অধ্যায় ০৩ : পয়গম্বরীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

নবুয়াত

আগের অধ্যায় তিনটি বিষয় আলোচিত হয়েছেঃ

প্রথমত , আল্লাহ তা’য়ালার আনুগত্যের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে আল্লাহর সত্তা ও গুণরাজি , তাঁর মনোনীত জীবন পদ্ধতি এবং আখেরাতের সুকৃতির প্রতিদান ও দুষ্কৃতির প্রতিফল সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান এবং সে জ্ঞানকে এমন পর্যায় পর্যন্ত এগিয়ে নিতে হবে, যেন তার উপর পূর্ণ প্রত্যয় বা ঈমান জন্মে ।

দ্বিতীয়ত , আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে নিজের চেষ্টায় এ জ্ঞান লাভ করার মতো কঠিন পরীক্ষায় ফেলেননি ,নিজে মানুষরেই মধ্য থেকে তাঁর মনোনীত বান্দাকে (যাদেরকে বলা হয় পয়গাম্বর) ওহীর মাধ্যমে এ জ্ঞান দান করেছেন এবং তাঁদের হুকুম করেছেন অন্যান্য বান্দার কাছে এ জ্ঞান পৌঁছে দিতে।

তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের উপর কেবল মাত্র এতটুকু দায়িত্বই রয়েছে যে, সে আল্লাহর সত্যিকার পয়গাম্বর চিনে নেবে। অমুক ব্যক্তি সত্যি সত্যি আল্লাহর পয়গাম্বর ,এ সত্য জানা হলেই তার অপরিহার্য কর্তব্য হচ্ছে তাঁর প্রদত্ত যে কোন শিক্ষার উপর ঈমান আনা , তাঁর যে কোন নির্দেশ মেনে এবং তাঁরই অনুসৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে চলা।

এখন সবার আগে বলবো পয়গাম্বরীর মূলতত্ত্ব এবং পয়গাম্বরকে চিনবার উপায়ই বা কি ?

পয়গাম্বরীর মূলতত্ত্ব

দুনিয়ায় মানুষের যেসব জিনিসের প্রয়োজন, আল্লাহ নিজেই তার সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। শিশুর যখন জন্ম হচ্ছে, তখন কত জিনিস তার সাথে দিয়ে তাকে দুনিয়ায় পাঠানো হচ্ছে তার হিসেব নেই। দেখবার জন্য চোখ, শুনবার জন্য কান , ঘ্র্রাণ ও শ্বাস টানবার জন্য নাক, অনুভব করবার জন্য সারা গায়ের চামড়ায় স্পর্শ অনুভূতি , চলবার জন্য পা, কাজ করার জন্য হাত, চিন্তা করার জন্য মস্তিষ্ক এবং আগে থেকেই সবরকম প্রয়োজনের হিসেব করে আরো বেশুমার জিনিস যুক্ত করে দেয়া হয়েছে তার ছোট্র দেহটির সাথে। আবার দুনিয়ার পা রেখেই সে দেখতে পায় জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় এত সব সরঞ্জাম – যার হিসেব করে শেষ করা সম্ভব নয়। হাওয়া আছে, আলো আছে, পানি আছে, যমীন আছে , আগে থেকেই মায়ের বুকে সঞ্চিত হয়ে আছে দুধের ধারা , মা -বাপ আপনজন -এমনকি ,অপরের অন্তরেও তার জন্য সঞ্চারিত করে দেয়া হয়েছে স্নেহ , ভালোবাসা ও সহানুভূতি -যা দিয়ে সে প্রতিপালিত হচ্ছে। যতই সে বড় হতে থাকে, ততই তার প্রয়োজন মিটাবার জন্য প্রত্যেক রকমের জিনিসই মিলতে থাকে, যেন যমীনও আসমানের সকল শক্তি তারই প্রতিপালন ও খেদমতের জন্য কাজ করে যাচ্ছে ।

এরপর আর একটু এগিয়ে যাওয়া যাক । দুনিয়ার কাজ -কারবার চালিয়ে নেয়ার জন্য যেসব যোগ্যতার প্রয়োজন হয়, তার সবকিছুই দেয়া হয়েছে মানুষকে। দৈহিক শক্তি , বুদ্ধি , উপলব্ধি , প্রকাশ- মতা এবং এমনি আরো কত রকম যোগ্যতা কম বেশী করে মওজুদ রয়েছে মানুষের মধ্যে । কিন্তু এখানে পাওয়া যায় আল্লাহ তা’য়ালার এক এক বিচিত্র ব্যবস্থাপনার পরিচয়। সকল মানুষকে তিনি ঠিক একই ধরনের যোগ্যতা দান করেননি। তাই যতি হত তা হলে কেউ কারুর মুখাপেক্ষী হতনা, কেউ কারুর একবিন্দু পরোয়া করতো না । এর জন্য আল্লাহ তায়ালা সকল মানুষের সামগ্রিক প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষের মধ্যে সব রকম যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন বটে; তার ধরনটা হচ্ছে এই যে , কোন এক ব্যক্তিকে যেমন এক যোগ্যতা বেশী করে দেয়া হয়েছে , তেমনি অপরকে দেয়া হয়েছে আর কোন যোগ্যতা । কেউ অপর লোকের চেয়ে শারীরিক পরিশ্রমের শক্তি বেশী করে নিয়ে আসে । কোন কোন লোক আবার বিশেষ বিশেষ শিল্পকলা বা বৃত্তির জন্মগত অধিকারী হয়, যা অপরের মধ্যে দেখা যায় না। কোন কোন লোকের মধ্যে প্রতিভা ও বুদ্ধি -বৃত্তিক শক্তি থাকে অপরের চাইতে বেশী। জন্মগত গুণের দিক দিয়ে কেউ হয় সিপাহসালার , কারুর মধ্যে থাকে নেতৃত্বের বিশেষ যোগ্যতা । কেউ জন্মে অসাধারণ বাগ্নিতর শক্তি নিয়ে , আবর কেউ স্বাভাবিক রচনাশৈলীর অধিকারী। এমন কোন কোন লোক জন্মে , যার মস্তিষ্ক সবচাইতে বেশী ধাবিত হয় গণিত -শাস্ত্রের দিকে এবং অপরের বুদ্ধি যার ধারে কাছেও ঘেষঁতে পারেনা, এমনি সব জটিল প্রশ্নের সামধান সে করে দেয় অনায়াসে। আবার কোন ব্যক্তি জন্মে বহু বিচিত্র নিত্য নতুন জিনিস উদ্ভাবনের শক্তি নিয়ে , যার উদ্ভাবনী শক্তি দেখে দুনিয়া তাকিয়ে থাকে তার দিকে অবাক বিস্ময়ে । কোন কোন ব্যক্তি এমন অতুলীয় আইন জ্ঞান নিয়ে আসে যে , যেসব আইনের জটিল তথ্য উৎঘাটন করার জন্য বছরের পর বছর চেষ্টা করেও অপরের কাছে তা বোধগম্য হয় না। তার দৃষ্টি আপনা থেকেই সেখানে পৌঁছে যায়। এ হচ্ছে আল্লাহর দান। কোন মানুষ নিজের চেষ্টায় আপনার মধ্যে এ যোগ্যতা সৃষ্টি করতে পারে না। শিক্ষা -দীক্ষার মারফতে ও এসব জিনিস তৈরী হয় না। প্রকৃতপক্ষে এগুলো হচ্ছে জন্মগত যোগ্যতা এবং আল্লাহ তা’য়ালার নিজস্ব জ্ঞান বলে যাকে ইচ্ছা এ যোগ্যতা দান করে থাকেন।

আল্লাহর এ দান সম্পর্কে ও চিন্তা করলে দেখা যাবে মানবীয় সংস্কৃতির বিকাশের জন্য যেসব যোগ্যতার প্রয়োজন বেশী হয়, মানুষের মধ্যে তা বেশী করেই সৃষ্টি হয়ে থাকে,আবার যার প্রয়োজন যতটা কম মানুষের মধ্যে তা ততোটা কমই সৃষ্টি হয়। সাধারণ সিপাহী দুনিয়ায় বহু জন্মে। চাষী, কুম্ভকার ,কর্মকার এবং এমনি আরো নানা রকম কাজের লোক জন্মে অসংখ্য কিন্তু জ্ঞান বিজ্ঞানে অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী রাজনীতি ও সিপাহসালারীর যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ জন্মে কম। কোন বিশেষ কর্মে অসাধারণ যোগ্যতা , দতা ও প্রতিভার অধিকারী লোকেরা আরো কম জন্মে থাকেন। কেননা তাঁদের কৃতিত্বপূর্ণ কার্যাবলী পরবর্তী বহু শতাব্দী ধরে তাঁদের মত সুদ ও প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রয়োজনের চাহিদা মিটিয়ে থাকে।

এখন বিবেচনা করতে হবে যে, মানুষের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার , গণিতশাস্ত্রবিদ , বিজ্ঞানী , আইন বিশেষজ্ঞ , রাজনীতিবিশারদ , অর্থনীতিবিদ ওঅন্যান্য বিভিন্ন দিকের যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ জন্ম নিলেই তা মানুষের পার্থিব জীবনের সাফল্য বিধানের জন্য যথেষ্ট নয়। এদের সবার চেয়ে বৃহত্তর আর এক শ্রেণীর মানুষের প্রয়োজন রয়েছে, যারা মানুষকে আল্লাহর সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে। অন্যান্য লোকেরা তো কেবল জানতে পারে , দুনিয়ার মানুষের জন্য কি কি রয়েছে, আর কি কি পন্থায় তা ব্যবহার করা যেতে পারে; কিন্তু এ কথা বলার লোকের ও তো প্রয়োজন আছে যে , মানুষ নিজে কিসের জন্য সৃষ্টি হলো ? দুনিয়ার সব জিনিস -পত্র মানুষকে কে দিয়েছেন ? এবং সেই দাতার ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য কি? কেননা মানুষ দুনিয়ায় তাঁর ইচ্ছা অনুসারে জীবন যাপন করেই নিশ্চিত ও চিরন্তন সাফল্য অর্জন করতে পারে। এ হচ্ছে মানুষের প্রকৃত ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন । মানুষের জ্ঞান এ কথা মেনে নিতে রাযী হতে পারে না যে , যে আল্লাহ আমাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রয়োজন মিটাবার সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন , তিনি আমাদের এ গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন না মিটিয়ে থাকবেন। না কিছুতেই তা সম্ভব নয়। আল্লাহ তায়ালা যেমন করে বিশেষ বিশেষ শিল্পকলা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তেমনি করে এমন মানুষও তিনি সৃষ্টি করেছেন, যাঁদের মধ্যে আলাহকে চিনবার উচ্চতম যোগ্যতা ছিল। নিজের কাজ থেকে তিনি তাঁদেরকে দিয়েছেন আলাহ্‌র বিধান (দ্বীন) , আচরণ (আখলাক) ও জীবন যাপন পদ্ধতি (শরীয়াত ) সংক্রান্ত জ্ঞান এবং অপর মানুষকে এসব বিষয়ের শিক্ষা দেয়ার কাজে তাঁদেরকে নিযুক্ত করেছেন । আমাদের ভাষায় এ সব মানুষকেই বলা হয় নবী, রাসূল অথবা পয়গাম্বর ।

পয়গাম্বরের পরিচয়

অন্যান্য জ্ঞান- বিজ্ঞান ও শিল্প -কলার যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ যেমন বিশেষ বিশেষ ধরনের প্রতিভা ও স্বভfব -প্রকৃতি নিয়ে জন্ম লাভ করেন, তেমনি করে পয়গাম্বরও এক বিশেষ ধরনের স্বভাব – প্রকৃতি নিয়ে আসেন।

এক জন্মগত প্রতিভার অধিকারী কবির বাণী শুনেই আমরা বুঝতেপারি যে , তিনি এক বিশেষ যোগ্যতার অধিকার নিয়ে জন্মেছেন , কারণ অপর কোন কোন ব্যক্তি বহু চেষ্টা করেও তেমন কবিতা শুনাতে পারেন না। এমনি করে জন্মগত প্রতিভার অধিকারী বক্তা, সাহিত্যিক , আবিষ্কর্তা , নেতা-সবারই সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় তাঁদের নিজ নিজ কর্মসূচীর ভিতর দিয়ে, কারণ তাঁদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ কার্যেক্ষেত্রে এমন অসাধারণ যোগ্যতা প্রকাশ করেন , যা অপরের মধ্যে দেখা যায় না। পয়গাম্বরের অবস্থাও তাই । তাঁর মন এমন সব সমস্যার চিন্তা করতে সক্ষম হয় । অপরের মন যার কাছে ঘেষতে ও পারেনা। তিনি এমন সব কথা বলে বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে পারেন, যা অপরের পক্ষে সম্ভব নয়। বহু বছরের চিন্তা ও গবেষণার পরও অপরের নযর যেসব সূক্ষ্ম বিষয়ের গভীরে পৌঁছতে পারে না, তাঁর নযর আপনা থেকেই সেখানে পৌঁছে যায় । তিনি যা কিছু বলেন , আমাদের যুক্তি তা মেনে নেয়, আমাদের অন্তর তার সত্যতা উপলব্ধি করে দুনিয়ার অন্তহীন পরীক্ষা -নিরীক্ষা ও সৃষ্টির সীমাহীন অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয় তার এক একটি বাণীর সত্যতা । অবশ্যি আমরা নিজেরা তেমনি কোন কথা বলতে চেষ্টা করলেও তাতে আমাদের ব্যর্থতা নিশ্চিত । তাঁর স্বভাব- প্রকৃতি এমন নিষ্কলুষ ও পরিশুদ্ধ হয়ে থাকে যে , প্রত্যেক ব্যাপারে তিনি সত্য , সহজ -সরল ও মহত্বপূর্ণ পন্থাঅবলম্বন করেন। কখনো তিনি কোন অসত্য উক্তি করেন না, কোন অসৎ কাজ করেন না। তিনি হামেশা পুণ্য ও সৎকর্মের শিক্ষা দান করেন এবং অপরকে যা কিছু উপদেশ দেন নিজে তার কার্যে পরিণত করে দেখান। তিনি যা বলেন , তার বিপরীত কাজ নিজে করেন এমন কোন দৃষ্টান্ত তাঁর জীবনে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁর কথায় ও কাজে কোন স্বার্থের স্পর্শ থাকে না , অপরের মঙ্গলের জন্য তিনি নিজে তা স্বীকার করেন; কিন্তু নিজের স্বার্থের জন্য অপরের ক্ষতি সাধন করেন না। তাঁর সারা জীবন হয়ে উঠে সত্য -ন্যায়ের , মহত্ব , পবিত্রতা , উচ্চ-চিন্তা ও উচ্চাংগের মানবতার আদর্শ এবং বিশেষ অনুসন্ধান করেও তার ভিতরে পাওয়া যায় না কোন ত্রু“টি- বিচ্যুতি । এ ব্যক্তি যে আলাহ্‌র খাঁটি পয়গাম্বর , তা তাঁর এসব বৈশিষ্ট্য থেকেই পরিস্কার চিনে নেয়া যায়।

পয়গাম্বরের আনুগত্য

কোন বিশেষ ব্যক্তিকে যখনই আল্লাহর খাঁটি পয়গাম্বর বলে চিনে নেয়া যায় , তখন তাঁর কথা মেনে নেয়া তাঁর আনুগত্য স্বীকার করা , তাঁর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে চলা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কোন ব্যক্তি কে পয়গাম্বর বলে স্বীকার করা হবে অথচ তাঁর হুকুম মানা হবেনা এ কথা সম্পূর্ণ যুক্তি বিরোধী। ব্যক্তি বিশেষকে পয়গাম্বর বলে স্বীকার করে নেয়ার মানে , এ কথা মেনে নেয়া যে , তিনি যা কিছু বলেছেন আল্লাহর তরফ থেকে বলেছেন; যা কিছু করেছেন আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী করছেন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে যা কিছু বলা হবে, যা কিছু করা হবে, তা হবে আল্লাহর বিরুদ্ধে । আর যা কিছু আল্লাহর বিরোধী তা কখনো সত্য হতে পারে না। একারণেই কোন ব্যক্তিকে পয়গাম্বর বলে মেনে নেয়ার পর তাঁর কথা বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়া স্বতঃই অবশ্য কর্তব্য হয়ে পড়ে । তাঁর কথার যৌক্তিকতা ও কল্যাণ বোধগম্য হোক অথবা নাই হোক, তাঁর আদেশ-নিষেধের কাছে মস্তক অবনত করতেই হবে। পয়গাম্বরের কাছে থেকে যে বাণী আসবে, তাকে কেবলমাত্র পয়গাম্বরের বাণী হবার কারণেই সত্য , জ্ঞানগর্ভ ও যুক্তিসংগত বলে মেনে নিতে হবে। তাঁর কোন নির্দেশের যৌক্তিকতা কারো হৃদয়ংগম না হলে ও তার অর্থে এই নয় যে , তার ভিতরে কোন ত্রু’টি রয়েছে , বরং তার অর্থ হচ্ছে এই যে , তাঁর উপলব্ধির মধ্যে কিছু না কিছু ভুল রয়েছে।

এটা সুস্পষ্ট যে , কোন ব্যক্তি কোন বিশেষ শিল্পকলা সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত না হলে তার সর্বপ্রকার সূক্ষ্মতা তার কাছে ধরা পড়ে না, কিন্তু কোন বিশেষজ্ঞের কথা তার বোধগম্য হচ্ছে না, নিছক এ যুক্তিতে তার কথা মেনে নিতে অঙ্গিকার করলে সে কত বড় নির্বোধ বলে প্রমাণিত হবে। দুনিয়ার যে কোন কাজে প্রয়োজন হয় বিশেষজ্ঞের , বিশেষজ্ঞকে স্বীকার করে নেয়ার পর তার ওপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন করতে হয়, তার কোন কাজে হস্তক্ষেপ করা চলে না , কারণ সকল লোক সকল কাজে বিশেষজ্ঞ হতে পারেনা। কোন লোকই দুনিয়ার সব জিনিস সমভাবে উপলব্ধি করতে পারেনা। যে কোন উদ্দেশ্যে পূর্ণ জ্ঞান ও সতর্কতা সহকারে একজন বিশেষজ্ঞের সন্ধান করতে হবে এবং যখন কোন ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের পক্ষে শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ বলে পূর্ণ প্রতীতি জন্মাবে তখন তাঁর উপর পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়াই হবে একমাত্র কর্তব্য। তাঁর কাজে হস্তপে করা এবং তাঁর প্রত্যেকটি কথার ‘আগে আমায় বুঝিয়ে দাও নইলে মানব না’ বলতে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয় , বরং সোজাসুজি নির্বোধেরই কাজ। কোন উকিলের উপর মুকদ্দমার ভার ন্যস্ত করার পর এ ধরনের গোলযোগ করতে গেলে তিনি তাঁর দফ্তর থেকে বের করে দেবেন। ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য গিয়ে তাঁর প্রত্যকটি নির্দেশের সপক্ষে দলীল- প্রমাণ দাবী করলে তিনি চিকিৎসাই ছেড়ে দিবেন। ধর্মের ক্ষেত্রে ও সেই একই ব্যাপার । আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার প্রয়োজন সকলের রয়েছে। সকলেই জানতে চায় আলাহর ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী জীবন যাপন করা যায় কোন পদ্ধতিতে। অথচ কারো নিজের তা জানবার কোন সঠিক উপায় নেই। এখন প্রত্যেকের কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর কোন সত্যিকার পয়গাম্বরের সন্ধান করা। এ সন্ধানের কাজে বিশেষ সতর্কতা ও জ্ঞান -বুদ্ধি সহকারে অগ্রসর হতে হবে। কারণ খাঁটি পয়গাম্বর ছাড়া অপর কোন লোককে পয়গাম্বর বলে স্বীকার করে নিলে স্বাভাবিক ভাবেই সে ভুল পথে চালিত করবে; কিন্তু বহু পরীক্ষা -নিরীক্ষার পর যখন বিশ্বাস ও প্রত্যয় জন্মাবে যে , অমুক ব্যক্তি আল্লাহ তা’য়ালার সত্যিকার পয়গাম্বর , তখন তাঁর প্রতি পূর্ণ আস্থা স্থাপন করা এবং তাঁর প্রত্যকটি হুকুমের আনুগত্য করা সকলের জন্য অপরিহার্য ।

পয়গাম্বরগণের প্রতি ঈমানের আবশ্যকতা

যখন জানা গেল যে , আল্লাহর তরফ থেকে তাঁর পয়গাম্বর যে পথের নির্দেশ দেন তাই হচ্ছে ইসলামের সঠিক ও সরল পথ, তখন স্বতঃই বুঝতে পারা যাচ্ছে যে, পয়গাম্বরের প্রতি ঈমান আনা , তাঁর আনুগত্য করা এবং তাঁর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করা প্রত্যেকটি মানুষের জন্য অবশ্য কর্তব্য । যে ব্যক্তি পয়গাম্বরের প্রদর্শিত পথ বর্জন করে নিজের বুদ্ধি অনুযায়ী অন্যবিধ পথ উদ্ভাবন করে সে নিশ্চিতরূপে বিভ্রান্ত।

এ ব্যাপারে মানুষ বহু বিচিত্র ভুলের পথ ধরে চলে । এক শ্রেণীর লোক পয়গাম্বরের সত্যতা স্বীকার করে কিন্তু তাঁর উপর যেমন ঈমান পোষণ করে না, তেমনি তাঁর হুকুমের আনুগত্য করে না। এরা কেবল কাফের নয়, নির্বোধ ও বটে; কারণ পয়গাম্বরকে সত্যিকার পয়গাম্বর বলে স্বীকার করার পর তাঁর নির্দেশ মেনে না চলার অর্থ হচ্ছে জেনে বুঝে মিথ্যার আনুগত্য করা। এর চাইতে বড় আর কোন নির্বুদ্ধিতা যে হতে পারে না , এট সুস্পষ্ট সত্য।

কেউ কেউ আবার বলেঃ পয়গাম্বরের আনুগত্য করার প্রয়োজন আমাদের নেই । নিজেদের বুদ্ধি দিয়েই আমরা সত্যের পথ জেনে নিতে পারব। এও এক মারাত্মক ভুলের পথ। গণিতশাস্ত্র পাঠ করে নিশ্চিত জানা যায় যে, এক বিন্দু থেকে অপর বিন্দু পর্যন্ত মাত্র একটি সরল রেখাই টানা যেতে পারে। তাছাড়া আর যতো রেখাই টানা যাক , তা হয়তো বাঁকা হবে, নইলে অপর বিন্দু পর্যন্ত পৌঁছবে না। সত্যের পথ যাকে ইসলামী পরিভাষায় ‘সিরাতে মুসতাকীম ’ (সরল সঠিক পথ) বলা হয়। তার বেলায় ও সেই একই নীতি প্রযোজ্য । এ পথ মানুষ থেকে শুরু হয়ে আলাহ পর্যন্ত পৌঁছে এবং গণিতের উপরিউক্ত সূত্র অনুযায়ী তা একটিই হতে পারে। এ ছাড়া আর যেসব পথ রয়েছে , তা হয় বাঁকা , নইলে তা আলাহ পর্যন্ত পৌঁছবে না। কাজেই যে পথ সহজ -সরল , পয়গাম্বর তার নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া আর কোন রাস্তাই ‘সিরাতে মুসতাকিম’ হতে পারে না। পয়গাম্বরের নির্দেশিত পথ ত্যাগ করে যে ব্যক্তি নিজে কোন পথ খুঁজে বেড়ায় তাকে দু’টি বিকল্প পরিণতির যে কোন একটির সম্মুখীন হতে হবে। হয় তার আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছবার কোন পথ মিলবেনা , অথবা মিললেও তা হবে আকাবাঁকা দীর্ঘ পথ। সরল রেখার পরিবর্তে তা হবে বক্র রেখা । প্রথম পরিণতির দিক দিয়ে তো তার ধ্বংস অনিবার্য , দ্বিতীয় , পরিণতির দিক দিয়েও তার নির্বুদ্ধিতা প্রমাণিত হবার ক্ষেত্রে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকেনা। কোন নির্বোধ ও জ্ঞানহীন জানোয়ার ও এক স্থান থেকে স্থানান্তরে যাবার জন্য বাঁকা পথ ছেড়ে সোজা পথে চলতে থাকে। এক্ষেত্রে আল্লাহর কোন নেক বান্দাহ যাকে সোজা পথের নির্দেশ দিয়েছেন , সে যদি তাঁ কে বলতে থাকে ‘‘না, আমি তোমার দেখানো পথে চলবোনা, নিজে বাঁকা পথে হোঁচট খেয়ে খেয়ে আমার গন্তব্যে লক্ষের সন্ধান করে নেবো তাহলে তাকে কি বলা যায় ?”
যে কোন ব্যক্তি এ সাধারণ ভুলটি এক নযরে বুঝে নিতে পারে , কিন্তু বিশেষভাবে চিন্তা করে দেখলে আরো বুঝতে পারা যায় , যে ব্যক্তি পয়গাম্বারের উপর ঈমান আনতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে , তার জন্য আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের বাঁকা বা সোজা কোন পথই মিলতে পারে না। তার কারণ , যে খাঁটি ও সত্যনিষ্ট মানুষের কথা মেনে নিতে অস্বীকার করে , তার মস্তিষ্কে নিশ্চিতরূপে এমন কোন বিকৃতি রয়েছে , যার প্রভাবে সে সত্য পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখছে । তার উপলদ্ধিতে কোন ত্রু“টি থাকতে পারে, অথবা তার স্বভাব কোন সত্য ও সৎ বস্তুকে স্বীকার করে নিতে অনিচ্ছুক হওয়ার মতো বিকৃতি সম্পন্ন । হতে পারে সে বাপ-দাদার অন্ধ অনুকরণে লিপ্ত এবং রীতি হিসেবে যা আগে থেকে চলে এসেছে তার কোন বিরূপ সমালোচনা শুনতে সে রাযী নয়, অথবা সে হয়ে আছে আপন প্রবৃত্তির দাস এবং পয়গাম্বরের শিক্ষা মেনে নিতে সে অস্বীকার করেছে এজন্য যে, তা মেনে নেয়ার পর তার আর কোন পাপাচরণ ও অবৈধ কার্য-কলাপের স্বাধীনতা থাকবে না। এ কারণগুলো এমন যে , এর যে কোন একটি কোন ব্যক্তি বিশেষের মধ্যে থাকলে তার পক্ষে আল্লাহর পথ খুঁজে পাওয়া হয় অসম্ভব । আবার এর কোন কারণ কোন ব্যক্তি বিশেষের মধ্যে না থাকলে ও এটা অসম্ভব যে , একজন সত্যানুসারী , নির্দোষ ও সৎলোক একজন সত্যিকার পয়গাম্বরের শিক্ষা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ,পয়গাম্বর আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত এবং আল্লাহই তাঁর ওপর ঈমান আনার ও তাঁর আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। যে ব্যক্তি পয়গাম্বরের প্রতি ঈমান পোষণ করে না সে আল্লাহরই বিদ্রোহাচরণ করে। একজন লোক যে বাদশার প্রজা , তাঁর পক্ষ থেকে যাকেই শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হোক , তার আনুগত্য করতে সে বাধ্য । বাদশার নিযুক্ত শাসনকর্তাকে সে অমান্য করলে তার অর্থ হবে বাদশার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। শাসন কর্তৃপক্ষকে মেনে নেয়া আর তার নিযুত্ত শাসনকর্তাকে না মানা সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী ব্যাপার। আল্লাহ ও তাঁর প্রেরিত পয়গাম্বরের ক্ষেত্রে ও এ একই নীতি প্রযোজ্য আল্লাহ সকল মানুষের সত্যিকার বাদশাহ। মানুষের পথনির্দেশের জন্য তিনি যে ব্যক্তিকে প্রেরণ করেছেন এবং যার আনুগত্য স্বীকার করতে তিনি মানুষকে হুকুম দিয়েছেন , প্রত্যেক মানুষের ফরয তাকে পয়গাম্বর বলে স্বীকার করা ও অপর সবকিছুর আনুগত্য ছেড়ে কেবলমাত্র তাঁরই পথ অনুসরণ করা। তাঁর অনুসরণ থেকে যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে নিশ্চিতরূপে কাফের। সে আল্লাহকে মানুক অথবা নাই মানুক ,তাতে কিছুই আসে যায় না।

পয়গাম্বরীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মানব জাতির মধ্যে কি করে পয়গাম্বরীর ধারা শুরু হয়েছে এবং কি করে ক্রমে ক্রমে উন্নতির সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হয়ে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ পয়গাম্বরের মাধ্যমে সে ধারার সমাপ্তি ঘটেছে , এখন সেই কথাই বলছি।

এ কথা জানা গেছে যে, আল্লাহ তা’য়ালা সবার আগে তৈরী করেছিলেন একটি মাত্র মানুষ এবং সেই মানুষটি থেকেই তৈরী করেছিলেন তার সংগিনীকে । তারপর কত শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে গেছে। সেই আদি মানুষের বংশধররা ছেয়ে ফেলেছে সারা দুনিয়ার বুক। দুনিয়ায় আজ যতো মানুষ রয়েছে সবই প্রথম সৃষ্ট এক জোড়া মানুষের সন্তান । সকল জাতির ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বিবরণ সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, মানব জাতির শুরু হয়েছিল একটি মানুষ থেকে। মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে , দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে আলাদা আলাদা মানুষ তৈরী হযেছিল , বরং অধিকাংশ বিজ্ঞানী অনুমান করেনে যে , দুনিয়ায় সবার আগে একটি মাত্র মানুষই পয়দা হয়েছিলেন এবং আজকের দুনিয়ার যেখানে যতো মানুষই দেখা যাচ্ছে তারা সবাই এ একটি মাত্র মানুষেরই বংশধর।

আমাদের ভাষায় দুনিয়ার এ প্রথম মানুষকে বলা হয় আদম। আদম থেকেই আদমী শব্দের উৎপত্তি এবং এ শব্দটি হচ্ছে ইনসান বা মানুষের সমার্থক! আল্লাহ তা’য়ালা সবার আগে হযরত আদম আলাইহিস সালামকে নিযুক্ত করেছিলেন তাঁর পয়গাম্বর এবং তাকে তাঁর সন্তান সন্তুতিকে ইসলামের শিক্ষা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন , যেন তিনি তাদেরকে বলে দেন ঃ তোমাদের ও সারা দুনিয়ার আল্লাহ এক , তোমরা তাঁরই ইবাদাত কর , তাঁরই কাছে মাথা নত কর, তাঁরই কাছে সাহায্য ভিক্ষা কর , তাঁরই ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী দুনিয়ার বুকে সততা ও ইনসাফের সাথে জীবন যাপন কর। এমনি করে জীবন যাপন করলে তোমরা পাবে বাঞ্ছিত পুরস্কার এবং তার আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে তোমাদের প্রাপ্য হবে কঠিনতম শাস্তি।

হযরত আদম আলাইহিস সালামের বংশধরদের মধ্যে যারা ছিলেন সৎলোক , তারা পিতার নির্দেশিত সহজ পথ অনুসরণ করে চলতে লাগলেন ; কিন্তু অসৎ লোকেরা সে পথ ছেড়ে চলে গেল। ধীরে ধীরে সব রকম দুস্কৃতির সৃষ্টি হল , কেউ শুরু করলো চন্দ্র , সূর্য ও তারকার পূজা , কেউ আবার শুরু করলো গাছপালা , জীব -জানোয়ার ও নদী -পর্বতের উপাসনা। কেউ কেউ মনে করলো হাওয়া , পানি , আগুন , ব্যাধি , সুস্থতা ও শক্তি এবং প্রকৃতির অন্যান্য কল্যাণকর উপকরণ ও শক্তির খোদা আলাদা আলাদা এবং তাদের প্রত্যেকেরই পূজা করা প্রয়োজন, যাতে প্রত্যেক খোদা -ই খুশী হয়ে তাদের প্রতি মেহেরবান হয়। এমনি করে মূর্খতার কারণে শির্‌ক (অংশীবাদ) ও বুতপরস্তির (পৌত্তলিকতা ) নানা রূপ সৃষ্টি হলো এবং তার মাধ্যমে অসংখ্য ধর্মের উদ্ভব হলো। এ হচ্ছে সেই যুগের কথা যখন হযরত আদম আলাইহি সালামের বংশধররা দুনিয়ার বুকে। প্রত্যেক জাতি একটি নতুন ধর্ম তৈরী করে নিয়েছে এবং প্রত্যেকের রীতি নীতি হয়ে গিয়েছিল স্বতন্ত্র। হযরত আদম (আ) যে বিধান পেশ করেছিলেন তাঁর বংশধরদের কাছে, আল্লাহকে ভুলার সাথে সাথে মানুষ সেই বিধানকেও গেল ভুলে । মানুষ তখন শুরু করেছে তার প্রবৃত্তির দাসত্ব। সব রকম অন্যায় রীতি -নীতি জন্ম লাভ করেছে এবং সব রকম জাহেলী ধারণা প্রসার লাভ করেছে চারদিকে। ভাল-মন্দ বিবেচনায় মানুষ করছে ভুল । বহু অন্যায়কে তারা ভাল মনে করেছে, আর বহু ভাল কাজকে মনে করেছে খারাপ।

আল্লাহ তা’য়ালা প্রত্যেক জাতির মধ্যে পাঠাতে শুরু করলেন তাঁর পয়গাম্বর । প্রথমে হযরত আদম (আ) মানুষকে যে শিক্ষা দিয়েছেলেন , অন্যান্য পয়গাম্বর ও মানুষকে সেই শিক্ষাই দিতে লাগলেন । নিজ নিজ জাতিকে তাঁরা স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলেন তাদের ভুলে যাওয়া শিক্ষা। মানুষকে তাঁরা শিখালেন এক আল্লাহর ইবাদাত, তাদেরকে ফিরালেন শির্‌ক ও বুতপরস্তি পথ থেকে। জাহেলী রীতি ভেঙ্গে দিয়ে তারা আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী জীবন অতিবাহনের পথনির্দেশ করলেন এবং নির্ভুল বিধান বিশ্লেষণ করে তাদেরকে চালিত করলেন তাঁর আনুগত্যের পথে।হিন্দুস্তান, চীন, ইরান , ইরাক , মিসর , আফ্রিকা ও ইউরোপ –সোজা কথায় দুনিয়ায় এমন কোন দেশ নেই , যেখানে আল্লাহর তরফ থেকে কোন পয়গাম্বর আসেননি। তাঁদের সবারই ধর্ম ছিল এক ও অভিন্ন যাকে আমরা আমাদের নিজস্ব ভাষায় বলি ইসলাম ১ অবশ্যি তাঁদের শিক্ষা পদ্ধতি ও জীবন বিধান কিছুটা ভিন্ন ধরনের ছিল । প্রত্যেক জাতির মধ্যে যে ধরনের জাহেলীয়াত প্রসার লাভ করেছিল তা দূর করার উপরই বেশী করে জোর দেয়া হয়েছিল । যে ধরনের ভুল ধারণা যতোটা প্রচলিত হয়েছিল , তার প্রতিকারের জন্য ততোটা বেশী করে মনোয়োগ দেয়া প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল , তখন তাদের জন্য সহজ শিক্ষা ও সহজ বিধান দেয়া হয়েছিল । ধাপে ধাপে তারা যখন উন্নাতর পথে এগিয়ে যেতে লাগল , তাদের জন্য শিক্ষা ও অনুসরণীয় বিধানের ও ততো বেশী করে প্রসার হতে লাগলো। শিক্ষা ও বিধানের এ বিভিন্নতা কেবল বাইরের রূপেই সীমাবদ্ধছিল , কিন্তু সবারই প্রাণবস্তু ছিল এক অর্থাৎ বিশ্বাসের দিক দিয়ে তাওহীদ , কর্মে সততা ও সুশৃঙখলা এবং আখেরাতের প্রতিফল ও শাস্তির প্রতি প্রত্যয়ের বুনিয়াদই তার প্রাণ-বস্তু।

পয়গাম্বরের প্রতি ও মানুষ করেছে বহু অদ্ভুত আচরণ । মানুষ প্রথমে তাঁদের সাথে করেছে দুর্ব্যবহার , তাঁদের উপদেশ অগ্রাহ্য করেছে , কাউকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে , কাউকে বা হত্যা করেছে । সারা জীবন মানুষের কাছে শিক্ষা প্রচার করে কারুর আবার বহু কষ্টে দশ পাঁচ জন অনুগামী জুটেছে । কিন্তু আল্লাহর এ মনোনীত বান্দাগণ বরাবর তাঁদের কর্তব্য করে গেছেন অবিচলিত ভাবে। অবশেষে তাঁদের শিক্ষা মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে এবং বড় বড় কওম তাঁদের আনুগত্য স্বীকার করেছে। এরপর মানুষের ভ্রান্তি প্রবণতা (গুমরাহী) আবার নতুন রূপ পরিগ্রহ করল। পয়গাম্বরদের ওফাতের পর তাঁদের উম্মাতরা ভুলে গেল তাঁদের শিক্ষা । তাঁদের কিতাবে নিজেদের তরফ থেকে সব রকম ধারণা মিশ্রিত করে দিল। ইবাদাতের নতুন নতুন রূপ অবলম্বন করল – কোন কোন শ্রেণী খোদ পয়গাম্বরদের উপাসানা শুরু করে দিল । কেউ তার পয়গাম্বরকে বলতে লাগল আল্লাহর অবতার (অর্থাৎ আল্লাহ নিজেই মানব রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন) কেউ তার পয়গাম্বরকে বানিয়ে নিল আল্লাহর সাথে শরীক। মোটকথা , মানুষ এমন স্বেচ্ছারিতা শুরু করল যে , যারা মূর্তি ধ্বংস করেছিলেন সেই পয়গাম্বরগণকেই তারা পরিণত করলো মূর্তিতে । পয়গাম্বর তাঁর উম্মাতদের যে জীবন বিধান (শরীয়াত ) দিয়ে গিয়েছিলেন , ধীরে ধীরে তাকেও তারা বিকৃত করে ফেলল । তার মধ্যে তারা সব রকম মূর্খতা – প্রসূত রীতি মিশিয়ে ফেলল , কতো কাহিনী ও মিথ্যা বর্ণনার সংমিশ্রণ করল এবং মানুষের তৈরী বিধান সমূহকে পয়গাম্বরের প্রদর্শিত বিধানের সাথে চালু করে দিল । ফলে পয়গাম্বরদের প্রকৃত শিক্ষা ও বিধান কি ছিল এবং পরবর্তী লোকেরা তার সাথে কি কি মিশ্রিত করে তাকে রূপ দিয়েছে কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানে তা বুঝবার আর কোন উপায় থাকলো না । পয়গাম্বরদের নিজেদের জীবন -কাহিনী মিথ্যা ও অলীক বর্ণনা দ্বারা এমন ভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলা হয়েছে যে , তাঁদের জীবনের কোন নির্ভরযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যাচ্ছে না। তথাপি পয়গাম্বরদের জীবন সাধনার সবটুকুই ব্যর্থ হয়ে যায়নি। সর্বপ্রকার বিকৃতি ও পরিবর্তন সত্ত্বেও সকল জাতির মধ্যে আজো কিছু না কিছু সত্য বেঁচে রয়েছে । আল্লাহর অস্তিত্ব ও আখেরাতের ধারণা কোন না কোন রূপে সকল জাতির মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। সততা , সত্য ও নৈতিক জীবনের কোন কোন নীতি সাধারণভাবে সারা দুনিয়ার স্বীকৃতি লাভ করেছে। এ সংগে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির পয়গাম্বরগণ আলাদা আলাদা করে এক এক জাতিকে একটা নির্র্দিষ্ট সীমানা পর্যন্ত এমনভাবে তৈরী করে দিয়েছেন, যাতে র্নিবিশেষে সকল মানুষের কাছে গৃহিত হওয়ার মতো এক সাধারণ ধর্মের শিক্ষা দুনিয়ার মানুষের কাছে পেশ করা যেতে পারে।

আগেই বলেছি , গোড়ার দিকে প্রত্যেক জাতির মধ্যে আলাদা আলাদা পয়গাম্বর এসেছিলেন এবং তাঁদের প্রত্যেকের শিক্ষা তাঁর নিজ কওমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এর কারণ , তখনকার দিনে সকল কওমই পরস্পর বিচ্ছিন্ন ছিল। তাদের মধ্যে বড় বেশী মেলামেশা ছিল না। বস্তুত প্রত্যেক কওম নিজ নিজ দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এমনি অবস্থায় সকল কওমের জন্য এক সাধারণ যৌথ শিক্ষা প্রচার অত্যন্ত দুরূহ ছিল। এ ছাড়াও বিভিন্ন কওমের অবস্থা পরস্পর থেকে ছিল স্বতন্ত্র । তখনকার দিনে জাহেলী ধারণার প্রসার হয়েছিল অত্যধিক। এর ফলে নীতি বোধ ও আচরণের যে বিকৃত রূপ দেখা দিয়েছিল , প্রত্যেক জায়গায়ই তার ধরন ছিল স্বতন্ত্র। এর জন্যই আল্লাহর পয়গাম্বরদের জন্য অপরিহার্য ছিল প্রত্যেক কওমের মধ্যেই আলাদা আলাদা শিক্ষা ও হেদায়াত পেশ করা ধীরে ধীরে বিভ্রান্তিকর ধারণার উচ্ছেদ করে সঠিক ধারণা প্রচারের , ক্রমে ক্রমে জাহেলী জীবন পদ্ধতির বিনাশ সাধন করে শ্রেষ্টতম বিধানের আনুগত্য শিক্ষা দেয়ার এবং শিশুদেরকে যেভাবে শিক্ষিত করে তোলা হয়, তেমনি করে শিক্ষা দেয়ার । এমনি করে দুনিয়ার জাতি-সমূহকে শিক্ষিত করে তুলতে কত হাযার বছর চলে গিয়েছিল , তা আল্লাহ -ই জানেন। অবশেষে সে তার শৈশব অবস্থা অতিক্রম করে পরিণতির স্তরে আসতে শুরু করল। বাণিজ্য , শিল্প ও স্থাপত্যের অগ্রগতি হবার ফলে তাদের পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হল। চীন , জাপান থেকে শুরু করে ইউরোপ আফ্রিকায় দূর দূরান্ত পর্যন্ত কায়েম হল জাহাজ চলাচল ও স্থল পথে সফরের ধারা। অধিকাংশ জাতির বর্ণমালা উদ্ভব হল এবং লেখাপড়ার রেওয়ায শুরু হল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার হল এবং জাহিসমূহের মধ্যে চিন্তা ও জ্ঞানের বিনিময় চলতে লাগল । বড় বড় দিগ্ধিজয়ী জন্ম লাভ করল এবং তারা বড় বড় সাম্রাজ্য কায়েম করে বিভিন্ন দেশ ও বিভিন্ন জাতিকে এক রাজনৈতিক পদ্ধতিতে মিলিত করল । এমনি করে মানব জাতির বিভিন্ন কওমের মধ্যে গোড়ার দিকে যে দূরত্ব ও পার্থক্য দেখা যেতো, ক্রমে ক্রমে তা হ্রাস পেতে লাগলো এবং তখন ইসলামের একই শিক্ষা ও একই জীবন বিধান (শরীয়াত ) তামাম দুনিয়ার কাছে পেশ করার সম্ভাবনা দেখা দিল । আজ থেকে আড়াই হাযার বছর আগে মানুষের এতটা উন্নতি হয়েছিল এবং তারা নিজেরাই এক সার্বজনীন জীবন বিধানের প্রয়োজন অনুভব করছিল। বৌদ্ধধর্ম যদিও কোন পূর্ণাংগ ধর্ম -বিধান ছিলনা এবং তাতে কেবল নৈতিক চরিত্র সংক্রান্ত কতিপয় নীতির সমাবেশ হয়েছিল , তথাপি হিন্দুস্তান থেকে বেরিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম একদিকে জাপান ও মংগোলিয়া পর্যন্ত এবং অপর দিকে আফগানিস্তান ও বোখারা পর্যন্ত প্রসার লাভ করেছিল। এ ধর্ম মতের প্রচারকগণ বহু দূর দূরান্তের নানা দেশ পর্যটন করেছিলেন। এর কয়েক শতাব্দীর পর উদ্ভব হল ইসায়ী ধর্মের । যদি ও হযরত ঈসা (আ) ইসলামের শিক্ষা নিয়েই এসেছিলেন , তথাপি তাঁর তিরোধানের পর ঈসায়ী ধর্ম নামে এক বিকৃত ধর্ম তৈরী করে নেয়া হয়েছিল এবং ঈসায়ীরা এ ধর্মকে ইরান থেকে শুরু করে আফ্রিকা ও ইউরোপের দূর -দূরায নানা দেশ ছড়িয়ে দিল। বস্তুত দুনিয়া তখন এক সাধারন মানব ধর্মের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করছিল এবং তাঁর জন্য এতটা প্রস্তুত ছিল যে , যখন তেমন কোন পূর্ণাংগ ও নির্ভুল জীবন বিধানের সন্ধান পাওয়া গেল না, তখন অপরিণত ও অসম্পূর্ণ ধর্মসমূহকেই বিভিন্ন কওমের মধ্যে প্রচার করতে শুরু করলো ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *