অধ্যায় ১৭ : মহিলা কর্মীদের প্রতি উপদেশ

এতক্ষণ আমি যে সমস্ত বিষয়ে আলোচনা করেছি, তার অধিকাংশই পুরুষ ও মহিলাদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখন আমি জামায়াতের মহিলা কর্মী এবং জামায়াত সম্পর্কে আগ্রহপরায়ণ মহিলাদের উদ্দেশ্য কয়েকটি কথা বিশেষভাবে আরয করতে চাই।
সর্বপ্রথম আরয এই যে, আপনারা নিজেদের জীবনকে গড়ার জন্য দীন ইসলাম সম্পর্কে যথাসাধ্য জ্ঞান লাভের চেষ্টা করুন।
আপনারা শুধু কুরআন শরীফের অর্থ বুঝে পাঠ করেই ক্ষান্ত হবেন না, বরং হাদীস এবং ফিকাহ সম্পর্কে কিছু পড়াশুনা অবশ্যই করবেন। আপনাদের শুধু দীন ইসলামের মূল বিষয়বস্তু এবং ঈমানের দাবী সম্পর্কে মোটামুটি জ্ঞান লাভই যথেষ্ট নয়, বরং আপনাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের দৈনন্দিন কাজ-কর্ম সম্পর্কে দীন ইসলাম কি কি নির্দেশ দিচ্ছে তাও আপনাদের জানতে হবে। আজ মুসলমান পরিবার-সমূহে যে শরীয়াত বিরোধী কার্যকলাপ প্রচলিত হয়েছে এবং জাহেলী রসম-রেওয়াজ স্থান লাভ করেছে, এর একটি অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে দীন ইসলামের হুকুম আহকাম সম্পর্কে মহিলাদের ব্যাপক অজ্ঞতা। তাই সর্বপ্রথম নিজেদের দুর্বলতাসমূহ দূর করাই আপনাদের প্রধান কর্তব্য।

দ্বিতীয় কাজ এই যে, দীন ইসলাম সম্পর্কে আপনি যতটুকু শিক্ষালাভ করবেন, তদানুযায়ী নিজেদের বাস্তব জীবন, নৈতিক চরিত্র, আচার-ব্যবহার ও সাংসারিক জীবনকে গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন। একজন মুসলমান মহিলার চরিত্র এতখানি মযবুত হওয়া দরকার যে, কোন জিনিসকে যদি সথ্য বলে বিশ্বাস করে, তবে তার গোটা সংসার ও পরিবার-পরিজন সকলে একযোগে বিরোধিতা করলেও যেন তার বিশ্বাস অটল থাকে। আবার যে জিনিসকে সে বাতিল বা অন্যায় বিশ্বাস করবে কারো চাপে পড়ে এটাকে সত্য বলে স্বীকার করবে না। মাতা, পিতা, স্বামী ও পরিবারের অন্যান্য গুরুজন নিশ্চয়ই শ্রদ্ধার পাত্র, তাঁদের হুকুম অবশ্যই পালন করতে হবে, তাদের সাথে অবশ্যই আদব রক্ষা করে চলতে হবে; তাদের সাথে বেয়াদবি কিংবা উচ্ছৃংখলাপূর্ণ ব্যবহার করা চলবে না। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অধিকার সকলের উর্ধে। কাজেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফারমানীর পথে চলতে কেউ নির্দেশ দিলে আপনারা পরিষ্কার ভাষায় তা অস্বীকার করবেন। তিনি আপনার পিতাই হোন কিংবা স্বামী এ ব্যাপারে কোনো প্রকার দুর্বলতার প্রশ্রয় দেয়া চলবে না। বরং এর পরিণাম হিসেবে এ পার্থিব জীবনের যত ভয়ঙ্কর দেখা দিক না কেন, আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা রেখে আপনাকে তা হাসিমুখে বরদাশত করার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। দীনের আনুগত্যের ব্যাপারে আপনি যতখানি দৃঢ়তা প্রকাশ করবেন, ইনশাআল্লাহ আপনার পরিবেশে ততই এর শুভ প্রভাব বিস্তারিত হবে। এবং বিভ্রান্ত পরিবারগুলোর সংস্কার সংশোধনের ও আপনি সুযোগ পাবেন। পক্ষান্তরে শরীয়ত বিরোধী রীতিনীতি এবং দাবীর সামনে আপনি যতখানি নতি স্বীকার করবেন, ইসলামের বরকত ও কল্যাণকর হতে আপনার সমাজ ও পরিবেশে ঈমান ও নৈতিক দুর্বলতার একটি জঘন্য দৃষ্টান্তে পরিণত হবেন।

আপনার তৃতীয় কাজ এই যে, প্রচার ও সংশোধনমূলক কাজে সংসারের লোকজন, নিজের ভাই-বোন ও ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনের প্রতি আপনাদের সর্বপ্রথম ও সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা যে সমস্ত মহিলাকে সন্তান-সন্ততি দান করেছেন তাঁদের তো ইতিমধ্যেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দিয়েছেন। এখন তাঁরা যদি পাসের উপযোগী নম্বর লাভ না করেন, তবে অন্য কোনো জিনিসই তাঁদের ক্ষতিপূরণ করতে পারবে না; কাজেই তাঁদের নিকট সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ লক্ষবস্ত হচ্ছে নিজেদের সন্তা-সন্ততি। এদেরকে দীন ও দীনি চরিত্র শিক্ষা দান করা আমাদের কর্তব্য। বিবাহিতা মহিলাদের আর একটি কর্তব্য হচ্ছে আপন স্বামীকে সৎপথ প্রদর্শন করা, স্বামী যদি সৎপথেই চলতে থাকেন, তবে এ ব্যাপারে তাঁকে যথাসাধ্য সাহায্য করা কর্তব্য। তাছাড়া একটি বালিকা আদব-কর্ম সম্পন্ন করার পর যতটুকু সময় আপনারা বাঁচাতে পারেন, তা অন্যান্য মহিলাদের নিকট দীনের দাওয়াত পৌঁছাবার কাজে ব্যয় করবেন। আপনারা ছোট ছোট বালিকা ও অশিক্ষিত বৃদ্ধাগণকে লেখাপড়া শিখান এবং শিক্ষিতা মহিলাগণকে ইসলামী সাহিত্য পড়তে দেন। মহিলাদের জন্য নিয়মিত বৈঠকের আয়োজন করে তাঁদেরকে দীনি শিক্ষার সুযোগ দিন। আপনাদের মধ্যে যদি কেউ বক্তৃতা করতে না পারেন তবে কোনো ভালো পুস্তকের অংশবিশেষ পাঠ করে শুনাবেন। মোটকথা যেভাবেই হোক না হোক কেন, নিজেদের সাধ্যশক্তি অনুসারে আপনারা কাজ করবেন এবং নিজ নিজ পরিচিত এলাকার মহিলাদের মধ্যে থেকে অজ্ঞতা কুসংস্কার দূর করার জন্য পুরোপুরি চেষ্টা করবেন। শিক্ষিত মহিলাদের উপর বর্তমান আরো একটি বিরাট দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এক হিসেবে এ কাজটির গুরুত্ব অন্যান্য সকল কাজের তুলনায় অনেক বেশী। তা এই যে, বর্তমান পাশ্চাত্য ভাবাপন্ন মহিলারা যেভাবে এ দেশের সাধারণ মহিলা সমাজকে গুমরাহী, নিজ্র্জলতা এবং মানসিক ও নৈতিক উচ্ছৃংখলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং এ উদ্দেশ্যে তারা যেভাবে সরকারী উপায়-উপাদান ও সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করে মুসলমান মহিলা সমাজকে ভ্রান্ত পথে টেনে নিচ্ছেসমগ্র শক্তি দিয়ে এর প্রতিরোধ করা।

একাজটি শুধূ পুরুষদের একক প্রচেষ্টায় সম্পন্ন হতে পারে না। কারণ, পুরুষরা যখন এ গুমরাহীর প্রতিবাদ করে, তখন নারী সমাজাকে এই বলে বিভ্রান্ত করা হয় যে, এরা তোমাদেরকে শুধু দাসী বানিয়ে রাখতে চায়। চিরকাল এর ইচ্ছা পোষণ করে আসছে যে, নারী সমাজ চার বেড়ার মধ্যে আবদ্ধ থেকে তিলে তিলে মৃত্যুবরণ করুক। এ আযাদীর হাওয়া যেন তাদেরকে আদৌ স্পর্শ করতে না পারে। কাজেই এ বিপদকে দূর করার জন্য মহিলা সমাজের সক্রিয় সহযোগিতা লাভ করা আমাদের একান্ত আবশ্যক। আল্লাহর ফযলে আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষিতা ভদ্র ও আল্লাহ ভীরু মহিলাদের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। তাঁরা আপওয়া মার্কা বেগমদের দাঁতাভাংগা জবাব দেয়া তাদের কর্তব্য। তাদেরকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া উচিত যে, মুসলমান মহিলা সমাজ আল্লাহ তাআলার বিধি-নিষেধের সীমালংঘন করে যে তরক্কী ও প্রগতি লাভ করতে হবে তার প্রতি লানত-শত ধিক্কার, একথা তাদের দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করা উচিত। শুধু এটাই নয়, যেসব বাস্তব সমস্যা সমাধানের জন্য আল্লাহ ও রাসূলের বিধি-নিষেধ লংঘন করা আবশ্যক বলে প্রচার করা হচ্ছে, ইসলামী সীমারেখার মধ্যে অবস্থান করে সংঘবদ্ধভাবে এর সমাধান করেও তাদের দেখানো উচিত। এরূপ কাজের ফলে বিভ্রান্তকারী পুরুষ-নারীদের মুখ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *