বঁধুয়া, হিয়া-পর আও রে

         বঁধুয়া, হিয়া‐পর আও রে! মিঠি মিঠি হাসয়ি, মৃদু মৃদু ভাষয়ি,   হমার মুখ‐’পর চাও রে! যুগ‐যুগ‐সম কত দিবস ভেল গত,   শ্যাম, তু আওলি না— চন্দ‐উজর মধু‐মধুর কুঞ্জ‐’পর   মুরলি বজাওলি না! লয়ি গলি সাথ বয়ানক হাস রে,   লয়ি গলি নয়ন‐আনন্দ! শূন্য কুঞ্জবন, শূন্য হৃদয মন,   কঁহি...

বঙ্গলক্ষ্মী

তোমার মাঠের মাঝে, তব নদীতীরে, তব আম্রবনে‐ঘেরা সহস্র কুটিরে, দোহনমুখর গোষ্ঠে, ছায়াবটমূলে, গঙ্গার পাষাণঘাটে দ্বাদশ‐দেউলে, হে নিত্যকল্যাণী লক্ষ্ণী, হে বঙ্গজননী, আপন অজস্র কাজ করিছ আপনি অহর্নিশি হাস্যমুখে।                এ বিশ্বসমাজে তোমার পুত্রের হাত নাহি কোনো কাজে, নাহি...

বজাও রে মোহন বাঁশি

       বজাও রে মোহন বাঁশি। সার দিবসক            বিরহদহনদুখ        মরমক তিয়াষ নাশি॥ রিঝ‐মন‐ভেদন           বাঁশরিবাদন        কঁহা শিখলি রে কান!— হানে থিরথির          মরম‐অবশকর        লহু লহু মধুময় বাণ। ধসধস করতহ          উরহ বিয়াকুলু,        ঢুলু ঢুলু অবশ নয়ান। কত শত...

বর্ষশেষ

১৩০৫ সালে ৩০শে চৈত্র ঝড়ের দিনে রচিত ঈশানের পুঞ্জমেঘ অন্ধবেগে ধেয়ে চলে আসে           বাধাবন্ধহারা গ্রামান্তরে বেণুকুঞ্জে নীলাঞ্জনছায়া সঞ্চারিয়া           হানি দীর্ঘধারা। বর্ষ হয়ে আসে শেষ, দিন হয়ে এল সমাপন,           চৈত্র অবসান— গাহিতে চাহিছে হিয়া পুরাতন ক্লান্ত বরষের...

বর্ষামঙ্গল

ওই আসে ওই    অতি ভৈরব   হরষে জলসিঞ্চিত ক্ষিতিসৌরভ‐রভসে    ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা       শ্যামগম্ভীর‐সরসা। গুরুগর্জনে নীল অরণ্য শিহরে, উতলা কলাপী কেকাকলরবে বিহরে;       নিখিলচিত্তহরষা    ঘনগৌরবে আসিছে মত্ত বরষা।   কোথা তোরা অয়ি তরুণী পথিকললনা, জনপদবধূ তড়িৎ‐চকিত‐নয়না,   ...

বলাকা (সন্ধ্যারাগে-ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা)

সন্ধ্যারাগে-ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা আঁধারে মলিন হল, যেন খাপে ঢাকা বাঁকা তলোয়ার! দিনের ভাঁটার শেষে রাত্রির জোয়ার এল তার ভেসে-আসা তারাফুল নিয়ে কালো জলে; অন্ধকার গিরিতটতলে দেওদার-তরু সারে সারে; মনে হল, সৃষ্টি যেন স্বপ্নে চায় কথা কহিবারে, বলিতে না পারে স্পষ্ট...

বসন্ত

অযুত বৎসর আগে হে বসন্ত, প্রথম ফাল্গুনে               মত্ত কুতূহলী, প্রথম যেদিন খুলি নন্দনের দক্ষিণদুয়ার               মর্তে এলে চলি, অকস্মাৎ দাঁড়াইলে মানবের কুটিরপ্রাঙ্গণে               পীতাম্বর পরি, উতলা উত্তরী হতে উড়াইয়া উন্মাদ পবনে               মন্দারমঞ্জরী, দলে...

বসন্ত আওল রে

                বসন্ত আওল রে! মধুকর গুন গুন, অমুয়ামঞ্জরী    কানন ছাওল রে। শুন শুন সজনী, হৃদয় প্রাণ মম    হরখে আকুল ভেল, জর জর রিঝসে দুঃখদহন সব    দূর দূর চলি গেল। মরমে বহৈ বসন্তসমীরণ,    মরমে ফুটই ফুল, মরমকুঞ্জ‐’পর বোলই কুহুকুহু    অহরহ কোকিলকুল। সখি রে, উচ্ছল...

বহু যুগের ও পার হতে

বহু যুগের ও পার হতে আষাঢ় এল আমার মনে, কোন্‌ সে কবির ছন্দ বাজে ঝরো ঝরো বরিষনে॥ যে মিলনের মালাগুলি ধুলায় মিশে হল ধূলি গন্ধ তারি ভেসে আসে আজি সজল সমীরণে॥ সে দিন এমনি মেঘের ঘটা রেবানদীর তীরে, এমনি বারি ঝরেছিল শ্যামলশৈলশিরে। মালবিকা অনিমিখে চেয়ে ছিল পথের দিকে, সেই চাহনি এল...

বাঁশি

                        কিনু গোয়ালার গলি।                           দোতলা বাড়ির                  লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর                             পথের ধারেই।                লোনাধরা দেয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি,...

বাঁশি

বাঁশির বাণী চিরদিনের বাণী—শিবের জটা থেকে গঙ্গার ধারা, প্রতি দিনের মাটির বুক বেয়ে চলেছে; অমরাবতীর শিশু নেমে এল মর্ত্যের ধূলি দিয়ে স্বর্গ-স্বর্গ খেলতে। পথের ধারে দাঁড়িয়ে বাঁশি শুনি আর মন যে কেমন করে বুঝতে পারি নে। সেই ব্যথাকে চেনা সুখদুঃখের সঙ্গে মেলাতে যাই, মেলে না।...

বাংলার মাটি, বাংলার জল

বাংলার মাটি, বাংলার জল,   বাংলার বায়ু, বাংলার ফল— পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান॥ বাংলার ঘর, বাংলার হাট,   বাংলার বন, বাংলার মাঠ— পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান॥ বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা—...

বাণী

ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে আকাশের মেঘ নামে— মাটির কাছে ধরা দেবে ব’লে। তেমনি কোথা থেকে মেয়েরা আসে পৃথিবীতে বাঁধা পড়তে। তাদের জন্য অল্প জায়গার জগৎ অল্প মানুষের। ঐটুকুর মধ্যে আপনার সবটাকে ধরানো চাই— আপনার সব কথা, সব ব্যথা, সব ভাবনা। তাই তাদের মাথায় কাপড়, হাতে কাঁকন, আঙিনায়...

বাণীহারা

ওগো মোর     নাহি যে বাণী     আকাশে হৃদয় শুধু বিছাতে জানি।         আমি অমাবিভাবরী আলোকহারা             মেলিয়া তারা         চাহি নিঃশেষ পথপানে             নিষ্ফল আশা নিয়ে প্রাণে।         বহুদূরে বাজে তব বাঁশি,             সকরুণ সুর আসে ভাসি                 বিহ্বল...

বাদরবরখন, নীরদগরজন

বাদরবরখন, নীরদগরজন,   বিজুলিচমকন ঘোর, উপেখই কৈছে আও তু কুঞ্জে   নিতিনিতি মাধব মোর। ঘন ঘন চপলা চমকয় যব পহু,   বজরপাত যব হোয়, তুঁহুক বাত তব সমরযি প্রিয়তম,   ডর অতি লাগত মোয়। অঙ্গবসন তব ভীঁখত মাধব,   ঘন ঘন বরখত মেহ, ক্ষুদ্র বালি হম, হমকো লাগয়   কাহ উপেখবি দেহ॥ বইস বইস,...

বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল

বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান॥ মেঘের ছায়ায় অন্ধকারে রেখেছি ঢেকে তারে এই-যে আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান॥ আজ এনে দিলে, হয়তো দিবে না কাল-- রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল। এ গান আমার শ্রাবণে শ্রাবণে তব বিস্মৃতিস্রোতের প্লাবনে ফিরিয়া...

বার বার, সখি, বারণ করনু

বার বার, সখি, বারণ করনু   ন যাও মথুরাধাম বিসরি প্রেমদুখ রাজভোগ যথি   করত হমারই শ্যাম। ধিক্ তুঁহু দাম্ভিক, ধিক্ রসনা ধিক্,   লইলি কাহারই নাম। বোল ত সজনি, মথুরা‐অধিপতি   সো কি হমারই শ্যাম। ধনকো শ্যাম সো, মথুরাপুরকো,   রাজ্যমানকো হোয়। নহ পীরিতিকো, ব্রজকামিনীকো,   নিচয়...

বিচারক

প্রথম পরিচ্ছেদ অনেক অবস্থান্তরের পর অবশেষে গতযৌবনা ক্ষীরোদা যে পুরুষের আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়াছিল, সেও তাহাকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেল। তখন অন্নমুষ্টির জন্য দ্বিতীয় আশ্রয় অন্বেষণের চেষ্টা করিতে তাহার অত্যন্ত ধিক্কার বোধ হইল। যৌবনের শেষে শুভ্র শরৎকালের ন্যায়...

বিদায়

বসন্ত সে যায় তো হেসে, যাবার কালে      শেষ কুসুমের পরশ রাখে বনের ভালে।                তেমনি তুমি যাবে জানি,           ঝলক দেবে হাসিখানি, অলক হতে কসবে অশোক নাচের তালে। ভাসান-খেলার তরীখানি চলবে বেয়ে,      একলা ঘাটে রইব চেয়ে।           অস্তরবি তোমার পালে               ...

বিদায়

বিভাস        এবার চলিনু তবে। সময় হয়েছে নিকট, এখন        বাঁধন ছিঁড়িতে হবে। উচ্ছল জল করে ছলছল, জাগিয়া উঠেছে কলকোলাহল, তরণীপতাকা চলচঞ্চল        কাঁপিছে অধীর রবে। সময় হয়েছে নিকট, এখন        বাঁধন ছিঁড়িতে হবে।   আমি নিষ্ঠুর কঠিন কঠোর        নির্মম আমি আজি। আর নাহি দেরি,...