মদনভস্মের পর

পঞ্চশরে দগ্ধ করে করেছ এ কী সন্ন্যাসী—       বিশ্বময় দিয়েছ তারে ছড়ায়ে। ব্যাকুলতর বেদনা তার বাতাসে উঠে নিশ্বাসি,       অশ্রু তার আকাশে পড়ে গড়ায়ে। ভরিয়া উঠে নিখিল ভব রতিবিলাপসংগীতে,       সকল দিক কাঁদিয়া উঠে আপনি। ফাগুন‐মাসে নিমেষ‐মাঝে না জানি কার ইঙ্গিতে       শিহরি উঠি...

মদনভস্মের পূর্বে

একদা তুমি অঙ্গ ধরি ফিরিতে নব ভুবনে,       মরি মরি, অনঙ্গদেবতা। কুসুমরথে মকরকেতু উড়িত মধুপবনে,       পথিকবধূ চরণে প্রণতা। ছড়াত পথে আঁচল হতে অশোক চাঁপা করবী       মিলিয়া যত তরুণ তরুণী, বকুলবনে পবন হত সুরার মতো সুরভি—       পরান হত অরুণবরনি। সন্ধ্যা হলে কুমারীদলে বিজন তব...

মনে রবে কি না রবে আমারে

মনে রবে কি না রবে আমারে   সে আমার মনে নাই। ক্ষণে ক্ষণে আসি তব দুয়ারে,   অকারণে গান গাই॥ চলে যায় দিন, যতখন আছি   পথে যেতে যদি আসি কাছাকাছি তোমার মুখের চকিত সুখের   হাসি দেখিতে যে চাই—           তাই   অকারণে গান গাই॥ ফাগুনের ফুল যায় ঝরিয়া   ফাগুনের অবসানে—...

মরণ রে তুঁহুঁ মম শ্যামসমান

         মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।     মেঘবরণ তুঝ, মেঘজটাজূট,     রক্তকমলকর, রক্ত‐অধরপুট,     তাপবিমোচন করুণ কোর তব          মৃত্যু‐অমৃত করে দান॥               আকুল রাধা‐রিঝ অতি জরজর,               ঝরই নয়নদউ অনুখন ঝরঝর—               তুঁহুঁ মম মাধব, তুঁহুঁ মম দোসর,...

মরিয়া

        মেঘ কেটে গেল             আজি এ সকাল বেলায়।         হাসিমুখে এসো             অলস দিনেরি খেলায়।     আশানিরাশার সঞ্চয় যত             সুখদুঃখের ঘেরে ভরে ছিল যাহা সার্থক আর             নিষ্ফল প্রণয়েরে, অকূলের পানে দিব তা ভাসায়ে             ভাঁটার গাঙের ভেলায়।...

মহামায়া

প্রথম পরিচ্ছেদ মহামায়া এবং রাজীবলোচন উভয়ে নদীর ধারে একটা ভাঙা মন্দিরে সাক্ষাৎ করিল। মহামায়া কোনো কথা না বলিয়া তাহার স্বাভাবিক গম্ভীর দৃষ্টি ঈষৎ ভর্ৎসনার ভাবে রাজীবের প্রতি নিক্ষেপ করিল। তাহার মর্ম এই, ‘তুমি কী সাহসে আজ অসময়ে আমাকে এখানে আহ্বান করিয়া আনিয়াছ। আমি...

মা কি তুই পরের দ্বারে

     মা কি তুই       পরের দ্বারে পাঠাবি তোর ঘরের ছেলে?      তারা যে         করে হেলা, মারে ঢেলা, ভিক্ষাঝুলি দেখতে পেলে॥                         করেছি      মাথা নিচু,    চলেছি   যাহার পিছু                              যদি বা     দেয় সে কিছু অবহেলে—...

মাতার আহ্বান

বারেক তোমার দুয়ারে দাঁড়ায়ে   ফুকারিয়া ডাকো জননী! প্রান্তরে তব সন্ধ্যা নামিছে,   আঁধারে ঘেরিছে ধরণী। ডাকো, ‘চলে আয়, তোরা কোলে আয়।’ ডাকো সকরুণ আপন ভাষায়; সে বাণী হৃদয়ে করুণা জাগায়,   বেজে ওঠে শিরা ধমনী— হেলায় খেলায় যে আছে যেথায়   সচকিয়া উঠে অমনি। আমরা প্রভাতে নদী পার...

মাতৃমন্দির-পুণ্য-অঙ্গন কর

মাতৃমন্দির-পুণ্য-অঙ্গন কর’ মহোজ্জ্বল আজ হে বর      -পুত্রসঙ্ঘ বিরাজ’ হে। শুভ     শঙ্খ বাজহ বাজ’ হে। ঘন      তিমিররাত্রির চির প্রতীক্ষা           পূর্ণ কর’, লহ’ জ্যোতিদীক্ষা,           যাত্রীদল সব সাজ’ হে।...

মাধব না কহ আদরবাণী

মাধব না কহ আদরবাণী,   না কর প্রেমক নাম। জানয়ি মুঝকো অবলা সরলা   ছলনা না কর শ্যাম। কপট, কাহ তুঁহু ঝূট বোলসি,   পীরিত করসি তু মোয়। ভালে ভালে হম অলপে চিহ্ণনু,   না পতিয়াব রে তোয়। ছিদল‐তরী‐সম কপট প্রেম‐’পর   ডরনু যব মনপ্রাণ ডুবনু ডুবনু রে ঘোর সায়রে,   অব কুত নাহিক ত্রাণ।...

মানভঞ্জন

প্রথম পরিচ্ছেদ রমানাথ শীলের ত্রিতল অট্টালিকায় সর্বোচ্চ তলের ঘরে গোপীনাথ শীলের স্ত্রী গিরিবালা বাস করে। শয়নকক্ষের দক্ষিণদ্বারের সম্মুখে ফুলের টবে গুটিকতক বেলফুল এবং গোলাপফুলের গাছ – ছাতটি উচ্চ প্রাচীর দিয়া ঘেরা-বহির্দৃশ্য দেখিবার জন্য প্রাচীরের মাঝে মাঝে একটি...

মানসপ্রতিমা

ইমনকল্যাণ তুমি    সন্ধ্যার মেঘ শান্তসুদূর          আমার সাধের সাধনা,            মম  শূন্যগগনবিহারী! আমি    আপন মনের মাধুরী মিশায়ে          তোমারে করেছি রচনা—            তুমি  আমারি যে তুমি আমারি,              মম  অসীমগগনবিহারী!   মম     হৃদয়রক্তরঞ্জনে তব          চরণ...

মানসী

    মনে নেই, বুঝি হবে অগ্রহান মাস,             তখন তরণীবাস                 ছিল মোর পদ্মাবক্ষ-‘পরে।             বামে বালুচরে     সর্বশূণ্য শুভ্রতার না পাই অবধি।             ধারে ধারে নদী কলরবধারা দিয়ে নিঃশব্দেরে করিছে মিনতি।     ওপারেতে আকাশের প্রশান্ত প্রণতি...

মার্জনা

ওগো    প্রিয়তম, আমি তোমারে যে ভালোবেসেছি   মোরে    দয়া করে কোরো মার্জনা কোরো মার্জনা। ভীরু     পাখির মতন তব পিঞ্জরে এসেছি,   ওগো,    তাই বলে দ্বার কোরো না রুদ্ধ কোরো না। মোর    যাহা‐কিছু ছিল কিছুই পারি নি রাখিতে, মোর    উতলা হৃদয় তিলেক পারি নি ঢাকিতে, সখা,    তুমি...

মীনু

মীনু পশ্চিমে মানুষ হয়েছে। ছেলেবেলায় ইঁদারার ধারে তুঁতের গাছে লুকিয়ে ফল পাড়তে যেত; আর অড়রখেতে যে বুড়ো মালী ঘাস নিড়োত তার সঙ্গে ওর ছিল ভাব। বড়ো হয়ে জৌনপুরে হল ওর বিয়ে। একটি ছেলে হয়ে মারা গেল, তার পরে ডাক্তার বললে, ‘এও বাঁচে কি না-বাঁচে।’ তখন তাকে কলকাতায় নিয়ে এল। ওর...

মুক্তপথে

বাঁকাও ভুরু দ্বারে আগল দিয়া,           চক্ষু করো রাঙা, ঐ আসে মোর জাত-খোয়ানো প্রিয়া           ভদ্র-নিয়ম-ভাঙা। আসন পাবার কাঙাল ও নয় তো           আচার-মানা ঘরে– আমি ওকে বসাব হয়তো           ময়লা কাঁথার ‘পরে। সাবধানে রয় বাজার-দরের খোঁজে           সাধু...

মুক্তি

বিরহিণী তার ফুলবাগানের এক ধারে বেদী সাজিয়ে তার উপর মূর্তি গড়তে বসল। তার মনের মধ্যে যে মানুষটি ছিল বাইরে তারই প্রতিরূপ প্রতিদিন একটু একটু করে গড়ে, আর চেয়ে চেয়ে দেখে, আর ভাবে, আর চোখ দিয়ে জল পড়ে। কিন্তু, যে রূপটি একদিন তার চিত্তপটে স্পষ্ট ছিল তার উপরে ক্রমে যেন ছায়া পড়ে...

মুক্তির উপায়

ফকিরচাঁদ বাল্যকাল হইতেই গম্ভীরপ্রকৃতি। বৃদ্ধসমাজে তাহাকে কখনোই বেমানান দেখাইত না। ঠাণ্ডা জল, হিম এবং হাস্যপরিহাস তাহার একেবারে সহ্য হইত না। একে গম্ভীর, তাহাতে বৎসরের মধ্যে অধিকাংশ সময়েই মুখমণ্ডলের চারি দিকে কালো পশমের গলাবন্ধ জড়াইয়া থাকাতে তাহাকে ভয়ংকর উঁচুদরের লোক...

মেঘ ও রৌদ্র

প্রথম পরিচ্ছেদ পূর্বদিন বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে। আজ ক্ষান্তবর্ষণ প্রাতঃকাল ম্লান রৌদ্র ও খণ্ড মেঘে মিলিয়া পরিপক্বপ্রায় আউশ ধানের ক্ষেত্রের উপর পর্যায়ক্রমে আপন আপন সুদীর্ঘ তুলি বুলাইয়া যাইতেছিল; সুবিস্তৃত শ্যাম চিত্রপট একবার আলোকের স্পর্শে উজ্জ্বল পাণ্ডুবর্ণ ধারণ করিতেছিল...

মেঘদূত

মিলনের প্রথম দিনে বাঁশি কী বলেছিল? সে বলেছিল, ‘সেই মানুষ আমার কাছে এল যে মানুষ আমার দূরের।’ আর বাঁশি বলেছিল, ‘ধরলেও যাকে ধরা যায় না তাকে ধরেছি, পেলেও সকল পাওয়াকে যে ছাড়িয়ে যায় তাকে পাওয়া গেল।’ তার পরে রোজ বাঁশি বাজে না কেন? কেননা, আধখানা কথা ভুলেছি। শুধু মনে রইল, সে...