অধ্যায় ০৬ : লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’-র প্রকৃত তাৎপর্য ও মানব জীবনে এর প্রভাব

আল্লাহর প্রতি ঈমান

হযরত মুহাম্মাদ (সা)- এর সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছেঃ

“ আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই ।”

এ কালেমা -ই হচ্ছে ইসলামের বুনিয়াদ — যা দিয়ে এক কাফের এক মুশরিক ও এক নাস্তিক থেকে মুসলিমের পার্থক্য নির্ধারিত হয়। এ কালেমার স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতি দ্বারা এক মানুষ ও অপর মানুষের মধ্যে বিপুল পার্থক্য রচিত হয়। এ কালেমার অনুসারীরা পরিণত হয় এক জাতিতে এবং অমান্যকারীরা হয় তাদের থেকে স্বতন্ত্র জাতি। এর অনুসারীরা দুনিয়া থেকে শুরু করে আখেরাতে পর্যন্ত উন্নতি, সাফল্য ও সম্মানের অধিকারী হয় এবং অমান্যকারীদের পরিণাম হচ্ছে ব্যর্থতা অপমান ও পতন।

ছোট খাট কথাটি কেবল মুখে উচ্চারণ করার ফলেই মানুষে মানুষে এ বিপুল পার্থক্য রচিত হতে পারে না; মুখে দশ লক্ষ্য বার ‘কুইনিন ’ ‘কুইনিন ’ বললে এবং তা সেবন না করলে যেমন ম্যালেরিয়া কখনো ছাড়তে পারেনা, তেমনি মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ উচ্চরণ করলে, অথচ কি তার অর্থ, এ ক’টি শব্দ উচ্চরণ করে কত বড় জিনিসের স্বীকৃতি দান করা হল এবং এ স্বীকৃতির ফলে নিজের উপর কত বড় দায়িত্ব গ্রহণ করা হল তা যদি বুঝতে না পারা যায় তা হলে না বুঝে এমনি উচ্চারণ করার ফলে কারো কোন কল্যাণই সাধিত হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে প্রার্থক্য কেবল তখনই আসতে পারে , যখন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- র তাৎপর্য অন্তরে প্রতিভাত হবে তার অর্থের উপর পূর্ণ প্রত্যয় জন্মাবে এবং তাঁর বিরোধী যত রকম বিশ্বাস আছে, তা থেকে মন সম্পূর্ণরূপে মুক্তি লাভ করবে এবং আগুনের দাহিকা শক্তি ও বিষের মুত্যু ঘটাবার মতার প্রতি বিশ্বাস যতটুকু প্রভাব বিস্তার করে এ কালেমার প্রতি বিশ্বাস ও মন -মস্তিষ্কের উপর কমপক্ষে ততটা প্রভাব বিস্তার করবে। যেমন করে আগুনের প্রকৃতি সম্পর্কে ঈমান মানুষকে আগুনের স্পর্শ থেকে দূরে রাখে এবং বিষের প্রকৃতির উপর ঈমান বিষ পান থেকে তাকে বাঁচিয়ে রাখে, ঠিক তেমনি করে বিশ্বাস ও কর্মের সকল ক্ষেত্রে এ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’ কালেমার উপর ঈমান শিরক , কুফর , নাস্তিকতা প্রভৃতি দুষ্কুতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রূপ থেকে মানুষ কে বিরত করে রাখবে।

‘লা -ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ র অর্থ

‘ইলাহ ’ বলতে কি বুঝায় , সবার আগে তা-ই বুঝে নিতে হবে। আরবী ভাষায় ‘ইলাহ ’শব্দের অর্থ হচ্ছে ইবাদাতের যোগ্যঃ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্ব , গৌরব ও মহত্বের যে সত্তা উপাসনার যোগ্য এবং বন্দেগী ইবাদাতে যাঁর সামনে মস্তক অবনিমত করা যায়। ‘ইলাহ ’ শব্দের অর্থে এ তাৎপর্য ও শামিল রয়েছে যে , তিনি হবেন অনন্ত শক্তির অধিকারী যে শক্তির উপলব্ধি মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির সীমানা অতিক্রম করে যায়। ‘ইলাহ’ শব্দের তাৎপর্যের মধ্যে এও রয়েছে যে , তিনি নিজে কারুর মুখাপেক্ষী হবেন না, অথচ আর সবাই জীবনের সকল ব্যাপারে তাঁর মুখাপেক্ষী হবে এবং তাঁর কাছে সাহায্য ভিক্ষা করতে বাধ্য হবে। ‘ইলাহ’ শব্দের মধ্যে রহস্যময়তার অর্থও নিহিত রয়েছে। অর্থাৎ ‘ইলাহ’ তাকেই বলা যায়, যাঁর শক্তির উপর থাকবে রহস্যের আবরণ। ফারসী ভাষায় ‘খোদা ; হিন্দী ভাষায় , দেবতা , ইংরেজী ভাষায় ‘গড’ শব্দও এর কাছাকাছি অর্থে ব্যবহার হয় এবং দুনিয়ার অন্যান্য ভাষায় একই অর্থে বিশেষ বিশেষ শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

‘আল্লাহ ’ শব্দটি হচ্ছে একক -লা শরীক আল্লাহর ‘ইসমে জাত ’ বা মৌলিক নাম, মূল সত্তার পরিচায়ক নাম। ‘লা -ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’ কথাটির শব্দগত তরজমা হচ্ছে কোন ইলাহ নেই সেই বিশেষ সত্তা ব্যতীত যাঁর নাম আল্লাহ। এর তাৎপর্য হচ্ছে এই যে , সমগ্র সৃষ্টিতে আল্লাহ ব্যতীত এমন আর কোন সত্তার অস্তিত্ব নেই, যে উপাসনা পাওয়ার যোগ্য হতে পারে। তিনি ব্যতীত এমন যোগ্যতাসম্পন্ন আর কেউ নেই, ইবাদাত বন্দেগী ও আনুগত্যে যার সামনে মস্তক অবনমিত করা হয়। তিনিই একমাত্র সত্তা, যিনি তামাম জাহানের মালিক ও বিধানকর্তা , সবকিছুই তাঁর মুখাপেক্ষী , সবাই একমাত্র তাঁর কাছ থেকেই সাহায্য কামনা করতে বাধ্য । তিনি মানুষের উপলব্ধির বাইরে লুক্কায়িত এবং তাঁর অস্তিত্ব অনুভব করতে গিয়ে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে।

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’-র প্রকৃত তাৎপর্য

উপরে তা কেবল ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’ কথাটির শাব্দিক অর্থ বিশ্লেষণ করা গেল। এখন তার সঠিক তাৎপর্য পর্যালোচনা করব।
মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম যুগের যেসব তথ্য আমাদের হাতে এসেছে এবং প্রাচীনতম জাতিসমূহের যে সব ধ্বংসাবশেষ সন্ধান আমরা পেয়েছি , তা থেকে বুঝা যায় , প্রত্যেক যুগের মানুষ কোন না কোন খোদাকে মেনে নিয়েছে এবং কোন না কোন ধরনের ইবাদাত করেছে । আজো দুনিয়ার যত জাতি রয়েছে –তারা নিতান্ত আদিম প্রকৃতির হোক অথবা সুসভ্য হোক, তাদের সবারই মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে এই যে , তারা কোন বিশেষ সত্তাকে খোদা বলে মানছে , তার ইবাদাত করেছে। এ থেকে বুঝা যায় যে , খোদার ধারণা মানুষের প্রকৃতির শামিল হয়ে আছে। তার ভিতরে এমন কোন জিনিস রয়েছে যা তাকে বাধ্য করেছে কাউকে খোদা মানতে ও তার ইবাদাত করতে।

এরপর প্রশ্ন ওঠে মানুষের মধ্যে সেই বিশেষ জিনিসটি কি? প্রত্যেকটি লোক তার নিজের অস্তিত্বের প্রতি ও সকল মানুষের অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আপনা থেকেই এর জবাব উপলব্ধি করতে পারবে।

প্রকৃতপক্ষে , মানুষ বান্দা হয়েই পয়দা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সে পরমুখাপেক্ষী , দুর্বল ও দুঃস্থ। তার অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য যে অসংখ্য জিনিসের প্রয়োজন , তা তার শক্তির আধিপত্যের অধীন নয়। কখনো আপনা থেকেই তা তার হাতে আসে, আবার কখনো বা সে তা থেকে বঞ্চিত হয়।

এমন অনেক জিনিসই তো রয়েছে , যা তার পক্ষে কল্যাণকর । সে তা অর্জন করতে চায়; কিন্তু সেই সব জিনিস কখনো তার হাতে আসে , কখনো বা আসেনা ; কারণ সেই সব জিনিস অর্জন করার স্বাধীন ক্ষমতা আদৌ তার নেই।

আবার এমন অনেক জিনিস আছে, যা তার অনিষ্ট সাধন করে , তার সারা জীবনের পরিশ্রম মুহুর্তে বিনষ্ট করে দেয় , তার সকল আশা -আকাংখাকে ধূলি -লুন্ঠিত করে দেয় তাকে ব্যাধী ও মৃত্যুর কবলগ্রস্ত করে দেয়। সে চায় সেই সব অনিষ্টকর জিনিসকে ধ্বংস করে দিতে ; কখনো তা ধ্বংস হয়, কখনো হয়না। তার ফলে সে উপলব্ধি করে যে , সেই সব জিনিসের আসা না আসা, দূর হওয়া না হওয়ার উপর তার কোন কর্তৃত্ব নেই।

এমন অনেক কিছুই রয়েছে , যার শান-শওকত ও বৃহত্ব দেখে মানুষ ভীত হয়ে পড়ে । পাহাড়, নদী ও ভয়াবহ হিংস্র জানোয়ারের রূপ তার চোখের সামনে আসে । ঝড়ঝঞ্জা , প্লাবন ও ভুমিকম্পের নগ্নরূপ সে দেখতে পায়। মেঘের গর্জন , অন্ধকার ঘনঘটা , বজ্রের হুংকার বিজলীর চমক ও মুষলধারা-বৃষ্টির দৃশ্য একের পর এক তার চোখের সামনে আসতে থাতে। সে দেখে যে , এসব জিনিস কত বড় ,কত শক্তিশালী , কত মহিমাময় আর তার তুলনায় সে নিজে কত দুর্বল কত নগণ্য।

এসব বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য ও তার নিজের দীনতার বিভিন্ন প্রমাণ চোখের সামনে দেখে মানুষের অন্তরে স্বতঃই নিজের দাসত্ব (বন্দেগী) , পরমুখাপেক্ষিতা ও দুর্বলতার অনুভুতি জাগ্রত হয় এবং সেই অনুভূতির সাথে সাথেই জন্মে আল্লাহর ধারণা। যে হাতের ইংগিত চালিত হয় এসব মহাশক্তি , তাঁর ধারণা তার মনে জাগ্রত হয়। তাঁর শক্তির অনুভূতি মানুষকে বিনয় -নম্র করে , তারই কাছে সাহায্য ভিক্ষা করতে বাধ্য করে। তাঁর কল্যাণদায়ক শক্তির অনুভূতি মানুষকে বাধ্য করে বিপদ মুক্তির জন্য তাঁরই সামনে হস্ত প্রসরিত করতে। তার অনিষ্টকর শক্তির অনুভূতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে তাঁর ভীতি অন্তরে পোষণ করতে এবং তাঁর গযব থেকে বাঁচার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে।

অজ্ঞতার সর্বনিম্ন স্তর তাকেই বলা যায় , যখন মানুষে এসব ঐশ্বর্য ও শক্তিতে প্রত্যক্ষ ও তাদের কল্যাণকর বা অনিষ্টকর রূপ দেখে মনে করে যে, এরাই খোদা , তারা পূজা করতে থাকে জানোয়ার , পাহাড় ও নদীকে । তারা পূজা করে যমীন,আগুন, বৃষ্টি , হাওয়া , চন্দ্র , সূর্য ও আরো কত শক্তির ।

যখন এ অজ্ঞতার মাত্রা কিছুটা কম থাকে এবং জ্ঞানের আলোক কিছুটা পাওয়া যায় , তখন বুঝা যায় যে , এসব জিনিস মানুষেরই মত পরমুখাপেক্ষি কত বড় জানোয়ার তুচ্ছ মশা -মাছির মত মরে যায়; প্রকান্ড প্রকান্ড নদীর পানি ওঠে , নামে ,শুকিয়ে যায়, মানুষ নিজেই কেটে ফেলে পাহাড়। যমীনের ফলে- ফুলে সমৃদ্ধ হওয়া তার নিজর ইচ্ছাধীন নয়, পানি যখন তাকে সাহায্য করেনা , তখনই যমীন হয় শুষ্ক অনুর্বর । পানিও নিজের খুশী মত চলতে পারে না, তাকেও হতে হয় হাওয়ার মুখাপেক্ষি । হাওয়াও নিজের ক্ষমতার অধীন নয় , তার কল্যাণ অকল্যাণ নির্ভর করে অন্যবিধ কল্যাণের উপর । চন্দ্র , সূর্য , তারকার কোন বিশেষ বিধানের আনুগত্য করে চলে। এ বিধানের বাইরে তারা কখনো তাদের গতির বিন্দুমাত্র রদবদল করতে পারে না। এসব দেখে শুনে মানুষের মন কোন অদৃশ্য রহস্যাবৃত মুক্তির দিকে ফিরে যায় তখন সে ভাবতে থাকে যে , এসব দৃশ্যমান বস্তুসমূহের অন্তরালে রয়েছে এমন রহস্যাবৃত শক্তিপুঞ্জ ,যারা পরিচালিত করছে তাদেরকে এবং সবকিছুই হচ্ছে এ শক্তিপুঞ্জের অধীন। এখান থেকেই বহু খোদা ও বহু দেবতার ধারণার উদ্ভব হয়েছে। এ অবস্থাতেই মানুষ মেনে নিয়েছে আলো , হাওয়া , পানি ব্যাধি , স্বাস্থ্য ও আরো বহু জিনিসের আলাদা আলাদা খোদার অস্তিত্ব। তাদের কাল্পনিক মূর্তি তৈরী করে তারা করে চলেছে তাদের পূজা ।

এরপর যখন আরো বেশী করে জ্ঞানের আলো আসতে থাকে , তখন মানুষ দেখতে পায় যে , দুনিয়ার ব্যস্থাপনা চলছে এক শক্তিশালী আইন ও এক বড় রকমের বিধানের অনুসরণ করে। হাওয়ার গতি , বৃষ্টির আগমন , গ্রহ উপগ্রহের আবর্তন ,ঋতুসমূহের পরিবর্তনের মধ্যে কি নিয়ম শৃঙখলা বিরাজমান ; কিভাবে অগণিত শক্তি মিলে- মিশে কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বজগতের এ সামঞ্জস্য লক্ষ্য করে একজন মুশরিককেও মেনে নিতে হচ্ছে যে,সব ছোট ছোট খোদার উপর রয়েছে সবার বড় এক খোদার সার্বভৌম আধিপত্য ; নইলে এসব ভিন্ন ভিন্ন খোদা অনন্য নির্ভশীল ও স্বতন্ত্র হলে এবং সর্বত্র তাদের স্বেচ্ছাতন্ত্র চালিযে গেলে বিশ্বের এ বিপুল বিরাট কারখানা বির্পযস্ত হয়ে যেত এই বড় খোদার নাম দিয়েছে সে ‘আল্লাহ ’ ‘পরমেশ্বও’ ‘খোদায়ে খোদাগান’ -আরো কত কিছু। উপাসনার ক্ষেত্রে ছোট খোদাকেও শরীক করেন তাঁর সাথে । তার ধারণা আল্লাহর কর্তৃত্ব চলছে পার্থিব রাজা-বাদশাহর রাজত্বেরই মত। যেমন দুনিয়ার এক বাদশাহ রাজত্ব করেন তাঁর থাকে বহু মন্ত্রী , বিশ্বস্ত অনুচর , শাসনকর্তা ও দায়িত্বশীল কর্মচারী , তেমনি করে এ সৃষ্টির উপর রয়েছেন এক বড় খোদা; আর বহু ছোট ছোট খোদা রয়েছে তাঁর অধীনে । যতক্ষণ না এসব ছোট ছোট খোদা কে খুশী করা যাবে , ততক্ষণ বড় খোদার কাছে যাওয়া যাবে না। সুতরাং তাদেরও উপাসনা কর তাদের কাছে হাত পাত , তাদের অসন্তোষের ভয় কর , তাদেরকে বড় খোদার কাছে পৌঁছাবার মাধ্যমে পরিণত কর এবং নযর নিয়ায দিয়ে তাদেরকে খুশী রাখ।
আবার যখন জ্ঞানের ক্ষেত্রে আরো উন্নত হতে থাকে খোদার সংখ্যা তখন আরো কমতে থাকে। অজ্ঞ মানুষেরা যত খোদা তৈরী করে রেখেছে , তার মধ্যে এক একটির চিন্তা করলে মানুষ বুঝতে পারে যে, সে খোদা ই নয়। সে আমাদেরই মত এক বান্দাহ , এবং আমাদের চেয়েও বেশী অসহায় সে। এমনি করে একে একে এসব কাল্পনিক খোদা পরিত্যক্ত হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত কেবল এক খোদাই অবশিষ্ট থাকেন। কিন্তু এ এক খোদা সম্পর্কে ও মানুষের ধারণার অনেকখানি অজ্ঞাতার পরিচয় পাওয়া যায়। কেউ ধারণা করে যে , খোদা আমাদের মত রক্ত মাংসের দেহের অধিকারী এবং তিনি এক নির্দিষ্ট স্থানে বসে তাঁর খোদায়ী চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ মনে করে খোদা স্ত্রী -পুত্র- কন্যা নিয়ে মানুষের মত বাস করেন এবং মানুষের মত তাঁর সন্তান- সন্তুতির ধারা চলে আসছে। কেউ আবার অনুমান করে যে খোদা দুনিয়ার মানুষের আকৃতি ধারণ করে অবতরণ করে দুনিয়ায়। কেউ বলে খোদা এ দুনিয়ার কারখানা চালু করে দিয়ে নির্বিকভাবে বসে আছেন এবং কোথাও আরাম আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন । কারুর ধারণা , খোদার কাছে বুযর্গ লোকদের আত্মা সমূহের সুপারিশ অপরিহার্য এবং তাদের মাধ্যমে ব্যতীত সেখানে কোন কাজ চলতে পারে না। কেউ তার ধারণায় আল্লাহর এক বিশেষ রূপ পিরিকল্পনা করে নেয় এবং উপাসনার জন্য সেইরূপ সম্মুখে স্থাপন করার অপরিহার্য প্রয়োজন অনুভব করে । তাওহীদ বিশ্বাস পোষণ করা সত্ত্বেও এ ধরনের বহুবিধ ভুল ধারণা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে থাকে , যার ফলে মানুষ শিরক অথবা কুফরে নিমজ্জিত হয়। এর সব কিছুই হচ্ছে অজ্ঞতার পরিণতি ।

সবার উপরে রয়েছে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’ কথাটির স্থান । এ হচ্ছে সেই জ্ঞান যা খোদ আল্লাহ তা’য়ালাই প্রত্যেক যুগে তার নবীদের মাধ্যমে মানুষের কাছে প্রেরণ করেছেন। এ জ্ঞান সবার আগে তিনি হযরত আদম (আ) কে দিয়ে তাঁকে দুনিয়ায় অবতীর্ণ করেছিলেন। আদম (আ) এর পরে এ জ্ঞান লাভ করেছিলেন হযরত নূহ (আ) , হযরত ইবরাহীম (আ), হযরত মূসা (আ) ও অন্যান্য সকল পয়গাম্বর। আবার এ জ্ঞান নিয়েই সবার শেষে দুনিয়ায় তাশরীফ এনেছিলেন হযরত মুহম্মাদ (সা) । এ নির্ভুল জ্ঞানের মধ্যে কোন অজ্ঞতার স্পর্শ নেই । উপরে শির্‌ক বুতপরস্তি ও কুফরের যত রূপ আমি বর্ণনা করেছি, মানুষ পয়গাম্বরদের শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজস্ব উপলব্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তির উপর নির্ভর করেছে বলেই তাতে জড়িত হয়েছে। এবার এ ছোট খাট কথাটির অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য বিশ্লেষণ করব।

একঃ সবার আগে বিবেচ্য প্রশ্ন হচ্ছে আল্লাহর ধারণা। এই সীমাহীন বিশ্ব-প্রকৃতির দিকে দৃষ্টি নিপে করলে এর আদি ব্যবস্তাপনা ও অন্ত সর্ম্পকে ভাবতে গিয়ে আমাদের মন বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়ে। এক অজানা যুগ থেকে শুরু হয়েছে এর গতি এবং অজানা যুগের দিকে চলছে এগিয়ে । এর ভিতরে পয়দা হয়েছে সীমাসংখ্যাহীন অনন্ত সৃষ্টি এবং আরো পয়দা হয়ে চলছে। প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এমন বিস্ময়কর যে , তা উপলব্ধি করতে গিয়ে মনুষ্য জ্ঞান বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়েছে । এ বিপুল সৃষ্টির খোদায়ী কেবল তাঁরই পক্ষে সম্ভব , যিনি নিজে সীমাবন্ধনহীন , অনন্তকাল ধরে যিনি জীবন্ত , যিনি কারুর মুখাপেক্ষি নন , যিনি স্বাধীন , সর্বশক্তিমান , সার্বভৌম শক্তির অধিকারী ও সর্বজ্ঞ , সকল বস্তুর জ্ঞান যিনি রাখেন, কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন থাকতে পারেনা। সবার উপর যিনি বিজয়ী এবং যাঁর হুকুম অমান্য করতে কেউ পারে না, যিনি অনন্ত শক্তির মালিক এবং আপনা থেকে যাঁর কাছ থেকে সৃষ্টির সকল জীবের কাছে পৌঁছে জীবন ও জীবিকার সামগ্রী, যিনি সকল অভাব ত্রু“টি ও দুর্বলতা দোষ থেকে মুক্তি এবং যাঁর কার্যে অপর কারুর হস্তক্ষেপ চলতে পারে না।

দুইঃ আল্লাহর কর্তৃত্বের এসব গুণ কেবল একটি মাত্র সত্তার ভিতরে সীমাবদ্ধ হওয়াই অপরিহার্য ।একাধিক সত্তার মধ্যে এ সবগুণের অস্তিত্ব সমভাবে থাকা অসম্ভব , কারণ সবার উপর বিজয়ী ও সার্বভৌম শক্তির অধিকারী মাত্র একজনই হতে পারেন। এসব গুণরাজী ভাগাভাগী করে বহু খোদার মধ্যে বন্টন করে নেয়া ও তেমনি অসম্ভব। কেননা এক খোদা যদি হন সার্বভৌম শক্তির অধিকারী , অপর এক খোদা সর্বজ্ঞ , অপর একজন হন জীবন দানকারী তা হলে প্রত্যেক খোদাকে হতে হয় অপরের মুখাপেক্ষী এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা না থাকলে মুহুর্তে এ সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যাবে । এও সম্ভব হতে পারে না যে, এসব গুনরাজী এক থেকে অপরের কাছে ন্যস্ত হবে অর্থাৎ এর কোন গুণ কখনো থাকবে এক খোদার মধ্যে ; আবার কখনো থাকবে অপর খোদার মধ্যে ; কেননা যে খোদা নিজেকে জীবন্ত রাখার মতো ক্ষমতার অধিকারী নয় , সারা সৃষ্টিকে জীবন দান করা তার পক্ষে অসম্ভব এবং যে খোদা নিজের খোদায়ী সংরক্ষণ করতে পারে না , এত বড় বিরাট সৃষ্টির উপর কর্তৃত্ব চালানো তার পক্ষে সম্ভব নয়; সুতরাং যত বেশী করে জ্ঞানের দীপ্তি লাভ করা যাবে মনে তত বেশী প্রত্যয় জন্মাবে যে, কেবলমাত্র একই সত্তার মধ্যে আল্লাহর গুণরাজীর সমাবেশ হওয়া অপরিহার্য।

তিনঃ আল্লাহর কর্তৃত্বের পরিপূর্ণ ও নির্ভুল ধারণাকে দৃষ্টির সামনে রেখে সকল সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করা যেতে পারে। যতসব জিনিস দৃষ্টি পথে আসে, যা কিছু জ্ঞানের পরিধির মধ্যে আসে, তার কোন কিছুর মধ্যেই এসব গুণের সমাবেশ দেখতে পাওয়া যাবে না । বিশ্ব -প্রকৃতির সবকিছু অপরের মুখাপেক্ষী ও অপর কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত; তারা জন্মে , পরিবর্তিত হয়, মরে ও বাঁচে। কোনকিছুই অপরিবর্তিত অবস্থায় স্থায়ী হয়ে থাকতে পারে না। কারুরই নিজের খেয়াল খুশী অনুযায়ী কিছু করার মতা নেই। সর্বোপরি যে আইন বলবৎ রয়েছে তার চুল পরিমাণ অতিক্রম করার ক্ষমতা কারুর নেই। তাদের মধ্যে আল্লাহর সামান্যতম দ্যুতিও দেখা যায় না। আল্লাহর কার্যকলাপের মধ্যে তাদের কারুর বিন্দুমাত্র দখল নেই। লা- ইলাহা- র মানে হচ্ছে এই।

চারঃ বিশ্ব-জগতের সকল পদার্থের আল্লাহর কর্তৃত্ব অস্বীকার করার পর একথা অংগীকার করতেই হবে যে সর্বোপরি রয়েছেন আর এক স্বতন্ত্র সত্তা । একমাত্র তিনিই হচ্ছেন সকল কর্তৃত্বের গুণরাজীর অধিকারী এবং তিনি ব্যতীত আর কোন আল্লাহ নেই। ইল্লাল্লাহ -র মানে হচ্ছে এই।

সকল জ্ঞানের সেরা জ্ঞান হচ্ছে এই। যতই অনুসন্ধান ও গবেষণা চালানো যাবে , ততই বুঝতে পারা যাবে যে , জ্ঞানের শুরু এখানেই এবং শেষ সীমানাও এতেই সীমাবদ্ধ। পদার্থবিদ্যা , রসায়ন , জ্যোতিষ , ভূতত্ব , জীবতত্ত্ব , মানবীয় তত্ত্ব -এক কথায় বিশ্ব জগতের রহস্য অনুসন্ধানের যে কোন পথই অবলম্বন করা হবে, সেখানে গবেষণা চালিয়ে অগ্রসর হতে হতে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- র সত্যতা ক্রমাগত উদঘাটিত হতে থাকবে এবং তার প্রতি প্রত্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাবে। জ্ঞান -বিজ্ঞানের গবেষণার ক্ষেত্রে প্রতি পদে অনুভূত হবে যে , সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এ সত্যকে অস্বীকার করার পর সৃষ্টির যে কোন জিনিস নিরর্থক হয়ে যায়।

মানব জীবনে তাওহীদ বিশ্বাসের প্রভাব

‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ ’র স্বীকৃতি ঘোষণা করলে তার ফলে মানব জীবনে কি প্রভাব পড়ে এবং এ কালেমা অমান্যকারী দুনিয়া ও আখেরাতে কেন ব্যর্থ হয়, তার বর্ণনা এখানে পেশ করছি।

একঃ এ কালেমায় বিশ্বাসী ব্যক্তি কখনো সংকীর্ণ দৃষ্টিভংগী সম্পন্ন হতে পারে না। সে এমন এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী যিনি যমীন ও আসমানের স্রষ্টা , মাশরিক ও মাগরিবের মালিক , তামাম জাহানের পালনকর্তা । এ ঈমানের পর সারা সৃষ্টির কোন বস্তুই তার দৃষ্টিতে নিজের থেকে আলাদা মনে হতে পারে না। আপন সত্তার মতই সে এর সবকিছুকে এই মালিকের আধিপত্যের ও একই বাদশাহর প্রভুত্বের অধীন মনে করে। তার সহানুভূতি , প্রেম ও খেদমত কোন বিশেষ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। আল্লাহর বাদশাহী যেমন অনন্ত অসীম, তার দৃষ্টিভংগী ও তেমনি সীমা বন্ধনহীন হয়ে যায় । এ ধরনের দৃষ্টিভংগি এমন কোন লোকের মধ্যে থাকতে পারে না, যে ছোট ছোট খোদার বহু অস্তিত্ব স্বীকার করে অথচ যার খোদার মধ্যে মানুষেরই মত সীমাবদ্ধও ত্রু“টি- বিচ্যুতিপূর্ণ গুণের সমাবেশ হয়, অথবা যে ব্যক্তি গোড়া থেকেই খোদার অস্তিত্বই স্বীকার করে না।

দুইঃ এ কালেমা মানুষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আত্মসম্মানবোধ ও আত্মমর্যাদার অনুভুতি জাগিয়ে তোলে ।এর উপর বিশ্বাস পোষনকারী জানে যে , এক আল্লাহ -ই সকল শক্তির মালিক। তিনি ব্যতীত আর কেহ মানুষের কল্যাণ বা অকল্যাণ দান করতে পারে না, কেউ তাকে জীবন দিতে পারে না, মারতে পারে না ,এ জ্ঞানও প্রত্যয় তাকে আল্লাহ ব্যতীত অপর যে কোন শক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত , আত্মনির্ভরশীল ও নির্ভীক করে তোলে । তার শির কোন সৃষ্টির সামনে অবনমিত হয়না; তার হাত কারুর সামনে প্রসারিত হয় না। তার অন্তরে কারুর শ্রেষ্ঠত্বের আধিপত্য স্থান লাভ করে না। তাওহীদ বিশ্বাস ব্যতীত কোন অন্যবিধ বিশ্বাস থেকে গুণের এ জন্ম হয় না। শির্‌ক কুফর ও নাস্তিকতার অপরিহার্য প্রকৃতি হচ্ছে এইযে, মানুষ তার প্রভাবে সৃষ্টির সামনে অবনমিত হয়। তাকেই কল্যাণ অকল্যাণের মালিক মনে করে , তারই ভয় সে অন্তরে পোষণ করে এবং তার কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা করে।

তিনঃ আত্মসম্মানবোধের সাথে সাথে এ কালেমা মানুষের মধ্যে বিনয়ও সৃস্টি করে। এ কালেমার স্বীকৃতিদানকারী কখনো গর্বস্ফীত ও উদ্ধত হতে পারে না। শক্তির গর্ব , সম্পদের গর্ব ও যোগ্যতার গর্ব কখনো তার মনে স্থান লাভ করে না, কারণ সে জানে তার যা কিছু আছে , সবই আল্লাহর দান এবং তিনি যেমন সবকিছু দেয়ার শক্তি রাখেন , তেমনি সবকিছু নেয়ার শক্তিও তাঁর রয়েছে। এর মুকাবিলায় এমন লোকও রয়েছে যে কোনরূপ পার্থিব কৃতিত্ব অর্জন করে গর্বস্ফীত হয়ে ওঠে । কারণ সে মনে করে যে , তার সে কৃতিত্ব তার যোগ্যতার ফল। এমনি করে শিরক ও কুফরের সাথে অহংকাররের উদ্ভব অপরিহার্য , কেননা মুশরিক ও কাফের ব্যক্তি এ ধারণা পোষণ করে যে তাদের উপাস্য বহু খোদা ও দেবতার সাথে তাদের একটা বিশেষ সম্পর্ক, যা অপরের ভাগ্যে জোটেনা।

চারঃ এ কালেমায় বিশ্বাস পোষণকারী বেশ ভাল করেই জানে, আত্মার শুদ্ধি ও সৎকর্ম ব্যতীত তার মুক্তি ও সাফল্যের আর কোনপথ নেই। কারণ সে এমন এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস পোষণ করে যিনি আত্মনির্ভরশীল , কারুর সাথে যাঁর কোন বিশেষ সম্পর্ক নেই , যিনি পূর্ণ ন্যায় বিচারক, যাঁর কর্তৃত্বতে আর কারুর হস্তক্ষেপ বা প্রভাব চলতে পারে না। পাক্ষান্তরে যারা মুশরিক ও কাফের তাদের সর্বক্ষণ মিথ্যা আশার উপর নির্ভর করে জীবন যাপন করতে হয়। তাদের মধ্যে কেউ মনে করে যে , খোদ খোদার পুত্র তার পাপের প্রায়শ্চিত করবেন। কেউ মনে করে সে খোদার অনুগৃহীত সুতরাং তার কোন শাস্তি হতে পারে না। কারুর ধারণা তাদের বুযর্গেরা তাদের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন। কেউ আবার দেবতাকে নযর-নিয়ায দিয়ে ভাবছে , দুনিয়ার বুকে সবকিছু করার স্বাধীনতা সে পেয়েছে। এ ধরনের মিথ্যা বিশ্বাস তাকে সর্বক্ষণ পাপ ও দুস্কৃতির চক্রে টেনে নিয়ে যায় এবং সেই মিথ্যা বিশ্বাসের উপর ভরসা করে আত্মশুদ্ধি ও সৎকর্ম থেকে গাফেল হয়ে থাকে। নাস্তিক ব্যাক্তির ব্যাপারে বলা যায়, সে তো শুরু থেকেই এমন কোন শক্তিমান সত্তায় বিশ্বাস করে না ভাল মন্দ কাজের জন্য যার কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তাই সে দুনিয়ায় নিজেকে মনে করে যে কোন কাজ করার স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী। এ ধরনের লোকের অন্তরের আকাংখাই হয় তাদের খোদা এবং তারা হয় ইন্দ্রীয়পরতার দাস।

পাঁচঃ এ কালেমার স্বীকৃতিদানকারী কোন অবস্থায়ই হতাশ ও ভগ্ন হৃদয় হয়না। সে এমন এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে , যিনি আসমান যমীনের সকল ধনভান্ডারের মালিক , যার মহিমা ওঅনুগ্রহ সীমাহীন এবং যাঁর শক্তি অনন্ত । ঈমান তাকে দেয় অসাধারণ শান্তি ও নিশ্চিন্ততা এবং তার অন্তরকে আশায় পরিপূর্ণ করে । দুনিয়ার সকল দুয়ার থেকে সে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরতে পারে, কোন কিছুই তার কাছে না আসতে পারে এবং সকল উপায় ও পন্থা সে একে একে হারাতে পারে , তথাপি এক আল্লাহর উপর নির্ভর- প্রবণতা সে কোন অবস্থায়ই হারায় না এবং তারই বলে সে নতুন আশা বুকে নিয়ে নতুন প্রচেষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করে। এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস ব্যতীত অপর কোন বিশ্বাস থেকেই অন্তরের এ নিশ্চিন্ততা লাভ করা যেতে পারে না। মুশরিক , কাফের ও নাস্তিক যারা তাদের অন্তর ছোট হয়ে থাকে, তাদের নির্ভর করতে হয় সীমাবদ্ধ শক্তির উপর । তাই সংকটের পথে , দ্রুত তাদের ঘিরে ফেলে হতাশা এবং অনেক সময়ে এমনি অবস্থায় তাদের আত্মহত্যার পথ ধরতে হয়।

ছয়ঃ এ কালেমার উপর বিশ্বাস মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে দৃঢ় সংকল্প , উচ্চাকাঙ্খা , অধ্যবসায় ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের বিপুল শক্তি। আল্লাহর সন্তোষ বিধানের জন্য যখন সে কোন মহৎ কাজ করার পথে এগিয়ে যায় তখন অন্তরে প্রত্যয় পাষণ করে যে ,যমীন ও আসমানের বাদশাহর শক্তি রয়েছে তার পশ্চাতে। এ ধারণা তার ভিতরে পর্বতের দৃঢ়তা সৃষ্টি করে দেয় এবং দুনিয়ার সকল সংকট, বিপদ বিরোধী শক্তি সমূহ মিলিত হলেও তাকে তার সংকল্প থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। শির্‌ক কুফর ও নাস্তিকতায় শক্তি কোথায় পাওয়া যাবে ?

সাতঃ এ কালমা মানুষকে বীর্যবান করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে মানুষকে কাপুরুষ করে তোলে দুটো জিনিসঃ এক দিকে ধন- প্রাণ ও সন্তান -সন্তুতির প্রেম, অপরদিকে এ ধারণা যে আল্লাহ ব্যতীত মানুষের মৃত্যু ঘটাবার মত অপর কোন শক্তি রয়েছে এবং মানুষ চেষ্টা করে মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে পারে। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’ র প্রতি বিশ্বাস এ দুটো জিনিস অন্তর থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। প্রথমটি দূরিভূত হওয়ার কারণ, এ কালেমায় স্বীকৃতিদানকারী নিজের ধন -প্রাণ ও সবকিছুর মালিক বলে জানে একমাত্র আল্লাহকেই এবং সে আল্লাহর সন্তোষের জন্য সবকিছু কুরবান করতে তৈরী থাকে। তারপর দ্বিতীয় ধারণাটি ও তার অন্তরে অবশিষ্ট থাকে না , কারণ ‘লা-ইলহা ইল্লাল্লাহ ও কালেমার স্বীকৃতিদানকারীর দৃষ্টিতে প্রাণ হরণের ক্ষমতা মানুষ, পশু, তোপ , তলোয়ার ,লাঠি , পাথর কোন কিছুরই নেই এ মতের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ এবং তিনি মৃত্যুর যে সময় নির্দেশ করে রেখেছেন, তার আগে দুনিয়ার সকল শক্তি মিলিত হয়েও কারুর প্রাণ হরণ করতে পারে না। এ কারণেই আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণকারীর চেয়ে বেশী বীর্যবান ও সাহসী দুনিয়ার আর কেউ হতে পারেনা। নাংগা তলোয়ারের চমক, কামানের অগ্নিবর্ষণ , বোমাবৃষ্টি ও দুর্দান্ত সেনাবাহিনীর আক্রমণ সবকিছুই তার কাছে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়। আল্লাহর পথে যখন সে লড়াই করতে এগিয়ে যায় তখন তার চেয়ে দশগুণ শক্তিশালী বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। মুশরিক কাফের ও নাস্তিক এ শক্তি পাবে কোত্থেকে ? তাদের কাছে প্রাণই সবচেয়ে প্রিয় বস্তু এবং তারা মনে করে ,দুশমনই নিয়ে আসে মৃত্যু ; আর দুশমনকে সরিয়ে দিতে পারলেই মৃত্যুকেও সরিয়ে দেয়া যায়।

আটঃ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র প্রতি বিশ্বাস মানুষের মনে সন্তোষ , পরিতুষ্টি ও অনন্য নির্ভরতার গৌরবময় মনোভাব সৃষ্টি করে এবং লোভ লালসা হিংসা ও বিদ্বেষের অবাঞ্চিত মনোভাব তার অন্তর থেকে দূরীভূত করে দেয়। সাফল্য অর্জনের অবৈধ ও ঘৃণ্য ধারণা তার মনে অনুপ্রবেশের অবকাশই পায় না । সে মনে করে যে , রুযী- রোযাগার আল্লাহরই হাতে , তিনি যাকে ইচ্ছা বেশী করে দেন ,যাকে ইচ্ছা কম করে দেন । সম্মান , শক্তি , খ্যাতি ও আধিপত্য আল্লাহর ইখতিয়ারের অন্তগত ; তিনি আপন বিবেচনা অনুযায়ী যাকে যেমন ইচ্ছা কম করে দেন। আমাদের কর্তব্য হচ্ছে নিজ নিজ সীমানার মধ্যে বৈধ উপায়ে চেষ্টা করে যাওয়া । সাফল্য ও ব্যর্থতা আল্লাহর অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল । তিনি দিতে চাইলে দুনিয়ার কোন শক্তি তাঁকে বাধা দিতে পারে না আর তিনি দিতে না চাইলে কোন শক্তিই তাঁকে বাধ্য করতে পারে না। পাক্ষান্তরে মুশরিক , কাফের ও নাস্তিকেরা নিজস্ব সাফল্য ও ব্যর্থতাকে নিজস্ব প্রচেষ্টা ও পার্থিব শক্তিসমূহের সাহায্য অথবা বিরোধিতার উপর নির্ভরশীল মনে করে এবং সেই কারনেই তারা থাকে প্রলোভন ও হিংসাবৃত্তির দাস হয়ে। তাই সাফল্য লাভের জন্য ঘুস , খোশামোদ , ষড়যন্ত্র ও সর্বপ্রকার নিকৃষ্ট পন্থা অবলম্বন করতে তাদের কোন ভয় নেই। অপরের সাফল্যে তারা পরশ্রীকাতরতা ও প্রতিহিংসায় জ্বলে মরে এবং তাকে -তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার ব্যাপরে কোন রকম চেষ্টার ত্রু“টি করে না।

নয়ঃ সবচেয়ে বড় ব্যাপার এই যে , ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র প্রতি বিশ্বাস মানুষকে আল্লাহর আইনের অনুসারী করে তোলে । কালেমার প্রতি ঈমান পোষণকারী বিশ্বাস করে যে আল্লাহ প্রকাশ্য ও গোপন বস্তু সম্পর্কে অবগত আছেন, তিনি আমাদের শাহ্‌রগ অপেক্ষা অধিকতর নিকটবর্তী। রাতের অন্ধকারে অথচ নিঃসংগ নির্জনতায় যদি আমরা কোন পাপের কাজ করি , তা তিনি জানতে পান। আমাদের অন্তরের গভীরে যদি কোন অসদাকাঙা জন্ম নেয়, তার খবরও অল্লাহ্‌র কাছে পৌঁছে যায়। আর সবার কাছে আমরা যা গোপন করতে পারি , আল্লাহর কাছে তা আমরা গোপন করতে পারি না। সবার কাছ থেকে আমরা পালিয়ে বাঁচতে পারলেও আল্লাহর রাজ্যের বাইরে আত্মগোপণ করার সাধ্য আমাদের নেই । সবার কাছ থেকে বাঁচতে পারলেও আল্লাহর হাত থেকে আমরা বাঁচতে পারি না। এ প্রত্যয় যতবেশী শক্তিশালী হবে, মানুষ তত বেশী আল্লাহর আদেশ-নিষেধের অনুগত হবে। যা কিছু আল্লাহ তায়ালা নিষেধ করে দিয়েছেন , তা তার কাছে ঘেষতে পারবে না। আর যা কিছু করার হুকুম করে দিয়েছেন সে নিঃসংগতা ও অন্ধকারের মধ্যে ও তা পালন করবে । কেননা সে জানে, এমন এক পুলিশ তার পেছনে যে, কখনো কোন অবস্থায়ই তাকে একা ছেড়ে দেবে না এবং এমন এক আদালতের ভীতি তার রয়েছে যার ওয়ারেন্ট এড়িয়ে সে কোথাও পালাতে পারেনা। এ কারণেই মুসলিম হওয়ার সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে জরুরী শর্ত হচ্ছে লা-ইলাহা ইল্লাহ ও উপর ঈমান আনা । আগেই যেমন বলা হয়েছে যে , মুসলিম মানে হচ্ছে আল্লাহর অনুগত বান্দাহ হওয়া , তেমনি আল্লাহর অনুগত হওয়া ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ না মানুষ এ প্রত্যয় পোষণ করে যে আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই।

হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর শিক্ষার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বুনিয়াদ জিনিস হচ্ছে আল্লাহর উপর ঈমান । এ হচ্ছে ইসলামের কেন্দ্র ও মূল এবং তার শক্তির উৎস । এ ছাড়া ইসলামের যেসব বিশ্বাস , আদেশ বিধান রয়েছে সবকিছুই দাঁড়িয়ে আছে এরই উপর নির্ভর করে এবং সব কিছুকেই শক্তি সংগ্রহ করতে হয় এ একই কেন্দ্র থেকে। এ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস কে বাদ দিলে এ ইসলামের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *