অধ্যায় ০৮ : অযথা অহমিকা বর্জন

তৃতীয় যে বিষয়ে আমি আপনাদেরকে উপদেশ দিতে চাই তা এই যে, গত কয়েক বছর যাবৎ ক্রমাগত চেষ্টার ফলে আপনাদের ব্যক্তিগত কিংবা সাংগঠনিকভাবে কখনো দেখা না দেয়। আপনারা যেন ব্যক্তিগত কিংবা সাংগঠনিকভাবে কখনো এরূপ ভুল ধারণা পোষণ না করেন যে, আমরা এখন পূর্ণত্ব লাভ করেছি, যা কিছু যোগ্যতা অর্জন করা দরকার ছিলো, তার সবই আমরা হাসিল করে ফেলেছি। সুতরাং এখন আর আমাদের কাম্য এমন কোনো বস্তু নেই, যেজন্য আমাদেরকে আরো চেষ্টা-যত্ন করতে হবে। আমাকে এবং জামায়াতের অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণকে অনেক সময়ই একটি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বেশ কিছুদিন যাবত কিছু সংখ্যক লোক জামায়াতে ইসলামীর-প্রকৃতপক্ষে জামায়াত পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনের মূল্য হ্রাস করার মতলবে প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, এ জামায়াত নিছক একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার আত্মশুদ্ধি বা আধ্যাত্মিকতার কোনো নাম-নিশানা নেই। এর কর্মীদের মধ্যে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক এবং আখেরাত চিন্তার অভাব রয়েছে। এদলের পরিচালক নিজে যেমন কোনো পীরের মুরীদ নয়, তেমনি তিনি কোনো খানকা হতেও তাকওয়া পহহেযগারী বা ইহসান-কামালিয়াতের ট্রেনিং-এর সুযোগ পাবেন, তারও কোনো সম্ভবনা নেই। এধরনের প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর কর্মী এবং আন্দোলনের প্রতি আগ্রহশীল লোকদের মনে জামায়াতের প্রতি বীতশ্রদ্ধার সৃষ্টি করা এবং তাদেরকে পুনরায় এমন আস্তনায় ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা করা, যেখানে কুফরীর আশ্রয়ে থেকে ইসলামের আংশিক খেদমত করাকেই আজ পর্যন্ত এক বিরাট কীর্তীরূপে গণ্য করা হচ্ছে, যেখানে দীন ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা ও বিজয়ী করার কোনো কল্পনারই অস্তিত্ব নেই। বরং যেখানে এ ধরনের কোনো পরিকল্পনার কথা উত্থাপন করার পার নানাভাবে এটাকে এক অধর্মীয় প্রস্তাব বলে প্রমাণ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে এবং এরূপ প্রস্তাবকে এমনভাবে বিকৃত করা হয়েছে যে, কুফর ও ফাসেকীর পরিবর্তে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার পুন: প্রতিষ্ঠা ও প্রাধান্য বিস্তারের কল্পনাকে একটি নিতান্ত বৈষায়িক চিন্তা বলে অভিহিত করা হয়েছে। একারণেই আমাদরকে বাধ্য হয়ে খানকার আত্মশুদ্ধি ও ইসলামী আত্মশুদ্ধির মধ্যকার পার্থক্য উদঘাটন করতে হয় এবং প্রকৃত তাকওয়া পরহেযগারী ও ইহসানের সঠিক পরিচয় যা ইসলামের কাম্য-পরিষ্কার করে বর্ণনা করতে হয় এবং ধর্ম শিল্পে লোকগণ যে সনাতন ও কামালিয়াতের শিক্ষা বা ট্রেনিং দিচ্ছেন, তার সাথে ইসলামের পার্থক্য কতটুকু তা বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সেই সাথে জামায়াতে ইসলামী কর্তক অনুসৃত সংশোধন ও ট্রেনিং পদ্ধতি এবং এর ফলাফলও আমাদেরকে প্রকাশ করতে হয়, যেন ইসলাম সম্পর্কে সঠিক চেতনা সম্পন্ন যে কোনো লোক একথা বুঝতে পারেন যে, জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশ্য ও কর্মনীতির প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার পর প্রাথমিক ভাবধারা সৃষ্টি হতে শুরু করে, তা জীবন ব্যাপী আত্মশুদ্ধির ট্রেনিং লাভের পরও এমনকি ট্রেনিংদাতাদের মধ্যেও দেখা যায় না।

এ সকল কথা আমরা আমাদের সমালোচকদের বে-ইসাফীর কারণেই বলতে বাধ্য হচ্ছি। নিছক আত্মরক্ষার জন্য নয়, বরং ইসলামী আন্দোলনের নিরাপত্তার জন্য এটা আমাদের বলতে হয়, কিন্তু এ সমস্ত কথার ফলে আমাদের সহকর্মীদের মনে যেন কোনো প্রকার গর্ব-অহংকার কিংবা নিজেদের কামালিয়াত সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা না জন্মে, সে জন্য আমরা আল্লাহর নিকট পানাহ চাচ্ছি। আল্লাহ না করুন, আমাদের মধ্যে যদি কোনো প্রকার মিথ্যা অহমিকা দেখা দেয়, তবে এ পর্যন্ত আমরা যতটুকু লাভ করেছি তাও হয়তো হারিয়ে বসবো।

এ বিপদ হতে আত্মরক্ষার জন্যই আমি আপনাদেরকে তিনটি নিগুঢ় সত্য ভালো করে বুঝে নিতে এবং তা কখনো বিস্মৃত না হতে অনুরোধ করি।

কামালিয়াত (পূর্ণত্ব) একটি সীমাহীন ব্যাপার, এর শেষ সীমা আমাদের দৃষ্টির অগোচরে অবস্থিত। মানুষের কর্তব্য হচ্ছে, এর শীর্ষদেশে আরোহণ করার জন্য ক্রমাগত চেষ্টা করা এবং কথাও পৌঁছেয়ে একথা ব্যক্ত না করে যে, সে কামেল হয়ে গিয়েছে। কোনো ব্যক্তি যে মুহূর্তে এ ধারণায় পতিত হবে সাথে সাথেই তার উন্নতি থেমে যাবে। শুধু যে থেমে যাবে তা-ই নয়, বরং সেই সাথে তার অবনতির সূত্রপাত হবে। একথা স্মরণ রাখা দরকার যে, কেবল উচ্চস্থানে উন্নীত হওয়ার জন্যই নয় বরং সেই সাথে তার অবনতির সূত্রপাত হবে। একথা স্মরণ রাখা দরকার যে, কেবল উচ্চস্থানে উন্নীত হওয়ার জন্যই নয় বরং সেখানে টিকে থাকতে হলেও অবিশ্রান্ত চেষ্টা-তৎপরতা আবশ্যক। কারণ এ চেষ্টার ধারা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে নিম্নভূমির আকর্ষণ মানুষকে নীচের দিকে টানতে আরম্ভ করে। কোনো বুদ্ধিমান লোকের পক্ষে কেবলমাত্র নীচের দিকে তাকিয়ে সে কতখানি উপরে উঠেছে, তা দেখা উচত নয়। বরং তার আর কতখানি উপরে উঠেছে, তা দেখা উচিত নয়। বরং তার আর কতখানি উপরে উঠতে হবে এবং এখনো সে কতখানি দূরে রয়েছে এটাই তার দেখা কর্তব্য।

দ্বিতীয়ত, ইসলাম আমাদের সামনে মানুষত্বের যে উচ্চতম আদর্শ উপস্থাপিত করেছে, এর প্রাথমিক স্তরসমূহ ও অন্যান্য অনৈসলামিক ধর্ম ও মতবাদগুলোর উচ্চতম আদর্শের তুলনায় অনেক ঊর্ধে অবস্থিত। এটা আদৌ কোনো কল্পনাপ্রসূত মান নয় বরং এ পার্থিব জীবনেই আম্বিয়ায়ে কিরাম, মহানুভব সাহাবাগণ এবং জাতির আদর্শ পুরুষগণ পবিত্র জীবনধারা আমাদের সামনে ইসলামের মহান আদর্শ সম্পর্কে পথনির্দে করেছে। এ আদর্শ আমন সর্বদা আপনার সামনে রাখবেন। এভাবে আপনার তথাকথিত কামালিয়াতের বিভ্রান্তির কবল থেকে আত্মরক্ষা করতে পারবেন এবং নিজেদের পশ্চাৎপদতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভে সক্ষম হবেন। পরন্তু উন্নতি লাভের চেষ্টা-তৎপরতার জন্য এটা এমনভাবে অনুপ্রেরণা যোগাতে থাকবে, যার ফলে আপনি আজীবন সংগ্রাম-সাধনার পরও মনে করবেন যে, এখনো উন্নতির অনেক স্তর বাকী রয়েছে। আপনার আশেপাশে মূমূর্ষ রোগীদের দেখে নিজেদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা সম্পর্কে একটুও গর্ববোধ করবেন না। আপনারা নৈতিক ও আধ্যাত্মিকতার সেই বীর পাহলোয়ানদের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন যাদের স্থলাভিষিক্ত হিসেবেই আপনারা শয়াতানের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ময়দানে অবতীর্ণ হচ্ছেন। দীন-সম্পদের ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত উন্নত ও অগ্রসর লোকদের দিকে লক্ষ্য রাখা এবং বৈষায়িক ধন-সম্পদের কর্তব্য, যেন তার ভিতর থেকে দীন-সম্পদের ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত দুর্বল লোকদেরকে সামনে রাখাই ঈমানদার লোকদের কর্তব্য, যেন তার ভিতর থেকে দীন-সম্পদ লাভের তৃষ্ণা বিদূরিত না হয় এবং আল্লাহ তাআলা তাকে যতটুকু বিষয়-সম্পত্তি দান করেছেন তাতেই সে আল্লাহর শোকর করতে পারে এবং অল্পতেই যেন তার ধন-সম্পদের পিপাসা নিবৃত হয়।

তৃতীয়ত, আমাদের জামায়াত এ পর্যন্ত যতটুকু গুণ-বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে, প্রকৃতপক্ষে শুধু তা বর্তমান বিকৃত পরিবেশের কারণেই সম্ভব হয়েছে। কেননা এ ঘনঘোর অন্ধকার মধ্যে আমরা যে ক্ষীণ শিখার একটি প্রদীপ জ্বলাবার সৌভাগ্য লাভ করেছি, তাই এখন উজ্জ্বল প্রকটিত হয়ে দেখা দিয়েছে। নতুবা প্রকৃত সত্য কথা এই যে, ইসলামের নিন্মতম আদর্শের সাথে আমাদের চেষ্টা-তৎপরতার তুলনা করলেও প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে-ব্যক্তিগত জীবন ও সাংগঠনিক ক্ষেত্রে-কেবলমাত্র ত্রুটি-বিচ্যুতি স্বীকার কির তবে তা যেন শুধু বিনয় প্রকাশের জন্যই না হয়, বরং তা যেন আন্তরিক স্বীকৃত হয়। এর ফলে আমাদের প্রত্যেকটি দুর্বলতা যেন সুস্পষ্টরূপে ধরা পড়ে এবং তা দূর করার জন্য আগ্রহ ও চেষ্টা যেন তীব্রতর হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *