১৫. সবিনয় নিবেদন

 পরম শ্রদ্ধেয় শ্ৰীশ্ৰীজীব ন্যায়তীৰ্থ মহাশয় বৃদ্ধ বয়সেও (নব্বই ঊর্ধ্বে) অশেষ ধৈর্য সহকারে এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপিটি পাঠ করে যে মূল্যবান মন্তব্য করেছেন তা পাঠকগণের অনুধাবনের জন্য এই গ্রন্থের সঙ্গে সংযোজিত করা হল। এই সুযোগ ঘটায় গবেষণা বস্তুর গুরুত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে, এজন্য আমি গর্বিত। তার মন্তব্যগুলির পরিপ্রেক্ষিতে আমার রামায়ণ সম্পৰ্কীয় রহস্যভেদ তথা বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গি স্বচ্ছতর করার অভিলাষে এই ‘সবিনয় নিবেদন’।

আমার এই গ্রন্থ রচনার মূলে প্রেরণা স্বতঃস্ফুর্ত। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, ওয়েবার প্রমুখ বিশিষ্ট মনীষীগণ রামায়ণ মহাকাব্যে কৃষি বিষয়ক ইংগিত লক্ষ্য করেছেন, কিন্তু রাম-কথা অনুসরণে ধারাবাহিক আলোচনা করেননি। বিষয়টি আমাকে কৌতুহলী করেছিল। পুরানের অনেক কাহিনী যে জ্যোতির্মণ্ডল এবং নৈসর্গিক ঘটনার রূপক এই বিষয়ে পথিকৃত আচার্য যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির রচনাবলী আমাকে শুধু অনুপ্রেরণা দেয় নাই, অনেক বিষয়ে তাকে অনুসরণও করেছি। শ্রীমতী বেলাবাসিনী গুহ ও শ্ৰীমতী অহনা গুহ রচিত ঋগ্বেদ ও নক্ষত্র বইটিও আমার গবেষণার ক্ষেত্রে মূল্যবান সহায়ক ছিল।

 

‘প্রাক কথা’ অধ্যায়ে সিন্ধু সভ্যতার উল্লেখ করার উদ্দেশ্য উক্ত সভ্যতার প্রাপ্ত নিদর্শন এবং ভৌগলিক অবস্থান হতে বলা যায় এই সভ্যতা বাণিজ্য ও কৃষিভিত্তিক ছিল। খৃঃ পূঃ প্রায় পাঁচহাজার বছর আগেকার এই সভ্যতায় কৃষিকাজের যে সম্প্রসারণ ঘটেছিল তার প্রভাব ভারতবর্যের অন্যত্র বিস্তার লাভ করা স্বাভাবিক। ভারতবর্ষে কৃষিকাজের ব্যাপকতা কতকাল আগে ছিল তার একটি ইংগিত রাখার জন্যই এই প্রসঙ্গর উত্থাপন করা হয়েছে। সিন্ধু সভ্যতা আর্যকৃষ্টি অথবা অন্-আর্যকৃষ্টি এই তর্ক এড়িয়েও বলা যায় আর্যরা যদি বহিরাগত (অনেক পণ্ডিত এই অনুমান করেন ) হয়ে থাকে তাহলে সিন্ধু সভ্যতার এলাকায় তৎপূর্বে অন্‌-আর্য গোষ্ঠীর বসতি নিশ্চয় ছিল। আর্যগণের এই অঞ্চলে আগমনের পূর্বে স্থানটি জনহীন ছিল এমন কোন তথ্য নাই বা এমন চিন্তা করার কোন কারণ নাই। সুতরাং উক্ত বাণিজ্য ও কৃষিভিত্তিক সভ্যতার উন্মেষ ঘটার আগে বা পরে অথবা সমকালে আর্য ও অন্‌-আর্য গোষ্ঠীর ধর্ম, আচার অনুষ্ঠান এবং রক্তের সংমিশ্রণ ঘটে সহাবস্থান পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল এই চিন্তা খুব কষ্টকল্পনা হয় না। সিন্ধুসভ্যতার নিদর্শনে আর্য ভাবধারার পরিচয় যেমন আছে, তেমনি লিঙ্গ প্রতীকি নিদর্শনগুলি অন্-আর্য কৃষ্টির প্রতি ইংগিত রাখে।

রাক্ষস বিরাধকে কবর দেওয়া হলেও রাক্ষসরাজ রাবণের মরদেহ আনুষ্ঠানিক ভাবে দাহ করা হয়েছিল (৬.১১৩.১২০)। রামায়ণে উভয় প্রথার নির্দেশ পাওয়া যায়।

রামায়ণের বিভিন্ন উপাখ্যান বিশ্লেষণ করে রাম-কথার সূত্র যখন কৃষিভিত্তিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি, তখন ইতিহাস স্বীকৃত প্রাচীনতম কালে ভারতবর্ষের যে স্থানে বা সভ্যতায় কৃষিকাজের প্রভূত উন্নতি হয়েছিল সেই সভ্যতার সামান্যতম উল্লেখ করে কৃষিভিত্তিক সভ্যতার প্রথম বিকাশ ক্ষেত্রটির প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে প্রয়াসী হয়েছি মাত্র।

 

ভাষা-বিশারদগণের অভিমত বালকাণ্ডের কোন কোন অংশ এবং প্রায় সমগ্র উত্তরকাণ্ডের রচনা পদ্ধতি অযোধ্যা হতে লঙ্কা এই পাঁচটি কাণ্ড হতে স্বতন্ত্র। একারণে ঐ অংশগুলি প্রক্ষীপ্ত বা পরবর্তী সংযোজন হিসাবে চিন্তা করা হয়।

বালকাণ্ডের অনেক উপাখ্যান ও ঘটনা যথা গঙ্গোৎপত্তি ও কার্তিকেয় জন্ম, বসিষ্ঠ-বিশ্বামিত্র দ্বন্ধ, অহল্যা উদ্ধার, ইন্দ্র কর্তৃক দিতির গর্ভ-ছেদন ইত্যাদি—এগুলি বাদ দিলেও রামায়ণে রাম-কথার মূল কাহিনী বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন হত না। অথচ এই সকল উপাখ্যানের পরিপ্রেক্ষিতে রাম চরিত্রটি দৈবত্ব লাভ করেছে।

উপরোক্ত কারণগুলি বিবেচনা করেই মূল পাণ্ডুলিপিতে বালকাণ্ড এবং উত্তরকাণ্ড সম্পর্কে ঐরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। অবশ্য এই মন্তব্যে তর্কের অবকাশ থাকতে পারে, কিন্তু আমার মূল বক্তব্য তথা বিশ্লেষণ কোন ভাবে ব্যহত হয় না।

বৈদিক শাস্ত্রে সীতা নামের যে প্রাচীনত্ব আছে, সেই তুলনায় রাম নামটি অনেক অর্বাচীন কালের। অনুমিত হয় আবেস্তার ‘রামাহুর বৈদিক শাস্ত্রে তথা বেদপন্থীদের নিকট ‘রামাসুর’ নামে গৃহীত হয়েছিল। এই ‘রামাহুর’ অথবা ‘রামাসুর’ শব্দের সূত্র ধরে রাম শব্দের উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা চিন্তা করা হয়েছে। পণ্ডিতগণের মতে আবেস্তা ও বেদপন্থীগণ পূর্বে এক ছিল। পরবর্তীকালে দুইটি ধারায় বিভক্ত হয়েছে। যে ভূখণ্ডে আবেস্তাপন্থীদের প্রাধান্য ছিল তার সংলগ্ন ক্ষেত্রে সিন্ধু সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। সুতরাং আপাতঃদৃষ্টিতে কোন প্রমাণ না থাকলেও সিন্ধু সভ্যতার মানবগোষ্ঠীর উপর আবেস্তাপন্থীদের বিশেষ প্রভাব বর্তমান থাকা কষ্ট-কল্পনা বলে মনে হয় না। সিন্ধু সভ্যতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল বাণিজ্য। সেই সভ্যতার কালে গঙ্গাযমুনা বিধৌত অঞ্চল শুধু অনগ্রসরই ছিল না, ভূতত্বের দিক হতে ঐ এলাকা সম্ভবতঃ মনুষ্যবাসের প্রায় অনুপযোগী

The greater part of the Indo-Gangelic plains is built up of very late alluvial flood deposits of the rivers of the Indus-Ganges systems, borne down from the Himalayas and deposited at their foot. But most of this terrain became firm and dry enough to be habitable for man only some 5,000–7,000 years ago. (The Vedic Age, The Bharatiya Itihasa Samiti’s History and Culture of the Indian People, Volume I, 1952, Page 82).

সুতরাং স্থলপথে ও জলপথে বাণিজ্য উত্তর, পশ্চিম ও পশ্চিমোত্তর দেশের সঙ্গে নিবিড় হওয়াই স্বাভাবিক। এই সূত্র ধরে সিন্ধু সভ্যতায় আবেস্তাপন্থীদের প্রভাব মেনে নেওয়া খুব দোষাবহ হয় না। এই কারণে আবেস্তার ‘রামাহর’ এবং আরবি ভাষার ‘রামা’ শব্দটির সঙ্গে রাম শব্দের সামঞ্জস্য এনে রাম বাচক বর্ষণ-দেবতার প্রাচীন অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়াস নিয়েছি। ‘ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা অতি প্রাচীন’—মূল পাণ্ডুলিপিতে এই ধরণের বক্তব্য আমি রাখিনি।

একথা মানতে হবে ‘রাম’ শব্দটি পরবর্তীকালে বেদের (১০ম মণ্ডল) অন্তভূক্ত হয়েছে। আবেস্তাও সাম্প্রতিক কালের নয়। মূল পাণ্ডুলিপি রচনার কালে বাল গঙ্গাধর তিলক প্রমুখ গুণীজনের বেদের কাল নির্ধারণ সম্পৰ্কীয় বক্তব্যগুলি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে স্মরণ রেখে বিভিন্ন উপাখ্যান বিশ্লেষণ করে মোটামুটি একটি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেটি হল রামায়ণের কালে অশ্বিনী নক্ষত্রে ছয় অংশ চল্লিশ কলায় বাসন্ত-বিষুব হত। এই তথ্য সামনে রেখে ‘রাম’ শব্দটির উদ্ভব-সূত্র অনুসন্ধান করার কালে ‘রাম নামের উৎস’ প্রকরণে ‘রাম’ নামটি সম্পর্কে শ্রদ্ধেয় ডঃ সুকুমার সেনের বক্তব্য আমি গ্রহণ করেছি। ‘রাম’ শব্দটির যত অর্থ বা ব্যাখ্যা আছে তারও উল্লেখ করেছি। উদ্দেশ্য ‘রাম’ শব্দটি সম্পর্কে সকল প্রকার ভাবনা চিন্তাকে একটি পরিসরে সংকলিত করা। এই প্রকরণে ‘রাম’ শব্দের অর্থ মেঘ গ্রহণ করার যথাযথ যুক্তি গ্রন্থে রাখা হয়েছে।

 

নারদ বাল্মীকিকে যে রাম-কথা শুনিয়েছিলেন (বালকাণ্ড, ১ম সর্গ), সেই রাম-কথা রামের রাজ্যলাভেই ইতি হয়েছে। এরপর এগারে হাজার বৎসর রাজত্ব করার পর রাম ব্রহ্মলোকে গমন করবেন এবং রাজত্বকালে রাম শত সংখ্যক অশ্বমেধ যজ্ঞ, বর্ণাশ্রম প্রতিষ্ঠা ও ব্রাহ্মণদিগকে প্রচুর সংখ্যক গে৷ ও পর্যাপ্ত ধনাদি দান করবেন—নারদ এই ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন মাত্র। কিন্তু নারদের ভবিষ্যৎবাণীতে সীতার বনবাস, শত্রুঘ্নর যৌবরাজ্যে অভিষেক, লবকুশের জন্ম, রামের অশ্বমেধ যজ্ঞে পিতাপুরে মিলন, সীতার পাতাল প্রবেশ, কুশকে কোশলের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করা, রামের পরিশেষে লক্ষ্মণকে বর্জন এবং ভরত ও শত্রুঘ্ন সহ সরযূ নদীতে আত্মবিসর্জন—এই সব উল্লেখ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাবলীর কোন উল্লেখ নাই।

‘আদি শ্লোক’ প্রকরণে নারদ ও বাল্মীকি শব্দ দুইটির ব্যুৎপত্তিগত ও সাদৃশগত অর্থভেদ করে বলা হয়েছে বাল্মীকি (পাললিক ভূ-খণ্ড, যেখানে হলকর্ষণ করলে সীতার উদ্ভব হয়) নারদ (অন্তরীক্ষ, যেখান হতে বৃষ্টিপাত হয়)এর নিকট জানতে চেয়েছিল বর্তমান লোকে শ্রেষ্ঠ কে যিনি সর্বগুণে বিভূষিতা তখন নারদ (অন্তরীক্ষ) বর্ষণ-দেবতার গুণকীর্তন করে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। নর অর্থ নায়ক (ঋগ্বেদ ১.৫৩.২)। নায়ক অর্থে অগ্রণী, শ্রেষ্ঠ, প্রধান। সুতরাং এই শ্লোকে ‘নর’ শব্দটি ব্যবহার করে কোন ব্যক্তি বিশেষকে ইংগিত করা হয়েছে মনে হয় না। এই ক্ষেত্রে তিনটি জড় বস্তুতে মানবিক সত্তা আরোপ করে রহস্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

এখানে বর্ষণদেবতা অর্থে শুধু বৰ্ষাঋতু তথা বৃষ্টিপাতের চিন্তা করলে ভূল হয়। কারণ সকল ঋতুর কার্যকারক সূর্য। বর্ষচক্রের বিভিন্ন মাসে সূর্যর কার্যকারকতা ভিন্ন ভিন্ন, এজন্য শাস্ত্রে এক আদিত্যকে দ্বাদশ মাসে দ্বাদশ আদিত্যে ভাগ করা হয়েছে। ঋতুচক্রের এই আবর্তন না থাকলে এক আদিত্য যেমন দ্বাদশাদিত্যে প্রকাশিত হত না, তেমনি প্রাণ-জগতেরও বিকাশ ঘটত না। কারণ শুধু বর্ষা, শুধু শীত অথবা শুধু গ্রীষ্ম পরিবেশ নিশ্চয়ই প্রাণ বিকাশের উপযোগী নয়। সুতরাং বর্ষণদেবতাকে শাশ্বত প্রতিষ্ঠা লাভের বন্দনা করার অর্থ বৰ্ষাঋতুর চিরস্থায়ীত্ব কামনা করা নয়। বরং বর্ষাঋতুর কল্যাণে যেহেতু প্রাণ বিকাশের সূচনা, সে কারণে বর্ষামাসের আদিত্যর বন্দনার মধ্য দিয়ে দ্বাদশাদিত্যরই বন্দনা করা হচ্ছে। অতএব মূলকথা দ্বাদশাদিত্যর শাশ্বত প্রতিষ্ঠা লাভের বন্দন। দ্বিতীয়তঃ গ্রীষ্মঋতুর শেষ পর্যায়ে তৃষিত জীব-জগতের বর্ষণ কামনা কখনই যুগ যুগ পরিমাণ কালের জন্য বৰ্ষাঋতুর প্রতিষ্ঠা প্রার্থনা করা নয়। রামকে মেঘদেবতা হিসাবে উল্লেখ করলেও রাম মূলতঃ সূর্যর একটি স্বরূপ। যেমন পর্জন্য বর্ষণ-দেবতা, ইন্দ্রকেও বর্ধণ-দেবতা বলা হয়, বরুণ বর্ষণ-দেবতা। কিন্তু মূলে এর সকলেই আদিত্য, একই সূর্যর ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ মাত্র। অতএব, যেখানেই ‘ইন্দ্র’ শব্দটি পাওয়া যাবে সেখানেই ইন্দ্রকে শুধু মাত্র বর্ষণ-দেবতা বৃপে চিন্তা করলে অবশ্যই বিভ্রান্তি ঘটবে।

যাইহোক, কর্ষণযোগ্য ভূ-খণ্ড অর্থাৎ বাল্মীকি হয়ত মনে মনে গর্ব পোষণ করছিল সে জীবজগতকে (বিশেষ করে মানব সমাজকে) ধারণ করে আছে। কিন্তু অন্তরীক্ষ অর্থাৎ নারদের ‘রাম-কথা’য় ভুলের নিরসন হওয়ায় বাল্মীকি সত্য উপলব্ধি করে চিন্তান্বিত হতে পারে। কেননা মেঘদেবতার করুণাবর্ষণ ছাড়া আবাদি জমি বন্ধ্যা, সৃষ্টি তমসাচ্ছন্ন।

এছাড়াও নারদ, ব্রহ্মা এবং বাল্মীকির সাঙ্গিতীক-স্বরূপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে প্রমাণ দেওয়া হয়েছে নারদীয় লোকসঙ্গীতের সূত্র অনুসরণে বাল্মীকি সেই লোকসঙ্গীতের কথা ও সুর পরিমার্জিত করে বৈদিক সঙ্গীতধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করেছিলেন। নারদের ‘রাম-কথা’কে আমি নারদীয় লোকসঙ্গীত অর্থাৎ কৃষিজীবি মানুষের মেঘবন্দন গীতি মনে করি।

সুদুর অতীতে, বেদের কাল হতে দেখা যায় মানুষ সুফলপ্রদায়ী নৈসর্গিক ঘটনা, বৃক্ষাদি প্রভৃতিতে দেবত্ব আরোপ করেছে। দুঃখপ্রদায়ী ঘটনা বা বস্তুতে অদৈবিক সত্তা আরোপ করতেও ভুল করেনি। সুতরাং আমরা কি আশা করতে পারি না মানুষ যখন কৃষি নির্ভরশীল হয়ে সমাজ বন্ধন দৃঢ় করে জনপদের পত্তন করল; তখন ভূমি ও মেঘকে দেবত্বে প্রতিষ্ঠা করে ঘরে ফসল তোলার পর স্বতঃস্ফুর্ত আবেগে লোকসঙ্গীতের বিকাশ ঘটাবে না? যেমন আজও শোনা যায়, খরাক্লিষ্ট মানুষের শোকবিধুর লোকসঙ্গীত— ‘আল্লা ম্যাঘ দে, পানি দে’। এই আকুতি মেঘ বা বর্ষণের শাশ্বত প্রতিষ্ঠার জন্য নয়; বরং প্রাণিজগতের চিরস্থায়ীত্বের কারণে। কাজের ধরণ এবং পরিবেশ মনের মধ্যে যে ভাবাবেগের সৃষ্টি করে সেই ভাব, সেই কাজ ও সেই পরিবেশের সঙ্গে সমতা রেখে উদ্‌গীত হয় লোকসঙ্গীত। পরবর্তীকালে সেই সহজাত লোকসঙ্গীতের সুর ও কথার পরি জন করে উদ্ভাবন করা হয়েছে সঙ্গীতশাস্ত্র ও বিজ্ঞানসম্মত রাগ রাগিণীর। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়; বর্তমান কালের টোড়ী (টোডী) রাগের আদিম রূপের আমরা পরিচয় পাই উত্তর-পশ্চিম ভারতের পার্বত্য অঞ্চলের মেষ পালকদের কণ্ঠে। ‘আদি শ্লোক’ প্রকরণে আমি প্রচলিত কাহিনী বলতে নারদীয় কৃষিভিত্তিক লোকসঙ্গীতের ইংগিত করেছি। এই প্রকরণে আমি নারদ-বাল্মীকি কথোপকথনের পরবর্তী ঘটনার জ্যোতিবিজ্ঞান-ভিত্তিক বিশ্লেষণ করে ঋতুকালের বর্ণনা দিতে প্রয়াসী হয়েছি। আমি একাধিকবার বলেছি বাল্মীকি রচিত রামায়ণের দুইটি স্বরূপ আছে। বাহ্য-স্বরূপ মেঘ-দেবতার (অর্থাৎ ঋতু চকুর কার্যকারক সূর্য) বন্দন! অন্তঃস্বরূপ বাল্মীকির সমসাময়িক জনৈক ঐতিহাসিক ব্যক্তির পিতৃরাজ্য হতে বঞ্চিত হওয়া এবং পুনরায় সেই পিতৃরাজ্য উদ্ধার করার কাহিনী। কেন রামায়ণের এই দুই স্বরূপ তা সুস্পষ্টভাবে আলোচনা করেছি। সুতরাং বাল্মীকি রামায়ণের রাম একাধারে মেঘদেবতা, অন্যদিকে ব্যক্তিবিশেষ। বাল্মীকি ঐতিহাসিক রামচন্দ্রর শুধু সমসাময়িক নয়, অত্যন্ত ঘনিষ্ট এই প্রমাণ রামায়ণে পাওয়া যায়।

কিন্তু বর্তমানে বক্তব্য এই যে বাল্মীকি রামচন্দ্রর যেহেতু সমসাময়িক, সেকারণে তাঁর জীবনের বহু ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত। তাছাড়া সীতার শেষ জীবন কেটেছিল বাল্মীকির আশ্রমে। সুতরাং ধ্যান করার প্রয়োজন নাই, সীতার মুখে বাল্মীকি অবশ্যই রামচন্দ্রের বনবাস জীবনের সকল ঘটনা জেনেছেন একথা চিন্তা করা যায়। গর্ভবতী অবস্থায় সীতার নির্বাসন ও বাল্মীকির আশ্রমে আশ্রয়লাভ হয়েছিল। সেখানে লবকুশের জন্ম ও কিশোরকাল অতিবাহিত হয়। যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত শত্রুঘ্ন লবণবধের উদ্দেশ্যে মধুপুরী যাওয়ার কালে শ্রাবণ মাসে লবকুশের জন্ম। মথুরায় (মধুপুর) শাসন প্রতিষ্ঠিত করে দশবংসর পরে শত্ৰুঘ্ন যখন রামচন্দ্রকে দর্শনের উদ্দেশ্যে অযোধ্যা যান তখন একরাত্রি বাল্মীকির আশ্রমে বাস করার কালে রামায়ণ গান শুনেছিলেন।

সুতরাং বাল্মীকি নিজেই ঐতিহাসিক রামচন্দ্রর সকল ঘটনার সঙ্গে সম্যকভাবে পরিচিত ছিলেন। এরপর আর কি প্রয়োজন দেখা দেবে নারদের নিকট হতে রাম-কথা শুনে যাচাই করে নেওয়ার?

তবু যদি তাই ঘটে থাকে, তাহলে কখন নারদের সঙ্গে বাল্মীকির কথোপকথন হয়েছিল? রামচন্দ্র যখন রাজত্ব করছিলেন, সেই সময়ের তৎকালীন ঘটনা ত বাল্মীকির জানা ছিল। রামচন্দ্রর রাজত্বকালে তিনিই ত একমাত্র রাজচক্রবর্তী ছিলেন, তবে যাচাই করে নেওয়ার পর বাল্মীকি চিন্তিত হলেন কেন?

বাল্মীকি চিন্তিত হলেন; সেই চিন্তার অপনোদন কারণেরও কোন উল্লেখ পাই না রামায়ণে।

সুতরাং ঐতিহাসিক রামচন্দ্রর জীবনের ঘটনা নিয়ে একটি রূপক কাব্য সৃষ্টির উদ্দেশ্য যখন বাল্মীকি স্থির করলেন, তখন সেই রূপক কাব্যর বহিস্বরূপ হিসাবে নারদীয় কৃষিভিত্তিক লোকসঙ্গীতটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু এই লোকসঙ্গীতের কথা ও সুর কিভাবে পরিমার্জন করে ঐতিহাসিক তথ্যগুলির সন্নিবেশ ঘটানো হবে সেই কারণে বাল্মীকির চিন্তা হয়ত হয়েছিল।

আমি জ্যোতিষ তথ্যর দ্বারা প্রমাণ দিয়েছি বাল্মীকি আদেী তমসা নামক কোন নদীতে স্নান করতে যাননি। রহস্য সৃষ্টির কারণে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে যেন আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হয় বাল্মীকি শিষ্য ভরদ্বাজকে নিয়ে স্নানে গিয়েছিলেন। এই স্নানের পরিবেশ অক্ষুন্ন রাখার জন্য কলশ, বল্কল, কর্দমহীন তীর্থ প্রভূতি শব্দ শ্লোকে ব্যবহার করা হয়েছে।

বাদ্যযন্ত্রর ক্ষেত্রে মৃদঙ্গ, পাখোয়াজ, খোল, ডুগি এগুলি সবই কলশের রূপান্তর মাত্র। দক্ষিণাত্যর ঘটবাদ্যম্ মূলতঃ কলশ। কলশ(স)—কল (মধুরাস্ফুটধবনি) + √শু গতি + অ(ড)-ক। সুতরাং কলশ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ শ্রুতিমধুর শব্দের সামঞ্জস্য বিধান করছে।

বল্কল শব্দের অর্থ তারযন্ত্র হয় না একথা স্বীকার করি। এজন্যই বল্লকী (বীণা) এবং বল্কল উভয় শব্দ বল্‌(আবরণ করা) ধাতু নিষ্পন্ন বিধায় বল্কল শব্দটি তারযন্ত্রের রূপক হিসাবে প্রয়োগ করে আদিকবি রহস্য সৃষ্টি করেছেন একথা আমি বলতে চেয়েছি। কোন প্রাচীন গ্রন্থের মূল বক্তব্যে পৌঁছাতে হলে বহু অপ্রচলিত শব্দের সম্মুখীন হওয়া স্বাভাবিক। যেমন অহংস্পতি, মলিয়চে শব্দের বর্তমান অর্থ মলমাস। কিন্তু বৈদিককালে এই শব্দগুলি ঠিক কি কি অর্থে ব্যবহৃত হত আজও তা সঠিক নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। –

গ্রন্থে কোথাও বাল্মীকিকে আমি কৃষক হিসাবে প্রতিপন্ন করতে প্রয়াসী হইনি। সুতরাং বাল্মীকির কৃষকত্ব, তার আশ্রমে কৃষিক্ষেত্র অথবা একটি লাঙ্গল থাকার প্রশ্ন অনিবার্য কারণেই গ্রহণযোগ্য নয়। জাহ্নবীর অদূরে তমসা প্রসঙ্গের আমি যে ব্যাখ্যা দিয়েছি সেক্ষেত্রে কোন স্থানকাল বিরুদ্ধত ঘটেছে বলে মনে করি না।

 

আদি শ্লোকের বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে ‘মা’ অর্থ লক্ষ্মী এবং ‘নিষাদ’ অর্থ পতি ধরা হয়েছে। রামায়ণের সুপণ্ডিত টিকাকারগণ যখন ‘মা নিষাদ’ শব্দের অর্থ লক্ষ্মীপতি করেছেন এবং ‘মা’ অর্থ যখন লক্ষ্মী, তখন ‘নিষাদ’ অর্থ পতি হওয়ায় স্বাভাবিক; নতুবা লক্ষ্মীপতি শব্দ পাওয়া যেতে পারে না। এই ভিত্তিতে নিষাদ অর্থে পতি গ্রহণ করেছি। শব্দটির অর্থগত ভুল হলেও ‘মা নিষাদ’ শব্দের অর্থ লক্ষ্মীপতি পণ্ডিত মহলেই গ্রাহ্য হয়েছে। অতএব আদি শ্লোকে অর্থভেদ যা করেছি তা অক্ষুন্ন থাকছে।

 

সুবলচন্দ্র মিত্র সংকলিত ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’এ আছে রাক্ষস অর্থ ‘যা হইতে (ধনাদি) রক্ষিত হয়’। এই ছত্রটির দুইটি অর্থ করা যায়। ১। যার দ্বারা ধনাদি রক্ষিত হয়। এই অর্থে কুবেরের ধনরক্ষক রাক্ষস এবং মুদ্রারাক্ষসের প্রধানমন্ত্রী রাক্ষসের নামকরণ সার্থক হয়। ২। যার কবল হতে ধনাদি রক্ষা করতে হয়। আমি প্রথম অর্থে ‘রাক্ষস’ শব্দের ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছিলাম। ন্যায়তীৰ্থ মহাশয়ের অভিমত অনুসারে ‘রাক্ষস’ শব্দটি প্রত্যাহার করে নিয়ে ক্ৰৌঞ্চ শব্দের অন্য অর্থ ‘অসুর’ শব্দটি গ্রহণ করা যায় (A Sanskrit-English Dictionary by M. M. Williams) ।

অসুর অর্থ সূৰ্য্যঃ। ইতি মেদিনী॥ ঋগ্বেদে ‘অসুর’ শব্দের অর্থ ‘শত্ৰুগণের নিরসিতা’; ‘প্রাণবান’; ‘বলবান’ (১.৫৪.৩) (শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়)।

অতএব ক্ৰৌঞ্চ-মিথুন শব্দের ব্যাখ্যা করে দ্যাবাপৃথ্বীর যে স্বরূপতা প্রকাশ করা হয়েছে তা অক্ষুন্ন থাকছে। দ্যাবাপৃথ্বী প্রাণবান বলেই তার প্রাণ সৃষ্টি করছে।

দাবাপৃথ্বীকে যদি মিথুন রূপে গণ্য করা হয় তাহলে মহাকাশে অবস্থিত সূর্য এবং পৃথিবীকে মিথুনরূপে গ্রহণ করতে বাধা কোথায়?

সূর্য এবং পৃথিবীর মধ্যে বহু ব্যবধান সত্ত্বেও একটি নিদিষ্ট নিয়মে পৃথিবী সূর্যর চারিদিকে ঘুরছে। এই ঘূর্ণনে উভয়ের অবস্থান অনুসারে ঋতুর আবর্তনে পৃথিবী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। সূর্য এবং কর্ষিত। জমিকে মিথুন বলতে দোষ নেই এই কারণে যে সূর্যরশ্মি দ্বারা উভয়ে মিথুনাবদ্ধ। অতএব, সূর্য ও পৃথিবীর এই বন্ধনকি মিথুনের প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করা অসংগত হয়?

দ্যৌঃ ও পৃথ্বী অথবা সূর্য ও পৃথিবীকে কাব্যে মানবিক সত্তায় প্রকাশ করা হলে ঋতুচক্লের মধ্যে গ্রীষ্মঋতুর উত্তাপকেই কেবলমাত্র দেহীর কামাতুর অবস্থার দৈহিক উত্তাপের সঙ্গে তুলনা করা যায়, অন্য কোন ঋতুর সঙ্গে নয়। এজন্য কাব্যর ‘কামমোহিত’ শব্দে গ্রীষ্মঋতুর ইংগিত গ্রহণ করা হয়েছে।

 

ক্রৌঞ্চের মৃত্যুতে ক্রৌঞ্চীর করুণ বিলাপে বাল্মীকির হৃদয়ে করুণার আবির্ভাব হয়েছিল। এখানে শোক হতে করুণ রসের বিকাশ ঘটেছে। সুতরাং বাল্মীকির শোকের অর্থাৎ চিত্তপীড়ার কারণ প্রচণ্ড গ্রীষ্মে দাবদাহ। যদি সত্যই বাল্মীকি কোন ব্যাধ কর্তৃক সুরতাসক্ত পক্ষী-মিথুনের পুরুষটির নিধনে উদ্বেলিত হয়ে অভিশাপ বাণী উচ্চারণ করতেন, সেক্ষেত্রে অবশ্যই ক্ৰোধের অভিব্যক্তি থাকত। কিন্তু রামায়ণে ক্ৰৌঞ্চ-বধ ঘটনার বিবরণে সেই ভাবের কোন প্রকাশ নাই। এই ঘটনায় বাধের সাক্ষাৎ আবির্ভাবও ঘটেনি।

অতএব, গ্রন্থে ব্যাধ অর্থে লুব্ধক নক্ষত্রকে (মৃগব্যাধ নামে পরিচিত) ইংগিত করা অসংগত হয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ ক্ৰৌঞ্চ-বধ ঘটনায় ব্যাধের সাক্ষাৎ আবির্ভাব কখনই ঘটেনি। সূর্যর মিথুন রাশিতে অবস্থান কালে রাত্রির আকাশে লুব্ধক নক্ষত্র দৃশ্য হয় না। ক্ৰৌঞ্চ-বধের পর শ্লোকের আবির্ভাব। উদ্‌গীত শ্লোকে বাল্মীকির বিস্ময়।

বাল্মীকির বিস্ময়ের কারণ কি?

ন্যায়তীৰ্থ মহাশয়ের অভিমত, “বস্তুত বেদ যে অপৌরুষেয়—ইহা নির্ণয়ের পক্ষে আদিকবি বাল্মীকির এই বিস্ময় অন্যতম কারণরূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে।”

শোকবিহ্বল বাল্মীকির কণ্ঠ হতে শ্লোক উদ্‌গীত হওয়ার পরক্ষণেই ছন্দোবদ্ধ তন্ত্রীলয়সমন্বিত অভিশাপ বাণীর মধ্যে বাল্মীকি ‘বেদ অপৌরুষেয়’ এই নির্ণয় করে বিস্মিত হলেন ভেবে নিতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। কেন না অভিশাপকালে কি কেউ অভিশাপ বাণীটি ছন্দোবদ্ধ ও তন্ত্রীলয়সমন্বিত করে তোলার জন্য সচেতন থাকেন? এও যদি সম্ভব হয় তাহলে বাণীটি উদ্‌গীত হওয়ার পরক্ষণেই তাৎক্ষণিক পরিবেশ ও ঘটনা ভুলে বাণীটির ছন্দ ও সুর নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতে পারেন?

আমি বলেছি কৃষিভিত্তিক লোকসঙ্গীতের পরিমার্জিত কথা ও সুর নিয়ে চিন্তাভাবনা করার কালে বাল্মীকি শিষ্য কর্তৃক বাদিত মৃদঙ্গ জাতীয় বাদ্যযন্ত্রর সহযোগিতা বাতিল করে স্বহস্তে তার-যন্ত্র গ্রহণ করে সেই বাদ্য সহযোগে ছন্দোবদ্ধ ও তন্ত্রীলয়সমন্বিত নতুন রীতির মেঘবন্দন উদ্ভাবন করেছিলেন। বাল্মীকি চিন্তিত বা বিস্মিত হননি,; আত্মহারা হয়ে এই মেঘবন্দনাটিকে শ্লোক বলে অভিহিত করেন। শ্লোক অর্থ স্তুতিলক্ষ্মণা বাক্‌ (ঋগ্বেদ ১.১১৮.৩ সায়ণ)।

শোকঃ শ্লোকত্বমাগতঃ (রামায়ণ, ১.২.৪০)।

শোক বা চিত্তপীড়া ভাব হতে করুণ রসের বিকাশ ঘটে। করুণ রসের আশ্রিত স্বর নি (নিষাদ) এবং পা (পঞ্চম)।

বাল্মীকির ক্ৰৌঞ্চ-মিথুন দর্শন শৃঙ্গার রসের ইংগিত দেয়। পরে দ্যাবাপৃথ্বীর গ্রীষ্মকালীন এই পরিবেশে চিত্তবিকার হেতু শোক তথা করুণ রসের বিকাশ ঘটে। ছন্দোবদ্ধ ও তন্ত্রীলয়সমন্বিত শ্লোকটি রচিত হয়েছিল শৃঙ্গার ও করুণরসের প্রাধান্য দিয়ে, যে কারণে মা (মধ্যম-শৃঙ্গার ভাব) বাদী এবং সা (যড়জ-করুণভাব) সম্বাদী ধরা হয়েছে। প্রচণ্ড দাবদাহে বিশ্বচরাচর যখন ধ্বংসের মুখে, সেই দৃশ্যে শোকাভিভূত অবস্থায় মেঘদর্শনে শ্লোকের আবির্ভাব। সুতরাং গ্রন্থে পূর্বাপর সামঞ্জস্য ব্যহত হয়েছে বলে মনে করি না।

ন্যায়তীর্থ মহাশয়ের অভিমত—“বরং লক্ষ্মী (সীতা) পতি রাম যে ক্ৰৌঞ্চ-মিথুন রাক্ষসদম্পতি রাবণ ও মন্দোদরীর একটি (পুরুষ) রাবণকে বধ করিয়া চিরন্তন গৌরব লাভ কর—এই অর্থটিই ব্যঞ্জিত হইয়াছে। অবশ্য ইহ পরবর্তীকালে টীকাকারদের উদ্ভাবিত অর্থান্তর, বৃপকবাদে কল্পিত অর্থ অপেক্ষা এই ব্যঞ্জনালভ্য অর্থ সঙ্গতিপূর্ণ মনে হয় না কি?”

এই বক্তব্য মানতে হলে বলতে হয় রাবণকে বধ করার কারণেই আদিকবি রামকে চিরন্তন গৌরবে ভূষিত করছেন। তাহলে ক্ৰৌঞ্চর (রাবণ) মৃত্যুতে ও ক্ৰৌঞ্চীর (মন্দোদরী) করুণ বিলাপে আদিকবির হৃদয়ে করুণ সঞ্চারিত হয়েছিল একথা মানা যায় না। রামায়ণে রাবণের মৃত্যুতে এবং মন্দোদরীর বিলাপের কালে আদিকবি তার এই হৃদয় উদ্বেলতা প্রকাশ করেননি। আদিকবি প্রথম শ্লোকে রামকে গৌরবান্বিত করলেও তার হৃদয় মন্দোদরীর শোকে দোলায়িত হওয়ায় কষ্ঠ হতে শ্লোক নিঃসৃত হয়েছিল একথা মেনে নিলে আদিকবির বিশেষ কৃপাদৃষ্টি তার রচিত মহাকাব্যে মন্দোদরীর প্রতি বষিত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেই নজির রামায়ণে নেই, বরং আদিকবির সকল পক্ষপাতিত্ব রাম ও সীতার প্রতি।

 

শাস্ত্র অনুসারে চতুৰ্বর্ণের পুরুষের উপনয়ন বিধি আছে। উপনয়নের একটি মুখ্য অনুষ্ঠান কর্ণবেধ৷ একদা নারীদেরও উপনয়ন হত। পুরুষের ক্ষেত্রে যখন জন্মক্রিয়ার একটি অনুষ্ঠান হিসাবে কর্ণবেধ প্রথা ছিল, তখন নারীর ক্ষেত্রেও অনুরূপ কোন অনুষ্ঠান থাকা অস্বাভাবিক নয়।

শুনেছি রাজস্থান উত্তরপ্রদেশের কোন কোন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে, যাদের মধ্যে বাল্যবিবাহ প্রচলিত আছে, এখনও বিয়ের সময়ে মেয়েদের নাক কান ফোঁড়ার রীতি আছে। পশ্চিমবঙ্গের কান্দি অঞ্চলে কোন কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনও এই রীতি অনুসরণ করা হয়।

তত্ৰাচ ন্যায়তীর্থ মহাশয়ের পরামর্শমত যদি এই মন্তব্যটি “নাসাকর্ণচ্ছেদন হিন্দু সমাজে প্রাচীনকাল হতে বিবাহ অনুষ্ঠানের একটি রীতি। সেই রীতি শুপণখার ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হল কেন?” বাদ দেওয়া হয় তাহলে মূল বক্তব্য কোনক্রমেই ব্যাহত হচ্ছে না। কিন্তু সর্বগুণে বিভূষিত রাম বিকৃতরূপ শূর্পণখার সঙ্গে পরিহাস করে মিথ্যা বলেছিলেন একথাও মানা যায় না। কারণ সমগ্র রামায়ণে রামের পরিহাস-প্রিয়তার কোন ইংগিত নাই। অযোধ্যায় রাজা হয়ে রামচন্দ্র যখন সীতার সঙ্গে পরিচারিকা পরিবেষ্টিত হয়ে বিহার করছিলেন (উত্তরকাণ্ড, ৫২ সর্গ) তখনও কিন্তু রামের কোন পরিহাস-প্রিয়তার উল্লেখ পাই না।

রামের মেঘদৈবতের সঙ্গে লক্ষণের যে সম্পর্ক দেখান হয়েছে সেক্ষেত্রে লক্ষ্মণ ঊর্মিলাকে বিবাহ করেছিল এটা মানতে হয়। কিন্তু রামের ব্যক্তি সত্তা (যা রামায়ণের ঐতিহাসিক পর্যায়ের অন্তর্ভূক্ত) নিয়ে আলোচনা কালে লক্ষণের স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন লক্ষ্মণকে অবিবাহিত এবং কার্যকারণে কোন রাক্ষসীকন্যার পানিগ্ৰহণ হয়ত অস্বাভাবিক নাও হতে পারে। প্রথম হতেই বিশ্বামিত্রর রামের প্রতি নির্দেশ ছিল তাড়কাকে নিধন করার। এক্ষেত্রে তাড়কার নাসাকণ প্রথমে ছেদন করে পরে বাহু ছেদন ও পরিশেষে বক্ষঃস্থলে শরনিক্ষেপ করে হত্যার কারণ কি? নিধন যেখানে মূল উদ্দেশ্য, সেক্ষেত্রে নাসাকৰ্ণ ছেদনের কি প্রয়োজন ছিল? বিষয়টি কি প্রশ্ন তোলে না?

 

ন্যায়তীৰ্থ মহাশয়ের মতে বিশ্বামিত্র প্রভৃতি চরিত্রগুলি অলংকার শাস্ত্রানুসারে প্রাসঙ্গিক।

একথা মেনে নিয়েও বলা যায় সরযুর দক্ষিণ তীরে বলা ও অতিবলা মন্ত্র গ্রহণকালে রাম বিশ্বামিত্রকে গুরু পর্যায়ে স্বীকার করেছিলেন। বিশ্বামিত্র রামকে বহু প্রকার অস্ত্র গ্রহণ ও সংহার বিদ্যা শিক্ষাদান করেন, এক কথায় বিশ্বামিত্র রামকে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এই ঘটনাগুলি অবশ্যই উভয়ের ব্যক্তিসত্তা নির্দেশ করে। কিন্তু, তারপর এত সুখ দুঃখের মধ্যে রাম কোনও সময়ে বিশ্বামিত্রকে স্মরণ করলেন না অর্থাৎ আদিকবি বিশ্বামিত্রকে একান্তভাবে ‘প্রাসঙ্গিক চরিত্র’ হিসাবে কাব্যে উপস্থাপিত করে রাম সীতার বিবাহের পরই হিমালয়ে নির্বাসন দিলেন একথা মানতেও দ্বিধা জাগে।

অপরদিকে, বিশ্বামিত্র চরিত্রটিকে যদি নৈসর্গিক ঘটনা হিসাবে স্বীকার করা হয়, সেক্ষেত্রে সহজাতভাবে বিশ্বামিত্রকে মহাকাব্যে প্রাসঙ্গিক চরিত্র বলা যায়।

মন্থরার ক্ষেত্রেও এই একই যুক্তি প্রযোজ্য।

এই দুই চরিত্রের স্বরূপতা স্পষ্ট করা হলে যেহেতু মূল বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়, একারণে মূল পাণ্ডুলিপির সঙ্গে সিদ্ধাশ্রমের অন্তরালে এবং ‘বায়স-মন্থরা-ত্রিশংকু পরিচয় নতুন দুইটি প্রকরণ যুক্ত করে দেওয়া হল।

 

বালকাণ্ডে আছে রামচন্দ্র লবকুশকে অযোধ্যার রাজপ্রাসাদে ডেকে এনে রামায়ণ গান শুনেছিলেন। কিন্তু গান শোনানোর পর লবকুশ পুনরায় আশ্রমে ফিরে গিয়েছিল এমন কোন ইংগিত রাখা হয় নাই। (বালকাণ্ড; ৪র্থ সর্গ।)

ক্ৰৌঞ্চ-বধ এবং পৌলস্ত্য-বধ শব্দদ্বয়ে ‘বধ’ শব্দটি ব্যবহার করে রহস্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ‘বধ’ শব্দের প্রচলিত অর্থ নিধন বা হত্যা। কিন্তু বধঃ (পুং) শব্দের অন্য অর্থ নির্বাসনং, পরিবর্জনং ইত্যাদি। ইতামরঃ॥ (শব্দকম্পন্দ্রম)। সুতরাং ক্ৰৌঞ্চ-বধ অর্থে গ্রীষ্মকালীন সূর্যর নির্বাসন অর্থাৎ বৰ্ষাঋতুর আগমন। পৌলস্ত্যবধ অর্থে অগস্ত্য নক্ষত্রর উদয়ে বর্ষা ঋতুর আগমন এই ধারণার পরিবর্জন।

 

‘রামজন্মকথা’ প্রকরণে ঋষ্য শব্দের অর্থ মৃগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঋষ্য (পুং),- ঋষ্‌ +য (ক্যপ্‌)—র্ম্ম, বাহুলকে; ১। কৃষ্ণসার মৃগবিশেষ। ঋষ্যে নীলাঙ্গকঃ —ভাবপ্রকাশ। ২। মৃগ (বঙ্গীয় শব্দকোষ—শ্ৰীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়)।

অঙ্গনা,– (অঙ্গ +ন + আপ্‌) (স্ত্রী) বৃষ-কৰ্কট-কন্যা-বৃশ্চিক-মকর-মীন-রাশয়ঃ। ইতি জ্যোতিষতত্ত্বম্॥ (শব্দকল্প্দ্রুম)।

 

বৈদিক মন্ত্রগুলিকে আদৌ কৃষক সঙ্গীত (চাষার গান) হিসাবে আমি প্রমাণের চেষ্টা করিনি। রামায়ণ বেদ নয়, কাব্যগীতি। সুতরাং কৃষিভিত্তিকো লোকসঙ্গীতকে পরিমার্জিত করে শাস্ত্র-সম্মত-কাব্যগীতি রচনা করতে বাধা কোথায়।

রামায়ণে বৈদিক যজ্ঞাদির উল্লেখ আছে বলেই এটিকে বেদমন্ত্র নির্ভরশীল মানতে হবে কেন? জনক যে যজ্ঞ করেছিলেন তা মূলতঃ হলকর্ষণ।

 

ত্রিলোকে রাবণের অস্তিত্ব রামায়ণে প্রথম প্রকাশ করা হয় বিশ্বামিত্র যখন দশরথের নিকট রামের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন।
পৌলস্ত্যবংশপ্রভবে রাবণে নাম রাক্ষসঃ।
স ব্রহ্মণ দত্তবরন্ত্রৈলোক্যং বাধতে ভূশম্॥১৬ (১.২০.১৬)
অর্থাৎ, পৌলস্ত্যবংশ সম্ভূত মহাবাহু মহাবীর্য্যবান রাবণ নামক রাক্ষস ব্ৰহ্মার নিকট হইতে বরলাভ করিয়া, বহু রাক্ষসে পরিবৃত হইয়া তিন লোককেই উৎপীড়িত করিতেছে।

এই সময় দশরথের আচরণে স্পষ্ট যে তিনি রাবণের শক্তি সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। সুতরাং রাবণের রাজধানী লঙ্কা একথা তার জানা ছিল নিশ্চয়ই, নতুবা প্রশ্ন রাখতেন।

মারিচকে বধ করে রাম লক্ষ্মণ আশ্রমে ফেরার পথে মৃতপ্রায় জটায়ুর মুখে সীতাহরণ কাহিনী অবগত হয়েছিলেন। জটায়ু রামকে বলল, ‘আয়ুষ্মান! তুমি যাহাকে মহাবনে ঔষধির ন্যায় অন্বেষণ করিতেছ, সেই সীতাও আমার প্রাণ, এই উভয়ই রাবণ কর্তৃক অপহৃত হইয়াছে (৩.৬৭.১৫)। আরণ্যকাণ্ডের সাতষট্টি ও আটষট্টি সর্গ দুইটিতে স্পষ্ট দেখা যায় জটায়ু রামকে রাবণ সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত করিয়েছিল। সুতরাং রাবণ যে সীতাকে হরণ করে দক্ষিণদিকে গিয়েছে রাম তা সম্যক জানতেন। অতঃপর রাম লক্ষণের সঙ্গে কবন্ধর সাক্ষাৎ হলে সেখানেও লক্ষ্মণ রাবণ কর্তৃক সীতাহরণের কথা বলেছেন (৩,৭০ সর্গ)। কবন্ধর নিকট রাম রাবণের বিস্তারিত পরিচয় জানতে চাইলে প্রত্যুত্তরে কবন্ধ রামকে ঋষ্যমুকে অবস্থানকারী সুগ্ৰীবের সঙ্গে সখ্যতা স্থাপনের পরামর্শ দিল। সুগ্ৰীব রাবণের সম্পর্কে কিছুই অবগত ছিল না। (৪.৭.২)। অথচ অঙ্গদের নেতৃত্বে হনুমান প্রমুখকে দক্ষিণদিকে সীতার অন্বেষণে পাঠানোর সময় তাদের নির্দেশদানকালে কিন্তু সুগ্ৰীব রাবণের বাসস্থানের ইংগিত দিয়েছে (৪.৪১.২৫)।

অতএব, রাবণ সীতাকে হরণ করে দক্ষিণদিকে গিয়েছে, এই রাবণ বিশ্রবার পুত্র ও কুবেরের বৈমাত্রেয় ভাই এবং রাবণের বাসস্থান কোথায় এই সব তথ্য অবশ্যই হনুমানদের জানা ছিল। শুধু জানা ছিল না রাবণ সীতাকে হরণ করে কোথায় রেখেছে। এই কারণে ন্যায়তীৰ্থ মহাশয়ের পরামর্শমত ‘সম্পাতি রহস্য’ প্রকরণের নিম্নোক্ত ছত্র কয়েকটি প্রত্যাহার করে নিলাম।

“হনুমানরা জানত যে রাবণ সীতাকে হরণ করে লঙ্কায় রেখেছে, সুতরাং এ বিষয়ে সম্পাতি কাহিনীতে নূতন কোন তথ্যর অবতারণা করা হয়নি। অথচ উদ্দেশ্যহীন ভাবেও নিশ্চয়ই এই কাহিনী বিবৃত হয়নি।”

উপরি উক্ত অংশটুকু প্রত্যাহারের দরুণ ‘সম্পাতি রহস্য’ প্রকরণের মূল বিশ্লেষণ বিন্দুমাত্র বিঘ্নিত হয় না।

এই প্রকরণে আরও দুইটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রথমতঃ অশ্বত্থ শব্দের অর্থ। অশ্বত্থ (পুং),—ন শ্বথ (শ্বঃ স্থিত)। অশ্বিনী নক্ষত্র (অশ্বশীৰ্ষ সাদৃশ্যে) পাণিনি (৪.২.৫)। অশ্বিনী নক্ষত্রযুক্ত পৌণমাসী, পাণিনি (৪.২.২২)। (৩) অশ্বিনী নক্ষত্রযুক্ত কাল, সিদ্ধান্ত কৌমুদী। (৪) অশ্বত্থ ফলের সময়, সিদ্ধান্ত কৌমুদী। (শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় কৃত বঙ্গীয় শব্দকোষ দুষ্টব্য)।

দ্বিতীয়তঃ নিশাকর শব্দের রূপকভেদ নিয়ে।

নিশা শব্দে মেষ হতে কর্কট রাশি পর্যন্ত স্থানের নির্দেশ করা হয়। এই চারটি রাশির দুইটি প্রান্ত একটি অশ্বিনী নক্ষত্রর প্রথম পাদে এবং অন্যটি অশ্লেষা নক্ষত্রর শেষ পাদে। এই দুই প্রান্তকে দুই হাতের প্রান্তদেশের ইংগিত হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে, যেহেতু উপখ্যানে নিশাকর শব্দ দ্বারা একটি মানবিক সত্তা সৃষ্টি করা হয়েছে।

 

জনক বংশ বিশ্লেষণ কালে এই বংশের প্রথম পুরুষ নিমিকে বীজ এর প্রতিভূ প্রতিপন্ন করা হয়েছে এবং বীজের অংকুরোদগম স্তরটিকে ‘জনক’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এই বংশের সকলকেই ‘জনক’ নামে অভিহিত করা যায়। অপরদিকে সীরধ্বজ অর্থে কৃষক, যে হলকর্ষণ করলে সীতার আবির্ভাব ঘটে। সুতরাং সেও জনক। এখানে ‘জনক’ শব্দটি দুইটি ক্ষেত্রে দুইটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

 

বাল্মীকি রামায়ণের মূল বক্তব্যের দ্বৈত সত্তা আছে। অন্তর্নিহিত বক্তব্য ঐতিহাসিক, কিন্তু বাহ্যিক স্বরূপ কৃষিভিত্তিক লোকসঙ্গীতের পরিমার্জিত রূপ। এই দ্বৈত সত্তার ক্ষেত্রে স্মরণে রাখতে হবে প্রতিটি চরিত্র, উপাখ্যান, স্থান, কাল ইত্যাদির দ্বৈত সত্তা নাও থাকতে পারে। যেমন সীতার বাল্মীকি আশ্রমে নির্বাসন প্রসঙ্গটির মধ্যে কৃষিভিত্তিক বক্তব্য নাই, এটি ঐতিহাসিক তথ্যের অন্তভূক্ত বলে মনে করি। কিন্তু বাল্মীকি আশ্রমে লবকুশের জন্ম একাধারে কৃষিভিত্তিক, অপরদিকে ঐতিহাসিক তথ্য সমৃদ্ধ। বিশ্বামিত্র, মন্থরা, ঊর্মিলা, মাণ্ডবী, শ্ৰুতকীর্তি প্রভৃতি চরিত্রগুলি একান্তভাবে নৈসর্গিক ঘটনা এবং/অথবা কৃষিভিত্তিক। একারণে রামায়ণে এঁদের ভূমিকা ঐ পর্যায়েই সীমিত।

সুতরাং বিরাট রামায়ণ মহাকাব্যের মোটামুটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে এই গ্রন্থে সম্ভাব্য পরম্পরা রক্ষা করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে অন্যান্য অংশ বা উপাখ্যানগুলিকেও আলোচনায় গ্রহণ করা হবে। যেমন, বর্তমানে রাক্ষসকুল সম্পর্কে কোন প্রকরণ রাখা হয় নাই, পরবর্তী খণ্ডে আলোচনার জন্য।

 

রাম ও সীতা চৌদ্দ বৎসর বনবাসে ছিলেন।

নব বর্ষাণি পঞ্চ চ; সাধারণ অর্থে চৌদ্দ বৎসর।

কিন্তু বর্ষ শব্দের অর্থ বর্ষণ, বৎসর, ভাগ, খণ্ড (শব্দকল্পদ্রূম্)। বর্ষ্‌— √বৃষ্‌ + অ (আচ্‌)—ভা, মেঘবারিপাত, বর্ষণ, বৃষ্টি। ঋগ্বেদ (৫.৫৮.৭)। বর্ষবৎ অবিরলপাত। বর্ষ—বৃষ +অ—ধি; বৎসর।

সুতরাং ‘নব বর্ষাণি পঞ্চ চ’ শব্দের অর্থ চৌদ্দ খণ্ড বা ভাগ ধরা যায়। চান্দ্র-মাসে বৎসর হিসাবে বারোটি শুক্ল পক্ষ (বা খণ্ড) ও বারোটি কৃষ্ণ পক্ষ (বা খণ্ড)। এই অনুসারে চৌদ্দটি পক্ষ অর্থাৎ সাত মাস বলা যায়।

দক্ষিনায়ণাদির পর হতে বায়ুর গতি পরিবর্তনের দরুণ মেঘের গতির বদল হয়। শারদ-বিষুবর পর জলশূন্য মেঘ দক্ষিণগামী হয়ে বসন্ত ঋতুর শেষে পুনরায় আবিভূত হয়। এই সাতমাস কাল বর্ষণের প্রবলতা থাকে না। এজন্য এই সময়কালকে রামের বনবাস বলে ইংগিত করা হয়েছে।

বর্ষাশেষে হলকর্ষণের প্রয়োজনীয়ত ফুরিয়ে যায়। পুনরায় বর্ষার পূর্বে হলমুখে সীতার আবির্ভাব ঘটে। এই কারণে রামের সঙ্গে সীতারও বনে গমন।

কিন্তু মহাকাব্যে বর্ণিত বনবাসকালের এই একটি মাত্র অর্থ ধরলে চলবে না। সেখানে নানা ঘটনায় ব্যক্তি রামচন্দ্র ও মানবী সীতার তথ্যও সন্নিবেশিত হয়েছে।

সুতরাং রাম সীতার বনবাসের কাল আক্ষরিক অর্থে চৌদ্দ বৎসর ধরে সেই সময়কালে অযোধ্যায় বা অন্য কোন ভূখণ্ডে অনাবৃষ্টি হেতু কৃষিকাজ ছিল না অথবা দাক্ষিণাত্যে কৃষিকাজ প্রচলন করার ইংগিত দেওয়ার জন্য রাম সীতার বনবাস এমন অর্থ সঠিক হয় না। দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী ফিরতি মৌসুমী বায়ুর কারণে দাক্ষিণাত্য অঞ্চলে বারিপাতের কারণে সেই অঞ্চলে চাষের কাজ হয় এই তথ্যটুকু মাত্র বনবাস প্রসঙ্গে স্বীকার করে নেওয়া যেতে পারে।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন রামের ‘চৌদ্দ বৎসর বনবাস’ বক্তব্যটি রামায়ণে বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে। ‘বর্ষ’ শব্দটি ছাড়া ‘সমা’ ও ‘সংবৎসর’ শব্দ দুইটিরও উল্লেখ আছে। কিন্তু ‘বর্ষ’ শব্দটির বাহুল্য বেশী।

মন্থরার কুমন্ত্রণায় কৈকেয়ীর রামকে বনবাসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হতে রামের কৌশল্যার নিকট বনগমনের অনুমতি গ্রহণ করা পর্যন্ত অযোধ্যাকাণ্ডে অন্ততঃ পনের বার ‘বর্ষ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যথা,—

১। নব বর্ষাণি পঞ্চ চ (অযোধ্যাকাণ্ড ৯.৩০; ১২.২২; ১৮.৩৫; ৩৯.৩৫)

২। চতুর্দশ হি বর্ষাণি (ঐ/ ৯.২১; ৯. ৩১; ২০. ২৯; ২৬.২৩)

৩। বর্ষাণি চ চতুর্দশ (ঐ/ ৯.২০)

৪। নব পঞ্চ চ বর্ষাণি (ঐ/ ১১.২৬; ২৪.১৭)

৫। সপ্ত সপ্ত চ বর্ষাণি (ঐ/ ১৮.৩৭)

৬। বর্ষাণীহ চতুর্দশ (ঐ/ ১৯.২৩)

৭। ষড়ষ্টেী চ বর্ষাণি (ঐ/ ২০.৩১)

৮। চতুর্দশ বনে বাসং বর্ষাণি বসতো মম (ঐ/ ৩৭, ৫)

‘বর্ষ’ শব্দের এই বহুল ব্যবহার মেঘদৈবত রাম ও কৃষিশ্রী সীতার চৌদ্দ পক্ষ অর্থাৎ সাত মাসের অনুপস্থিতির তথ্যকে সুনিদিষ্টভাবে ইংগিত করছে বলে আমি মনে করি।

অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে বনবাস প্রসঙ্গে যখন ঐতিহাসিক ঘটনার ইংগিত দেওয়া হয়েছে তখন ‘বর্ষ’ শব্দে বৎসর অর্থও গ্রহণ করতে হবে।

রাম অযোধ্যা ত্যাগ করার পরে চিত্ৰকূটে ভরতসহ অযোধ্যাবাসীগণকে আদিকবি উপস্থাপিত করেছেন। তারপর রাবণ বধের পর রামের অযোধ্যা প্রত্যাবর্তনের পূর্ব পর্যন্ত অযোধ্যা প্রসঙ্গ একান্তভাবে রামায়ণে অনুল্লিখিত। সুতরাং রামের চৌদ্দবৎসর বনবাসকাল অথবা সীতাহরণ ও সীতা উদ্ধারের মধ্যবর্তীকালে অযোধ্যায় অনাবৃষ্টি বা খরার দরুণ কৃষিকাজ ব্যহত হয়েছিল কিনা সে সম্পর্কে নিদিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। তবে অতীতে এমন নজির পাওয়া যায়। মগধে মৌর্যবংশের রাজত্বকালে একাধিক্ৰমে বারো বৎসর অনাবৃষ্টির জন্য দুর্ভিক্ষ চলেছিল; যার জন্য জৈন-ধর্মীয়দের এক বিরাট অংশ বর্তমান মহীশূর অঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল। দেখা যায় রামের প্রত্যাবর্তনের পূর্বে হনুমান যখন ভরতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তখন ভরতের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা হতে বৎসরাধিক কাল অনাবৃষ্টি বা অজন্মার যুক্তি গ্রহণ করা যায়।

দদর্শ ভরতং দীনং কৃশমাশ্রমবাসিনম্।
জটিলং মলদিগ্ধাঙ্গং ভ্রাতৃব্যসনকর্শিতম্॥ ৩০ (৬.১২৭.৩০)
অর্থাৎ, (হনুমান অযোধ্যা হইতে এক ক্লোশ দূরে সেই নন্দিগ্রামে গিয়া দেখিলেন) ভরত অতি দীনভাবে চীরকৃষ্ণাজিন পরিধানপূর্বক মুনিব্রত অবলম্বন করিয়া রহিয়াছেন এবং ভ্রাতৃশোকে কৃশ হইয়াছেন। তিনি তপস্বীর ন্যায় জটাধারণপূর্বক জীবনধারণ করিতেছেন। তাঁহার সর্বাঙ্গ মললিপ্ত হইয়াছে।

এখানে দেখা যায় ভরত রাজ্যভোগ পরিত্যাগ করে চীরকৃষ্ণাজিন ধারণ করায় পুরবাসীগণও সর্বপ্রকার ভোগ পরিত্যাগ করেছিল। বিশ্লেষণে ভরতকে শারদ-বিষুবর আগে ও পরে তিনমাস সময়কালের প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হয়েছে। সুতরাং রামের অযোধ্যা প্রত্যাবর্তনের প্রাক্‌কালে হনুমান ভরতের যে অবস্থা দেখল তার ভিত্তিতে সহজেই বল৷ যায় অযোধ্যায় ঘোর অনাবৃষ্টি চলছিল। ভরতসহ সকল পুরবাসী ভোগ পরিত্যাগ করেছিল অর্থে দেশে অজন্মা-পরিস্থিতি।

এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে রামকে অযোধ্যায় অভ্যর্থনা জানানোর জন্য যে আয়োজন হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ভরতের আদেশমত শত্রুঘ্ন বহু সহস্র ভূত্যগণকে নির্দেশ দিলেন,—

বিষ্টীরনেকসাহস্রীশ্চোদয়ামাস ভাগশঃ।
সমীকুরুতঃনিম্নানি বিষমণি সমানি চ॥৬
স্থানানি চ নিরস্যন্তাং নন্দিগ্রামাদিতঃ পরম্।
সিঞ্চন্তু পৃথিবীং কৃৎস্নাং হিম শীতেন বারিণী॥৭ (৬.১২৯.৬,৭)
অর্থাৎ, যে সকল স্থান উচ্চ এবং নিম্ন আছে, ছেদন এবং পূরণ দ্বারা সেই সকল স্থান সমতল করিয়া অযোধ্যা হইতে নন্দীগ্রাম পর্যন্ত সমস্ত ভূ-ভাগে তুষারের ন্যায় শীতল জল সিঞ্চন করা হউক।

এই নির্দেশের অর্থ রামের আগমনের পূর্বে হলকর্ষণ দ্বারা জমি প্রস্তুত করে জল সেচনের সাহায্যে বীজতলা তৈরীর ব্যবস্থা নেওয়া।

অযোধ্যার সিংহাসনে রামচন্দ্রর অভিষেকের সময়ে সেই উৎসবের সমকালেই বসুমতী শস্যশ্যামলী, বৃক্ষসকল ফলবান এবং কুসুমসহ সৌরভশালী হইয়া উঠিল।

অভিষেকে তদর্হস্য তদা রামস্য ধীমতঃ।
ভূমিঃ শস্যবতী চৈব ফলবন্তশ্চ পাদপাঃ॥৭২ (৬.১৩০.৭২)

এই শ্লোকটিতে দুইটি ইংগিত আছে। এক, ব্যক্তি রামচন্দ্রর শরৎ ঋতুতে অভিষেক; দুই, মেঘদেবতা রামের করুণায় ধরিত্রীর জীবধাত্রী স্বরূপতা। উভয়ক্ষেত্রে শরৎঋতুর আভাষ পাই।

রামচন্দ্রর অভিষেক উৎসবের সমকালেই বসুমতীর শস্যশ্যামল রূপে যে আনন্দর প্রকাশ তাতে মনে করা অসংগত হবে না যে বিগত বৎসরে বা কয়েক বৎসর অজন্মার পর প্রচুর ফসলের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল।

 

গ্রন্থে রামায়ণের কয়েকটি বিশেষ বিষয়ের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এখানে রাম এবং সীতার নৈসর্গিক তথা দৈবিক সত্তাকে উদ্‌ঘাটিত করতে প্রয়াসী হয়েছি। সেখানে নামগুলির অর্থান্তর করেই নিশ্চিন্ত হইনি, বিভিন্ন প্রকরণের প্রয়োজন অনুসারে ঘটনার সামঞ্জস্য বিধান করা হয়েছে। যেমন, সীতার পূর্বজন্ম, সীতার আবির্ভাব এবং সীতার সন্তান প্রসব একই প্রকরণে সন্নিবেশিত হয়েছে। অপরদিকে, ‘বায়স-মন্থরা-ত্রিশংকু পরিচয়’ প্রকরণে রামের উদ্দেশ্যে হনুমানের হাতে প্রদত্ত বন্দিনী সীতার অভিজ্ঞানের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে সীতার কৃষি-সত্তা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই প্রকরণে শুধু এই একটি মাত্র তথ্য নাই। রামের জন্মকালে, বনবাস গমনের প্রাক্‌কালে এবং বনবাসের প্রথম দিকে চিত্রকূট নামক স্থান ত্যাগের কালনির্ণয় পাওয়া যায় শনিগ্রহর বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করে। এই সব তথ্যগুলি ব্যক্তি রামচন্দ্রর জীবন বৃত্তান্তের সঙ্গে জড়িত, মেঘদৈবত রাম ও কৃষিদৈবত সীতার সঙ্গে প্রায় সম্পর্কহীন।

এই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রামায়ণের রূপকভেদের বিচার বিশ্লেষণ করা হলে বাল্মীকিকে একজন কৃষক অথবা তার আশ্রম সংলগ্ন কৃষিক্ষেত্র বা হলধর বাল্মীকিকে অনুসন্ধানের অনুসন্ধিৎসা জাগবে না। উপাখ্যানের প্রকৃতি অনুসারে সেই উপাখ্যানে চরিত্র বিশেষের মূল ভূমিকা তথা কার্যকারিতা উপলব্ধি করতে হবে।

যেমন, সীতা চরিত্রটির একমাত্র সত্তা হলরেখ নয়। সীতা কখনও পরিপূর্ণ মানবী, কখনও চন্দ্রের প্রতিভূ, কখনও ব্যক্তি রামচন্দ্রর ভাগী। রামের বনবাসকালে ব্যক্তি রামচন্দ্রর সঙ্গে তার ভাগ্যশ্রী যেমন জড়িয়ে আছে, তেমনি তার নর্মসহচরী মানবী সীতারও উপস্থিতি মেনে নেওয়৷ যায়। ফলে মহাকাব্যর বিভিন্ন উপাখ্যানের উপস্থাপনা অনুসারে রামের চৌদ্দ বৎসর বনবাসকালে কখনও সীতা রামচন্দ্রর ভাগ্যশ্রী কখনও বা সাক্ষাৎ স্ত্রী; অথবা নিছক কৃষিশ্রী।

সীতাহরণ কাহিনীতে কোন দুর্ধর্ষ নৃপতির মানবী সীতাকে অপহরণ যেমন সম্ভব হতে পারে, তেমনি ব্যক্তি রামচন্দ্র দশবৎসর কাল দণ্ডকারণ্য অঞ্চলে যে রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, কোন নৃপতি ছলনার আশ্রয় নিয়ে রামচন্দ্রকে সেই রাজ্য হতে রাজ্যচ্যুত করেছিল এই ইংগিতও গ্রহণ করা যায়।

 

উত্তরকাণ্ডে বর্ণিত সীতার নির্বাসন কাহিনীর সীতা মূলতঃ মানবী। কিন্তু রহস্য সৃষ্টির কারণে কৃষিশ্ৰী সীতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে কৃষিভিত্তিক লবঙ্কুশের প্রস্তাবনা করা হয়েছে। মানবী সীতার নির্বাসন কালে পুত্র প্রসবও ঐতিহাসিক তথ্যকে ইংগিত করে।

গর্ভাবস্থায় সীতা গঙ্গাতীরস্থ মুনি-আশ্রম দেখতে চেয়েছিলেন। আদিকবি নির্বাসিত সীতাকে বাল্মীকি আশ্রমে আশ্রয় দিয়েছিলেন। পাললিক ভূখণ্ডে সীতার উদ্ভব হয়। কৃষিকাজ সমাপ্তির পর সীতা ঐ ভূখণ্ডেই আশ্রিত থাকে। আবার যথাসময়ে সেখানেই হলমুখে সীতার আবির্ভাব ঘটে। এই কারণে বাল্মীকি আশ্রমই নির্বাসিত সীতার উপযুক্ত আশ্রয়স্থল।

এই ঘটনা সম্পর্কে ওয়েবার সাহেবের অভিমতের সঙ্গে আমি একমত নই।

 

মেঘের গমনাগমনে কর্ষিত জমির যে ভূমিকা এবং এই উভয়ের সংযোগে মানবসমাজের যে সমৃদ্ধি তার স্বীকৃতি একদা উদ্‌গীত হয়েছিল লোকসঙ্গীতে। এই লোকসঙ্গীতের রামকথা মূর্ত হয়েছিল কৃষিকাজের ফলশ্রুতির উপলব্ধি হতে। একারণে গ্রন্থের নাম ‘রামায়ণের উৎস কৃষি’ সঙ্গত হচ্ছে মনে করি।

 

ন্যায়তীৰ্থ মহাশয়কে আমার গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তিপূর্ণ প্রণাম জানিয়ে আমি রামায়ণ বিশ্লেষণের তত্ত্বগত ও তথ্যগত বক্তব্য সুধীজনের প্রজ্ঞার নিকট সবিনয়ে নিবেদন করলাম।