অধ্যায় ০২ : জিহাদ প্রসঙ্গে হাদীসে রাসূল (সা)

এক: হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, জিহাদ সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ হাদীসের শেষাংশে প্রিয় নবী করীম (সা) বলেন, “সেই আল্লাহর শপথ যাঁর হাতে আমার জীবন, আমর মন তো চায় আল্লাহর পথে আমি শহীদ হই, আবর জীবিত হই, আবার শহীদ হই, আবার জীবিত হই এবং আবার শহীদ হই”।

-(বুখারী, মুসলিম)

দুই: হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন-যাঁর হাতে আমার জীবন সে সর্বশক্তিমানের শপথ। যে ব্যক্তিই আল্লাহর পথে জখম হয়, আল্লাহ তাকে ভালবাভাবেই জানেন। কিয়ামতের দিন সে রক্তের রং ও মিশকের সুগন্ধি নিয়ে আগমন করবে।

তিন: হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমার চাচা আনাস বিন নযর বদরের যুদ্ধে শরীক হতে পারেননি। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দরবারে তিনি আরজ করেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা) মুশরিকদের বিরুদ্ধে আপনার প্রথম যুদ্ধে আমি অনুপস্থিত ছিলাম। আল্লাহর শপথ, যদি আমাকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে আসন্ন জিহাদে শরীক হওয়ার সুযোগ দেন, তাহলে আপনি দেখতে পাবেন, আমি কি করি। সুতরাং যখন ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানেরা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, তখন তিনি হঠাৎ চিৎকার করে বললেন, হে আল্লাহ! আমার সাথীরা যাকিছু করেছেন, আমি সে জন্যে তোমার কাছে মাফ চাইছি এবং মুশরিকগণ যা কিছু করছে আমি তা থেকে পবিত্র। অতপর তিনি সামনে এগিয়ে যেতেই সাদ বিন মায়াজকে দেখলেন এবং চিৎকার করে ওঠলেন, হে সাদ বিন মায়াজ। জান্নাত। জান্নাত। আমার প্রভুর শপথ। আমি তার খোশবু পাচ্ছি। ওহুদের দিক থেকেই আসছে। হযরত সাদ আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, তিনি না করলেন তা আমি পারালাম না। হযরত আনাস বলেন, পরে আমরা তাঁর শরীরে তলোয়ার, তীর ও বল্লমের আশিটি আঘাত দেখেছি। আমরা তাকে শহীদ অবস্থায় পেয়েছি। মুশরিকেরা তার অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেটে ফেলেছিল, এজন্যে কেউ তাঁকে চিনতে পারেনি। তাঁর বোন আঙ্গুল দেখে তাকে চিনেছেন। হযরত আনাস বলেন- আমরা মনে করতাম এঁদের মত লোকদের জন্যেই “এরূপ কত মুমিন রয়েছেন যাঁরা আল্লাহর সাথে ওয়াদা পূরণ করেছেন” এ আয়াতটি নাযিল করেছেন।

চার: হযরত উষ্মে হারেসা বিনতে সারাকা থেকে বর্ণিত, “তিনি হুজুর (সা) এর দরবারে এসে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কি হারেসা সম্পর্কে কিছু বলবেন না? জঙ্গে বদরের পূর্বে একটি অজ্ঞাত তীর এসে তাঁর শরীরে বিঁধে যায় এবং তিনি শহীদ হন। যদি তিন জান্নাতবাসী হয়ে থাকেন তাহলে আমি সবর করবো, অন্যথায় প্রাণ ভরে কাঁদব। হুজুর (সা) জবাব দিলেন, হারেসার মা! বেহেশতে তো অনেক বেহেশতবাসীই রয়েছেন তোমরা ছেলে তো সেরা ফেরদাউসে রয়েছেন।” (বুখারী)

চিন্তা করে দেখুন জান্নাতের চিন্তা কিভাবে তাঁদেরকে প্রাণ প্রিয় পুত্রের শোক পর্যন্ত ভুলিয়ে দেয়।

পাঁচ: হযরত আবদুল্লাহ বিন আবি আওফা (রা) থেকে বর্ণিত, “আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন, জেনে রেখো বেহেশত তরবারির ছায়াতলে”। (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ)

ছয়: হযরত জায়দ বিন কালিদ জুহানী থেকে বর্নিত, “রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, যে ব্যক্তি কাউকে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর জন্যে তৈরী করেছে, সে যেন নিজেই জিহাদ করলো এবং যে আল্লাহর পথে বের হয়েছে এমন কোনো গাজীর পরিবারের সাথে ভাল ব্যবহার করেছে সে যেন স্বয়ং জিহাদে শরীক হলো”।

-(বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযী)

সাত: “হযরত আবু হুরাইয়া (রা) থেকে বর্ণিত, “হুজুরে পাক (সা) এরশাদ করেছেন,যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস সহকারে জিহাদে কোনো ঘোড়া দান করে, কিয়ামতের দিন উক্ত ঘোড়ার খাদ্য, পানীয় এবং গোবরও তাঁর মিজানে থাকবে”-(বুখারী)
আট: হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, অপর একটি দীর্ঘ হাদীসের শেষাংশে রাসূলে কারীম (সা) বলেন, “আল্লাহর রাহে মুজাহিদের উদাহরণ সেই ব্যক্তির ন্যায়, যে রোযাও রাখে, রাতে নামাযও পড়ে এবং কালামে পাক তেলাওয়াত করে। কিন্তু রোযার সে কাতর হয় না, নামাযেও তার শৈথিল্য আসে না। ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহর পথে জিহাদকারীর অবস্থাও অনুরূপ থাকে”।
_(বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে মাজা ও তিরমিযী)

নয়: হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, “রাসূল (সা) বলেন, আমি কি তোমাদেরকে ভাল লোক আর কে মন্দ লোক তা জানিয়ে দেব না? সে ব্যক্তি ভাল লোকদের মধ্যে অন্যতম, যে ব্যক্তি ঘোড়া বা উটে সওয়াব হয়ে বা পায়ে হেটে সকল অবস্থাতেই মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর রাহে কর্মতৎপর থাকে। অপরদিকে সে ব্যক্তি মন্দ লোকদের অন্যতম, যে আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে অথচ তা থেকে কোনো নসিহত কবুল করে না”। -(নাসায়ী)

দশ: হযরত হযরত ইবেন আব্বাস (রা) বলেন, “আমি আল্লাহর রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছি, দু’প্রকারের চক্ষুকে আগুন স্পর্শ করে না, প্রথম সে চক্ষু যা আল্লাহর ভয়ে কাঁদে, দ্বিতীয়টি হলো সে চক্ষু যা শত্রুর প্রতীক্ষায় আল্লাহর পথে পাহারাদারী করে রাত কাটিয়েছে।“-তিরমিযী)

এগার: হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, “নবী করীম (সা) বলেছেন, সারা দুনিয়ার মানুষ আমার হয়ে যাওয়ার চেয়ে আল্লাহর রাস্তায় মৃত্যুবরণ করা আমার কাছে অধিক প্রিয়”। -(নাসায়ী)

বার: হযরত রাশেদ বিন সা’দ জনৈক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন, কোনো এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা) কবরে সকল মুমিনের পরীক্ষা হবে, কিন্তু শহীদের হবে না, এর কারণ কি? হুজুর (সা) জবাবে বলেন, তার মাথার ওপর তলোয়ার চমকানোই তার পরীক্ষার জন্যে যথেষ্ট”। -(নাসায়ী)

তের: হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, মওতের ছোঁয়া একজন শহীদের কাছে তেমন, যেমনটি তোমাদেরকে কেউ চিমটি কাটলে অনুভব কর”।
-(তিরমিযী, নাসায়ী, দারেমী)

চৌদ্দ: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, “রাসূলে করীম (সা) বলেন, আমাদের মহান আল্লাহ যে ব্যক্তির ওপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট, যে আল্লাহর রাহে জিহাদ করে এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা পরাজয় বরণ করলেও জিন দায়িত্ব উপলদ্ধি করে ফিরে দাঁড়ায় এবং আমৃত্যু লড়াই করে। তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা আমার এ বান্দার দিকে লক্ষ্য কর, আমার পুরস্কারের আশায় এবং শাস্তির ভয়ে সে পুনরায় জিহাদে লিপ্ত হয়েছে শেষ পর্যন্ত নিজের জান দিয়েছে। তোমরা সাক্ষী থাক, আমি তাকে মাফ করে দিলাম”। -(আবু দাউদ)

পনর: আবু দাউদ শরীফে হযরত আবুল খায়ের বিন সাবেত বিন কয়েস বিন সাষ্মাস তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে দেখা যায় আহলে কিতাবের বিরুদ্ধে জিহাদে নিহত হলে, নিহত মুসলমান দু’জন শহীদের সাওয়াব পাবে।
এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় আহলে কিতাবদের সাথে জিহাদ করা অবশ্য কর্তব্য। জিহাদ কেবল মুশরিকদের বিরুদ্ধে নয় বরং যারাই ইসলামের দুশমন তাদের সকলের বিরুদ্ধেই জিহাদ করতে হবে। আর আহলে কিতাবদের বিরুদ্ধে জিহাদ করলে আল্লাহর নিকট তাঁর জন্যে দ্বিগুণ পুরুস্কার থাকবে।

ঘোল: হযরত সহল বিন হানিফ থেকে বর্ণিত আছে। “রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি খালেস অন্তকরণে আল্লাহর কাছে শাহাদাতের বাসনা করে, সে ব্যক্তি বিছানায় মারা গেলেও আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদা দেবেন”। -(মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনে মাযাহ)

সতর: হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, “একজন সাহাবী কোনো এক স্থান অতিক্রম করছিলেন, সেখানে একটি নহর ছিল। তিনি নহরটি পছন্দ করলেন এবং মনে মনে চিন্তা করলেন, এ জায়গায় একাকবী বসে ইবাদাত করলে কতই না ভাল হতো। তিনি তাঁর ইচ্ছা নবী করীম (সা) এর কাছে ব্যক্ত করলেন। হুজুর (সা) বললেন, তা করবে না। তোমাদের পক্ষে ঘরে বসে সত্তর বছর নামাযে কাটানোর চেয়ে আল্লাহর পথে বের হওয়া অধিক উত্তম। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিন এবং বেহেশতে স্থান দান করুন। আল্লাহর পথে জিহাদ করা। যে ব্যক্তি কিছুক্ষণ সময়ের জন্যে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করেছে, তার জন্যে জান্নাত অবধারিত। -(তিরমিযী)

ঊনিশ: হযরত মিকদাদ বিন মাদকারব থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহর নিকট শহীদের ছয়টি বৈশিষ্ট্য। প্রথম আক্রমণেই তাকে মাগফেরাত করা হয়, দুনিয়ায় থাকাকালীন অবস্থাতেই তাকে বেহেশতের ঠিকানা জানিয়ে দেয় হয়, কবর আযাব থেকে তার নাজাত হয়,কিয়ামতের ভয়াবহ আতংক থেকে সে নিরাপদ থাকবে, তাকে ইয়াকুত খচিত একটি সম্মানিত টুপি পরিধান করানো হবে, যা সারা দুনিয়া এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু রয়েছে তার চেয়েও মূল্যবান হবে, মৃগ-নয়না হুরেরা তার স্ত্রী হবে এবং সে সত্তর জন আত্মীয়ের জন্যে শাফায়াত করবে”। -(তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)

বিশ: হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে। “রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি জিহাদের চিন্তা ব্যতিরেকে আল্লাহর সাথে দেখা করবে তার সে সাক্ষাত ত্রুটিপূর্ণ হবে”। -(তিরমিযী, ইবেন মাজাহ)

একুশ: হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, “রাসূলে কারীম (সা) বলেন, যে ব্যক্তি খুলুছিয়াতের সাথে শাহাদাত কামনা করে, শহীদ না হলেও তাকে শহীদের মর্যাদা দেয়া হবে”। -(মুসলিম)

বাইশ: হযরত ওসমান বিন আফফান (রা) থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাহে একরাতও কোনো ঘাঁটি পাহারা দেয়, তার জন্যে তার হাজার রাতের নামাযেরে সমান (সওয়াব) হবে”। -(ইবনে মাজাহ)

তেইশ: হযরত আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, “নবী করীম (সা) বলেছেন, একটি নৌযুদ্ধ দশটি স্থল যুদ্ধের সমান এবং যে নদীতে পড়ে গেল, সে যেন আল্লাহর রাহে খুনে সিক্ত হয়ে গোসল করে ওঠলো”। -(ইবনে মাজাহ)

চব্বিশ: হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, “জঙ্গে ওহুদের দিন আবদুল্লাহ বিন আমর বিন হিশাম শহীদ হলে পর তাঁর ছেলে জাবিরকে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন যে, আল্লাহ জাবিরের পিতার সাথে একেবারে মুখোমুখী কথা বলেছেন। এ হাদীসের শেষাংসে বলা হয়েছে আবদুল্লাহ বিন আমরের প্রার্থনা অনুযায়ী আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেন, “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছেন তাদের তোমরা মৃত মনে করো না”।

পঁচিশ : হযরত আনাস (রা) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, “নবী করীম (সা) বলেছেন, আল্লাহর পথে কোনো জিহাদকারীকে বিদায় দেয়ার উদ্দেশ্যে সকাল বিকাল, কিছুদূর অগ্রসর হওয়া এবং তাকে সওয়ারীর পিঠে আরোহণে সাহায্য করা, আমার কাছে দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু রয়েছে, তার সবকিছু থেকে প্রিয়”। -(ইবনে মাজাহ)

ছাব্বিশ: হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, “আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন, আল্লাহর মেহমান তো কেবল তিনজন, গাজী, হাজী ও ওমরাহ সম্পাদনকারী”। -(মুসলিম)

সাতাশ: হযরত আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, “রাসূলে কারীম (সা) বলেন, শহীদ তার বংশের সত্তর ব্যক্তির জন্যে শাফায়াত করবে”। -(আবু দাউদ)

আঠাশ: হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা) থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তোমরা যখন ধারে বেচা-কেনা করবে, গাভীর লেজ ধরে থাকবে, চাষাবাদে লেগে যাবে এবং জিহাদ পরিত্যাগ করবে, আল্লাহ তখন তোমাদের ওপর অপমান চাপিয়ে দেবেন এবং তা তোমরা হাটতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা নিজের দ্বীনের দিকে প্রত্যাবর্তন করো”। -(আহমাদ, আবু দাউদ এবং হাকেম)
ঊনত্রিশ: হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণ সহ মুশরিকদের যখন পৌঁছে গেল তখন হুজুর (সা) ইরশাদ করলেন, অগ্রসর হও, সেই জান্নাতের দিকে যা সমস্ত আকাশ ও পৃথিবীর সমান প্রশস্ত। হযরত ওমায়ের বিন হাম্মামের মুখ থেকে নির্গত হলো, হ্যাঁ, হ্যাঁ। রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ কেন, তিনি উত্তরে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, কসম খেয়ে বলছি আমি জান্নাতবাসী হতে চাই, এজন্যেই হ্যাঁ হ্যাঁ বলেছি। তখন রাসূলূল্লাহ (সা) বলেন, সে সময়ে তিনি থলি থেকে কিছু খেজুর নিয়ে খেতে খেতে বললেন, আমি যদি এ খেজুর শেষ করা পর্যন্ত বেঁচে থাকি তাই হবে আমার জন্যে দীর্ঘ জীবন। সুতরাং তাঁর কাছে যত খেজুর ছিল মাটিতে ফেলে দিয়ে লড়াই শুরু করলেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি শাহাদাত বরণ করলেন”। -(মুসলিম)

ত্রিশ: হযরত আবু ইমরানের বর্ণনা অনুযায়ী মুসলমানেরা যখন রোম শহরে ছিলেন তখন বিরাট এক রোমান বাহিনী মুসলমানদের আক্রমণ করে। মুসলমান ও রোমকদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে যায়। এ যুদ্ধের বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর এক প্রেরণাদায়ক ঐতিহাসিক ভাষণের কথা উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধরত হযরত আবু আইয়ুব আনসারী বলেন, তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না’ –কুরআনে করীমের এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে নিজের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে সমস্ত সময় ব্যয় করা, এ কাজে নিয়োজিত থাকা এবং জিহাদ পরিত্যাগ করা। আবু আইয়ুব আনসারী আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে মৃত্যু পর্যন্ত দৃঢ় থাকেন এবং রোমেই তাঁর দাফন হয়”। _(তিরমিযী)

এখানে লক্ষ্য করার বিষয়, এ সময় হযরত আইয়ুব আনসারী বার্ধক্যের দ্বার অতিক্রম করছিলেন। অথচ তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে দ্বার অতিক্রম করছিলেন। অথচ তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও এ যুদ্ধের সময় দ্বীনের বিজয় ও ইসলামের গৌরবের জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন এবং যৌবনের আবেগ-উচ্ছাসে উদ্বেলিত হয়েছিলেন।

একত্রিশ: হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, “নবী করীম (সা) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি মরে গেল, অথচ সে জিহাদ করেনি বা তার মনে জিহাদের জন্যে কোনো চিন্তা, সংকল্প বা ইচ্ছাও দেখা যায়নি তবে সে মুনাফিকের ন্যায় মারা গেল”।
-(মুসলিম ও আবু দাউদ)

এধরনের আরো অনেক হাদীস রয়েছে যাতে নৌযুদ্ধ, স্থল যুদ্ধ, কিতাবধারী জাতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ইত্যাদি সম্পর্কীয় বিস্তারিত হেদায়াত ও নিয়মাবলী রয়েছে। এসব হাদীসের সংখ্যা এতবেশী যে, একটি বিরাট গ্রন্থ এ সম্পর্কে আলোচনার জন্যে আমাদের যথেষ্ট নয়। অনুরূপভাবে “আল মাশারেউল আশওয়াক ইলা মাশারেউল উশশাক” এবং “মছিরুল কারাম ইলা দারিল ইসলাম” এবং সিদ্দিক হাসান খানের “আল ইবরাতু ফিমা আরাদা আনিল্লাহ হে রাসূলিহি ফিল গিজওয়া অল জিহাদে অল হিজরতে” প্রভৃতি গ্রন্থে উক্ত শ্রেণীর প্রচুর তথ্য পাওয়া যাবে। হাদীস গ্রন্থের জিহাদ অধ্যায়ে এ ধরনের বহু মূল্যবান হাদীস রয়েছে।
মুসলিম আইনবিদদের দৃষ্টিতে জিহাদা

পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফ থেকে জিহাদের ফযীলত সম্পর্কিত আয়াতে কারীমা ও হাদীসে নববী আপনাদের অবগতির জন্য পেশ করা হলো। এখন এ সম্পর্কে আমরা মুসলিম ফিকাহবিদদের কিছু বক্তব্য পেশ করছি। একই সাথে আধুনিক আলেমদের মতামতও আমরা উল্লেখ করছি, যাতে করে সংশ্লিষ্ট সকলেই জিহাদের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন এবং এ ব্যাপারে বর্তমান মুসলিম সমাজের উদাসীনতা সম্পর্কেও সচেতন হতে পারেন।

এক: “মাজমাউল আনহার ফি সারহি মুলতাকিযুল আবহার”- এর গ্রন্থকার হানাফী দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, “জিহাদের আভিধানিক অর্থ হলো নিজেদের মুখের এবং কাজকর্মের সমগ্র শক্তিকে কাজে লাগানো। কিন্তু শরীয়াতের পরিভাষায় জিহাদ বলতে বুঝায় ধর্মের দুশমনদের দমন, তাদেরকে খতম করে দেয়া এংব দ্বীনের ভিত্তিকে মজবুত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। এ জিহাদ করতে হবে বিরুদ্ধবাদীদের সাথে, মুশরিকদের এমনকি ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধেও। বিদ্রোহীদের সাথে লড়াই করা ফরযে কেফায়া। জিহাদের আহবান এসে গেলে তা প্রত্যেকের ওপর ফরয হয়ে যায়, যদিও তার জন্য অনেকে প্রস্তুত থাকেন না। সকলেই যদি জিহাদ ছেড়ে দেয় তাহলে প্রত্যেকে প্রস্তুত থাকেন না। সকলেই যদি জিহাদ ছেড়ে দেয় তাহলে প্রত্যেকেই গুনাহগার হবে। হুজুর (সা) বলেছেন, কোনো মুসলিম শহর অথবা মুসলিম জনবসতি যদি অমুসলমানেরা দখল করে নেয়, তাহলে প্রত্যেকের জন্য জিহাদ করা ফরযে আইন হবে। এক্ষেত্রে স্বামী, পিতা-মাত, প্রভু বা পাওনাদার অনুমতি না দিলেও যথাক্রমে তাদের স্ত্রী, সন্তান, গোলাম ও ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের জিহাদে যোগদান করতে হবে। স্ত্রী, সন্তান, গোলাম ও ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের জিহাদে যোগদান করতে হবে। এজন্যে কোনো প্রকার অনুমতি বা সম্মতির প্রয়োজন নেই।

দুই: “বাসালাতুস সালেক লি-আকরাবুল মাসালেক ফি মাজহাবিল ইমাম মালিক” এর গ্রন্থকার বলেন, ইসলামের বিজয়ের জন্যে প্রতি বছর জিহাদ করা ফরযে কেফায়া। কিছু রোক জিহাদে লিপ্ত থাকলে বাকীরা দায়িত্ব মুক্ত থাকেন। ইমাম যদি হুকুম দেন অথবা মুসলিম জনবসতি দুশমনের হামলার সম্মুখীন হয়, তাহলে সে এলাকার সকল মুসলমানের ওপর নামায-রোযার ন্যায় জিহাদও ফরযে আইন হবে। যদি সে এলাকার লোক দুশমনের মোকাবেলার জন্যে যথেষ্ট না হয়, তাহলে প্রতিবেশী মুসলমানদের জন্যে জিহাদ করা ফরয হবে। এ পরিস্থিতিতে স্ত্রীলোক ও গোলামদের ওপরেও জিহাদ ফরয, যদিও স্বামী ও প্রভুর অনুমতি না থাকে। দেনাদারেরর জন্যেও জিহাদ ফরয। মা-বাবা সন্তানকে ফরযে আইন পালন করা থেকে নিষেধ করতে পারেন না, তবে ফরযে কেফায়ার ব্যাপারে বারণ করতে পারেন, দুশমনের হাতে বন্দী মুসলমানকে মুক্ত করা ফরযে কেফায়া, যদি বন্দী নিজের মুক্তিগণ আদায় করার জন্যে প্রয়োজনীয় সম্পদের অধিকারী না হয় তবে প্রয়োজনে মুসলমানদের সকল সম্পদের বিনিময়ে তাকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

তিন: শাফী মাযহাবের সমর্থক ইমাম নববী বলেন, “নবী করীম (সা) এর যুগে জিহাদ ফরযে কেফায়া ছিল। কারো কারো মতে ফরযে আইন ছিল। তাঁর মতে কাফেরদের নিজস্ব এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরযে কেফায়া। কিন্তু তারা যদি মুসলিম এলাকায় হামলার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করে, সে ক্ষেত্রে তাদেরকে যে কোনো উপায়ে হটিয়ে দিতে হবে। এজন্যে যে জিহাদ হবে, তা সবার জন্যেই বাধ্যতামূলক হবে”। -(মতনুল মিনহাজ)

চার: ইমাম কুদামা হাম্বলী “আল মুগনীতে” লিখেছেন যে, জিহাদ ফরযে কেফায়া, তবে কাফের ও মুসলিম সৈন্যরা মুখোমুখি হলে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া নাজায়েয। এ সময় অটল থাকা ফরযে আইন। এছাড়া কাফেরদেরকে অনুপ্রবেশের পর কোনো শহর থেকে বের করার জন্য যুদ্ধ করা এবং আমীরের নির্দেশ মোতাবেক বছরে একবার জিহাদের জন্যে বের হওয়া ফরযে আইন।
পাঁচ: ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের মতে ফরজের পরে জিহাদের চেয়ে উত্তম কাজআর কিছু হতে পারে না।

হযরত আনাস বিন মালেক (রা) বলেন, “একবার রাসূলে করীম (সা) সহাস্য মুখে ঘুম থেকে উঠেন। উম্মে হারাম বলেন-আমি জিজ্ঞেস করলাম,ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার হাসার কারণ কি? তিনি জবাব দিলেন, আমার উম্মতের মধ্যে কিছু লোক আল্লাহর পথে জিহাদে বের হয়েছে-এটা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে, তারা এমনভাবে সমুদ্রের ওপর আরোহণ করছে যেমন একজন বাদশাহ তার শাহী মসনদে গিয়ে বসে”। -(বুখারী, মুসলিম)

এ হাদীসেই পরে দেখা যায় যে, উম্মে হারাম (রা) আরজ করেন- দোয়া করুন যেন আল্লাহর রাহে জিহাদকারীদের তালিকায় আমার নামও লেখা হয়। হুজুর (সা) তাঁর জন্যে দোয়া করেন। এরপর অনেক দিন পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকেন এবং যেসব মুসলমান সাগর পাড়ি দিয়ে সাইপ্রাস যান এবং জিহাদ করে সে দেশ জয় করেন, তিনিও তাঁদের সাথী হয়েছিলেন। সেখানেই তিনি মারা যান এবং সে স্থানে তার কবরও রয়েছে।

ছয়: আল্লামা ইবনে হাযম জাহেরী ‘আল মুহাল্লা’ গ্রন্থে বলেন, জিহাদ মুসলমানদের জন্যে ফরয। কিছু লোক যদি জিহাদে শরীক থাকে, দুশমনদেরকে নিজ এলাকায় ঢুকতে না দেয়, মুসলিম দেশের সীমান্ত রক্ষা করে এবং দুশমনদের এলাকায় ঢুকে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাহলে অন্যান্র মুসলমানেরা জিহাদের দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি পাবে, অন্যতা কারো দায়িত্ব মুক্তির প্রশ্নই ওঠে না। আল্লাহ বলেন, “বের হয়ে যাও (জিহাদের উদ্দেশ্যে) অস্ত্র-শস্ত্র হালকা হোক বা ভারী হোক এবং আল্লাহর পথে তোমার জান-মাল দিয়ে জিহাদ কর।” সাধারণত মা-বাবার অনুমতি ছাড়া সন্তানের পক্ষে জিহাদে যোগদান বৈধ নয়। কিন্তু কোনো মুসলিম জনবসতি আক্রান্ত হলে সক্ষম সকল মুসলমানের ওপর জিহাদ ফরয, পিতা-মাতার অনুমতি না থাকলেও। জিহাদে গেলে পিতা-মাতা উভয়ে বা তাদের কোনো একজনের মারা যাওয়ার আশাংকা থাকলে তাদেরকে বাড়ীতে রেখে জিহাদে শরীক হওয়া জায়েয নেই।

সাত: ইমাম শাওকানী তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ-‘আল সাইফুল জাব্বার’-এ বলেন যে, জিহাদ অবশ্যই ফরযে কেফায়া। কিছু লোক এ দায়িত্ব পালন করলে অন্যরা অব্যাহতি পাবেন। কিন্তু লোক এ দায়িত্ব পালন করলে অন্যরা অব্যাহতি পাবেন। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সে জনবসতির কিছু সংখ্যক লোক জিহাদে যোগদান না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সকলের ওপরই জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ওয়াজিব থাকে। একইভাবে আমীর যদি জিহাদের আদেশ দান করেন তাহলে সেটা ফরযে আইন হবে।

সকলেই বুঝতে পারেন, মুজতাহিদ, মুকাল্লিদ, প্রাচীন ও আধুনিক যুগের সকল ওলামাই এ ব্যাপারে একমত যে, দ্বীনের প্রচারের উদ্দেশ্যে জিহাদ ফরজে কেফায়া এবং হামলাকারী দুশমনদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরযে আইন। একথা সবাই জানেন,

মুসলমানেরা যদি কাফেরদের হাতে পরাজিত হয় তাহলে তাদের দেশ, মান-ইজ্জত, ধন-সম্পদ সব কিছুই বিপন্ন হয়, তখন তাদের পক্ষে দীনের প্রচার করা তো দূরের কথা, স্বয়ং তাদের ঘরেই দীনের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠে। এমতাবস্থায় প্রত্যেক মুসলমানেরা ওপর জিহাদ করা ফরয হিসেবে এসে পড়ে। কাজেই জিহাদের আশা নিয়েই সে পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে আর সেই জন্যে সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকবে।

বর্তমান যুগে মুসলমানরা যেভাবে জিহাদ ছেড়ে দিয়েছে, ইতিপূর্বে তা কখনো দেখা যায়নি, আগে তারা এ ব্যাপারে এতটুকুও গাফেল হয়নি। মনে হচ্ছে বর্তমান যুগই মুসলমানদের জন্যে অন্ধকার যুগ। কারণ তাদের পূর্বের সে সাহবস-বীরত্ব আজ আর দেখা যায় না। অথচ আগের জামানার আলেম, ওলামা, সুধী, মেহনতী মানুষ নির্বিশেষে সকলেই জিহাদী জজবায় মশগুল থাকতেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিখ্যাত ফকীহ ও অলিআল্লাহ হযরত আবদুল্লাহ বিন মুবারক অধিকাংশ সময়ই জিহাদে থাকতেন এবং শিষ্য-শাগরিদদের মধ্যে জিহাদী জোশ সৃষ্টি করতেন। বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী এক বছর জিহাদ, এক বছর জিহাদ, এক বছর শিক্ষকতা ও এক বছর হজ্জ করে কাটাতেন। কাজী আসাদ ইবনুল ফোরাদ মালেকী তাঁর যুগের বিখ্যাত নৌ-প্রধান ছিলেন। ইমাম শাফেয়ী দু’শ তীর নিক্ষেপ করলে কোনোটিই ব্যর্থ হতো না।

এখন বলুন আমাদের পূর্বপুরুষদের অবস্থার সাথে আমাদের হাল-হাকিকতের কোনো মিল আছে কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *