অধ্যায় ০৫ : একটি ভুল ধারণার অপনোদন

আজকাল এক ধরনের ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। সেটা হলো, দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছোট জিহাদ, বড় জিহাদ হলো নফসের সাথে সংগ্রাম করা। এর দলীল হিসেবে এ হাদীসটি পেশ করা হয়, ‘আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদের দিকে ফিরে যাচ্ছি। লোকেরা জিজ্ঞেস করলে বড় জিহাদ কি? এরশাদ হলো, মন বা নফসের সাথে জিহাদ”। অথচ সত্যি কথা হলো এই যে, এটা কোনো হাদীসই নয়।

হাফেজ ইবনে হাজর এর মতে এটি একটি প্রবাদ বাক্য যা ইবরাহীম বিন আবলা বলেছেন। উল্লেখ্য যে, হাদীস ও সুন্নাতের ক্ষেত্রে ইবনে হাজর অপরিসীম মর্যদার অধিকারী।

‘তুখরীজু আহাদীসুল ইয়াহইয়া’ গ্রন্থে ইরাকী বলেন, ইমাম বায়হাকী দুর্বল সনদ সহ হযরত জাবির থেকে একটি বর্ণনা করেছেন। কাজেই যারা দুশমনের বিরুদ্ধে জিহাদ করাকে ছোট জিহাদ বলতে চায় তারা আসলে মুসলমানদের মন থেকে জিহাদের ধালণাকে মিটিয়ে দিতে চায় এবং মুসলিম জাতিকে জিহাদের প্রস্তুতি থেকে গাফেল রাখতে চায়।

তাছাড়া প্রবাদ বাক্যটিকে হাদীস বলে স্বীকার করে নিলেও একথা মোটেই প্রমাণিত হয় যে, আমাদের যাবতীয় কাজকর্মের মধ্যে আন্তরিকতা সৃষ্টি এবং কেবলমাত্র আল্লাহকেই রাজী করার উদ্দেশ্যে কাজ করার মনোভাব পয়দা করার জন্যে নিজের প্রবৃত্তির সাথে সংগ্রাম অপরিহার্য।

একথাও মনে রাখা দরকার যে, জিহাদ শুধু নফসের সাথে হয় না। সৎকাজের আদেশ-নির্দেশ দান ও অসৎকাজের প্রতিরোধের জন্যে সংগ্রাম করাও তো জিহাদ। হুজুর (সা) বলেন, “অত্যাচারী শাসকের আমলে সত্য কথা বলা উত্তম জিহাদ”।
কিন্তু কোনো জিহাদই শাহাদতে কোরবার সমান হতে পারে না। কোনো প্রতিদানই মুজাহিদীনের জন্যে নির্ধারিত মহান প্রতিদানের সমকক্ষ হতে পারে না। যারা মহান ও গৌরবান্বিত শাহাদাত কামনা করেন, তাদের জন্য একটি মাত্র পথই খোলা রয়েছে-তাহলে আল্লাহর রাহে জান লুটিয়ে দেয়া।

শেষ কথা

প্রিয় ভাইয়েরা, যে জাতির বেঁচে থাকা ও দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়া উভয়ই সুন্দর, যারা ইজ্জত-সম্মানের সাথে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে অভ্যস্ত, তারা দুনিয়াতে সম্মানিত হয় এবং আখেরাতে জান্নাতের অধিকারী হয়। কিন্তু আধুনিক যুগে আমরা পার্থিব জীবনকেই বেশী ভালবাসি, তাই আমরা পদে পদে লাঞ্চিত, অপমানিত ও পর্যুদস্ত হচ্ছি। আর মৃত্যুর ভয়ে শাঙ্কিত আছি সর্বক্ষণ। সুতরাং জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হোন। মরণকে বরণ করার জন্যে তৈরী থাকুন। জীবন আপনাদেরকে খুঁজে নেবে।

একটু চিন্তা করুন। মৃত্যুর হাত থেকে কারো রেহাই নেই। মৃত্যু একবার সবারই জন্যে আসবে। কিন্তু এ মৃত্যু যদি আল্লাহর পথে হয় তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতের উভয় জগতেই সফলতা লাভ করতে পারবেন। আর আকথা সত্যি যে, আল্লাহ যা তকদিরে রেখেছেন, তাইতো ঘটবে। কাজেই চিন্তার কি কারণ থাকতে পারে? আল্লাহর এ বাণী সম্পর্কে চিন্তা করুন-

“অতএব এ চিন্তা ও দু:খের পর পুনরায় আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কিছু লোকের ওপর পরম সান্ত্বনা নাযিল পরে দিলেন এমনভাবে যে, তারা তন্দ্রাবিশিষ্ট হতে লাগলো। কিন্তু অপর একটি দল-যাদের কাছে গুরুত্ব ছিল একমাত্র স্বার্থের তারা আল্লাহ সম্পর্কে এমন সব জাহেলী মনোভাব পোষণ করতে লাগলো, যা ছিল সত্যের সুস্পষ্ট খেলাপ। (তারা এখন বলে) ‘এ সমস্ত বিষয় পরিচালনার ব্যাপারে আমাদেরও কি কোনো অংশ আছে? তাদের বলে দিন, সমস্ত বিষয়ের ইখাতিয়ার আল্লাহর হাতে। প্রকৃতপক্ষে এরা যে সমস্ত কথা নিজেদের মনে গোপন রেখেছে, তা আপনার কাছে প্রকাশ করছে না। এদের আসল বক্তব্য হলো, যদি ইখতিয়ারে আমাদের কোনো অংশ থাকতো, তবে এখানে আমরা নিহত হতাম না। তাদের বলে দিন, “তোমরা যদি নিজেদের ঘরে অবস্থান করতে, তবুও যাদের মৃত্যু অবধারিত ছিল, তারা নিশ্চয়ই তাদের মৃত্যু-স্থানের দিকে বের হয়ে আসতে। আর এই যে ব্যাপার ঘটলো, এর কারণ ছিল এই যে, তোমাদের বুকের মধ্যে যা কিছু লুকানো রয়েছে আল্লাহ তা পরীক্ষা করবেন এবং তোমাদের মনে যে কুটিলতা রয়েছে, আল্লাহ তা পরিস্কার করে ফেলবেন। আল্লাহ মনের অবস্থা খুব ভালভাবেই জানেন”। -(সূরা আলে ইমরান : ১৫৪)

আসুন, আমার সবাই এমন পথের সন্ধান করি, যে পথে সম্মানের সাথে মৃত্যুকে আলিঙ্গুন করতে পারি। শুধুমাত্র এ পথেই পুণ্যেই অধিকারী হওয়া যায় আর সাফল্যের আগমন পথও এটাই। আল্লাহ আপনাদেরকে শাহাদাতের পেয়ালা পান করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদেরকে শহীদের মর্যাদা দান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *