অধ্যায় ০৩ : জিহাদ ও মুসলমান

জিহাদ সম্পর্কে ইসলামের বিধি-বিধান পূর্বে অনেকেই বুঝনেনি। বরং তাদের অভিযোগ ছিল এই যে, ইসলাম যুদ্ধ চায় এবং খুনা-খুনী পছন্দ করে। আসলে ইসলাম শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই সদাসর্বদা জিহাদের জন্যে তৈরী ও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। জুলুম, না-ইনসাফী, অন্যায়-অনাচার-ব্যভিচারের সয়লাব সৃষ্টি করার জন্যে বা প্রবৃত্তির হীন চাহিদা পূরণ অথবা স্বীয় স্বার্থ সিদ্ধির উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’আলা জিহাদ ফরয করেননি, একথা আমাদের মনে রাখা দরকার। আল্লাহ জিহাদ ফরয করেছেন ইসলামের প্রচার, প্রসার ও আন্দোলনের কাজ যাতে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা যায়, শান্তি ও নিরাপত্তা কায়েম হয় এবং ন্যায় ও সততা প্রতিষ্ঠিত থাকে। কারণ একমাত্র এ পথেই মুসলমানগণ তাদের ওপর অর্পিত-মহান দায়িত্ব পালন করতে পারে। তাছাড়া এ-ও লক্ষ্য করার বিষয়, জিহাদ ও কিতালের সাথে সাথে ইসলাম সন্ধিও করতে আগ্রহী হয়, তাহলে তোমরাও তাতে সম্মত হওয় এবং আল্লাহর ওপর নির্ভর কর।

মুসলমান যুদ্ধের ময়দানে যায় শুধু একটি বাসনা নিয়ে। আর তাহলে আল্লাহর কালেমা বুলন্দ হোক, তা ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে। মান-ইজ্জত, ধন-দৌলত, ভোগ-ঐশ্বর্য, মালে-গণিমতের খেয়াল বা জুলুম-অবিচারের চেষ্টা এর কোনোটাই মুসলমানেরা কামনা থাকতে পারে না, যদি সত্যিকারের মুজাহিদ সে হয়। এ ক্ষেত্রে তার শুধুমাত্র একটি জিনিসই হালাল তা হচ্ছে, আল্লাহর রাস্তায় তার শির লুটিয়ে দেয়া এবং তাঁর সৃষ্টির হেদায়াতের জন্যে আকুল আগ্রহ পোষণ করা।

হযরত হারিস বিন মুসলিম বিন হারিস বর্ণনা করেন, “আমার পিতা আমাকে বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে একটি মুজাহিদ বাহিনীর সাথে জিহাদে পাঠান। দুশমনের আক্রমণ করার স্থানে পৌঁছেই আমি ঘোড়ার লাগাম টেনে সাথীদের পেছনে ফেলে সামনে গিয়ে উপস্থিত হলাম। গোত্রের লোকজন তখন আমার কাছে অনুনয় বিনয় শুরু করে । আমি তাদের উদ্দেশ্যে বললাম, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বল, শান্তি পেয়ে যাবে। তারা তাই করলো। এতে আমার সংগী-সাথীরা আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে মত প্রকাশ করেন যে, আমি তাদেরকে গনিমতের মাল থেকে বঞ্চিত করেছি। ফিরে আসার পর তারা এ ঘটনা হুজুর (সা) কে জানায়। ঘটনা শুনে হুজুর (সা) আমাকে ডেকে আমার কাজের খুবই প্রশংসা করলেন এবং বললেন, খুশী হও, আল্লাহ সেই গোত্রের প্রত্যেকটি লোকের বিনিময়ে তোমাদের জন্যে এত এত প্রতিদান বরাদ্দ করেছেন। তিনি আরো বললেন, আমি তোমাকে একটি অছিয়ত লিখে দিচ্ছি, আমার অবর্তমানে তোমার কাজে লাগবে। এরপরে তিনি অছিয়ত লিখে তাতে মোহর লাগিয়ে আমাকে দিয়ে দেন।” -(আবু দাউদ)

হযরত সাদ্দাদ বিন ইলহুদী (রা) থেকে বর্ণিত আছে। “এক বেদুইন এসে রাসুলুল্লাহ (সা) এর হাতে ইসলাম কবুল করে। তিনি হিজরত করে রাসূল (সা) এর খেদমতে আসার জন্যে তাঁর কাছে আরজ পেশ করেন। রাসূল (সা) তাকে সাহায্য করার জন্যে এক সাহাবীকে নির্দেশ দান করে। পরে এক যুদ্ধে কিছু মালে গণিমত পাওয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (সা) অন্যান্যদর সাথে তাঁকেও অংশ দেন। এতে তিনি বলেন যে, তিনি মালে গণিমতের আশায় মুসলমান হননি। তিনি আরো বলেন, আমি এজন্যে সাথী হয়েছি যে, একটি তীর এসে আমার গলায় বিধবে এবং মৃত্যুর সাথে মোলাকাত করে আমি জান্নাত চলে যাবো। হুজুর (সা) বললেন, তুমি যদি সত্যবাদী হও, তাহলে আল্লাহ তোমার আশা পূরণ করবেন। কিছুক্ষণ পরে যখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল তখন রাসূল (সা) এর সামনে তাঁর লাশ পেশ করা হলো। দেখা গেল, তিনি যে স্থানে চেয়েছিলেন ঠিক সে স্থানেই একটি তীর বিদ্ধ হয়েছে। নবী করীম (সা) জিজ্ঞেস করলেন, এ কি সে-ই। লোকেরা বললো, জী হ্যাঁ। রাসূল (সা) বললেন, তার কামনা সত্য ছিল। আল্লাহ তার দুটি আশা পূরণ করেছেন। হুজুর (সা) এর পবিত্র জুব্বা দ্বারা তাঁর কাফন হয় এবং হযরত (সা) নিজে তাঁর জানাযার নামায পড়ান। নামাযের সময়ে রাসূলুল্লাহ (সা) এর মুখে একথা শুনা যায়, আল্লাহ তোমার বান্দা তোমার পথে জিহাদ করেছে, অতপর শহীদ হয়েছে, আমি এর সাক্ষী”। -(নাসায়ী)

হযরত আবু হুরাইরা (রা) এর বর্ণিত একটি হাদীস, “এক ব্যক্তি রাসূল (সা) এর কাছে আরজ করে, ইয়া রাসূলুল্লাহ কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর পথে জিহাদ করে এবং তার মনে মালে গণিমতের আকাঙ্ক্ষাও থাকে, তাহলে কেমনে হবে? ইরশাদ হলো, তার জন্যে কোনো প্রতিদান নেই। সে তিনবার প্রশ্ন করে আর তিনবারই হুজুর উত্তর দেন, ‘তার জন্যে কোনো প্রতিদান নেই”। -(আবু দাউদ)
হযরত আবু মূসা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, “এক বেদুইন আল্লাহর রাসূলের নিকট হাজির হয়ে জিজ্ঞেস করলো, এক ব্যক্তি বাহাদুরী দেখাবার জন্যে যুদ্ধ করে, এক ব্যক্তি ক্রোধের বশে যুদ্ধ করে, এক ব্যক্তি সুনাম-সুখ্যাতির জন্যে যুদ্ধ করে, কার যুদ্ধ আল্লাহর কালেমা সর্বোচ্চ ও সর্বোন্নত হোক কেবল তারই যুদ্ধ মহান আল্লাহর পথে সুম্পন্ন হবে” –(মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমীযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ)

আল কুরআন ও হাদীসে রাসূলের এ সমস্ত বর্ণনা ছাড়াও প্রিয়নবী (সা) এর সম্মানিত সংগী-সাথীদের জীবনের ঘটনাবলী পর্যালোচনা ও মুসলমানদের বিজিত এলাকায় নিয়োজিত দায়িত্বশীলদের কার্যকলাপ আলোচনা করলে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাঁরা লোভ-লালসা ও ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধে ছিলেন। আসলে জীবনের মূল লক্ষ্যের প্রতি তাঁরা ছিলেন পুরোপুরি বিশ্বস্ত এবং মানুষের হেদায়াত ও আল্লাহর কালেমার প্রসারের জন্যে তাঁদের জীবনের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড এটাই যে, সাক্ষ্য দেয়। তাঁদের বিরুদ্ধে নিছক ক্ষমতা দখল বা পররাজ্য আক্রমণ ও দখলের লালসার অভিযোগ বা ধন-সম্পদ লাভের উগ্র আকাঙ্ক্ষার অপবাদ একেবারেই ভিত্তিহীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *