০০৬. সীরাতে ইবনে হিশামের মর্যাদা

মূলত: ইবনে ইসহাকের সীরাত গ্রন্থই সীরাত পাঠকদের জন্য প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রধান প্রামাণ্য গ্রন্থরূপে বিবেচিত হয়ে আসছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনেতিহাসে বুৎপত্তিসম্পন্ন খুব কম লোকই এমন ছিলেন যাঁরা ইবনে ইসহাকের সীরাত গ্রন্থ’কে ঐ বিয়য়ের প্রধান পথ-প্রদর্শকরূপে গ্রহণ করেননি। এ সীরাতে ইবনে ইসহাকই প্রাচীনকাল থেকে “সীরাতে ইবনে হিশাম” নামে জ্ঞানীজনের কাছে পরিচিত। কেননা ইবনে হিশাম এই গ্রন্থের সংকলক ও সংক্ষেপক ছিলেন। ইবনে খাল্লিকান বলেন,“ইবনে হিশামই ইবনে ইসহাকের সংগৃহীত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামরিক ও সাধারণ জীবনেতিহাসসহ গোটা জীবনেতিহাসকে একত্রিত, সংকলিত ও সংক্ষিপ্ত করেছেন।এটাই বর্তমানে সীরাতে ইবনে হিশাম নামে পাঠক সমাজের হাতে শোভা পাচ্ছ।”

বেশ কিছুসংখ্যক টীকাকার ও ব্যাখ্যাকার সীরাতে ইবনে হিশামের টীকা লিখতে এগিয়ে এসেছিলেন। তন্মধ্যে আবুল কাসেম আবদুর রহমান আস্ সুহাইলীর (৫৮১ হি:) “আর রাউদুল আনফ” নামক টীকাটি খুবই বিস্তারিত ও দীর্ঘ পরিসর।[৪.আবুল কাশেম আবদুর রহমান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনে আলখুসায়মী আস-সুহাইলী আল আন্দালুসী আল মালকী। সুহাইল স্পেনের কোরা এলাকার অস্তর্গত একটি উপত্যকার সাম। তিনি ৫০৮ হিজরী সনে জন্মগ্রহণ কর্নে এবং সেখানেই বসবাস করেত থাকেন। পরে মরক্কোতেও তিন বছর অতিবাহিত করেন এবং সেখানে ৫৮১ হিজরী সনে ইনতিকাল করেন।] এরপরে যিনি এই গ্রন্থের পর্যলোচনায় মনোযোগী হন, তিনি হলেন আবু যার আল খুশানী।[৫. আবু যার মুসআব ্ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মাসউদ আল জিয়ানী আল খুশানী। স্পেনের খুশাইন নামক গ্রামে এবং কাদায়ার খুশাইন গোত্রের নামানুসারে তিনি খুশানী বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি হিজরী ৫৩৩ সনে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬০৪ সনে ইনতিকাল করেন।] তিনি এই দুর্বোধ্য অংশগুলোর ব্যাখ্যা করেন এবং তার গ্রন্থ ‘র্শাহ সীরাতুন্ নববীয়া’য় কিছু কিছু সমালোচনাও করেন। আর ডক্টর ব্রুনলাহ গ্রন্থখানি প্রকাশ করেন। বদরুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ আল আইনী“কাশফুল লিসান ফী শারহে সীরাতে ইবনে হিশাম” নামে এর ব্যাখ্যা প্রণয়ন সম্পন্ন করেন ৮০৫ হিজরী সনে।

অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই কিছু কিছু গ্রন্থাকার এই গ্রস্থের সংক্ষেপকরণের দিকেও মনোযোগী হয়েছেন। তাদের একজন হলেন বুরহানুদ্দীন ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ আল মুরহাল আশ্শাফেয়ী। ‘আযযাখীরা ফী মুখ্তাছারিস্ সীরাহ্” নামে আঠারটি অধ্যায়ে গ্রথিত এই গ্রস্থে তিনি সীরাতে ইবনে হিশামকে শুধু সংক্ষিপ্তই করেননি, বরং কিছু বিষয়ের সংযোজনও করেছেন।৬৬১ হিজরী সনে তিনি এই গ্রন্থ রচনার কাজ সমাপ্ত করেন। অত:পর ৭১১ হিজরী সনে আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে ইবরাহীম ইবনে আবদুর রহমান আলওয়াসেতী “মুখতাছার সীরাতে ইবনে হিশাম” নামে আর একটি সংক্ষেপিত গ্রন্থ রচনা সম্পন্ন করেন।এমনকি কতিপয় গ্রন্থাকার সীরাতে ইবনে হিশামকে কাব্যাকারেও সংকলন করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন (১) আবু মুহাম্মাদ আবদুল আযীয ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সাইদ আদ দুমাইরী আদ দাইরিনী, ওফাত ৬০৭ হিজরী, (২)আবু নছর আল ফাতাহ বিন মূসা বিন মুহাম্মাদ আল মাগরিবী, ওফাত ৭৯৩ হিজরী। শেষোক্ত গ্রন্থাকারের রচিত গ্রস্থের নাম “আল ফাতহুল কারীব ফী সীরাতিল হাবীব।” গ্রন্থখানি দশ হাজার পংক্তিতে সংকলিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *