা যায়।

বিশ্লেষণ

কুরআন মজীদে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বলা হইয়াছে :

‘হে মুমিনগণ! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেওয়া হইয়াছে। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস এবং নারীর বদলে নারী।’ (সূরা বাকারা : ১৭৮)।’

‘আল্লাহু যাহার হত্যা নিষিদ্ধ করিয়াছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত তাহাকে হত্যা করিও না। কেহ অন্যায়ভাবে নিহত হইলে তাহার উত্তরাধিকারীকে তো আমি উহার প্ৰতিকারের অধিকার দিয়াছি। অতএব হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে।’ (সূরা বনী ইসরাঈল : ৩৩)।

‘তাহাদের জন্য উহাতে বিধান দিয়াছিলাম যে, প্ৰাণের বদলে প্ৰাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং যখমের বদলে অনুরূপ যখম।’ (সূরা মাইদা : ৪৫)

ধারা8 কিসাস ক্ষমাযোগ্য

নিহত ব্যক্তির ওয়ারিসগণ এবং আহত ব্যক্তি ইচ্ছা করিলে দিরাত (রক্তপণ) গ্ৰহণ করিয়া অথবা দিয়াত ব্যতীতই অপরাধীকে ক্ষমা করিয়া দিতে পারে।

বিশ্লেষণ

কুরআন মজীদে হত্যাকাণ্ডের শাস্তি উল্লেখের পরপরই বলা হইয়াছে :

‘কিন্তু তাহার ভাইয়ের পক্ষ হইতে কিছুটা ক্ষমা প্রদর্শন করা হইলে যথাযথ বিধির অনুসণ করা এবং সততার সহিত তাহার দেয় পরিশোধ করা বিধেয়। ইহা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ’ (সূরা বাকারা : ১৭৮)।

ধারা-২৫ দিয়াত-এর সংজ্ঞা

মনুষ্য হত্যার ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে শরীআত মোতাবেক পক্ষবৃন্দের আপোস-রফার ভিত্তিতে যে অর্থ প্ৰদান কৱা হয় তাহাকে ‘দিয়াত’ বলে।

বিশ্লেষণ

নিহত ব্যক্তির ওয়ারিসগণ আদালতের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে হত্যাকারীর সঙ্গে আপোসরফা করিতে পারে। এই অর্থই দিয়াত হিসাবে গণ্য।

ধারা-২৬ আল-আরশ

(ক) মানবদেহের কোন অঙ্গের ক্ষতিসাধনের কারণে যে অর্থ প্ৰদান বাধ্যতামূলক হয় তাহাকে ‘আল-আরশ’ বলে।১২

(খ) অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আল-আয়াশ-এর পরিমাণ নির্ধারণ করিবে: আইন প্ৰণয়নকারী কর্তৃপক্ষ।

বিশ্লেষণ

‘আরশ’ শব্দের অর্থ যখম বা অনুরূপ ক্ষতি। দেহের কোন অঙ্গ আহত বা অকেজো করার সমান পরিমাণ শাস্তি অপরাধীর উপর কার্যকর করা কোন কারণে সম্ভব না হইলে উহার পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ স্বরূপ যে অর্থ প্ৰদান করা হয় তাহাই আরশ হিসাবে গণ্য। যেসব ক্ষেত্রে ‘দিয়াত’ আরোপ করা সম্ভব নহে। সেসব ক্ষেত্রে ‘আরশ’ প্রযোজ্য হয়।

ধারা-২৭ তাযীরএর সংজ্ঞা শ্ৰেণীবিভাগ

(ক) আল্লাহ বা মানুষের অধিকার সংশ্লিষ্ট এবং হন্ধ ও কাফফারা বহির্ভূত যেসব অপরাধের জন্য শরীআতে নির্দিষ্ট কোন শাস্তির ব্যবস্থা করা হয় নাই, তাহাকে তাযীর (Discretionary Punishment) বলে।

(খ) তাযীর নিম্নবর্ণিত তিন শ্রেণীতে বিভক্ত—

(১) পাপকর্মের তাযীর অর্থাৎ শরীআতে যেসব কাজ হারাম ঘোষণা করা হইয়াছে তা হাতে লিপ্ত হওয়া পাপকর্ম ও শাস্তিযোগ্য হিসাবে গণ্য;

(২) জনস্বার্থে তাযীর, অর্থাৎ যেসব কাজ স্বয়ং নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু কতিপয় বৈশিষ্ট্যের কারণে নিষিদ্ধ হইয়াছে;

(৩) বিপরীত কর্ম করার কারণে তাযীর, অর্থাৎ শরীআতে যেসব কাজ মানদুব (সুন্নাত, নফল ইত্যাদি) অথবা মাকরূহ হিসাবে গণ্য তাহার বিপরীত কর্মানুষ্ঠানের জন্য শাস্তি।

বিশ্লেষণ

উপরোক্ত তিন শ্রেণীর মধ্যে পার্থক্য এই যে, প্রথমোক্ত শ্রেণীভুক্ত কাজ স্থায়ীভাবে হারাম, দ্বিতীয় শ্রেণীর কাজ ততক্ষণ হারাম নয় যতক্ষণ পর্যন্ত না উহার মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান পাওয়া যাইবে এবং তৃতীয় শ্রেণীভুক্ত কাজ হয় করার নির্দেশ প্ৰদান করা হইয়াছে অথবা না করার নির্দেশ প্ৰদান করা হইয়াছে, কিন্তু উহার বিপরীত কার্যক্রমকে পাপ আখ্যায়িত করার পরিবর্তে শুধু বিরোধিতা হিসাবে আখ্যায়িত করা

ফকীহগণ এই বিষয়ে একমত যে, তাযীর কেবল সেইসব অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, শরীআত যাহার জন্য হদ্দ অথবা কাফফারা ধাৰ্য করে নাই, অপরাধকর্মটি আল্লাহর অবাধ্যাচরণ হউক অথবা এমন অপরাধই হউক যাহার প্রভাব মানুষের উপর পতিত হয়।’ আল্লাহর অবাধ্যাচরণ বলিতে এমন প্রতিটি কর্মকে বুঝায় যাহার দ্বারা জনস্বাৰ্থ, সমাজের ঐক্য ও উহার শাস্তি-শৃংখলা বিঘ্নিত হয়। আর যে অপরাধের প্রভাব মানুষের উপর পতিত হয় তাহা ব্যক্তি-অধিকার সংশ্লিষ্ট। ‘শরীআত যে কাজ করিতে নিষেধ করিয়াছে তাহাতে লিপ্ত হওয়া এবং যে, কাজ করিতে নির্দেশ প্রদান করিয়াছে তাহা হইতে বিরত থাকাকে পাপকৰ্ম’ বলে। অর্থাৎ অপরাধের সংজ্ঞা ও পাপকর্মের সংজ্ঞা একই।

তাযীর সম্পর্কে হানাফী ফকীহ ইমাম যায়লাঈ বলেন, প্রতিটি পাপকর্মে তাযীর প্রযোজ্য…কিন্তু তাযীরের অধীন সংশ্লিষ্ট অপরাধের সুনির্দিষ্ট শাস্তি নিদ্ধারিত নাই। ইমাম অপরাধের ধরন ও অপরাধীর অবস্থা বিবেচনা করিয়া শাস্তি নির্ধারণ করিবেন। একজন শাফিঈ ফকীহ বলেন, কোন ব্যক্তি এমন কোন অপরাধকৰ্মে লিপ্ত হইলে, যাহার জন্য হদ্দও নির্ধারিত হয় নাই এবং কাফ্‌ফারাও নয়, তাহার শাস্তি ইমাম নির্ধারণ করবেন।’

একজন মালিকী ফকীহা কিসাস, দিয়াত ও হাদ-এর আওতাভুক্ত অপরাধ আলোচনার পর বলেন, উহা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে তাবীর প্রযোজ্য হইবে, যাহা ইমাম নির্ধারণ করবেন এবং তিনি আল্লাহর অবাধ্যাচরণ ও মানুষের অধিকার খর্বকারী অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করবেন।

একজন হাম্বলী ফকীহ বলেন, তাযীর মূলত শিক্ষামূলক শাস্তি, যাহা সেই অপরাধের ক্ষেত্রে প্রদত্ত হইবে যাহার জন্য হদ্দ অথবা কাফফারা নিদ্ধারণ করা হয় নাই। তাযীরের সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্ধারিত নাই, বরং ইমাম তাহার সুবিবেচনা অনুযায়ী অপরাধীর অবস্থার দিকে লক্ষ্য রাখিয়া উহা নির্ধারণ করবেন।’

শরীআতের সাধারণ নীতিমালা এই যে, তাযীর কার্যকর করিতে হইলেও উহার সমর্থনে নস বিদ্যমান থাকিতে হইবে। কিন্তু জনস্বাৰ্থ বিবেচনা করিয়া শরীআত উক্ত নীতির ব্যতিক্রম করারও অনুমতি দিয়াছে এবং নস বিদ্যমান না থাকিলেও জনস্বার্থে শাস্তির ব্যবস্থা করা যাইবে। যেসব কর্ম এই ব্যতিক্রমের আওতাভুক্ত হইবে তাহার পূর্ণ তালিকা প্ৰদান সম্ভব নহে। কারণ এই ব্যতিক্রমের আওতাভুক্ত কাজসমূহ সরাসরি হারাম নহে, বরং কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে নিষিদ্ধ সাব্যস্ত করা হয়। কোন বৈধ কাজকে তখনই শাস্তিযোগ্য সাবস্ত করা যায় যখন তাহা জনস্বার্থ ও শৃংখলার (Public order and administration) জন্য ক্ষতিকর হইয়া দাড়ায়। জনস্বার্থে শাস্তির ব্যবস্থা করার পক্ষে ফকীহগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাদীস দলীল হিসাবে পেশ করিয়াছেন। ‘এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে উট চুরির অভিযোগ দায়ের করা হইলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাহাকে আটক করেন। কিন্তু চুরির অপরাধ প্ৰমাণিত না হওয়ায় তিনি তাহাকে বেকসুর খালাস দেন’।

উপরোক্ত ঘটনায় কয়েদ তাবীরের আওতাভুক্ত একটি শাস্তি, কারণ আসল শাস্তি কেবল অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরই কার্যকর করা যাইত। জনস্বার্থেই তিনি অনুরূপ শাস্তির ব্যবস্থা করেন। কারণ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত স্বাধীনভাবে ছাড়িয়া দিলে তাহার পলায়ন বা আত্মগোপন করার আশংকা থাকিত। সে পলায়ন বা আত্মগোপন করিলে এবং আদালতে দোষী প্ৰমাণিত হইলে তাহার উপর শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব হইত না এবং নিরপরাধ প্রমাণিত হইলে অযথা হয়রানির শিকার হইত। অতএব জনস্বার্থ ও শাস্তি-শৃংখলা রক্ষার স্বার্থেই এই ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা করা যাইতে পারে।

বিপরীত কর্ম করার কারণেও তাযীর প্রযোজ্য হইতে পারে। ফকীহগণের ঐক্যমত অনুযায়ী হারাম কাজে লিপ্ত হইলে অথবা ফরজ কাজ ত্যাগ করিলে তাযীর কার্যকর হইবে। কিন্তু মাকরূহ কাজে লিপ্ত হইলে এবং মানদূব কাজ ত্যাগ করিলে তাহা তায়ীরের আওতাভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে ফকীহগণের মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। তাহাদের একদলের মতে উহা তাযীরের আওতাভুক্ত হইবে।’ এবং অপর দলের মতে তাযীরের আওতাভুক্ত হইবে না। মাকরূহ ও মানদূব-এর সংজ্ঞায় মতপার্থক্য হওয়ার কারণেই এই মতভেদ হইয়াছে।

শাস্তির বিপক্ষ দলের মতে মাকরূহ এমন কাজ যাহা বর্জনের নির্দেশ থাকিলেও তাহা করার এখতিয়ার আছে এবং মানদূব এমন কাজ যাহা করার নির্দেশ থাকিলেও বর্জনের এখতিয়ার আছে। শাস্তি কার্যকর করার পক্ষপাতী দলের মতে মাকরূহ। এমন নিষিদ্ধ কাজ যাহা করার এখতিয়ার (Option) নাই এবং মানদূব এমন কাজ যাহা বর্জনের এখতিয়ার নাই। এই শেষোক্ত দল শাস্তির পক্ষপাতী হওয়া সত্ত্বেও এই পর্যায়ভুক্ত কর্ম বা কর্মবিরতিকে পাপ এবং কর্তাকে পাপী বলেন না, বরং উহাকে ‘বিপরীত কর্ম’ বলেন। এই শেষোক্ত দলের মতে উক্ত কর্ম বা কর্মবিরতি বারবার ঘটিলেই কেবল তাহা শাস্তিযোগ্য হইবে, একবার বা দুইবার ঘটিলে নহে।

তবে বিষয়টি জনস্বার্থ ও শাস্তি-শৃংখলা বিনষ্টকারী হইলে উহার একবার সংঘটনই শাস্তির জন্য যথেষ্ট। হযরত উমার ফারাক (রা)-এর কার্যক্রম এই মতের সপক্ষে দলীল হিসাবে পেশ করা হয়। একদা তিনি এক ব্যক্তিকে অতিক্ৰম করিয়া যাইতেছিলেন। লোকটি একটি বকরী যবোহ করার উদেশে শক্ত করিয়া বাধিয়া উহাকে মাটিতে শোয়াইয়া রাখিয়া স্কুড়িতে শান দিতেছিল। উমর (রা) তাহাকে বেত্ৰাঘাত করেন এবং বলেন, তুমি আগেই ছুড়িতে শান দিলে না কেন?

ধারা-২৮ তাযীর বাধ্যতামূলক হওয়ার শর্ত

নারী-পুরুষ, মুসলিম-অমুসলিম, বালেগ-নাবালেগ নির্বিশেষে যে কোন বুদ্ধিজ্ঞান সম্পন্ন অপরাধীর উপর তাযীর কার্যকর হইবে।

বিশ্লেষণ

অপরাধী বুদ্ধিজ্ঞান সম্পন্ন হইলেই তাযীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হইবে, তাহার বালেগ হওয়া শর্ত নহে এবং সে যে ধর্মেরই অনুসারী হউক, যে লিঙ্গেরই হউক। অবশ্য নাবালেগকে প্রদত্ত শাস্তি শাস্তি হিসাবে গণ্য না হইয়া প্রশিক্ষণ হিসাবে গণ্য হইবে। তাহাকে ভদ্র, সভ্য, অধ্যবসায়ী, কর্মঠ, নিয়মানুবতী ও ধর্মানুরাগী হিসাবে গড়িয়া তোলার জন্য তাহার উপর তায়ীর তাব্দীব হিসাবে কার্যকর হইবে। যেমন মহানবী (সা) :

‘তোমাদের সন্তানগণ সাত বৎসরে পদাৰ্পণ করিতেই তাহাদিগকে নামায পড়ার নির্দেশ দাও। তাহারা দশ বৎসরে পদাৰ্পণ করিলে ইহার জন্য তাহাদিগকে মার।’ ২৫

ধারা-২৯ তাযীর ক্ষমাযোগ্য কিনা

অপরাধ কর্মের ছায়া মানুষের অধিকার খর্ব হইলে বিচারক অপরাধীকে ক্ষমা করিতে পরিবেননা,তবে ক্ষতিগ্ৰস্ত পক্ষ ক্ষমা করিতে পারে।কিন্তু উহার দ্বারা আল্লাহর অধিকার খর্ব হইলে বিচারক তাহার সুবিবেচনা অনুযায়ী অপরাধীকে শাস্তিও দিতে পারেন, ক্ষমাও করিতে পারেন অথবা শুধু তিরষ্কার করিয়াও ছাড়িয়া দিতে পারেন।

বিশ্লেষণ

মানুষের অধিকারে হস্তক্ষেপ, যেমন কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তির ইজতিহানি করিল বা তাহাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করিল বা অনুরূপ অপরাধ। এই ক্ষেত্রে বিচারক অপরাধীকে ক্ষমা করিতে পারেন না। আল্লাহ্র অধিকারে হস্তক্ষেপ, যেমন কোন ব্যক্তি রমযান মাসে সঙ্গত কোন ওজর ব্যতীত প্রকাশ্যে পানাহার করিল, নামায ত্যাগ করিল বা অনুরূপ অপরাধ। এই ক্ষেত্রে বিচারক যদি মনে করেন, অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন, তবে তিনি তাহার শাস্তির ব্যবস্থা করিবেন, আর যদি মনে করেন যে, তাহাকে তিরষ্কার করা বা সতর্ক করিয়া দেওয়াই যথেষ্ট। তবে তিনি তাহাই করিবেন।

ধারা-৩০ তাযীরের আওতায় সম্পদ আটক

তাযীরের আওতায় অপরাধীর মাল ক্রোক করা যাইবে কিন্তু উহা নষ্ট করা যাইবে না এবং অপরাধী সংশোধন হইলে তাহার মাল তাহাকে ফেরত দিতে হইবে।

বিশ্লেষণ

এখানে মাল ক্রোক অৰ্থ অপরাধীর মাল একটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত আটক রাখা, যাহাতে অপরাধী পরিণাম উপলব্ধি করিয়া সংশোধন হইতে পারে। অতঃপর উহা সে ফেরত পাইবে। বিচারক উহা নিজের ব্যক্তিগত ব্যবহারেও লাগাইতে পারিবেন না এবং বায়তুল মালেও যোগ করিবেন না। কারণ কোন মুসলমানের জন্য অপর কোন ব্যক্তির মাল আইনসঙ্গত পন্থা ব্যতীত ভোগদখল করা বৈধ নহে। অপরাধীর সংশোধন হওয়ার ব্যাপারে বিচারক নিরাশ হইলে তিনি তাহার আটককৃত মাল জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করিতে পরিবেন।

ধারা-৩১ শাস্তির সীমা

তাযীরের আওতায় অপরাধীকে তিরস্কার, সতর্কীকরণ, বেত্ৰাঘাত, সম্পদ আটক ও কয়েদ করা যাইতে পারে এবং জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্ৰীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত উন্নীত হইতে পারে।

বিশ্লেষণ

অপরাধ যদি হদ্দের আওতাভুক্ত না হয়, যেমন কেহ অপর কাহাকেও বলিল, তুমি পাপাচারী, চোর, শরাবখোর ইত্যাদি, তবে এইসব ক্ষেত্রে বিচারক অপরাধের তারতম্য অনুযায়ী তিরষ্কার, বেত্ৰাঘাত, কয়েদ ইত্যাদি যে কোন শাস্তির ব্যবস্থা করিতে পারেন। হযরত উমর (রা) যে উবাদা ইবনুস সমিত (রা)-কে আহাম্মক বলিয়াছিলেন তাহা তাযীরের আওতায় তিরস্কার অর্থেই বলিয়াছিলেন, তাঁহাকে অপমান বা খাটো করার উদ্দেশ্যে বলেন নাই। ফকীহগণ এই বিষয়ে একমত যে, তাযীরের পরিমাণ হদ্দের পরিমাণের চাইতে কম হইতে হইবে।

মহানবী (সা) বলেন :

‘যে ব্যক্তি হদ্দ-বহির্ভুত অপরাধে হদ্দের সমান শাস্তি দিল সে সীমা লঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’

অবশ্য সার্বিক কল্যাণের দিক বিবেচনা করিয়া আইন প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষ হদ্দের পরিমাণের অধিক শাস্তিও দিতে পারেন।

জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনা করিয়া অপরাধীকে তাযীরের আওতায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাইতে পারে। হানাকী ফিকহ-এ ইহার জন্য ‘রাজনৈতিক হত্যা’ পরিভাষা ব্যবহার করা হইয়াছে। বিচারক যদি মনে করেন যে, অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ব্যতীত সামাজিক নিরাপত্তা ও শাস্তি-শৃংখলা ফিরাইয়া আনা সম্ভব নহে। তবে সেই ক্ষেত্রে তিনি অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দিতে পারেন। যেমন কোন ব্যক্তি বারবার চৌর্যকর্মে, শরাবপানে বা পশ্চাদ্বারে যেনায় লিপ্ত হইলে অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়।২৯

সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) বলেন :

‘মহানবী (সা) সফরে থাকাকালে তাঁহার নিকট এক গুপ্তচর আসিল এবং তাঁহার কোন এক সাহাবীর নিকট বসিয়া কথাবার্তা বলিল, অতঃপর কাটিয়া পড়িল। মহানবী (সা) বলিলেন; তোমরা তাহার অনুসন্ধান করিয়া তাহাকে হত্যা কর। আমি (সালামা) তাহাদের সকলের আগে যাইয়া তাহাকে হত্যা করিলাম। মহানবী (সা) গুপ্তচরের সঙ্গের মালপত্র আমাকে প্ৰদান করেন।’

‘এক ব্যক্তি মহানবী (সা)-কে গালিগালাজ করিত। তাহাকে বারণ করা হইলেও সে বিরত থাকিল না। এমনকি তাহাকে হুমকি প্ৰদান করা হইলেও সে তাহাতে কৰ্ণপাত করিল না। এক মুসলিম ব্যক্তি তাহাকে হত্যা করিলে বিষয়টি মহানবী (স)-এর নিকট উত্থাপিত হইল। তিনি তাহার রক্ত নিষ্ফল বলিয়া রায় দিলেন।’

শরীআত তাযীরের আওতাভুক্ত অপরাধ এবং শাস্তি বৰ্ণনা করিয়াছে। বিচারক বিবেচনা করিয়া দেখিবেন যে, অপরাধকর্মটি শরীআতের কোন নস দ্বারা সমর্থিত এবং এই জাতীয় অপরাধের জন্য শরীআত কোন ধরনের শাস্তির প্রস্তাব করে, অতঃপর তিনি তাহার রায় প্ৰদান করিবেন। শরীআত বিচারককে এই অধিকার প্রদান করিয়াছে যে, তিনি তাহার বিবেচনামতে অপরাধীকে এক বা একাধিক প্রকারের শাস্তি প্রদান করিতে পারেন। অপরাধের ধরন, অপরাধ সংঘটনের পরিবেশ এবং অপরাধীর অবস্থা বিবেচনা করিয়া তিনি তাহাকে ছাড়িয়াও দিতে পারেন। তিনি নিজ বিবেচনায় হালকা অথবা কঠোরতর শাস্তির ব্যবস্থাও করিতে পারেন।

ধারা৩২ () তাধীর নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষ

(ক) আইন প্ৰণয়নকারী কর্তৃপক্ষ তাযীরের আওতাধীন অপরাধসমূহের শাস্তি নির্ধারণ করিবেন।

(খ) তাযীরের আওতায় প্রদত্ত যে কোন শাস্তি নস দ্বারা সমর্থিত হইতে হইবে।

বিশ্লেষণ

তাযীরের আওতায় যেসব শাস্তি প্ৰদান করা হইবে তাহা নস দ্বারা সমর্থিত হইতে হইবে। ইসলামী আইনের অধীনে তাযীরের আওতাভুক্ত শাস্তিসমূহ হইল উপদেশ দান, (সাময়িকভাবে) সম্পর্কচ্ছেদ, সাতকীকরণ, ভীতিপ্ৰদৰ্শন, হালকা মারধর, বেত্ৰাঘাত, তিরস্কার, কয়েদ, জরিমানা, ক্ষতিপূরণ, জনসমক্ষে অপমান, নির্বাসন, ফাঁসি, মৃত্যুদণ্ড ইত্যাদি। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে :

‘তোমরা তাহাদের মধ্যে যাহাদের অবাধ্যতার আশংকা কর তাহার-দরকে সদুপদেশ দাও, অতঃপর তাহাদের শয্যা বর্জন কর এবং তাহাদেরকে প্রহার কর। যদি তাহারা তোমাদের অনুগত হয় তবে তোমরা তাহাদের বিরুদ্ধে কোন পথ অন্বেষণ করিও না। নিশ্চয় আল্লাহ্ মহান, শ্রেষ্ঠ।’ (সূরা নিসা : ৩৪)।

উপরোক্ত আয়াত দ্বারা পৰ্যায়ক্রমে তিন প্রকারের তাযীর অনুমোদিত হইয়াছে–সদূপেদেশ, সম্পর্কত্যাগ ও মারধর। উপরোক্ত তিনটি বিষয়ের কোনটিই হন্দের আওতাভুক্ত শাস্তি নয়। অতএব যেসব অপরাধের ক্ষেত্রে হদ্দ বা কাফফারা নির্ধারিত নাই, সেইসব ক্ষেত্রে উপরোক্ত শাস্তি প্ৰযোজ্য হইতে পারে। বিছানা পৃথক করা ছাড়াও সম্পর্কত্যাগ বিভিন্নরূপে হইতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যে তিনজন সাহাবী তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করিয়া মদীনায় থাকিয়া যান, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর জনগণকে তাহাদের সহিত কথাবার্তা বলিতে, সামাজিক লেনদেন করিতে, এমনকি তাহদ্দের স্ত্রীদেরকে তাহদ্দের সহিত একত্রে বসবাস করিতে নিষেধ করেন, যাবত না আল্লাহর পক্ষ হইতে কোন ফয়সালা আসিয়া যায়। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) সুবাই নামক এক ব্যক্তিকে বেত্ৰাঘাত ও নির্বাসন দণ্ড প্ৰদান করেন এবং জনগণকে তাহার সহিত কথাবার্তা বলিতে নিষেধ করেন। যে প্রদেশে তাহাকে নির্বাসনে প্রেরণ করা হইয়াছিল সেই প্রদেশের আমোল (প্ৰশাসক) উমর (রা)-কে অপরাধীর সংশোধন হওয়ার কথা অবহিত করার পর তিনি তাহার উপর হইতে উক্ত দণ্ড প্রত্যাহার করেন।’ মহানবী (সা) বলেন, :

‘যে ব্যক্তি তাহার ঘরের এমন জায়গায় তাহার চাবুক ঝুলাইয়া রাখে যেখান হইতে তাহা তাহার পরিবারের লোকদের নজরে পড়ে, আল্লাহ্ তাআলা তাহাকে অনুগ্রহ করুন।’

‘তোমার পরিবার হইতে লাঠি তুলিয়া রাখিও না।’

উপরোক্ত দুইটি হাদীস দ্বারা শাস্তির ভয় দেখানো ও সতর্ক করার কথা বলা হইয়াছে এবং শিশুদেরকে দশ বৎসরে পদার্পণের পর নামাযে অভ্যন্ত করার জন্য মারপিট করার কথা বলা হইয়াছে। অপরাধীকে তিরষ্কারের শাস্তিও নস দ্বারা প্ৰমাণিত।

‘আবু যার (রা) বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে গালি দেই এবং তাহার মায়ের বংশের খোটা দিয়া তাহার আত্মসম্মানে আঘাত হানি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, হে আবু যার! তুমি তাহার মাতার বংশের খোটা দিয়া তাহার আত্মসন্মানে আঘাত হানিলে! তোমার মধ্যে এখনো জাহিলিয়াতের কালিমা রহিয়া গিয়াছে।’

‘একটি ক্রীতদাস রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে উপস্থিত জনসমক্ষে আবদুর রহমান ইবন আওফ (রা)-এর সহিত বিতর্কে লিপ্ত হয়। আবদুর রহমান (রা) ক্রোধান্বিত হইয়া দাসটিকে এই বলিয়া গালি দেন যে, হে কৃষ্ণাঙ্গ নারীর পুত্র। ইহাতে নবী (সা) অত্যন্ত রাগান্বিত হন এবং নিজের ডান হাত উপরে উত্তোলন করিয়া বলেন : ন্যায়সংগত সনদ ব্যতীত কৃষ্ণাঙ্গিনীর পুত্রের উপর শ্বেতাঙ্গিনীর পুত্রের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নাই। আবদুর রহমান (রা) অনুতপ্ত ও লজ্জিত হইয়া তাহার গণ্ডদেশ মাটিতে রাখিয়া ক্রীতদাসকে বলেন, তুমি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ইহাকে পদদলিত কর।’

উপরোক্ত হাদীসদ্বয়ের প্রথমোক্তটিতে আবু যার (রা)-কে এবং শেষোক্তটিতে আবদুর রহমান ইবন আওফ (রা)-কে রাসূলুল্লাহ্ (সা) অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তিরষ্কার করেন।

কারাগারে নিক্ষেপ এবং ফাঁসির দণ্ডও সুন্নীত দ্বারা প্রমাণিত।

‘মহানবী (সা) হইতে বৰ্ণিত আছে যে, তিনি এক ব্যক্তিকে যেনার অপবাদ আরোপের অভিযোগে আটক করিয়াছিলেন এবং আবু নাব নামীয় এক ব্যক্তিকে পাহাড়ের উপর জীবন্ত ফাঁসি দিয়াছিলেন।’

তাযীরের আওতায় মৃত্যুদণ্ড প্রদানের শাস্তিও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। মহানবী (সা) বলেন :

‘তোমরা এক ব্যক্তির শাসনাধীনে থাকা অবস্থায় যদি কোন ব্যক্তি আসিয়া তোমাদের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট করিতে চায়। তবে তোমরা তাহাকে হত্যা কর।’

‘অপর বর্ণনায় আছে, অচিরেই অনিষ্ট ও বিপদাপদের প্রাদুর্তাব হইবে। কোন ব্যক্তি এই উম্মতের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট করিতে চাহিলে তোমরা তাহাকে তরবারির আঘাত হান (হত্যা কর), সে যেই হউক না কেন।’

অনুরূপভাবে অর্থদণ্ড, ক্ষতিপূরণ, অপরাধীকে জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করা (বিশেষত অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, প্রতারণা ইত্যাদির ক্ষেত্রে), নির্বািসনদণ্ড ইত্যাদিও সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।

ধারা৩২ () নস নসবহির্ভূত তাযীর

(ক) তাযীরের আওতাভুক্ত যেসব অপরাধ ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় শাস্তি-শৃংখলার জন্য স্থায়ীভাবে ক্ষতিকারক সেইসব অপরাধ মনসা দ্বারা চিহ্নিত;

(খ) রাষ্ট্র যেসব কাজ পরিবেশ-পরিস্থিতিয় প্ৰেক্ষাপটে রাষ্ট্ৰীয় সংগঠন ও শৃংখলার পরিপন্থী বিবেচনা করিবে উহাকে অবৈধ ঘোষণা করিবে এবং এজন্য যে নীতিমালা প্ৰণীত হইবে তাহা সংশ্লিষ্ট কাজটি অপরাধ হিসাবে গণ্য হওয়ায় পক্ষে নস-এর স্থলাভিষিক্ত বিবেচিত হইবে।

বিশ্লেষণ

ইসলামী শরীআতে তাযীরের আওতাভুক্ত অপরাধের প্রমাণে নস বিদ্যমান। ইসলামী শরীআত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষকে (উলিল আমর) রাষ্ট্ৰীয় সংগঠন, শৃংখলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য নীতিমালা প্রণয়নের এবং এই নীতিমালা লংঘনকারীর শাস্তিবিধানের অধিকার প্রদান করিয়াছে। একথা সুস্পষ্ট যে, তাযীরের অধীন কোন কোন অপরাধ প্রমাণের জন্য কুরআন-সুন্নাহ্‌র নস বিদ্যমান থাকিলেও কোন কোন অপরাধ প্রমাণের জন্য এই জাতীয় নস বিদ্যমান নাই। যেমন শরীআতে সূদের লেনদেন হারাম তথা একটি অপরাধকর্ম হিসেবে নিস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোন নস-এ ইহার শাস্তি বর্ণিত হয় নাই। এই ক্ষেত্রে শাস্তির ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণের বিষয়টি সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের উপর ন্যস্ত করা হইয়াছে। তবে শর্ত এই যে, সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত নীতিমালা শরীআতের বিধান, উহার প্রাণসত্তা ও উহার উসূলের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ হইতে হইবে।

ধারা-৩২ (গ) হদ্দ তাযীরের সমাবেশ

প্রয়োজনবোধে হদ্দের আওতাভুক্ত অপরাধীকে একই সংগে হাদ ও তাযীরের শাস্তি প্ৰদান করা যায়।

বিশ্লেষণ

ইসলামী আইনের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী হদ্দের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধীকে একইসঙ্গে তাযীরের আওতায় শাস্তি দেয়া যায় না। কিন্তু জনস্বার্থ ও শাস্তি-শৃংখলা রক্ষার প্রয়োজনে। একই সঙ্গে উভয়বিধ শাস্তি প্ৰদান করা যাইতে পারে। এই বিষয়ে চার মাযহাবের রায়ই বিদ্যমান আছে। ইমাম মালেক (র)-এর মতে মৃত্যুদণ্ড ব্যতীত হদ্দ ও কিসাসের আওতাভুক্ত অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীকে একইসঙ্গে হাদ ও তাযীরের শাস্তি প্ৰদান করা যায়।

ইমাম শাফিঈ (র)-এর মতেও উভয়বিধ শাস্তি একত্রে প্রদান করা যাইতে পারে। যেক্ষেত্রে আইনত হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা যায় না, যেমন পিতাপুত্রকে হত্যা করিলে তাহাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত না করিয়া তাহার উপর দিয়াত প্ৰদান বাধ্যকর হয়, সেই ক্ষেত্ৰে দিয়াত আরোপের সঙ্গে সঙ্গে তাযীরের আওতায়ও শাস্তি প্ৰদান করা যায়। ইমাম শাফিঈয় মতে মদ্যপানের শাস্তি চল্লিশ বেত্ৰাঘাত, ইহার অতিরিক্ত বেত্ৰাঘাত করা হইলে তাহা তাবীর হিসাবে গণ্য।

ইমাম আবু হানীফা (য়)-এর মতে অবিবাহিত যেনাকারীকে নির্ধারিত শাস্তি প্রদানের অতিরিক্ত নির্বাসন দণ্ড প্ৰদান করা হইলে এই শেষোক্ত দণ্ড তাযীর হিসাবে গণ্য হইবে। তাঁহার মতে মূল শাস্তির সহিত নির্বাসন দণ্ডও যুক্ত হইতে পারে।’

————-

তথ্য নির্দেশিকা

(সংশোধন করা হয় নি)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *