অধ্যায় ০৭ : ফেরেশতা , আসমানী কিতাব ও রাসুলগণের প্রতি বিশ্বাস

আল্লাহর ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান

আল্লাহর প্রতি ঈমানের পর নবী করীম (সা) আমাদেরকে ফেরেশতাদের অস্তিত্বের প্রতি ঈমান পোষণের নির্দেশ দিয়েছে। তাঁর এ শিক্ষার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কল্যাণ হচ্ছে এই যে, এর ফলে তাওহীদের বিশ্বাস শিরকের যাবতীয় বিপদ সম্ভাবনা থেকে মুক্ত থাকে।
উপরে বলা হয়েছে যে , মুশিকরা খোদায়ীতে দু’রকমের সৃষ্টিকে শরীক করে নিয়েছে । এ দ্বিবিধ সৃষ্টির মধ্যে একটি হচ্ছে বাস্তব অস্তিত্বশীল ও দৃশ্যমান , যেমনঃ চন্দ্র , সূর্য ,তারকা, অগ্নি , পানি বিশেষ বিশেষ মহাপুরুষ প্রভৃতি । দ্বিতীয়টি হচ্ছে সেই ধরনের সৃষ্টি , যাদের কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই , যারা অদৃশ্য এবং পিছনে থেকে সৃষ্টির যাবতীয় শক্তিকে পরিচালিত করে , বিশ্বাস করা হয়ঃ যেমন , একজন হাওয়া পরিচালনা করে , একজন বৃষ্টিপাতের ব্যবস্থা করে অপর একজন দান করে আলো। এর ভিতরে প্রথমোক্ত ধরনের সৃষ্টি তো মানুষের চোখের সামনেই রয়েছে । ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বাণীই প্রমাণ করে দেয় যে , আল্লাহর কর্তৃত্বে তাদের কোন অংশই নেই । দ্বিতীয় ধরনের সৃষ্টি হচ্ছে মানব চক্ষুর অন্তরালে রহস্যাবৃত এবং মুশরিকদের এদের উপর বিশ্বাস পোষণের প্রবণতা বেশী দেখা যায়। তারা এসব জিনিসকে মনে করে দেবতা , খোদাও খোদার সন্তান -সন্ততি । এদের কল্পিত মূর্তি করে তারা তাদের সামনে হাযির করে কত নযর-নিয়ায। সুতরাং আল্লাহর একত্বের ধারণাকে এ দ্বিতীয় ধরনের শির্‌ক থেকে মুক্ত রাখার জন্য বিশ্বাসের একটি স্বতন্ত্র ধারা বর্ণনা করা হয়েছে।

হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা) আমাদেরকে বলে দিয়েছেন যে, যেসব রহস্যাবৃত জ্যোর্তিময় সত্তাকে মানুষ দেবতা , খোদা ও খোদার সন্তান -সন্ততি বলে থাকে প্রকৃতপক্ষ তারা হচ্ছে আল্লাহর ফেরেশতা। আল্লাহর কর্তৃত্বে তাদের কোন দখল নেই। তারা সবাই আল্লাহর ফরমানের অনুগত এবং তারা এতটা বাধ্য যে , আল্লাহর হুকুমের বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম তারা করতে পারে না। আল্লাহ তাদের মাধ্যমে নিজের রাজ্য পরিচালনা করেন এবং তারা ঠিক আল্লাহর হুকুম মুতাবিক কাজ করে যায়। নিজের ইচ্ছা ও স্বাধীন ক্ষমতা বলে কিছুই করার ক্ষমতা তাদের নেই। তারা আপন ক্ষমতা বলে আল্লাহর নিকট কোন পরিকল্পনা পেশ করতে পারে না। আল্লাহর দরবারে কারুর জন্য সুপারিশ করার ক্ষমতা ও তাদের নেই । তাদের পূজা ও তাদের সাহায্য ভিক্ষা করা মানুষের পক্ষে অপমানকর ; কেননা ‘রোযে আযল’বা সৃষ্টির দিনে আল্লাহর তা’য়ালা তাদেরকে বাধ্য করেছিলেন হযরত আদম (আ) কে সিজদা করতে; আদম (আ) কে তাদের চেয়ে অধিক জ্ঞান দান করেছিলেন । মানুষকে যে ফেরেশতাকুল সিজদা করেছিল তাদেরকে সিজদা করার ও তাদেরই কাছে ভিক্ষা চাওয়ার চেয়ে বড় অপমানকর ব্যাপার মানুষের পক্ষে আর কি হতে পারে?

হযরত মুহাম্মাদ (সা) একদিকে আমাদেরকে নিষেধ করেছেন ফেরেশতাদেরকে পূজা করতে ও তাদেরকে আল্লাহর শরীক মনে করতে। তিনি আমাদেরকে আরো বলেছেন যে , ফেরেশতা আল্লাহ তা’য়ালা মনোনীত সৃষ্টি। তাঁরা সর্বপ্রকার গোনাহ থেকে মুক্ত । তাঁদের প্রকৃতি এমন যে তাঁরা আল্লাহর আদেশ সমূহ অমান্য করতে পারে না। তাঁরা সর্বক্ষণ আল্লাহর ও বন্দেগী ইবাদাতে মশগুল থাকেন । তাদের মধ্যে একজন মনোনীত ফেরেশতার মাধ্যমে আল্লাহ তা’য়ালা তার পয়গাম্বরদের কাছে ওহী প্রেরণ করেন , তাঁর নাম হচ্ছে জিবরাঈল (আ) । হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা) কাছে কুরআন আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছিল জিবরাইল (আ) এর মাধ্যমে । এ ফেরেশতাদের মধ্যে এক শ্রেণী সর্বদা আমাদের সাথে লেগে আছেণ প্রতি মুহুর্তে । ভাল মন্দ গতিবিধি পরীক্ষা করছেন ; আমাদের ভালমন্দ প্রত্যকটি মানুষের জীবনের রেকর্ড সংরক্ষিত হচ্ছে । মৃত্যুর পর যখন আমরা আল্লাহর কাছে হাযির হব , তখন তারা আমাদের আমলনামা পেশ করবে এবং আমরা দেখতে পাব যে, জীবনভর গোপনে ও প্রকাশ্যে যা কিছু সৎকর্ম ও দুষ্কর্ম করেছি তার সবকিছুই সংরক্ষিত রয়েছে।

ফেরেশতাদের স্বরূপ আমাদের জানান হয়নি । কেবলমাত্র তাঁদের গুণরাজী আমাদেরকে বলা হয়েছে । তাঁদের অস্তিত্বের উপর প্রত্যয় পোষণের আদেশ হয়েছে । তাঁরা কেমন ও কেমন নয় , তা জানার কোন মাধ্যম আমাদের কাছে নেই। সুতরাং নিজস্ব বুদ্ধিতে তাদের সত্তা সম্পর্কে কোন মনগড়া কথা তৈরী করে নেয়া মূর্খতা মাত্র! আবার তাঁদের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হচ্ছে কুফরী । কেননা অস্বীকার করার মত কোন দলীল কারুর কাছে নেই এবং অস্বীকৃতির মানে হচ্ছে হযরত মুহাম্মাদ (সা) কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা । আমরা তাঁদের অস্তিত্বের উপর ঈমান পোষণ করি কেবলমাত্র এ কারণে যে , আল্লাহ তা’য়ালার সত্যিকার রাসূল আমাদেরকে দিয়েছেন তাদের অস্তিত্বের খবর।

আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান

হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর মাধ্যমে আমাদেরকে তৃতীয় যে জিনিসটির প্রতি ঈমান পোষণের শিক্ষা দেয়া হয়েছে, তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাসমূহ যা তিনি নাযিল করেছেন তাঁর নবীদের উপর।

আল্লাহ তা’য়ালা যেমন হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর উপর কুরআন নাযিল করেছেন , তেমনি করে তাঁর আগে যেসব রাসূল অতীত হয়ে গেছেন, তাঁদের কাছেও তিনি তার কিতাবসমূহ প্রেরণ করেছিলেন । তার মধ্যে কোন কোন কিতাবের নাম আমাদেরকে বলা হয়েছে , যেমন হযরত ইবরাহীম (আ) এর কাছে প্রেরিত ছুহুফে ইবরাহীম (ইবরাহীমের গ্রন্থরাজি ), হযরত মূসা (আ) এর কাছে প্রেরিত তাওরাত , হযরত দাউদ (আ) এর কাছে অবতীর্ণ যবুর এবং হযরত ঈসা (আ) এর কাছে প্রেরিত ইঞ্জিল । এ ছাড়াও অন্যান্য কিতাব বিভিন্ন নবীর কাছে এসেছে , কিন্তু তার নাম আমাদেরকে বলে দেয়া হয়নি। এ কারণে অপর কোন ধর্মীয় কিতাব সম্পর্কে আমরা প্রত্যয় সহকারে বলতে পারি না যে , তা আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে তেমনি আবার এথাও বলতে পারি না যে তা আল্লাহর তরফ থেকে আসেনি। অবশ্য আমরা ঈমান পোষণ করি যে , যে কিতাবই আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে , তার সবই পূর্ণ সত্যাশ্রিত ছিল।

যেসব কিতাবের কথা আমাদেরকে বলা হয়েছে , তার মধ্যে ছুহুফে ইবরাহীমের অস্তিত্বই দুনিয়ায় নেই। তাওরাত , যবুর ও ইঞ্জিল ইয়াহুদী ও ঈসায়ীদের নিকট অবশ্য রয়েছে কিন্তু কুরআন শরীফে আমাদেরকে বলা হয়েছে যে , এসব কিতাবে মানুষ আল্লাহর বাণীকে পরিবর্তন করে দিয়েছে এবং নিজেদের তরফ থেকে অনেক কথাই তার মধ্যে মিশিয়ে ফেলেছে। ঈসায়ী ও ইয়াহুদীরা নিজেরাই স্বীকার করে যে আসল কিতাবগুলো কাছে নেই, রয়েছে কেবল তার তরজমা এবং তাতেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সংশোধন ও পরিবর্তন করা হয়েছ এবং এখনো হচ্ছে । এসব কিতাব পড়লে পরিস্কার বুঝা যাবে যে , তার মধ্যে এমন বহু কথা রয়েছে যা আল্লাহর তরফ থেকে কখনো আসতে পারেনা। এ কারণে যেসব কিতাব বর্তমান রয়েছে তা ঠিক আল্লাহর কিতাব নয়; তার মধ্যে আল্লাহর কালাম ও মানুষের কালাম মিলে মিশে গেছে এবং কোনটি আল্লাহর কালাম ও কোনটি মানুষের কালাম তা বুঝবারও কোন উপায় নেই। সুতরাং অতীতের কিতাবসমূহের উপর ঈমান পোষণের যে হুকুম আমাদেরকে দেয়া হয়েছে , তার ধরন হচ্ছে কেবল এই যে , আল্লহ তা’য়ালা কুরআন মজীদের আগেও দুনিয়ার প্রত্যেক জাতির কাছে তাঁর আদেশসমূহ আপন নবীদের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন এবং যে আল্লাহর কাছে থেকে কুরআন এসেছে , সেই একই আল্লাহর কাছে থেকেই সেই সব কিতাবও তাঁর হুকুমসমূহ নিয়ে এসেছিল কুরআন কোন নতুন ও অভিনব কিতাব নয় , বরং অতীতের সেই শিক্ষাকে জীবন্তকরার জন্যই তা প্রেরিত হয়েছে, যে শিক্ষা অতীত যুগের লোকেরা পেয়ে বিনষ্ট করে ফেলেছে অথবা পরিবর্তন করেছে অথবা মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত কথার সাথে মিশিয়ে ফেলেছে।

কুরআন শরীফ আল্লাহ তা’য়ালার আখেরী কিতাব । কতকগুলি দিকে দিয়ে তার অতীতের কিতাবসমূহের মধ্যে পার্থক্য রয়েছেঃ

একঃ পূর্বে যেসব কিতাব অবতীর্ন হয়েছিল , সেগুলোর অধিকাংশের আসল লিপি দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে , রয়ে গেছে কেবলমাত্র সেগুলোর অনুবাদ। কিন্তু কুরআন যেসব শব্দ সম্বলিত হয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল তা এখনো পুরোপুরি অক্ষুন্ন রয়েছে , তার একটি মাত্রও বর্ণ এমন কি একটি বিন্দু পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়নি।

দুইঃ পূর্রবর্তী কিতাবমূহে মানুষ কালামে ইলাহীর সাথে নিজস্ব কালাম মিশ্রিত করে ফেলেছে। একই কিতাবে আল্লাহর কালাম রয়েছে , জাতীয় ইতিহাস রয়েছে , বুযর্গদের অবস্থার বর্ণনা রয়েছে , ব্যাখ্য রয়েছে , বিধান কর্তাদের উদ্ভাবিত বিধান সংক্রান্ত সমস্যার আলোচনা রয়েছে , এবং এর সবকিছুর এমনভাবে সংমিশ্রিত হয়ে আছে যে আল্লাহর কালাম তার ভিতর থেকে আলাদা বাছাই করে নেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কুরআন আমরা পাই নিছক আল্লাহর কালাম এবং তার মধ্যে অপর কারুর কথার বিন্দুমাত্র সংমিশ্রণ ঘেটেনি। তাফসীর , হাদীস , ফিকাহ , সিরাতে রাসূল , সীরাতে সাহাবা , ইতিহাস –ইসলাম সম্পর্কে মুসলমানগণ যা কিছু লিখেছেন , তা সবই কুরআন থেকে আলাদা বিভিন্ন গ্রন্থারাজিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে। কুরআন মজীদে তার এটি শব্দও মিশ্রিত হতে পারেনি।

তিনঃ দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির কাছে যেসব কিতাব রয়েছে তার মধ্যে একখানি কিতাব সম্পর্কে ঐতিহাসিক দলীল দ্বারা প্রমাণ করা চলে না , তা যে নবীর প্রতি আরোপ করা হয় , প্রকৃতপক্ষে তাঁরই মাধ্যমে তা নাযিল হয়েছিল। বরং বিভিন্ন ধর্মীয় কিতাব এমনও রয়েছে , যার সম্পর্কে গোড়া থেকে বুঝা যায়নি কোন যামানায় কোন নবীর উপর তা অবতীর্ণ হয়েছিল । কিন্ত কুরআন সম্পর্কে এমন বলিষ্ঠ ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে যে , কোন ব্যক্তিই হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর সাথে তার যোগযোগ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করতে পারে না । এমনকি তার আয়াত সমূহে সম্পর্কে কোন আয়আত কখন কোথায় নাযির হয়েছিল তাও সঠিকভাবে জানা যায়।

চারঃ পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ যেসব ভাষায় নাযিল হয়েছিল , বহুকাল ধরে তা মৃত ভাষায় পরিণত হয়েছে। আজকের দুনিয়ায় কোথাও সে ভাষায় কথা বলবার লোক অবশিষ্ট নেই এবং তা বুঝবার লোকও খুব কমই পাওয়া যায়। এ ধরনের কিতাব যদি অবিকৃত ওনির্ভুল অবস্থাও পাওয়া যেত তথাপি তার বিধান সমূহ সঠিকভাবে বুঝা ও তার অনুসরণ করা সম্ভব হত না। অথচ কুরআন যে ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে তা হচ্ছে একটি জীবন্ত ভাষা । দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ আজো এ ভাষায় কথা বলছে , কোটি কোটি মানুষ এ ভাষা জানে ও বুঝে। এর শিক্ষার ধারা দুনিয়ার সর্বত্র জারী রয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তি এ ভাষা শিখতে পারে। যদি কোন ব্যক্তি এ ভাষা শিখবার অবকাশ না পায় , প্রত্যেক জায়াগয় সে এমন সব লোকের সন্ধান পেতে পারে , যাঁরা তাকে কুরআন শরীফের অর্থ বুঝিয়ে দেবার যোগ্যতা রাখেন।

পাঁচঃ দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির কাছে যেসব ধর্মীয় কিতাব রয়েছে , তার প্রত্যেক কিতাবে সন্নিবেশিত আদেশসমূহ দেখে বুঝা যায় যে, কেবলমাত্র এক বিশেষ যুগের অবস্থা বিবেচনায় তখনকার প্রয়োজন মিটাবার জন্যই তা প্রেরিত হয়েছিল , কিন্তু এখন তার প্রয়োজনই নেই অথবা তার অনুসরণ করে কাজ করা যায় না। এদ্বারা একটা সত্যই স্পষ্ট হয়ে উঠে যে , এসব কিতাব ভিন্ন ভিন্ন জাতির জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এর কোন কিতাবই তামাম দুনিয়ার জন্য আসেনি । আবার যে জাতির জন্য সেই কিতাব এসেছিল তাদের জন্য ও তা সর্বকালে প্রযোজ্য হয়ে আসেনি, বরং তা এসেছিল একটি বিশেষ যামানার জন্য । এবার কুরআনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে এ কিতাবের সর্বত্র সাধারণভাবে মানুষকে সম্বোধন করা হয়েছে। এর কোন একটি ধারা দেখেও এমন সন্দেহ হবেনা যে , তা কোন বিশেষ জাতির উদ্দেশ্যে এসেছে । অনুরূপভাবে এ কিতাবে যেসব বিধান রয়েছে, তা সর্বকালে সর্বত্র কার্যকরী করা যেতে পারে। এদ্বারা প্রমাণিত হয় যে , কুরআন সারা দুনিয়ায় সর্বকালে প্রয়োজন।

ছয়ঃ পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের প্রত্যেকটিতেই সৎকর্ম ও ন্যায় নীতির কথা বর্ণনা করা হয়েছিল এবং চরিত্র , নৈতিকতা , সততা ও সত্যনিষ্ঠার নীতিসমূহ শিক্ষা দেয়া হয়েছিল । প্রত্যেকটি কিতাবেই আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী জীবন যাপন করার নির্দেশ করা হয়েছিল , একথা সত্যিই, কিন্তু কোন কিতাবই এমন ছিল না , যাতে কোন কিছু বাদ না দিয়ে সকল গুণের সমাবেশ করা হয়েছে। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে আলাদা আলাদা করে যেসব গুণের বর্ণনা দেয়া হয়েছিল , একমাত্র কুরআনেই তার সকল কিছুর সমাবেশ হয়েছে এবং পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে যেসব কথা বাদ পড়ে গিয়েছিল তাও এ কিতাবে সন্নিবেশিত হয়েছে।

সকল ধর্মীয় কিতাবে মানুষের কৃত হস্তেক্ষেপ ও বিকৃতির দরুন এমন সব কথা মিশ্রিত হয়ে গেছে, যা বাস্তব সত্যের বিপরীত ও যুক্তি বিরোধী এবং যুলুম ও অত্যাচারের উপর প্রতিষ্ঠিত । মানুষের বিশ্বাস ও কার্যকলাপে তার ফলে বিকৃতিদুষ্ট হয়ে যায়। এমন কি , অনেক কিতাবে অশ্লীলতা ও নৈতিকতা বিরোধী কথাও দেখা যায়। কুরআন এসব বিকৃতি থেকে মুক্ত । তার মধ্যে এমন কোন কথা নেই , যা যুক্তি বিরোধী এবং যা প্রামাণ্য দলীল ও পরীক্ষা দ্বারা ভুল প্রমান করা যেতে পারে। এর কোন হুকুম অবিচারের সংস্পর্শ নেই, এর কোন কথাই মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে না এবং এর ভিতর অশ্লীলতা ও নৈতিকতা বিরোধী কথার নাম নিশানা নেই। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সারা কুরআন শরীফ উচ্চাংগের জ্ঞান -বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তি , ন্যায় বিচারের শিক্ষা , সঠিক পথের নির্দেশ এবং সর্বোত্তম বিধান ও আইন পরিপূর্ণ হয়ে আছে।

উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যের দরুন তামাম দুনিয়ার জাতিসমূহকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন কুরআনের প্রতি ঈমান পোষণ করে এবং অপর সকল কিতাবকে ছেড়ে একমাত্র এ কিতাবেরই অনুসরণ করে। কেননা আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী জীবন যাপনের জন্য মানুষের যেরূপ পথ নির্দেশের প্রয়োজন তার সবকিছুই এর মধ্যে পরিপূর্ণ ও নির্ভুল ভাবে বর্ণিত হয়েছে । এ কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার পর আর কোন কিতাবের প্রয়োজন নেই।

কুরআন ওঅন্যান্য কিতাবের মধ্যে তফাত কি তা যখন জানা হয়ে গেল তখন প্রত্যেকেই বুঝতে পারে যে কুরআন ব্যতীত অন্যান্য আল্লাহর কিতাবের উপর ঈমানের ক্ষেত্রে কতটা পার্থক্য থাকা প্রয়োজন। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান কেবল তার সত্যতা স্বীকারের সীমানা পর্যন্ত —থাকবে , অর্থাৎ বিশ্বাস পোষণ করতে হবে যে সেই সব কিতাবও আল্লাহর তরফ থেকে এসেছিল,সত্যাশ্রিত ছিল এবং যে উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কুরআন নাযিল হয়েছে সেই একই উদ্দেশ্যে সেই সব কিতাব এসেছে । কুরআনের উপর ঈমান এ ধরনের হবে যে , এ হচ্ছে আল্লহর বিশুদ্ধ কালাম , পরিপূর্ণ সত্যের বাহন এর প্রতিটি শব্দ সুরতি , এর প্রতিটি উক্তি সত্য এর প্রতিটি আদেশের অনুসরণ করা ফরয । কুরআন বিরোধী যে কোন জিনিসই অগ্রাহ্য করতে হবে ।

আল্লাহর রাসূলদের প্রতি ঈমান

কিতাবমূহের পর আল্লাহর সকল রাসূলের উপর ঈমান পোষণ করার নির্দেশ ও আমাদেরকে দেয়া হয়েছে।

পূর্ববর্তী অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে , দুনিয়ার সকল কওমের মধ্যে আল্লাহর রাসূল এসেছিলেন এবং সর্বশেষ হযরত মুহাম্মাদ (সা) ইসলামের যে শিক্ষা দেয়ার জন্য দুনিয়ায় তাশরীফ এনেছিলেন , তাঁরাও সেই এক শিক্ষাই দিয়েছিলেন । এদিক দিয়ে বিচার করলে আল্লাহর সকল রাসুলই একই শ্রেণীর অর্ন্তভুক্ত ছিলেন। কোন ব্যক্তি তাঁদের মধ্যে কোন একজন বিশেষ রাসূলকে মিথ্যা বলে ঘোষণা করলে তার ফলে সকলকেই মিথ্যা ঘোষণা করা হল। এবং অনুরূপভাবে কোন একজন রাসূলের সত্যতা স্বীকার করলে তার পক্ষে সকলেরই সত্যতা স্বীকার করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। দৃষ্টান্তস্বরূপ মনে করা যেতে পারে , দশজন লোক একই কথা বলছেন। তাদের মধ্যে একজনকে সত্যভাষী বলে স্বীকার করে নিলে আপনা থেকেই বাকী নয়জনকে সত্যভাষী বলে স্বীকার করা হয়ে যায় । যদি একজনকে মিথ্যবাদী বলা হয়, তাহলে তার মানে হচ্ছে তাদের কথিত উক্তিকেই মিথ্যা ঘোষণা করা হচ্ছে। তার ফলে তাদের দশজনকেই মিথ্যাবাদী বলা হল। এ কারণেই ইসলামে সকল রাসূলের প্রতি ঈমান পোষণ করা অপরিহার্য । যে ব্যক্তি কোন রাসূলের প্রতি ঈমান পোষণ না করবে সে কাফের হয়ে যাবে , এমনি করে অন্যান্য রাসূলের উপর ঈমান আনলেও এর কোন ব্যতিক্রম হবে না।

হাদীসে বর্ণিত হয়েছে , যে দুনিয়ার বিভিন্ন কওমের কাছে যেসব নবী প্রেরিত হয়েছিলেন , তাঁদের সংখ্যা ছিল এক লাখ চব্বিশ হাজার । কতকাল ধরে এ দুনিয়ায় মানুষের বসতি হয়েছে আর কত কওম দুনিয়া থেকে অতীত হয়ে গেছে , একথা ভেবে দেখলেই বুঝা যায় , এ সংখ্যাটা খুববেশী নয়। এ সোয়া লাখ নবীর মধ্যে থেকে যাদের নাম কুরআনে আমাদের কাছে উল্লেখ করা হয়েছে , তাঁদের প্রতি সুস্পষ্ট ঈমান পোষণ করা অপরিহার্য । বাকী যাঁরা ছিলেন , তাঁদের সবারই সম্পর্কে কেবলমাত্র এ ধারণা পোষণের শিক্ষা আমাদের দেয়া হয়েছে যে , যে লোককেই আল্লাহর তরফ থেকে তাঁর বান্দাহদের হেদায়াত করার জন্য পাঠানো হয়েছে তাঁরা খাঁটি ছিলেন , সত্যবাদী ছিলেন। হিন্দুস্তান , চীন, ইরান , মিসর , আফ্রিকা , ইউরোপ এবং দুনিয়ার অন্যান্য দেশে যেসব নবী এসে থাকবেন ,আমরা তাঁদের সবারই প্রতি ঈমান পোষণ করি; কিন্তু আমরা কোন বিশেষ ব্যক্তি সম্পর্কে যেমন বলতে পারি না যে , তিনি নবী ছিলেন , তেমনি একথাও বলতে পারি না যে , তিনি নবী ছিলেনা । কারণ তাঁর সম্পর্কে আমাদেরকে কিছুই বলা হয়নি । অবশ্যি বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা যেসব লোককে তাদের পথপ্রর্দশক বলে মেনে নেয় , তাঁদের বিরুদ্ধে কিছু বলা আমাদের পেক্ষে বৈধ নয়। খুব সম্ভব হতে পারে যে তাঁদের মধ্যে কেউ সত্যিকার নবী ছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁদের অনুসারীরা তাদের প্রচারিত ধর্মকে বিকৃত করে ফেলেছে , যেমন করে বিকৃত করেছে হযরত মূসা (আ) ও হযরত ঈসা (আ) এর অনুগামীরা । সুতরাং আমরা যে মত প্রকাশ করব তা তার ধর্ম ও তাঁর রীতিনীতি সম্পর্কেই করব ; কিন্তু পথপ্রদর্শকদের সম্পর্কে আমরা নিরবতা অবলম্বন করব , যেন না জেনেশুনে কোন রাসূল সম্পর্কে অসংগত উক্তি করে আমরা অপরাধী না হই।

হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর মত অন্যান্য নবীরাও ছিলেন আল্লহর সত্যিকার পয়াগাম্বর ; তাঁরাও ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত , ইসলামের সহজ সরল পথ তারাও দেখিয়েছিলেন এবং তাঁদের সকলের উপর ঈমান পোষণের নির্দেশ আমাদের দেয়া হয়েছে , এদিক দিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁদের মধ্যে কোন তফাত নেই , কিন্তু এমনি সকল দিক দিয়ে সমপর্যায়ভুক্তহওয়া সত্ত্বেও হযরত মুহাম্মাদ (সা) ও অন্যান্য পয়গাম্বরদের মধ্যে তিনটি বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে।

প্রথমত, পূর্ববর্তী নবীরা বিশেষ কওম, বিশেষ যামানার জন্য এসেছিলেন এবং হযরত মুহাম্মাদ (সা) কে প্রেরণ করা হয়েছিল তামাম দুনিয়ার জন্য ও সর্বকালের জন্য নবী হিসেবে। আগের অধ্যায়ে আমরা তার বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

দ্বিতীয়, পূর্ববর্তী নবীদের শিক্ষা হয় দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে , অথবা কোনরূপ অবশিষ্ট থাকেলেও নিজস্ব স্বরূপ সহ তা রক্ষিত হয়নি। এমনি করে তাঁদের সঠিক জীবন কাহিনী আজ দুনিয়ার কোথাও খুজে পাওয়া যায় না বরং তার সাথে মিলিত হয়ে গেছে সংখ্যাহীন গল্পকাহিনী । এ কারণেই কেউ তাঁদের পথ অনুসরণ করতে চাইলেও তাঁর পক্ষে তা সম্ভব হয় না । পাক্ষান্তরে , হযরত মুহাম্মাদ (সা)– এর শিক্ষা তাঁর পবিত্র জীবন –কথা তাঁর মৌখিক উপদেশ, তাঁর অনুসৃত পন্থা , তাঁর নৈতিক জীবন , স্বভাব ও সৎকর্মসমূহ –এক কথায় তাঁর জীবনের প্রতিটি জিনিস দুনিয়ার বুকে পূর্ণ সংরক্ষিত হয়ে রয়েছে । এ কারণেই প্রকৃতপক্ষে সকল পয়গাম্বরের মধ্যে কেবল হযরত (সা) -ই একমাত্র জীবন্ত পয়গাম্বর এবং একমাত্র তাঁরই অনুসরণ করা সম্ভব হতে পারে।
তৃতীয় , পূর্ববর্তী নবীগণের মাধ্যমে ইসলমের যে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল তা সুসম্পূর্ণ ছিল না। প্রত্যক নবীর পরে অপর কোন নবী এসে তাঁর আদেশ , আইন ও হেদায়াত সমূহ সংশোধন ও সংযোজন করেছেন এবং সংশোধন ও উন্নতির ধারা বরাবর জারী রয়েছে। এ জন্য এসব নবীর যামানা অতীত হয়ে যাওয়ার পর তাঁদের শিক্ষাকে আল্লাহ তা’য়ালা সংরক্ষিত করে রাখেননি; কেননা প্রত্যেকটি পূর্ণাংগ শিক্ষার পর তার পূর্ববর্তী অসম্পূর্ণ শিক্ষার আর প্রয়োজন থাকেনি। অবশেষে হযরত মুহাম্মাদ (সা) -এর মাধ্যমে ইসলামের এমন শিক্ষা দেয়া হয়েছে , যা প্রত্যেক দিকে দিয়ে সুসম্পূর্ণ । তার পূর্বে সকল নবীর শরীয়াত আপনা থেকেই বাতিল হয়ে গেছে , কেননা সম্পূর্ণ জিনিসকে পরিত্যাগ করে অসম্পূর্ণ জিনিসের অনুসরণ করা বুদ্ধি বৃত্তি বিরোধী । যে ব্যক্তি হযরত মুহাম্মাদ (সা) -এর আনুগত্য করবে সে প্রকৃতপক্ষে সকল নবীরই আনুগত্য করবে। তার কারণ হচ্ছে এই যে , সকল নবীর শিক্ষায় যা কিছু কল্যাণকর ছিল তার সবকিছুই মওজুদ রয়েছে হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর শিক্ষায় । আবার যে ব্যক্তি তার আনুগত্য ছেড়ে পূর্ববর্তী কোন নবীর আনুগত্য স্বীকার করবে , সে বহুবিধ কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে, কেননা যেসব কল্যাণকর নির্দেশ পরবর্তীকালে এসেছে , আগেকার শিক্ষায় তা ছিল না।

উপরিউক্ত কারণে তামাম দুনিয়ার মানুষের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য হচ্ছে একমাত্র হযরত মুহাম্মাদ (সা) – এর আনুগত্য করা । মুসলমান হওয়ার জন্য হযরত মুহাম্মাদ (সা)- এর উপর ঈমান আনা তিনটি দিক দিয়ে মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরী।

প্রথমত , তিনি হচ্ছেন আল্লাহর সত্যিকার পয়গাম্বর ।

দ্বিতীয় , তাঁর হেদায়াত সর্বতোভাবে সুসম্পূর্ণ । তার মধ্যে কোন অসম্পূর্ণতা নেই এবং তা সর্বপ্রকার ত্রু“টি- বিচ্যুতি থেকে মুক্ত।

তৃতীয় , তিনি হচ্ছেন আল্লাহর আখেরী পয়গাম্বর । তাঁর পরে কিয়ামত পর্যন্ত কোন কওমের মধ্যে কোন নবী আসবেন না। অতপর এমন কোন ব্যক্তির আবির্ভাব কখনো হবেনা , মুসলমান হওয়ার জন্য যার উপর ঈমান আনা শর্ত হিসেবে গণ্য হবে অথবা যাকে না মানলে কোন ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *