অধ্যায় ০৫ : রোযা

নামাযের পরেই মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ তাআলা যে ইবাদাত ফরয করেছেন তা হচ্ছে রমযান মাসের রোযা। সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস বন্ধ রাখার নামই রোযা। নামাযের ন্যায় ও রোযোকেও আবহমানকাল থেকে সকল নবীর শরীয়াতেই ফরয করা হয়েছে। অতীতের সকল নবীর উম্মতগণ এমনিভাবেই রোযা রাখত,যেমন রাখছে শেষ নবী (সা) এর উম্মতগণ। অবশ্য রোযার হুকুম আহকাম, রোযার সংখ্যা এবং রোযার সময় ও মুদ্দতের ব্যাপারে বিভিন্ন নবীগণের শরীয়াতে পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, প্রত্যেক ধর্মেই রোযা রাখার প্রথা কোনো না কোনো প্রকারে বর্তমান আছে। অবশ্য তারা এতে নিজেদের ইচ্ছামত অনেক কিছু যোগ করে নিয়েছে এবং নানাভাবে এর রূপ বিকৃত করে দিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। কুরআন মজীদে আল্লাহ এরশাদ করেছেন-

يَآيُّهَا الذِّيْنَ اَمَنُوْا كُتِبَ عَلَيْكُمْ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّكُوْنَ ـ
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য রোযা ফরয করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল। সূরা আল বাকার : ১৮৩

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর তরফ থেকে যত শরীয়াত দুনিয়ায় নাযিল হয়েছে, তার প্রত্যেকটিতেই রোযা রাখার বিধি-ব্যবস্থা ছিল। চিন্তা করার বিষয় এই যে, রোযার মধ্যে এমন কি বস্তু নিহিত আছে, যার জন্য আল্লাহ তাআলা সকল যুগের শরীয়াতেই এর ব্যবস্থা করেছেন।

ইতি পূর্বে আরো কয়েকজন বলেছি যে, মানুষেরে সমগ্র জীবনকে ইবাদাত অর্থাৎ আল্লাহর বন্দেগীতে পরিণত করাই হচ্ছে ইসলামের আসল উদ্দেশ্য। মানুষ জন্মগতভাবেই আল্লাহর বান্দাহ, আল্লাহর বন্দেগী তার প্রকৃত স্বভাব। কাজেই ইবাদাত অর্থাৎ চিন্তা ও কর্মের দিক দিয়ে এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহর বন্দেগী পরিত্যাগ করা মানুষের পক্ষে উচিত নয়। জীবনের প্রত্যেকটি কাজ এবং সকল সময় চিন্তা করা উচিত যে, আল্লাহর সন্তোষ কিসে, আর কোন জিনিসে তার অসন্তোষ। তারপর যে দিকেই যাওয়া উচিত এবং যেদিকে তাঁর অসন্তুষ্টি সেদিক থেকে ঠিক তেমনি দূরে থাকা উচিত, যেমন আগুন থেকে প্রত্যেকটি মানুষ দূরে থাকে। যে পথ আল্লাহ পছন্দ করেন সেই পথে চলা, যে পথ তিনি পছন্দ করেন না সেই না চলাই মানুষের কর্তব্য। এভাবে মানুষের সমগ্র জীবন যখন গঠিত হবে তখন প্রমাণিত হবে যে, সে যথাযথভাবে আল্লাহর বন্দেগী করছে এবং وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالاِنْسَ اِلاَّ لِيْعْبُدُوْنَ ـ (الذريت) মানুষ ও জ্বীন জাতিকে কেবল আমার ইবাদাত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। আল্লাহর এ ঘোষণা অনুসারে সে নিজের জন্মের উদ্দেশ্য সার্থক করতে পেরেছে।

একথাও পূর্বে বলা হয়েছে যে, নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত নামে পরিচিত যে ইবাদাতগুলো মানুষের প্রতি ফরয করা হয়েছে, মানুষকে সেই আসল ইবাদাতের জন্য তৈরি করাই হচ্ছে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য। এগুলো ফরয সাব্যস্ত করার অর্থ এ নয় যে, গুণে গুণে দিনে রাতে পাঁচবার নামায পড়লেই রমযান মাসে ত্রিশ দিন ধরে সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত ক্ষুৎ পিপাসার কষ্ট সহ্য করলেই, মালদার হলে বছরে একবার যাকাত এবং জীবনে একবার হজ্জ আদায় করলেই আল্লাহর প্রতি মানুষের কর্তব্য পুরোপুরি পালন হয়ে গেল এবং তারপর মানুষের পূর্ণ আযাদী-যা ইচ্ছে তাই করতে পারে-বরং এ ইবাদাতগুলোর ভিতর দিয়ে মানুষকে ঠিকভাবে গঠন করা এবং তার গোটা জীবনকে আল্লাহর বন্দেগীর যোগ্য করে তোলাই হচ্ছে এ ইবাদাতগুলোকে ফরয করার আসল উদ্দেশ্য। এখন উদ্দেশ্য সামনে রেখে বিচার করতে হবে যে, রোযা মানুষকে কেমন করে সেই আসল ইবাদাতের জন্য প্রস্তুত করে।

রোযা ছাড়া অন্যান্য যেসব ইবাদাত আছে, তা পালন করার জন্য কোনো না কোনো রূপে বাহ্যিক প্রকাশের আশ্রয় নিতে হয়। নামায পড়ার সময় নামাযীকে ওঠা-বসা ও রূক-সিজদা করতে হয়। এটা অন্য লোকে দেখতে পারে। হজ্জ করার জন্য দীর্ঘ পথ সফর করতে হয়, আর সেই সফরও করতে হয় হাজার হাজার মানুষের সাথে মিলে। যাকাত আদায়ের ব্যাপারও অন্ততপক্ষে দুজনকে জানতে হয়-একজন দেয়, আর একজন তা গ্রহণ করে। এসব ইবাদতে কথা কারো কাছে গোপন রাখতে পারে না। এটা আদায় করলেই অন্য লোক জানতে পারে। কিন্তু রোযার কথা আল্লাহ এবং রোযাদার ভিন্ন অন্য কেউ জানতে পারে না। এক ব্যক্তি যদি সকলের সামনে সেহরী খায় ইফতারের সময় সকলের সাথে মিলে ইফতার করে আর দিনের বেলা গোপনে কিছু খায় বা পান করে, তবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। প্রকাশ্যভাবে সকল লোকই তাকে রোযাদার বলে মনে করবে একথা ঠিক; কিন্তু আসলে সে মোটেই রোযাদার নয়।

রোযার এ দিকটা সামনে রেখে চিন্তা করুন। যে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে রোযা রাখে লুকিয়ে কিছু পানাহার করে না, কঠিন গরমের সময় পিপাসায় কলিজা যখন ফেঁটে যাবার উপক্রম হয় তখন যে এক ফোঁটা পানি পান করে না-অসহ্য ক্ষুধার দরুন চোখে তারা ফুটতে শুরু করলেও কোন কিছু খাওয়ার ইচ্ছা করে না- সেই ব্যক্তির ঈমান কত মযবুত? আল্লাহ তাআলা যে আলেমুল গায়েব সেই কথা সে কতখানি দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করে। কত নিসন্দেহে সে জানে যে, তার কাজ দুনিয়ার লোকদের কাচে অজানা থাকলেও সারাজাহানের মালিকের কাছে কিছু অজানা নয়। তার মনে আল্লাহর ভয় কত তীব্র, অসহ্য কষ্ট স্বীকার করা সত্ত্বেও কেবলমাত্র আল্লাহর ভয়েই সে এমন কাজ করে না যাতে তার রোযা ভেঙ্গে যেতে পারে। পরকালের বিচারের প্রতি তার আকীদা-বিশ্বাস কত দৃঢ়। এক মাস সময়ের মধ্যে সে কমপক্ষে তিনশত ষাট ঘন্টাকাল রোযা থাকে। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সে কমপক্ষে তার মনে কখনো কোনো সন্দেহ জাগে না। এ ব্যাপারে তার মনে যদি এতটুকু সন্দেহ হতো যে, পরকাল আছে কিনা, কিংবা সেখানে আযাব বা সওয়াব হবে কিনা বলে কোনো দ্বন্দ্ব যদি তার মনে থাকতো তাহলে সে কিছুতেই তার রোযা পূর্ণ করতে পারতো না। এ সন্দেহ সৃষ্টি হলে কেবল আল্লাহর হুকুম বলে মানুষ কিন্তু পানাহার না করার সংকল্পে মযবুত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।

এভাবে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বছর এক মাসকাল মুসলমানদের ঈমানের ধারাবাহিক পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। এ পরীক্ষায় মানুষ যতই মযবুত হয়, ততই তার ঈমান দৃঢ় হয়। বস্তুত এটা পরীক্ষার ওপরে পরীক্ষা, ট্রেনিং এর ওপর ট্রেনিং। কারো কাছে যখন কোনো আমানাত রাখা হয় তখন তার ঈমান বড় পরীক্ষায় পড়ে যায়। যদি সে এ পরীক্ষায় ভালভাবে উত্তীর্ণ হতে পারে এবং সে যদি আমানাতের খেয়ানত না করে, তখন তার মধ্যে আমানাতের বোঝা বহন করার আরও বেশী ক্ষমতা হয়। ক্রমে সে আরও আমানাতদার হতে থাকে। তদ্রুপ আল্লাহ তাআলাও ক্রমাগতভাবে এক মাসকাল পর্যন্ত দৈনিক বারো চৌদ্দ ঘন্টা ধরে মুসলমানদের ঈমানকে এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। এ পরীক্ষায় সে যখন পুরোপুরিভাবে উত্তীর্ণ হয় তখন তার মধ্যে আল্লাহকে ভয় করে অন্যান্য গুনাহ হতে ফিরে থাকার যোগ্যতা অধিক পরিমাণে জাগ্রত হয়। তখন সে আল্লাহকে আলেমুল গায়েব মনে করে গোপনেও আল্লাহর আইন ভেঙ্গে করতে পারে না। প্রত্যেকটি কাজে সে সেই কিয়ামতের দিনকে মনে করবে যেদিন সবকিছুই খুলে যাবে এবং নিরপেক্ষভাবে প্রত্যেকটি ভাল কাজে ভাল ফল এবং মন্দ কাজের মন্দ ফল দেয়া হবে।একথা বলা হয়েছে কুরআন পাকে নিন্মলিখিত আয়াতে:

يَآيُّهَا الَّذِيْنَ اَمَنُوْا كُتِبَ عَلَيْكُوْمُ الصِّيِامُ كَمَا كُتِبَ عَلى الَّذِيْنَ مِنْ قِبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ ـ (البقرة : 183)
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য রোযা ফরয করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল। সূরা আল বাকার : ১৮৩

রোযার আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, এটা মুসলমাকে দীর্ঘকাল শরীয়াতের হুকুম ধারাবাহিকভাবে পালন করতে বাধ্য করে। নামাযের এক ওয়াক্তে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগে। যাকাত বছরে একবার মাত্র আদায় করতে হয়। হজ্জে অবশ্য দীর্ঘ সময় লাগে, কিন্তু তার সুযোগ সমগ্র জীবনে মাত্র একবারই এসে থাকে। তাও আবর সকল মুসলমানের জন্য নয়, কেবল মালদার লোকেরাই সেই সুযোগ পায়। কিন্তু রোযা এসব ইবাদাত হতে অস্পূর্ণ আলাদা তা প্রত্যেক বছর পূর্ণ একটি মাস ধরে দিন-রাত প্রত্যেক (সমর্থ) মুসলমানকে ইসলামী শরীয়াত পালনের অভ্যাস করায়। শেষ রাতে সেহরী খাওয়ার জন্য ওঠতে হয়, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই খানাপিনা সব বন্ধ করতে হয়, সারাদিন কোনো কোনো কাজ কিছুতেই করা যায় না, সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সময়ে ইফতার করতে হয়-একটু আগেও নয়, একটু পরেও নয়। ইফতারের পরে খানাপিনা ও আরাম করার অনুমতি আছে। কিন্তু তার পরেই তারাবীহ নামযের জন্য দৌঁড়াতে হয়। এভাবে প্রত্যেক বছর পূর্ণ একটি মযবুত আইনের দ্বারা বেঁধে রাখা হয়। তারপর এগারো মাসের জন্য তাকে জীবনের কর্মক্ষেত্রে মুক্ত করে দেয়া হয়। এ মাসে যে ট্রেনিং সে পেয়েছে, পরবর্তী এগারো মাস তার কাজ-কর্মের ভিতর তা যেন প্রতিফলিত হয় এবং তারপরও কোনো বিষয় অস্পূর্ণ থাকলে পরবর্তী বছর তা যেন পূর্ণ করে দেয়া হয়।

মুসলমান সমাজের এক এক ব্যক্তিকে আলাদাভাবে এ ট্রেনিং নেয়ার ব্যবস্থা করা হলে তা মোটেই ফলপ্রসু হতো না। সৈনিকদেরকে কখনো এক একজন করে প্যারেড করানো হয় না, গোটা সৈন্যবাহিনীকে একত্রে এক সাথে তা করান হয়। সকলকে একই সময় বিউগলের আওয়ায শুনে উঠতে হয় এবং বিউগলের আওয়ায অনুসারে নির্দিষ্ট কাজে লেগে যেতে হয়। ফলে সৈন্যদের মধ্যে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করার অভ্যাস হয়। সেই সাথে একজনের ট্রেনিং এ অন্যজন সহযোগিতা করে থাকে। একজনের ট্রেনিং কোনরূপ অস্পূর্ণ থাকলে দ্বিতীয়জন এবং দ্বিতীয়জনের অসম্পূর্ণ থাকলে তৃতীয়জন তা পূর্ণ করে থাকে ঠিক এজন্য ইসলামে রমযান মাসকে রোযা পালন করার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়ছে। সমগ্র মুসলমানকে আদেশ করা হয়েছে, তারা সকলে মিলে এ সময়ে রোযা রাখতে শুরু করবেন। বস্তুত এ হুকুমটি মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদাতকে সামগ্রিক ইবাদাতে পরিণত করে দিয়েছে। এক সংখ্যাকে লক্ষ্য দ্বারা গুণ করলে যেমন লক্ষ্যের একটি বিরাট সংখ্যা হয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি এক এক ব্যক্তির আলাদাভাবে রোযা রাখায় যে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করা যায় লক্ষ কোটি মানুষ একত্রে রোযা রাখলে লক্ষ্য কোটি গুণ বেশী উন্নতি লাভ করা সম্ভব। রমযানের মাস সমগ্র পরিবেশকে নেকী আর পরহেযগারীর পবিত্র ভাবধারায় উজ্জল করে তুলে। গোটা জাতীয় জীবনে তাকওয়া পরহেযগারীর সবুজ তাজা ফসল বৃদ্ধি পায়। প্রত্যেক ব্যক্তি কেবল নিজেকেই গুনাহ হতে বাঁচাতে চেষ্টা করে না বরং তার মধ্যে কোনো প্রকার দুর্বলতা থাকলে তার জন্য অন্য সব রোযাদার ভাই তার সাহায্য ও সহযোগিতা করে। রোযা রেখে গুনাহ করতে প্রত্যেকটি মানুষের লজ্জাবোধ হয়; পক্ষান্তরে প্রত্যেকের মনে কিছু ভাল ও সওয়াবের কাজ করার ইচ্ছা জাগে। সম্ভব হলে গরীবকে একবেলা খাবার দেয়, উলঙ্গ ব্যক্তিক কাপড় দান করে, বিপন্নের সাহায্য করে। কোথাও নেক কাজ হতে থাকলে তা বন্ধ করতে চেষ্টা করে। এভাবে চারদিকে নেকী ও তাকওয়ার একটি মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সকল প্রকারের পুণ্য ও ভাল কাজ বৃদ্ধি পাওয়ার অনুকূল মৌসুম শুরু হয়। বস্তুত দুনিয়াতে সকল ফসল নির্দিষ্ট মৌসুমে ফলে থাকে। তখন চারদিকে কেবল সেই ফসলেরই চমৎকার দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয়। এজন্যই শেষ নবী (সা) এরশাদ করেছেন-

كُلُّ عَمَلٍ اِبنِ ادَمَ يُضُاعَفُ الْحَسَنَةَ بِعَشَرِ اَمْثَالِهَا اِلى سَبْعِ مَائَةِ ضِعْفٍ ـ قَالَ اللهُ تَعَالى الصَّوْمُ اِلاَّ الصَّوْمُ فَانَّهُ لِىْ وَاَنَا اَجْرِى بِه ـ
মানুষের প্রত্যেকটি কাজের ফল আল্লাহর দরবারে কিছু না কিছু বৃদ্ধি পায়; একটি নেক কাজের ফলে দশগুণ হতে সাতশত গুণ পর্যন্ত বেশী হয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহ বলেন রোযাকে এর মধ্যে গণ্য করা হবে না কারণ রোযা খাছ করে কেবল আমারই জন্য রাখা হয়। আর আমিই এর প্রতিফল দান করবো।

এ হাদীস দ্বারা পরিষ্কারভাবে জানা গেল যে, নেক কাজ যে করে তার নিয়ত অনুসারে নেক কাজের ফল অত্যাধিক বৃদ্ধি পায় বটে, কিন্তু সেই সবের একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। কিন্তু রোযার ফল বৃদ্ধির কোনো শেষ সীমা নির্দিষ্ট নেই। রমযান মাস যেহেতু মঙ্গল, কল্যাণ ও নেকী বৃদ্ধি পাবার মৌসুম, এ মৌসুমে কেবল একজন মুসলমানই নয়, লক্ষ কোটি মুসলমান মিলে এ নেকীর বাগিচায় পানি ঢালে। এজন্য তা সীমা সাংখ্যাহীন ফল দান করতে পারে। এ মাসে যত ভাল নিয়তের সাথে ভাল কাজ করা যাবে, যত বরকত রোযাদার নিজে লাভ করবে এবং অন্য রোযাদার ভাইকে দিতে চেষ্টা করবে- তারপর পরবর্তী এগারো মাস পর্যন্ত এ মাসের যত প্রভাব রোযাদারের ওপর থাকবে এটা ততবেশী সুফল দেবে। এটা এমনভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকবে যার কোনো শেষ সীমা পরিসীমা থাকবে না। এখন মুসলমান নিজেরাই যদি এটাকে সীমাবদ্ধ করে রাখে, তবে সে কথা স্বতন্ত্র।
রোযার এ আশ্চর্যজনক সুফল এবং বরকতের কথা শুনে প্রত্যেকের মনেই এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে, আজ তা কোথায় গেল? মুসলমান আজ রোযা রাখে নামায পড়ে। কিন্তু এর সুফল যা বর্ণানা করা হয় তা তারা আদৌ লাভ করছে না কেন? এর একটি কারণ আমি পূর্বেই বলেছি। তা এই যে, ইসলামের ব্যাপক বিধানের বিভিন্ন অংশকে আলাদা করে ফেলার পর এবং তাতে বাইরের অনেক নূতন জিনিসের আমদানীর পর তা থেকে আসল ফল লাভের আশা করা যায় না।

দ্বিতীয় কারণ এই যে, ইবাদাত সম্পর্কে বর্তমান মুসলমানদের দৃষ্টিভংগী সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তারা এখন মনে করেছে যে, সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত কিছু খানাপিনা না করার নামই ইবাদাত। আর এ কাজ কোনো লোক করলেই তার ইবাদাত পূর্ণ হলো, এরূপ মনে করা হয়। এভাবে অন্যান্য ইবাদাতেরও কেবল বাইরের পূর্ণ হলো, এরূপ মনে করা হয়। এভাবে অন্যান্য ইবাদাতরেও কেবল বাইরের কাঠামো ও অনুষ্ঠানকেই ইবাদাত বলে মনে করা হয়। এজন্যই কাজের মধ্যে স্বত:স্ফূর্তভাবে হওয়া আবশ্যক। মুসলমানদেরে শতকরা ৯৯ জন বরং তার চেয়েও বেশী লোক তা থেকে বঞ্চিত। ঠিক এজ্যই ইবাদাতসমূহ পূর্ণ ফল দেখাতে পারে না। কারণ ইসলামে নিয়ত, বুদ্ধি-বিবেচনা এবং আন্তরিকতার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে। পরবর্তী প্রবন্ধে এ সম্পর্ক বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *