অধ্যায় ১৪ : জামায়াতের নেতৃবৃন্দের প্রতি উপদেশ

জামায়াতের সদস্যগণকে আনুগত্যের অনুরোধ জানাবার সাথে সাথে জামায়াতের নেতৃবৃন্দকে আমি হুকুম চালাবার সঠিক পন্থা শিক্ষা করার উপদেশ দিচ্ছি। যিনি জামায়াতের কোনো দায়িত্বপূর্ণ পদে অভিষিক্ত হবেন, যার অধীনে কিছু সংখ্যক লোক থাকবে, তার পক্ষে নিজেকে বড় কিছু একটা মনে করে অধস্তন সমকর্মীদের উপর অহেতুক কর্তাগিরী ফলানো কোনো মতেই সংগত নয়। তার পক্ষে কখনো প্রভুত্বের স্বাদ গ্রহণ করা উচিত নয়, বরং সহকর্মীদের সাথে নম্র ও মধুর ব্যবহার করাই তার কর্তব্য। কোনো কর্মীর মনে বিদ্রোহের ভাব ও কর্মপন্থার উপর অর্পিত না হয়, সে জন্য সর্বদা তার বিশেষভাবে সতর্ক থাকা দরকার। যুবক-বৃদ্ধ, দুর্বল-সবল, ধনী-গরীব ইতাদির ব্যাচ বিচার না করে সকলের জন্য একটা ধারা অবলম্বন করা তার পক্ষে ব্যক্তিগত অবস্থার প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা উচিত এবং যে এতটুকু সুযোগ-সুবিধা লাভের যোগ্য তাকে ততটুকু সুযোগ-সুবিধা দেয়া উচিত। জামায়াতকে তার এমনভাবে গড়ে তোলা উচিত, যেন আমীর কোন বিষয়ে উপদেশ দিলেন কিংবা আবেদন করলেন, কর্মীগণ যেন তা নির্দেশ হিসেবেই গ্রহণ করে তদানুযায়ী কাজ সম্পন্ন করে। কোনো বিষয়ে যদি আমীরের আবেদন কার্যকরী না হয় এবং বাধ্য হয়ে তিনি হুকুম দেয়ার প্রয়োজনবোধ করেন তবে তা দ্বারা সাংগঠনিক চেতনারই অভা¬¬ব প্রমাণিত হয়। প্রকৃতপক্ষে বেতন ভুক্ত সিপাহীদেরকেই হুকুম দিতে হয়। কিন্তু যে স্বেচ্ছা-সৈনিকরা আপন প্রভুর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই সমবেত হয়েছে, আল্লাহর কাছে নিজেকে নির্বাচিত আমীরের আনুগত্যের বেলায় তাদের নির্দেশের কোনো প্রয়োজন হয় না। তাদের জন্য শুধু এটুকু ইশারাই যথেষ্ট যে, অমুক জায়গায়, অমুক কাজ সম্পাদন করে আপন প্রভুর খেদমত আনজাম দেয়ার সুযোগ তোমার উপস্থিত হয়েছে। যেদিন আপনারা দেখতে পাবেন যে, নিজেদের মধ্যে মাঝে মাঝে যেসব তিক্ততার সৃষ্টি হয়, তার প্রায় সবগুলোই স্বাভাবিকভাবে দূরীভূত হয়েছে।

শেষ উপদেশঃ

আমার শেষ আবেদন এই যে, জামায়াতে ইসলামীর সাথে যারা সংশিষ্ট রয়েছেন-রুকুন ও মুত্তাফিক নির্বিশেষে তারা সকলে …… আল্লাহর পথে ব্যয়ের আগ্রহ ও অভ্যাস বর্জন করুন, আল্লাহর কাজকে ব্যক্তিগত কাজের উপর প্রাধান্য দিতে থাকুন এবং এর জন্য এতখানি আগহ ও উৎসাহের সৃষ্টি করুন যে, তা যেন আপনাদেরকে নিশ্চিত মনে বসে থাকতে না দেয়। আপনি কেবলমাত্র নিজেই মুসলমান না হয়ে নিজের পকেটকেও মুসলমান করুন। একথা কখনো ভুলবেন না যে, আল্লাহর হক শুধু আপনার প্রাণ, দেহ এবং সময়ের উপরই সীমাবদ্ধ নয় বরং আপনার পকেটের উপরও তাঁর হক ও দাবী রয়েছে। এ হক আদায়ের জন্য আল্লাহর ও তাঁর রাসূল নূণ্যতম পরিমাণ নিধারণ করেছেন, কিন্তু সর্বাধিক পরিমাণ সম্পর্কে কোনো সীমা নির্দেশ করেননি। এটা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আপনার উপরই ন্যস্ত হয়েছে, এজন্য আপনার বিবেক-বুদ্ধিকে আপনি জিজ্ঞেস করুন, কি পরিমাণ অর্থ ব্যয় করলে আপনার ধন-সম্পত্তিতে আল্লাহ তাআলার যতটুকু অধিকার রয়েছে তা আদায় করা হলো বলে আপনি মনে করতে পারবেন। এ বিষয়ে আমি কারো অবস্থা বিচার করতে পারি না। তবে একথা আমি অবশ্যই বলবো, যারা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, আখেরাতেও কোনো পরোয়া যাদের নেই, তাদের নিজেদের ভ্রান্ত ও বিকৃত মতবাদের প্রতিষ্ঠার জন্য যেরূপ বিরাট ত্যাগ স্বীকার করছে তা দেখে আল্লাহ এবং আখেরাতের প্রতি আস্থাশীল ব্যক্তিদের লজ্জিত হওয় উচিত।

দীন ইসলামকে কায়েম করারা ব্যাপারে কর্মীদের যতখানি তৎপর হওয়া আবশ্যক, তাতে এখনো যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে আমি অনুভব করছি। জামায়াতের কতিপয় কর্মী নিসন্দেহে পূর্ণ নিবিষ্টিচিত্তে দায়িত্ব পালন করছে-যা দেখে স্বাভাবিকভাবেই আনন্দে হৃদয় ভরে য়ায এবং তাদের জন্য অন্তরের অন্তস্থল থেকে দোয়া করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু অধিকাংশ কর্মীর মধ্যে এখনো তদ্রুপ আগ্রহ দেখা যায় না। ফাসেকী ও আল্লাহদ্রোহীতার প্রাধান্য এবং আল্লাহর দীনের (জীবন ব্যবস্থ) বর্তমান অসহায় অবস্থা দেখে একজন মুমিনের অন্তরের যে যাতনা ও ক্ষোভের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হওয়া উচিত তা খুব কম লোকের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। এ ব্যাপারে আপনার পক্ষে অন্তত ততখানি অস্থির হওয়া উচিত, নিজের অসুস্থ সন্তানকে দেখে কিংবা ঘরে আগুন লাগার আশাংকা দেকা দিলে আপনি যতখানি অস্থিরবোধ করেন। অবশ্য এ বিষয়েও একজনের কর্ম তৎপরতা ও আগ্রহ সম্পর্কে কোনো সীমা নির্দেশ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এ বিষয়ে প্রত্যেকের আপন বিবেক-বুদ্ধি অনুসারেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত যে, কতখানি কাজ করার পর তার সত্য প্রীতির দায়িত্বসমূহ সুসম্পন্ন হয়েছে বলে মনে করা সংগত হবে। অবশ্য আপনাদের শিক্ষার জন্য সেই সমস্ত বাতিলপন্থীদের কর্মতৎপরতার প্রতি একবার লক্ষ্য করাই যথেষ্ট হবে, যারা দুনিয়ার বুকে কোনো না কোনো বাতিল মতবাদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য অষ্পপ্রহর সংগ্রাম করছে এবং সেজন্য নিজেদের জান-মাল উৎসর্গ করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *