০০৭. সীরাতে ইবনে হিশামের বক্ষ্যমাণ সংক্ষিপত রূপ

যৌবনের প্রারম্ভে আমি এই গ্রন্থখানা আগাগোড়া পড়বার জন্য বার বার চেষ্টা করতাম কিন্তু এর রচনা পদ্ধতির বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীনতা ঘোর মানসিক পীড়া ও একঘেঁয়েমী সৃষ্টি করতে। ফলে খানিকটা এখান থেকে খানিকটা ওখান থেকে পড়তাম। ভাষার মাধুর্য ও লালিত্য এবং বিষয়বস্তুর মাহাত্ন্যই আমাকে এইসব বিচ্ছিন্ন অংশগুলো পড়তে আকৃষ্ট করতো। ঐ অংশগুলো আমার কাছে ঊষর মরুভূমিতে পুষ্পকাননের মত উপভোগ্য মনে হতো।

আসলে কুরআন-হাদীস পড়লে মনে যে নিখাদ বন্দেগীর ভাব জাগে ও ঐকান্তিক আনুগত্যবোধ অনুভূত হয় সীরাত বিষয়ক বই-পুস্তক পড়লে আমি ঠিক তেমনি ধরনের অসুভূতি লাভ করতাম। মনে হয়, কি এক অজানা রহস্যের দুর্বার আকর্ষণে আমি বার বার ওটা পড়তে চাইতাম। আমার মরহুম পিতাও সীরাত বিষয়ের একজন গ্রন্থাকার ছিলেন। “তালখিছুদ দুরুসিল আওয়ালিয়াহ ফিস সীরাতিল মুহাম্মাদিয়া” নামে তিনি ত্রিশটি অধ্যায়ে সমাপ্ত একখানা সংক্ষিপ্ত রচনা করেন। দীর্ঘদিন ব্যাপী ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ওটাই ছিাল একমাত্র পাঠ্যপুস্তক। বলা বাহুল্য,তৎকালে সীরাত ছিল বিদ্যালয়গুলোর অন্যতম পাঠ্য বিষয়।

এতদসত্বেও সীরাতে ইবনে হিশাম গ্রন্থখানি আমি আগাগোড়া পড়তে সক্ষম হইনি। আগেই বলেছি যে, রচনা পদ্ধতির বিন্যস্ততার অভাব এবং অসংলগ্ন ও খাপছাড়া বর্ণনা রীতিই এর কারণ। সেখানে একজন সীরাত পাঠকের সমনে হঠাৎ করে এসে গতিরোধ করে দাঁড়ায় বদরের সকল যুদ্ধবন্দীর নাম, বদরের মুসলিম বাহিনীর ব্যবহৃত সমস্ত ঘোড়ার নাম, আনসার ও কুরাইশদের মধ্য থেকে যেসব মুসলিম সৈনিক বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, যারা শহীদ হন এবং মুশরিকদের মধ্যে যাঁরা নিহত হয় তাদের সকলের নামের সুদীর্ঘ ফিরিস্তি। অনুরূপভাবে বদর যুদ্ধে যেসব কবিতা আবৃত্তি করা হয়েছে, পূর্ব-পুরুষের মহিমা কীর্তনমূলক যেসব সংলাপ উচ্চারিত হয়েছে, বংশ পরম্পরা উল্লেখ করে যেসব ভাষণ দেয়া হয়েছে, নিছক শব্দের মায়াজাল বুনে যে লম্বা বুলি আওড়ানো হয়েছে এবং সীরাতের মূল বিষয়ের সাথে সংগতিহীনÑ যদিও তার কাছাকাছি কুরআনের যেসব ব্যাখ্যার অবতারণা করা হয়েছে এর অধিকাংশ সীরাত গ্রন্থে’র প্রচলিত রীতি মুতাবিক বর্ণনা পরম্পরা তথা সনদের উল্লেখ যার গুরুত্ব একমাত্র সমালোচক পন্ডিতদের কাছেই স্বীকৃত, এসব জিনিস পাঠকের সীরাত অধ্যায়নে অন্তরায় হয়ে দেখা দেয়।

এজন্য আমি বক্ষ্যমাণ সংক্ষেপিত গ্রন্থের মাধ্যমে পাঠকের কাছে সুখপাঠ্য, অধ্যয়নের দারাবাহিকতা বিনষ্ট না করার ব্যবস্থা সম্বলিত ও নবতর আঙ্গিকে শোভিত করে সীরাতের এই নির্যাসটুকু ইপস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। অবশ্য মূল গ্রন্থের আসল বক্তব্য যাতে অবিকৃত থাকে, সে ব্যাপারে আমি পূর্ণ সচেষ্ট থেকেছি, যাতে করে পাঠক তা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারেন ও আসল গ্রন্থ থেকে প্রামাণ্য তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন। মূল গ্রন্থের একটি বর্ণও আমি পরিবর্তন করিনি। কেননা গ্রন্থকারের বক্তব্য অবিকলভাবে উপস্থাপন করা যে আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য, তা আমি সব সময় মনে রেখেছি। ইবনে হিশামের কথা যথাযথভাবে উদ্ধৃত করা ও সেজন্য কথার শুরুতেই ‘ইবনে হিশাম বলেছেন’ বলে উল্লেখ করার রীতি আমি গ্রহণ করেছি ও তা অব্যাহতভাবে অনুসরণ করেছি। সংকলনের প্রয়োজন ও চাহিদা অনুসারেই যেখানে যেমন করা দরকার করেছি। বাদ বাকী সমস্ত ইবনে ইসহাকের বক্তব্য, যা ইবনে হিশাম কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যোখানে প্রয়োজন হয়েছে, কেবলমাত্র সেখানে ব্যতীত আর কোথাও আমি বর্ণনাদাতাদের নাম উল্লেখ করিনি, যদিও মূল গ্রন্থে ইবনে ইসহাক অথবা ইবনে হিশাম প্রায় ক্ষেত্রেই তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। ইবনে হিশামের সমস্ত উদ্ধৃতিতে আমি শৃঙ্খলার সাথে বিন্যস্ত করার প্রতি যত্নবান থেকেছি, প্রয়োজনবোধে তার কোন কোনটার ব্যাখ্য-বিশ্লেষন করেছি। এ ক্ষেত্রে সীরাত বিশ্লেষকদের বর্ণনা এর্ব বিশ্বস্ত হাদীস গ্রন্থ ও অভিধানের উপর আমাকে নির্ভর করতে হয়েছে।

যার মূল গ্রন্থ অধ্যয়নের সুযোগ থেকে বঞ্জিত, বক্ষ্যমাণ সংক্ষেপিত সংকলন তাদের পক্ষে ঐ গ্রন্থ পাঠের একটা সহজ পন্থাবিশেষ। এতে করে বর্তমান তরুণ সমাজের সাথে তাদের প্রাচীন ও সুমহান উতরাধিকারের সুষ্ঠু সংযোগসূত্র স্থাপিত হতে পারে।

পাঠকগণ এই গ্রন্থ মাত্র কয়েকদিনেই পড়ে শেষ করতে পারেন এবং তা থেকে দ্রুততার সাথে মূল্যবান ও কল্যাণকর জ্ঞানার্জনে সক্ষম হতে পারেন। কিন্তু এর স্থলে তাকে যদি মূল গ্রন্থ পাঠ করতে হতো যা বর্তমানে পাঠক মাত্রেরই নাগালের বাইরে তাহলে তাতে তার বহু মাস লেগে যেতো।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন এই গ্রন্থ দ্বারা সমাজকে উপকৃত করেন। জ্ঞানের রাজ্যে আমার এই ক্ষুদ্র ও নগণ্য প্রচেষ্টা সার্থক হলেই নিজেকে কৃতার্থ মনে করবো। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টিই আমার এ প্রচেষ্টার একমাত্র লক্ষ্য।

আব্দুস সালাম হারূন
মিসরুল জাদীদাহ্
মধ্য রমজান
১৩৭৪ হিজরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *