১১. বায়স-মন্থরা-ত্রিশঙ্কু পরিচয় – একাদশ প্রকরণ

বনবাসকালে রাম ভ্রাতা ও স্ত্রীসহ কিছুকাল চিত্ৰকুট পৰ্বতে বাস করেছিলেন। এখানে বসবাসকালে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল, যার বিবরণ অভিজ্ঞান হিসাবে রামকে জ্ঞাপন করানোর কারণে সীতা অশোকবনে বন্দিনী থাকাকালে হনুমানকে বলেছিলেন।

চিরকুট পৰ্বতের পাদদেশে উত্তর-পূর্বে অর্থাৎ ঈশাণকোণে প্রচুর ফলমূল ও জলপরিপূর্ণ পর্বতময় একটি স্থান আছে। মন্দাকিনী নদীর অতি দূরদেশস্থ সিদ্ধাশ্রিত সেই দেশে রাম যখন বাস করছিলেন, সেই সময় একদিন আর্দ্রগাত্র হয়ে রাম সীতার কোলে উপবেশন করেছিলেন। তখন এক বায়স মাংসাভিলাষী হয়ে সীতার স্তনাভ্যন্তরে চঞ্চুপুট দ্বারা আঘাত করে। সীতা ঢিল ছুঁড়ে বায়সকে তাড়াতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু সেই বলিভোজী বায়স বারংবার নিবারিত হয়েও তার বক্ষস্থল বিদারণকরতঃ সেখানেই লীন হয়ে থাকল, কিছুতেই অন্যত্র গমণ করল না। তখন সীতা পাখির উপর রাগ করে বস্ত্রের গ্রন্থি দৃঢ় করার জন্য কাঞ্চিদাম আকর্ষণ করতে উদ্যত হলে, তাঁর বসন স্খলিত হল। সীতার সেই অবস্থা দেখে রাম হেসেছিলেন। সীতা রাগাম্বিতা, লজ্জিতা ও ভক্ষ্যলোলুপ-বায়স কর্তৃক বিদারিত হয়ে রামের সমীপে গিয়ে স্বামীর কোলে বসে শ্রান্তিবশতঃ ঘুমিয়েছিলেন। এইভাবে উভয়ে পর্যায়ক্ৰমে উভয়ের কোলে ঘুমিয়েছিলেন।

ইতিমধ্যে বায়স পুনরায় এসে হাজির হল। সীতা জেগে গিয়ে স্বামীর কোল হতে উঠছেন এমন সময় কাক হঠাৎ এসে সীতার বক্ষঃস্থল নখর দ্বারা ক্ষতবিক্ষত করল। সীতার বক্ষঃস্থল হতে শোণিতবিন্দু ক্ষরিত হল, অতঃপর ক্ষরিত শোণিতবিন্দু শরীরে পতিত হওয়ায় রামের নিদ্রাভঙ্গ হলে সীতার স্তনমধ্যে ক্ষত দেখে এবং বায়সের কীর্তি অবগত হয়ে রাম সেই বায়সের বিনাশ বাসনা করলেন।

শক্র-পুত্র এই বায়স বিপদ অনুধাবন করে বায়ুবেগে ধরান্তরে দুত পলায়ন করল। তখন ক্রুদ্ধ রাম দর্ভ-মুষ্ঠি হতে একটি দর্ভ নিয়ে মন্ত্ৰপুত করে ব্রহ্মাস্ত্রে যোজিত করলে সেই দর্ভ জ্বলন্ত কালাগ্নির ন্যায় বায়সের অভিমুখে প্রজ্বলিত হল। নিক্ষিপ্ত প্রজ্বলিত দর্ভ পশ্চাদ্‌ধাবন করলে বায়স কোথাও আশ্রয় না পেয়ে শেষে রামের শরণাগত হল। রাম দয়াপরবশতঃ প্রাণরক্ষা করে বায়সকে বললেন, ব্ৰহ্মাস্ত্র ব্যর্থ হওয়ার নয়। অতএব বল তোমার কি সংহার করব?

বায়স বলল, আমার দক্ষিণচক্ষু ব্ৰহ্মাস্ত্র দ্বারা সংহার্য হউক।

বায়সের দক্ষিণচক্ষু বিনষ্ট হল। তারপর সে রাম ও দশরথকে নমস্কার করে নিজের ঘরে প্রতিগমণ করল। (১)

আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতা হতে দেখা যায় বায়স অর্থাৎ কাক তার স্বভাববশে কোন ভক্ষ্যবস্তুর দিকে লক্ষ্য স্থির করার সময় ঘাড় বেঁকিয়ে থাকে, যেন তার একটি চোখ অন্ধ। কিন্তু কাকের দুই চোখেই দৃষ্টিশক্তি আছে। কাকের এই স্বভাব অবলম্বন করে আদিকবি বায়স-কাহিনী রচনা করেছিলেন এই ধারণা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে একটি কাক স্খলিতবসনা কোন প্রাণময়ী রমণীর স্তনাভ্যন্তরে ঠোকর দিতে পারে কি? আর দিলেও নিবারণ করলে নিশ্চয় উড়ে যাবে, সেখানে লীন হয়ে থাকবে না। উপরন্তু এই ঘটনার কালে রাম সীতার কোলে বসেছিলেন। সুতরাং সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য ঘটনা। অথচ এই অবাস্তব ঘটনাটি বন্দিনী সীতা অভিজ্ঞানস্বরূপ রামকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন।

আরও লক্ষ্যণীয় যে ঘটনাটি ঘটেছিল চিরকুট পৰ্বতের প্রত্যন্তদেশে অবস্থানকালে। কিন্তু ঘটনাটির উল্লেখ করা হল অনেক কাল পরে, যখন হনুমান লংকার অশোকবনে সীতার সন্ধান পেয়ে ফিরে আসার সময়ে রামের জন্য কোন অভিজ্ঞান প্রার্থনা করল। এই প্রসঙ্গে আরও স্মরণীয় যে বনবাসকালে রামসীতার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য লক্ষ্মণ সকল সময়ে সচেতন থাকতেন। কিন্তু এক্ষেত্রে লক্ষ্মণকে সেই ভূমিকা পালন করতে দেখা গেল না। সুতরাং আপাতঃ দৃষ্টিতে কাহিনীটি অলীক মনে হলেও যেহেতু এইটি অভিজ্ঞান হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে সেকারণে এর রহস্য-বক্তব্য মানতে হবে।

 

বলিভোজী মাংসাশী বায়স শক্র-পুত্র।

শক্র অর্থ ইন্দ্র, দ্বাদশাদিত্যের এক আদিত্য। আদিত্য অর্থে সূর্য। ইন্দ্র অর্থ যিনি প্রভুত্ব করেন। সুতরাং শক্র-পুত্র শব্দটি ব্যবহার করে রহস্য সৃষ্টি করা হয়েছে। মূলতঃ শক্র-পুত্র অর্থে সূর্য-পুত্র অর্থাৎ শনিগ্রহ বুঝতে হবে। শনিগ্রহকে আরেকটি কারণেও শক্র-পুত্র বলা যায়। বৃহস্পতি গ্ৰহ যেমন পুষ্যা নক্ষত্রে প্রথম আবিষ্কৃত হওয়ায় পুষ্যা নক্ষত্রে জন্ম বলা হয়, তেমনি শনিগ্ৰহ আবিষ্কৃত হয়েছিল অনুরাধা নক্ষত্রে। জ্যৈষ্ঠ মাসের রাত্রির আকাশে আবিষ্কৃত হওয়ায় শক্র-পুত্র, কারণ জ্যৈষ্ঠ মাসের আদিত্যর নাম ইন্দ্র বা শব্ৰু। এছাড়া কাক অর্থ খঞ্জ; শনিগ্রহও পঙ্গু।

কাক যেমন ঘাড় বেঁকিয়ে শিকার সন্ধান করে, শনিগ্রহও তেমনি নিজ কক্ষপথে তির্যকভাবে অবস্থিত হয়ে পরিভ্রমণ করে। শনিগ্রহ প্রাচীন মতে কৃষ্ণবর্ণ। কাক দ্বিজ (পক্ষী), শনিও পুরাণ মতে দ্বিজ (ব্রাহ্মণ)। এই সূত্রগুলির সুযোগে শনিগ্রহ নিয়ে আদিকবি রূপক সৃষ্টি করেছেন।

রামের জন্মকালে শনিগ্রহ সুউচ্চ স্থানে ছিল। তুলারাশির ০° হতে ২০° অংশ অর্থাৎ চিত্র নক্ষত্রর দ্বিতীয় পাদ হতে স্বাতী নক্ষত্রর সম্পূর্ণ শনিগ্রহর তুঙ্গস্থান।

অতএব রামের জন্মকালে শনিগ্রহ যদি তুলা রাশিতে চিত্রা নক্ষত্রে ১৮৪°৪০’ (একশত চুরাশি অংশ চল্লিশ কলায়) থাকে, তাহলে রামের বনগমন কালে অর্থাৎ রামের চব্বিশ বছর তিন মাস বয়সকালে শনিগ্ৰহর অবস্থান হয় কর্কট রাশিতে অশ্লেষা নক্ষত্রে ১১৫°৪০’ (একশত পনের অংশ চল্লিশ কলায়)। এই হিসাব মত শনিগ্ৰহর উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্রে ১৪৬°৪০’ (একশত ছিচল্লিশ অংশ চল্লিশ কলায়) সংক্ৰমণ হয় রামের বয়স যখন ছাব্বিশ বছর দশমাস এবং শনিগ্ৰহর এই নক্ষত্র অতিক্রম করার কালে রামের বয়স আন্দাজ সাতাশ বছর এগারো মাস দশদিন। এই দৃষ্টিকোণ হতে বলা যায় রামের বনবাসকালে এক তিথিতে শনিগ্ৰহর উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্রে সংক্ৰমণ হয়েছিল এবং প্রায় তেরো মাস পরে পুনরায় ঐ নক্ষত্রকে বক্ৰীগতিতে স্পর্শ করে মার্গী হয়ে সম্পূর্ণ ত্যাগ করেছিল। বায়স কাহিনীতে এই সময়কাল নির্দেশ করা হয়েছে।

চিত্র অর্থ আকাশ। কুট শব্দে ছেদক ধরা যায়, কুট অর্থে ছেদন ধরে নিয়ে। অতএব চিত্ৰকুট শব্দে আকাশ-ছেদক; অর্থাৎ, রবিপথ ও পৃথিবীর আবর্তন পথ যে বিন্দুতে ছেদ করছে,—শারদ ও বাসন্ত বিষুব স্থানদ্বয়। অপরদিকে চিত্রকুট শব্দে চিত্রা নক্ষত্র-সমম্বিত গৃহ–এই অর্থও হয়। রামায়ণের কালে চিত্রা নক্ষত্রর শেষপাদে শারদ-বিষুব হত। একথা রামায়ণের একাধিক উপাখ্যান বিশ্লেষণ করে প্রমাণ রেখেছি। সুতরাং চিত্ৰকুট শব্দের উপরোক্ত দুই অথ’ভেদেই আকাশের চিত্রা নক্ষত্রকে ইংগিত করছে। চিত্র নক্ষত্রর উত্তর-পূর্বে অর্থাৎ ঈশাণ কোণে উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্রর অবস্থান।

চিত্র অর্থ আকাশ ধরে, চিরকুট শব্দে আকাশের তুঙ্গস্থান অর্থাৎ দক্ষিণায়নাদি স্থানও ধরা যেতে পারে। এক্ষেত্রেও রামায়ণের কালের দক্ষিণায়নাদি স্থান পুষ্যা নক্ষত্রর ঈশাণকোণে উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্রর অবস্থান। উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্র ছায়াপথ হতে অনেক দূরে অবস্থিত। কাহিনীতে মন্দাকিনী শব্দে ছায়াপথ বুঝানো হয়েছে।

এই কাহিনীতে রাম ও সীতা যথাক্ৰমে সূর্য ও চন্দ্রর প্রতীক। সূর্য ও চন্দ্রর বিভিন্ন অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন মাস বা ঋতু নির্দেশ করে।

সুতরাং কৃষিকাজের ক্ষেত্রেও সূর্য ও চন্দ্রর অবস্থান অনস্বীকার্য। অতএব মেঘদেবতা রাম ও কৃষিশ্রী সীতাকে যথাক্রমে সূর্য ও চন্দ্রর প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করা চলতে পারে।

বায়সের আক্রমণের পূর্বে রাম আর্দ্রগাত্রে সীতার কোলে উপবেশন করেছিলেন। এখানে আর্দ্রগাত্র শব্দে ছায়াপথে নিমগ্ন শতভিষা নক্ষত্রে সূর্যর অবস্থান। চন্দ্রর দীপ্তি সূর্যরশ্মির প্রতিফলনে। পূর্ণিমা তিথিতে সূর্যর বিপরীতে চন্দ্রর অবস্থানহেতু পরিপূর্ণ ঔজ্জ্বল্য। এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বর রূপক বর্ণনা হল সীতার (চন্দ্রর কোলে রামের (সূর্যর) উপবেশন। অনুরূপভাবে, অমাবস্যা তিথিতে সূর্য ও চন্দ্র একই অংশে থাকে, একারণে কাহিনীতে বলা হয়েছে রামের কোলে সীতার উপবেশন। বায়সের প্রথম আক্রমণের দিন চন্দ্র উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্রে ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে শনিগ্ৰহর ঐ নক্ষত্রে সংক্ৰমণ। শনিগ্রহ উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্র স্পর্শ করে বক্ৰী হয়েছিল ধরা যায়, এই কারণে যে তাড়না সত্তেও বায়স সীতার বুকে লীন হয়েছিল। শনিগ্রহ বক্রী ও মার্গী হওয়ার প্রাক্‌কালে গতি এতই মন্দ হয় যে কয়েক দিন মনে হয় গ্রহটি যেন নিশ্চল হয়ে আছে।

সীতার বস্ত্রস্খলন অর্থে চন্দ্রর উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্র ত্যাগ করে পরবর্তী নক্ষত্রে সংক্ৰমণ।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন একদা বৈদিককালে উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্রে দক্ষিণায়ন হত। সেই ইংগিত দেওয়ার জন্য কাহিনীতে ঘটনাস্থলকে বল৷ হয়েছে সিদ্ধাশ্ৰিত দেশ।

রামায়ণে রামের প্রসঙ্গে যেমন আছে, সেরকম সীতার জন্মকালের গ্রহনক্ষত্র সমাবেশের কোন উল্লেখ নাই। কিন্তু পরবর্তী টিকাকারগণ নির্দেশ করেন যে মাধব মাসে অর্থাৎ বৈশাখ শুক্লা নবমী তিথিতে চন্দ্র উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্রে সীতার জন্ম হয়েছিল। বিবাহের ক্ষেত্রে কন্যার জন্ম নক্ষত্রে বিবাহদিন ধার্য করার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। উত্তরফল্গুনী নক্ষত্রে চন্দ্রর অবস্থান কালে সীতার বিবাহ হয়েছিল। এই সকল দিক বিবেচনা করে বলা যায় উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্রর সঙ্গে সীতার বিশেষ সম্পর্ক আছে। বায়স কাহিনীতে মূলতঃ উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্রে শনিগ্ৰহর সংক্ৰমণ ও নিষ্কমণ ব্যক্ত করে একটি নিদিষ্ট সময়কালের প্রতি ইংগিত রাখা হয়েছে। বায়সের আক্রমনে বিপর্যস্তা সীতা রামের কোলে ঘুমিয়েছিলেন। অর্থাৎ ফাল্গুনী পূর্ণিমার পরবর্তী অমাবস্যা। এইভাবে পর্যায়ক্ৰমে উভয়ে উভয়ের কোলে ঘুমিয়েছিলেন, অর্থাৎ, অনেকগুলি পূৰ্ণিমা ও অমাবস্যা অতিক্রান্ত হয়েছিল।

এরপর পুনরায় বায়সের আগমন ও আক্ৰমণ। তখন রামের ক্রোড় হতে সীতা গাত্রোথান করছিলেন; অর্থাৎ, অমাবস্যার নিবৃত্তিকাল।

প্রথম ঘটনা ফাল্গুনী পূর্ণিমায় ঘটে থাকলে, প্রায় তেরে মাস পরে চৈত্র পূৰ্ণিমার পরবর্তী অমাবস্যার নিবৃত্তির কালে দ্বিতীয় ঘটনা ঘটেছিল। এই সময়ে সূর্য কৃত্তিকা নক্ষত্রে। তখন শনিগ্রহ বক্ৰীগতিতে পুনরায় উত্তরফল্গুনী নক্ষত্র স্পর্শ করেছে। বৈশাখী শুক্লপক্ষে চন্দ্র যখন উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্রে, সূর্য তখন কৃত্তিকা নক্ষত্রর শেষ অংশে এবং শনিগ্রহ ইতিমধ্যে বক্ৰীগতি ত্যাগ করে মাগী হয়ে উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্র পরিত্যাগ করছে।

এই নৈসর্গিক ঘটনাটি কাহিনীতে বায়সের পুনরায় আক্ৰমণ হিসাবে ব্যক্ত করা হয়েছে।

রাম প্রথমে কোন ভ্ৰক্ষেপ করেননি। তারপর সীতার বক্ষস্থল হতে রক্ত ঝরে তার গায়ে পড়লে ক্রুদ্ধ হয়ে দেখলেন বায়স সীতার অভিমুখে ধাবিত হচ্ছে। তখন রাম দৰ্ভমুষ্ঠি হতে একটি দর্ভ নিয়ে মন্ত্রপূত করে ব্ৰহ্মাস্ত্রে সংযোজন করলে সেই দৰ্ভ কালাগ্নির ন্যায় প্রজ্জ্বলিত হয়ে বায়সের অভিমুখে ধাবিত হল। বায়স ভয়ে ধরাস্তরে পলায়ন করল।

ঘটনার সূত্রপাত কৃত্তিকা নক্ষত্রে অমাবস্যা তিথির নিবৃত্তির কালে বক্ৰী শনিগ্ৰহর উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্র স্পর্শ। অতঃপর বৈশাখী শুক্ল নবমী তিথিতে চন্দ্রর উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্রে অবস্থানকালে সূর্যর রোহিণী নক্ষত্রে সংক্ৰমণ। ইতিমধ্যে শনিগ্রহ বক্ৰীগতি ত্যাগ করে মাগী হয়ে হস্ত নক্ষত্রে উপনীত হয়েছে।

কৃত্তিকা নক্ষত্রই পুরাণে শরবন। এই কাহিনীতে এই নক্ষত্রটিকে দর্ভমুষ্ঠি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একটি মাত্র দর্ভ অর্থে কৃত্তিকা নক্ষত্রর শেষ কলা। ব্ৰহ্মাস্ত্র রোহিণী নক্ষত্রর রূপক। রোহিণী নক্ষত্রর বৈদিক নাম ব্ৰহ্মা। একটি দর্ভ ব্রহ্মাস্ত্রে সংযোজন শব্দে কৃত্তিকা নক্ষত্রর শেষ অংশ হতে রোহিণী নক্ষত্রে প্রবেশ। একটি তিথিকালে কিছু সময়ের জন্য সূর্যর কৃত্তিকা নক্ষত্রর শেষকলা ও রোহিণী নক্ষত্রর প্রথম কলার সংযোগস্থলে অবস্থান ছিল। এই সময়কালে শনিগ্রহ মার্গী হয়ে উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্র ত্যাগ করে। অপরদিকে দ্রুতগতি হেতু চন্দ্র তখন পরবর্তী নক্ষত্রে; অর্থাৎ, শনির সম্মুখবর্তী। এই ঘটনাকে কাহিনীতে বায়সের সীতার পশ্চাদধাবন বলা হয়েছে।

পরিশেষে বায়স রামের শরণাপন্ন হল।

রোহিণী নক্ষত্রর প্রথম পাদ ৪০° (চল্লিশ অংশ) হতে উত্তর-ফল্গুনী নক্ষত্রর শেষ পাদ ১৬০° (একশত ষাট অংশ) এই দূরত্ব সূর্যর অতিক্রম করতে সময় লাগে চার মাস। এই চার মাসে শনিগ্ৰহ আন্দাজ ৪° (চার অংশ) অতিক্রম করে হস্তী নক্ষত্রেই অবস্থান করবে। অতএব একটা সময়ে শনিগ্রহ ও সূর্য হস্তা নক্ষত্রে একই অংশে উপনীত হবে। এই সমরেখায় অবস্থানকে কাহিনীতে রামের নিকট বায়সের শরণ নেওয়া বলা হয়েছে।

ব্ৰহ্মাস্ত্রে বায়সের দক্ষিণ চক্ষু বিনষ্ট।

বাস্তবে দেখা যায় বায়স বামদিকে ঘাড় কাত করে শিকার সন্ধান করে। ব্রহ্মাণ্ডে শনিগ্রহর বলয়গুলি ক্লান্তিবৃত্তর দিকে ২৭° (সাতাশ অংশ) কোণ করে কাত হয়ে পরিভ্রমণ করে। এই তথ্যটি নির্দেশনার কারণে ব্ৰহ্মাস্ত্রে বায়সের ডান চক্ষু বিনষ্ট বলা হয়েছে।

প্রতি বৎসরই একবার সূর্য ও শনিগ্রহ একই অংশে মিলিত হয়। তত্ৰাচ এই ঘটনার এমন কি তাৎপর্য রয়েছে যার দরুণ এই ঘটনাকে অভিজ্ঞান হিসাবে গ্রহণ করা হল?

কাহিনীতে বলা হয়েছে বায়সের আক্রমণে সীতার ক্ষতবিক্ষত বক্ষস্থল হতে ক্ষরিত শোণিতবিন্দু রামের দেহে পড়েছিল। সীতা অর্থ হলরেখ। অনাবৃষ্টিহেতু কৃষিকাজ ব্যাহত হলে কর্ষিত জমি অনাবাদী পড়ে থাকে। সীতার বক্ষস্থল হতে রক্তক্ষরণ অর্থে খরাজনিত পরিস্থিতি।

অশোকবনে বন্দিনী সীতা তার আয়ুষ্কাল আর মাত্র এক মাস একথা হনুমানকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে রামকে জানানোর জন্য বারংবার অনুরোধ করেছিলেন।(২)

সীতার এই ব্যাকুলতা সেই বৎসরেও অনাবৃষ্টির ইংগিত করছে। সূর্য রোহিণী নক্ষত্র অতিক্রম করার পরও যদি মেঘের সমাগম ও বর্ষণ না হয় তাহলে অনাবৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে সীতার একমাসের আয়ুষ্কাল বলতে বৰ্ষাঋতুর শেষ মাস। এই সময়েও বর্ষণ দেবতার কৃপা না হলে কর্ষিত জমি সম্পূর্ণ বন্ধ্যা পড়ে থাকে।

এই অনাবৃষ্টি জনিত অবস্থা রামের চিত্ৰকূট পৰ্বতে অবস্থানকালে একবার ঘটেছিল। সেই ঘটনার সূত্র ধরে অশোকবনে বন্দী থাকার সময়ের একটি বৎসরের অবস্থাও বৃপকে ব্যক্ত করা হয়েছে।

 

মহাকাব্যে রামের রাজ্যাভিষেকের সিদ্ধান্ত এবং পরিশেষে তার বনবাসের সময়কাল মধ্যে শনিগ্ৰহর উল্লেখ আরও একবার রূপকে পাওয়া যায়। রামের চব্বিশ বছর পূর্ণ হওয়ার পর দশরথ রামের রাজ্যভিষেকের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। সেদিন পূনর্বসু নক্ষত্রযোগ, চৈত্র মাস। রামের জন্ম সময়ের মাস ও তিথির সঙ্গে মিল রয়েছে এই ঘটনার। পুষ্যা নক্ষত্রযোগে অভিষেক-ক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য বসিষ্ঠ প্রমুখ পুরোহিতগণকে তিনি নির্দেশ দিলেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে তৎকালে একদিনের মধ্যে মহাসমারোহ পূর্ণ ঐ অনুষ্ঠান করা সম্ভব ছিল না। সুতরাং ‘পুষ্যা নক্ষত্রযোগ’ শব্দ ব্যবহার করে রহস্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

এই ঘোষণার কথা জেনে লক্ষ্মণ, সুমিত্রা ও সীতার সঙ্গে কৌশল্য জনার্দনের ধ্যান করেছিলেন। জনার্দন,—জন (লোক)—অর্দ (যাচ্ঞা করা) + অনটু কর্ম; জনগণ যাঁহাকে যাচ্ঞা করে। জনার্দন অর্থ বিষ্ণু। এই সূত্রে বসন্ত ঋতুর চৈত্র মাসের সূর্য। বরাহ মতে চৈত্র মাসের আদিত্যর নাম বিষ্ণু।

অতঃপর দশরথ পুনরায় রামকে ডেকে জানিয়েছিলেন যে তার জন্ম নক্ষত্রে সূর্য, মঙ্গল ও রাহুর সমাবেশ হয়েছে, যা জাতক ও রাজ্যের পক্ষে বিশেষ ক্ষতিকর। ইক্ষ্বাকু বংশের কুলনক্ষত্র বিশাখা যার বিপরীতে কৃত্তিকা নক্ষত্রে পূর্ণিমায় একদা বিষুব হত। এই হিসাবে কৃত্তিকা নক্ষত্রে সূর্য মঙ্গল ও রাহুর সমাবেশ বিবেচনা করে বলা যায় তখন বৈশাখ মাস।

উৎসবের আয়োজন চলছে যখন সেই সময় কৈকেয়ীর দাসী মন্থরা রামের ধাত্রীর কাছে রামের রাজ্যাভিষেকের সংবাদ পেয়ে কৈকেয়ীকে জানাল। কৈকেয়ী এই সুসংবাদে আনন্দিত হয়ে মন্থরাকে গলার হার উপহার দিয়েছিলেন। বিনিময়ে মন্থরা কৈকেয়ীকে কুমন্ত্রনা দিয়ে রামের চোদ্দ বৎসর বনবাস ও ভরতের রাজ্যলাভের ব্যবস্থা করল। অথচ রামের বনগমনের পরে ভরত ও শত্ৰুঘ্ন অযোধ্যায় প্রত্যাগত হলে মন্থরাকে তাদের হাতে অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল।

মন্থরার প্রচেষ্টায় মূলতঃ রামকথার বিস্তার লাভ ঘটেছে। অথচ ভরত রাজ্যলাভ করার পর সমগ্র রামায়ণে মন্থরার আর কোন উল্লেখ নাই। আদিকবি মন্থরাকে কুব্জা বলে উল্লেখ করেছেন; এমন কি বক্রা ও পরমপাপিকা (অশুভদৰ্শনা) বলতেও দ্বিধা করেননি। অথচ তিনিই মন্থরার যে রূপবর্ণনা করেছেন সেই অনুসারে একটি রূপসী নারী কল্পনায় ভেসে ওঠে।

“পৃথিবীতে বিকলাঙ্গ অশুভদৰ্শন অনেক কুব্জা আছে, কিন্তু তুমি বায়ুভরে অবনত কমলিনীর ন্যায় অতি প্রিয়দর্শনা। মন্থরে! তোমার বদন বিমল চন্দ্রের ন্যায় আহ্লাদকর; তোমার বক্ষস্থল স্কন্ধ হইতে উন্নত হইয়া ক্ৰমশঃ অবনত হইয়াছে; তোমার স্তন-দুটী অতি স্থূল, তোমার উত্তম-নাভিবিশিষ্ট উদর লজ্জিতের ন্যায় সন্নত হইয়াছে, তোমার জঘন একে ত অতিবিস্তীর্ণ ও নির্দ্দোষ, তাহাতে মনোহর কাঞ্চীদামে বিভূষিত হইয়া আরও মনোহর হইয়াছে; তোমার জঙ্ঘা দুটী অতি প্রশংসনীয় এবং তোমার উভয় পদতলই সম্যক্ প্রশস্ত; আহা! তোমার কি শোভা। মন্থরে! তোমার জঙ্ঘা সম্যক্ আয়তা, এজন্য যখন তুমি ক্ষৌমবাস পরিধান করিয়া আমার অগ্রে অগ্রে গমন কর, তখন তোমার অতীব শোভা হয়।”(৩)

এত সুন্দর সুগঠিত দেহসৌষ্ঠব যার সেই মন্থরাকে কুজা, বিকলাঙ্গ (বক্রা) ও অশুভদৰ্শন (পরমপাপিক) কিভাবে বলা যায়? পরবর্তী একটি শ্লোকে মন্থরা সম্পর্কে আদিকবি বলছেন, —

হৃদয়ে তে নিবিষ্টান্তা ভূয়শ্চান্যাঃ সহস্রশঃ।
তদেব স্থগু যদ্দীর্ঘং রথঘোণমিবায়তম্॥ ৪৬ (২.৯.8৬)

এই শ্লোকের রথঘোণ অর্থাৎ রথনাভি (রথচক্ৰ মধ্যস্থ দারুপিণ্ডিকা) সদৃশ্য স্থগু অর্থাৎ মাংসপিণ্ড শব্দটির সূত্র ধরে আমরা কুব্জা শব্দের সমর্থন খুঁজেছি। মূলতঃ রথঘোণ শব্দটি প্রয়োগ করে এখানে স্থগু অর্থে মন্থরার যুগ্ম পয়োধরের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে। হৃদয়ে যার সহস্ৰ মায়া, সেই প্রসঙ্গে পিঠের কুঁজের কথা উঠতেই পারে না। এই দৃষ্টিকোণ হতে মন্থরার ভূমিকা চিন্তা করতে হবে।

মন্থরা,—মন্থর শব্দ + আপ্‌; মন্দগামিনী, ধীরা ইত্যাদি।

মন্থর,—মন্থ্‌ (মন্থন করা ইত্যাদি) + অরন্‌ কর্তৃ; মন্দগামী, ধীর, পৃথু, বকু, বৃহৎ, নত ইত্যাদি।

মন্থরাকে কুব্জা বলা হয়েছে। কুব্জ,–কু (অশুভ, কুটিল) উজ (ঋজুতা) যার; অর্থাৎ, যে অশুভঘটনপারদর্শী অথবা কুটিলতায় যে দৃঢ়।

শনিগ্ৰহর অনেক নামের মধ্যে দুটি নাম হল মন্দ এবং পঙ্গু। প্রাচীন সাহিত্যে শনিগ্রহকে মন্থীন বলা হয়েছে।(৪)মন্থরার প্রতি আরোপিত বিশেষণগুলি শনিগ্রহর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুতরাং রহস্য সৃষ্টির কারণে শনিগ্রহকে স্ত্রী-রূপে কল্পনা করে মন্থরা নামে অভিহিত করা হয়েছে।

রাম কাহিনীতে মানবী মন্থরার যে ভূমিকাই থাক, বর্তমান বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে চরিত্রটি শনিগ্ৰহর রূপক। রামের চব্বিশ বৎসর বয়স পূর্ণ হওয়ার কালে শনিগ্ৰহর অবস্থান ছিল কর্কট রাশিতে অশ্লেষা নক্ষত্রে ১০৬°৪০’ (একশত ছয় অংশ চল্লিশ কলায়); এই সময় বক্ৰী থাকলে পুষ্যা নক্ষত্রে অবস্থান হবে।

‘রাম জন্ম কথা’ প্রকরণে প্রমাণ রেখেছি মিথুন রাশি পর্যন্ত কৌসল্যা (গ্রীষ্মঋতু) এবং কর্কট রাশি হতে চার রাশি পর্যন্ত কৈকেয়ী (বৰ্ষাঋতু)। রামায়ণের কালে দক্ষিণায়নাদি ছিল পুষ্যা নক্ষত্রর প্রথম পাদে।

মন্থরা কৈলাস শিখর সদৃশ প্রাসাদশীর্ষে উঠে অপর প্রাসাদে অবস্থিত রামধারীর নিকট রামের রাজ্যাভিষেকের কথা জেনেছিল। কৈলাস মেরুর দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থিত। সুতরাং কৈলাস শিখর সদৃশ অর্থে দক্ষিণায়নাদির পূর্ব প্রান্তে পুষ্যা নক্ষত্রর পরে অশ্লেষা নক্ষত্র ধরা যায়।

ধাত্রী অর্থ জননী। রাম সূর্যবংশীয় মেঘদেবতা। তাহলে তাকে আদিত্য হিসাবে গণ্য করা যায়। আদিত্যগণকে ধারণ করেছেন অদিতি, অর্থাৎ পুনর্বসু নক্ষত্র।

ধাত্রী শব্দের অপর অর্থ গঙ্গা।  ধাত্রী ছিল পাণ্ডুর ক্ষৌম বসন পরিহিতা। এখানে গঙ্গা শব্দে ছায়াপথ, যেখানে মিথুন রাশি নিমজ্জ। এই সূত্রেও পুনর্বসু নক্ষত্রর ইংগিত গ্রহণ করা যায়।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় যে অভিষেকের প্রস্তুতির নির্দেশ দিতে বসিষ্ঠ রামের পাণ্ডুরবর্ণ মেঘতুল্যনিবিড়-প্রভাশালী বাসভবনে গিয়েছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণের আরোহণযোগ্য অশ্বযুক্ত উপযুক্ত রথে চেপে তৃতীয় কক্ষায় প্রবেশ করার পরে রামের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটেছিল।(৫)

রথ সমেত বাসভবনের তৃতীয় ঘরে প্রবেশ করা অবশ্যই বাস্তবোচিত ঘটনা নয়। সুতরাং এই বিবরণে সূর্যর কক্ষপথের তৃতীয় ভাগ অর্থাৎ মিথুন রাশি ইংগিত করা হয়েছে মনে করি। এক্ষেত্রে সূর্যর অবস্থান পুনর্বসু নক্ষত্রর শেষপাদে ধরে নেওয়া যায়। তখন গ্রীষ্মঋতুর শেষ অধ্যায়; একারণে রামের বাসভবনের বিবরণে পাণ্ডুরবর্ণ মেঘতুল্যনিবিড়প্রভাশালী বিশেষণ ব্যবহার করা হয়েছে।

মন্থ্রা প্রসঙ্গে শেষ পর্যায়ে শত্রুঘ্ন কর্তৃক লাঞ্ছনা। তারপর রামায়ণে মন্থরার আর কোন উল্লেখ নাই। এই ঘটনা শনিগ্ৰহর কর্কট রাশি ত্যাগ করাকে নির্দেশ করছে।

পরিশেষে রামায়ণের আরেকটি বিবরণের প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয়।

লক্ষ্মণ ও সীতাসহ রাম বনগমনের উদ্দেশ্যে অযোধ্যা ত্যাগ করলে সেদিন সূর্যাস্তের পর ত্রিশঙ্কু, মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতি এই সমস্ত দারুণ গ্রহ চন্দ্রের নিকটে অবস্থিত ছিল।(৬)

রামের জন্মকালে বৃহস্পতি পুনর্বসু নক্ষত্রে ছিল; সম্ভবতঃ কর্কট রাশির প্রথম পাদে। তাহলে রামের বয়স যখন চব্বিশ বৎসর কয়েক মাস তখনও বৃহস্পতির অবস্থান হবে কর্কট রাশিতে। সুতরাং অন্যান্য গ্রহগুলিও সেই সময় ঐ রাশিতে ছিল। বুধগ্রহ কখনও সূর্য হতে বেশী দূরে অবস্থান কবে না। সুতরাং সূর্যর কাছাকাছি থাকাই স্বাভাবিক। অতএব সময়কালটি কৃষ্ণ পক্ষ। এখানে ত্রিশঙ্কু শব্দটি রহস্যর সৃষ্টি করছে। পূর্বোক্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা যায় এই শব্দ দ্বারা শনিগ্ৰহ বুঝানে হয়েছে। শনিগ্ৰহর তিনটি বলয়ের তথ্যকে ভিত্তি করে ত্রিশঙ্কু নামকরণ হয়েছে।

ত্রিশঙ্কুর প্রচলিত কাহিনী হল বিশ্বামিত্র নিজের তপস্যাফলে তাকে সশরীরে স্বগে পাঠালে ইন্দ্র বললেন, ত্রিশঙ্কু, ‘তুমি গুরুশাপহত, অতএব অবাকশিরা হইয়া ভূপতিত হও’। ত্রিশঙ্কুকে পতনোমুখ দেখে বিশ্বামিত্র ‘তিষ্ঠ তিষ্ঠ’ বলে তাকে অন্তরালে অবস্থিত করলেন।

অবাকশির অর্থ অবনতমস্তক। নভোঃমণ্ডলে একমাত্র শনিগ্ৰহর অবস্থান দেখে মনে হয় যেন আনতমুখে নিজ কক্ষপথে বিচরণ করছে। সুতরাং ‘অবাকশিরাস্ত্রিশঙ্কু’ শব্দে শনিগ্ৰহর ইংগিত মানতে হয়।

রাম-কথার ঘটনা কালে শনিগ্ৰহর বিভিন্ন অবস্থানকে ভিত্তি করে দুইটি রূপক কাহিনী ও একটি রূপক নামের অবতারণা করে কালনির্দেশ করা হয়েছে।

———————

পাদটীকা

(১) বাল্মীকি রামায়ণ : সুন্দরকাও ৩৮ এবং ৬৭ সর্গ।

(২) ঐ : ৫.৩৮.৬৪; ৫.৪০.১০

(৩) ঐ : ২.৯.৪০-৪৫

(৪) “……… … … there is also a convention of taking Manthin to mean Saturn” —Sankar Balakrishna, Dikshit in “English Translation of

Bharatiya Jyotish Sastra’, Part-I, Page-61. Published by the Manager of Publications, Civil lines, Delhi, 1969

(৫) বাল্মীকি রামায়ণ : ২.৫.৪-৫

(৬) ঐ : ২.৫১.১০