০১৪. আসহাবুল ফীলের ঘটনা

অতঃপর আবরাহা সানাতে কুল্লাইস নামে এমন একটি গীর্জা তৈরী করে, তৎকালীন বিশ্বে যার সমতুল ও সদৃশ কোন ঘর ছিল না।[৭.এটাই হলো সেই ঐতিহাসিক গীর্জা, যাকে আবরাহা পবিত্র কা’বার বিকল্প হিসেবে তৈরী করেছিলো। আরবরা কা’বার পরিবর্তে ঐ গীর্জাকে হজ্জের কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করুক, ঐ গীর্জার এলাকার হজ্জকে স্থনান্তরিত করুক এটাই ছিল তার অভিলাষ।]

অতঃপর সে নাজাশীকে পত্র লিখলো, “হে রাজা, আমি আপনার জন্য এমন একটি গীর্জা গড়েছি, যার তুলনা ইতহাসে পাওয়া যায় না। আরবদের হজ্জকে আমি এই গীর্জার এলাকায় স্থনাস্তরিত না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হবো না।”নাজাশীর কাছে লেখা আবরাহার এই চিঠির কথা অচিরেই আরবদের জানাজানি হয়ে লেল। তারা ভীষণ ক্ষুদ্ধ হলো।বনী কিনানা গোত্রে রক্তপাত নিষিদ্ধ হওয়ার মাসকে হালাল করণের প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী একটা গোষ্ঠী। [৮.এই গোষ্ঠীকে বলা হতো নাসায়াহ। জিলকদ, জিলহজ্জ ও মুহাররম এই তিন মাসকে এক নাগাড়ে রক্তপাতহীন মাস হিসেবে পালন করা আরবদের পক্ষে কষ্টকর ছিল। নরহত্যার মাধ্যমে ডাকাতি লুটতরাজ ইদ্যাদি করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ চলতো। এজন্য এক নাগাড়ে তিন মাস নিষিদ্ধ মাস যাপন তদের কাছে বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিল। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হজ্জ সমাপন করে মিনা থেকে ৮এর বাকী অংশ …. বেরিয়ে লোকজনের সামনে নিম্নরূপ ঘোষণা উচ্চারণ করতো, “আমি সেই ব্যক্তি যার কোন কলংক নেই, যার হুমকির কোন জবাব আসে না এবং যার সিদ্ধান্ত কেউ পাল্টাতে পারে না।” সবাই সমস্বরে বলতো, “আলবৎ! আলবৎ!!” অতঃপর পুনরায় সবাই বলতো, “আমাদের একটা নিষিদ্ধ মাস পিছিয়ে দাও। মুহাররম মাসটা হালাল করে দাও এবং তার বদলে সফর মাস নিষিদ্ধ বলে গণ্য কর।” এটাই নাসা বা হারাম মাসকে মনগড়[ভাবে পিছিয়ে নেয়াপর প্রক্রিয়া। এটা একটা জাহেলী রেওয়াজ এবং সম্পূর্ণ অনৈসলামিক রীতি।-অনুবাদক]

তাদের একজন রগচটা লোক গোপনে গিয়ে আবরাহার ঐ গীর্জায় পয়াখানা করে রেখে আবার নিজের বসতিতে ফিরে এলো।

যথাসময়ে ব্যাপারট আবরাহার কানে গেল। সে লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো,

“এই কা-টা কে করলো?” লোকেরা জানালো, “জনৈক আরব এ কাজ করেছে। সে মক্কার কা’বাঘরে হজ্জ আদায়কারীদের দলভুক্ত। আপনি মক্কা থেকে এখানে হজ্জ স্থানান্তর করতে ইচ্ছুকÑ একথা শুনে সে রেগে গিয়ে এ কাজ করেছে। এ দ্বারা সে প্রমাণ করতে চায় যে, এই গীর্জা কা’বার বিকল্প হতে পারে না এবং এটা হজের কেন্দ্র হবার যোগ্য নয়।”

আবরাহা তো রেগেই আগুন। সে শপথ করলো যে, যেমন করেই হোক সে কা’বাকে ধ্বংস করবেই। হাবশীদেরকে সে তার অভিপ্রায় জানালো। হাবশীরা সব রকমের উপকরণ ও সরঞ্জাম দিয়ে তাকে প্রস্তুত হতে সাহায্য করলো। যথাসময়ে সে একদল হস্তীনিয়ে কা’বা অভিযানে বেরিয়ে পড়লো। আরবরা ব্যাপারটা জানতে পেরে ভীষণ প্রমাদ গুনলে এবং ভীত সন্ত্রন্ত হয়ে পড়লো। আল্লাহর পবিত্র ঘর কা’বাকে আবরাহা ধ্বংস করতে চায় শুনে আরবরা উপলব্ধি করলো যে, হানাদরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা তাদের একান্ত কর্তব্য

ইয়ামানের জনৈক সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী নাগরিক ‘যূ-নফর’ সমগ্র ইয়মানবাসী ও অন্যান্য আরবদেরকে আহ্বান জানালেন কা’বা শরীফকে রক্ষা করার জন্য আরাহার বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। যারা তার আহ্বানে সাড়া দিল। তদের নিয়ে যূ-নফর আবারাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন। কিন্তু তিনি ও তাঁর বাহিনী পরাজিত হলেন এবং যূ-নফর বন্দী হলেন। এরপর আবরাহা তার ইস্পিত লক্ষ্যে এগিয়ে গেলো। খাস’য়াম উপজাতীয়দের এলাকায় পৌঁছলে নুফাইল ইবনে হাবীব আল্ খাসয়ামী দু’টি খাসয়ামী গোত্র শাহরান ও নাহিস এবং আরো কয়েকটি সমমনা আরব গোত্রকে সাথে নিয়ে আবরাহার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। যুদ্ধে নুফাইলও সদলবলে পরাজিত ও বন্দী হলেন। আবরাহা নুফাইলকে মুক্তি দিলে সুফাইল তার পথ প্রদর্শক হিসেবে সহযাত্রী হলেন। আবরাহা যখন তায়েফের উপর দিয়ে এগিয়ে চলছিল, তখন সাকীফ গোত্রের কিছু লোকজন সাথে নিয়ে মাসউদ ইবনে মু’আততিব তার সাথে সাক্ষাৎ করলো এবং তাকে বললো, “হে রাজা, আমরা একান্ত অনুগত গোলাম তুল্য। আপনার বিরোধী নই আমরা। আপনি যে ঘর লক্ষ্য করে চলেছেন, ওটা আমাদের উপাসনার ঘর নয়। আপনি তো চাইছেন মক্কার ঘরে হামলা চালাতে। বেশ আমরা আপনার পথপ্রদর্শক হিসেবে একজন লোক সঙ্গে দিচ্ছি। সে আপনাকে দেখিয়ে দেবে কা’বা ঘর।” আবরাহা তাদের প্রতি প্রীত ও সদয় হলো। তায়েফবাসী তার সাথে আবু রিগাল নামক এক ব্যক্তি কে মক্কার পথ দেখিয়ে দেয়ার জন্য পাঠালো। আবরাহা ও তার দলবলকে সাথে নেয়ে মুগাম্মাস[৯.তায়েফগামী পথে মক্কার নিকটবর্তী একটি স্থানের নাম।]নামক স্থানে উপনীত হলে আবু রিগাল মারা গেল। পরবর্তীকালে আরববাসী আবু রিগালের কবরে পাথর নিক্ষেপ করতো এবং আজও মুগাম্মাসে তার কবরে লোকেরা পাথর নিক্ষেপ করে থাকে।

আবরাহা মুগাম্মাসে যাত্রাবিরতি করার সময় আসওয়াদ বিন মাকসূদ নামক জনৈক হাবশী নাগরিককে ঘোড়ায় চড়িয়ে মক্কা পরিদর্শনে পাঠায়। আসওয়াদ মক্কা পর্যন্ত যায় এবং ফিরে আসার সময় উপত্যকায় চারনভূমিতে বিচরণশীল কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের লোকদের গবাদি; পশু ধরে নিয়ে আসে। এইসব গবাদি পশুর মধ্যে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিমের দুশো উটও ছিল। তিনি ঐ সময় কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও বড় নেতা ছিলেন। গবাদি পশু ধরে নিয়ে আসার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ ঐ এলাকার কুরাইশ, কিনানা ও হুযাইল গোত্র আবরাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে চেয়েছিল। কিন্তু নিজেদের অক্ষমতা বুঝতে পেরে তারা সে ইচ্ছা পরিহার করে।

আবরাহা হুনাতাহ আল্ হিমইয়ারীকে মক্কায় পাঠাবার সময় বলে দিল, “প্রথমে মক্কার সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ও নেতা যিনি, তাঁকে চিনে নিও। অতঃপর তাঁকে বলো, রাজা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে আসেননি। এসেছেন শুধু কা’বা ঘরকে ধ্বংস করতে। তোমরা যদি আমাদেরকে একাজে বাধা দিতে কোন যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত না হও তাহেল তোমাদের রক্তপাতের কোন ইচ্ছা আমাদের নেই। তিনি যদি আমার সাথে যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক না হয়ে থাকেন তাহলে তাঁকে আমার কাছে নিয়ে আসবে।”

হুনাতাহ মক্কায় প্রবেশ করে খোজ নিয়ে জানতে পারলো, মক্কায় সমচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ও নেতা হলেন আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম। সে আবদুল মুত্তালিবের কাছে উপস্থিত হলে এবং রাজা তকে যা বলতে বলেছিলো তা বললো। আবদল মুত্তালিব বললেন, “আল্লাহর কসম, আমরা তার সাথে যুদ্ধ করতে চাইনে এবং সে ক্ষমতাও আমাদের নেই। এটা আল্লাহর পবিত্র ঘর। এটা তাঁর নিজস্ব ঘর ও নিজস্ব সম্ভ্রমের ব্যাপার। আর যদি তিনি বাধা না দেন তবে আমাদের কিছু করার থাকবে না।”

তখন হুনাতাহ বললো, “আপনি আমার সাথে রাজার কাছে চলুন। কারণ তিনি আমাকে আদেশ করেছেন আপনাকে সঙ্গে করে তার কছে নিয়ে যেতে।” আবদুল মুত্তালিব তাঁর এক পুত্রকে সাথে নিয়ে আবরাহার নিকট চললেন। আবরাহার সৈন্যদের কাছে পৌঁছেই তিনি যূ-নফর নম্পর্কে খোঁজ নিলেন, যিনি তাঁর বন্ধু ছিলেন। বন্দী যূ-নফরের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। তিনি কললেন, “হে যূ-নফর, আমাদের উপর যে বিপদ নেমে এসেছে, তার প্রতিকারে তোমার দ্বারা কি কোন সাহায্য হতে পারে?” যূ-নফর বললো, “এমন একজন রাজবন্দীর কি-ইবা সাহায্য করার ক্ষমতা থাকতে পারে, যে প্রতি মুহূর্তে প্রহর গুনছে, এই বুঝি তাকে হত্যা করা হয়? আমার বাস্তবিকই তোমাদের এই মুসিবতে তেমন কিছু করার নেই। তবে আনীস নামক একজন মাহুত আছে। সে আমার বন্ধু। তাকে আমি বার্তা পাঠাচ্ছি। তোমার উচ্চ মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে তাকে অবহিত করবো ও রাজার কাছে তুমি যাতে নিজের বক্তব্য পেশ করতে পার সেজন্য তাকে অনুমতি চেয়ে দিতে বলবো। এমনকি সম্ভব হলে সে যাতে তোমার ব্যাপারে সুপারিশও করে, সেজন্য তাকে অনুরোধ করবো।” আবদুল মুত্তালিব বললেন, “এটুকুই যথেষ্ট হবে।” এরপর যূনফর আনীসের নিকট এই বলে বার্তা পাঠালো, “শোনো! আবদুল মুত্তালিব হলেন কুরাইশদের একচ্ছত্র অধিপতি। মক্কার বণিক সমাজের নেতা। উপত্যকাভূমিতে মানুষের এবং পাহাড় পর্বতের বন্য পশুর খাদ্য সরবরাহকারী হিসেবে তিনি পরিচিত। যেসব পশু রাজার হস্তগত হয়েছে, তন্মধ্যে দু’শত উট এই আবদুল মুত্তালিবের। সুতরাং তুমি রাজার সাথে সাক্ষাতের বন্দোবস্ত করে দাও এবং যতটা পার তাঁর উপকার কর।” আনীস বললো, “ঠিক আছে। আমি সাধ্যমত চেষ্টা করব।” আনীস আবরাহাকে বললো, “হে রাজা, কুরাইশদের নেতা আপনার দরবারে উপস্থিত। তিনি আপনার সাথে দেখা করতে চান। তিনি মক্কায় বণিকদের দলপতি। তিনি উপত্যকা ভূমিতে যেমন মানুষের আহার করান, তেমনি পর্বত শীর্ষের বন্য পশুর খাদ্য সরবরাহকারী বলেও সুখ্যাত। অনুগ্রহপূর্বক তাঁকে সাক্ষাতের অনুমতি দিয়ে তাঁর দাবী-দাওয়া পেশ করতে দিন।” আবরাহা তাঁকে অনুমতি দিলো।

আবদুল মুত্তালিব ছিলেন সেই সময়কার শ্রেষ্ঠতম সুদর্শন এবং অতি গণ্যমান্য ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। আবরাহা তাঁকে দেখেই মুগ্ধ ও অভিভূত হলো। সে আবদুল মুত্তালিবকে এতখানি সম্মানিত মনে করলো যে, নিজে উচ্চ আসনে বসে তাঁক নীচে বসতে দিতে পারলো না। পক্ষান্তরে হাবশীরা তাঁকে রাজার সাথে একই রাজকীয় আসনে উপবিষ্ট দেখুক, তাও পছন্দ করলো না। অগত্যা আবরাহা স্বীয় রাজকীয় আসন থেকে নেমে নীচের বিছানায় বসলো এবং আবদুল মুত্তালিবকে সেখানে নিজের পাশে বসালো অতপর দোভাষীকে বললো, “তাঁকে বক্তব্য পেশ করতে বলো।” দোভাষী আদেশ পালন করলো। আবদুল মুত্তালিব বললেন, “আমার অনুরোধ, আমার যে দুশো উট রাজার হাতে এসেছে, তা ফেরত দেয়া হোক।” দোভাষী যখন একথা আবরাহাকে জানালো তখন আবরাহা দোভাষীর মাধ্যমে বললো,“তোমাকে প্রথম দৃষ্টিতে যখন দেখেছিলাম তখন অবিভূত হয়েছিলাম কিস্তু এখন তোমার কথা শুনে তোমার প্রতি আমার ভীষণ বীতশ্রদ্ধা জন্মে গেছে। এচা খুবই আশ্চর্যজনক যে, তুমি আমার সাথে আমার হস্তগত দুশো উটের দাবী নিয়ে কথা বলছো। অথচ তোমার ও তোমার বাপদাদার ধর্মের কেন্দ্র যে কা’বাগৃহ, আমরা সেটাকে ধ্বংস করতে এসছি এ কথা জেনেও তুমি সে সম্বন্ধে কিছুই বলছো না।” আবদুল মুত্তালিব বললেন, “আমি শুধু উটেরই মলিক। কা’বা গৃহের মালিক আর একজন আছন, তিনিই তাঁর ঘর রক্ষা করবেন।” আবরাহা বললো,“আমার আক্রমণ থেকে তিনি এ ঘরকে ঠেকাতে পারবেন না।” আবদুল মুত্তালিব বললেন,“ সেটা আপনার আর কা’বা ঘরের মলিকের ব্যাপার।”

আবরাহা আবদুল মুত্তালিবের উট ফিরিয়ে দিলো। আবদুল মুত্তালিব কারাইশদের কাছে গেলেন এবং তাদেরকে সমস্ত ব্যাপারটা জানালেন। তিনি তাদেরকে মক্কা থেকে বেরিয়ে পার্শ্ববর্তী পাহাড় পর্বতের গোপন গুহাগুলোতে আশ্রয় নিয়ে আবরাহার সৈন্যদের সম্ভাব্য নির্যাতন থেকে আত্নরক্ষা করার নির্দেশ দিলেন। এরপর আবদুল মুত্তালিব নিজে কুরাইশদের একদল লোককে সাথে নিয়ে কা’বার দরজার চৌকাঠ আঁকড়ে ধরে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর কাছে আবরাহা ও তার সৈন্য সামন্তের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে তাঁর সাহায্য কামনা করে দোয়া করতে লাগলেন। আবদুল মুত্তালিব কা’বার চৌকাঠ ধরে বলতে লাগলেন,

“হে আল্লাহ, একজন বান্দাও তার দলবলকে রক্ষা করে থাকে। অতএব তুমি তোমার অনুগত লোকদেরকে রক্ষা কর। ওদের ক্রুশ বলবিক্রম যেন তোমার শক্তির উপর জয়যুক্ত না হয়। আমাদের কিবলাকে তুমি যদি ওদের করুণার ওপর ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকো তাহলে যা খুশি কর!”

এপর আবদুল মুত্তালিব কা’বার দরজার চৌকাঠ ছেড়ে দিলেন এবং তিনি ও তাঁর কুরাইশ সঙ্গীরা পর্বত গুহায় আশ্রয় নিলেন। সেখানে বসে তারা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন আবরাহা মক্কায় ঢুকে কি করে।

পরদিন প্রত্যুষে আবরাহা মক্কায় প্রবেশ করার প্রস্তুতি নেতে লাগলো। তার হস্তী বাহিনী ও সৈন্য বাহিনীকে সুসংহত করলো। তার হাতীর নাম ছিল মাহমুদ। আবরাহার সংকল্প ছিল, প্রথমে কা’বাকে ধ্বংস করবে, অতঃপর ইয়ামান ফিরে যাবে। হস্তী বাহিনীকে মমক্কা অভিমুখে পরিচালিত করলে নুফাইল ইবনে হাবীব এগিয়ে এলো এবং আবরাহার হাতীর পাশে দাঁড়ালো। অতঃপর সে হাতীর কান ধরে বললো, “হাঁটু গেড়ে বসে পড়ো। নচেত যেখান থেকে এসেছো ভালোয় ভালোয় সেখানে ফিরে যাও। জেনে রেখো তুমি আল্লাহর পবিত্র নগরীতে রয়েছো।” অতঃপর কান ছেড়ে দিতেই হাতী হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। নুফাইল হাতীকে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে কোন রকমে পাহাঢ়ের ওপর চড়ালো। এরপর অনেক মারধোর করেও হাতীকে ওঠানে সম্ভব হলোনা। অতঃপর তার শুঁড়ের ভেতর আঁকাবাঁকা লাঠি ঢুকিয়ে রক্তাক্ত করে দেয়া হলো যাতে হাতী উঠে দাঁড়ায়। তবুও উঠলোনা। অতঃপর তাকে পেছনের দিকে ইয়ামান অভিমুখে ফিরতি যাত্রা করার জন্য চালিত করা মাত্রই ছুটতে আরম্ভ করলো। সিরিয়ার দিকে চালিত করলেও জোর কদমে চলতে লাগলো। অতঃপর যেই মক্কার দিকে চালিত করা হলো অমনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। ঠিক এই সময়ে আল্লাহ তায়ালা সমুদ্রের দিক থেকে এক ধরনের কালো পাখী পাঠালেন। প্রতিটি পাখিীর সাথে তিনটি করে পাথরের নুড়ি ছিল। একটা তার ঠোঁটে আর দুটো দুইপায়ে। পাথরগুলো কলাই ও বুটের মত। যার গায়েই সেগুলো পড়তে লাগলো, সে-ই তৎক্ষণাৎ মরতে লগলো। কিন্তু সবার গায়ে পড়তে পারলোনা। অনেকেই পালিয়ে যেখান থেকে এসেছে সেদিকে ফিরে যেতে লাগলো। লোকেরা রাস্তার যেখানে সেখানে পড়ে মরতে লাগলো। আবরাহার গায়ে একটা গুড়ি পড়তেই সে তৎক্ষনাৎ মারা গেল। ইবনে ইসহাক বলেন,

আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসেবে পাঠানোর পর এই ঘটনাকে কুরাইশদের প্রতি তাঁর বিশেষ করুণা ও অনুগ্রহ হিসেবে উল্লেখ করেন। কেননা এর মাধ্যমেই তিনি হাবশীদের পরাধীনতার বিপদ থেকে তাদেরকে উদ্ধার করেছিলেন। যাতে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য বহাল থাকে। আল্লাহ সূরা ফীলে বলেন,

[আরবী ***********]

“তুমি কি দেখনি, তোমার প্রতিপালক হাতীওয়ালাদের সাথে কি রকম আচরণ করেছিলেন? তিনি কি তাদের চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দেননি? তিনি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী পাঠিয়েছিলেন, যারা তাদের প্রতি কঠিন কংকর নিক্ষেপ করছিলো আর এভাবে তাদেরকে চর্বিত ভূষি বা ঘাসের মত বানিয়ে দিয়েছিলেন।”

One thought on “০১৪. আসহাবুল ফীলের ঘটনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *