তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী

তুমি     কেমন করে গান করো হে গুণী, আমি     অবাক্ হয়ে শুনি কেবল শুনি॥    সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে,    সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,    পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে            বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী॥      মনে করি অমনি সুরে গাই,      কণ্ঠে আমার সুর খুঁজে না পাই।    কইতে কী চাই, কইতে কথা বাধে—    হার মেনে যে পরান আমার কাঁদে,     আমায় তুমি ফেলেছ কোন্ ফাঁদে            চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি॥

তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে

তুমি যে    সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে, এ আগুন      ছড়িয়ে গেল সব খানে॥ যত সব       মরা গাছের ডালে ডালে              নাচে আগুন তালে তালে   রে, আকাশে       হাত তোলে সে কার পানে॥ আঁধারের      তারা যত অবাক হয়ে রয় চেয়ে, কোথাকার     পাগল হাওয়া বয় ধেয়ে। নিশীথের      বুকের মাঝে এই-য়ে অমল              উঠল ফুটে স্বর্ণকমল   রে, আগুনের      কী গুণ আছে কে জানে॥

তোমার কাছে এ বর মাগি

তোমার কাছে এ বর মাগি,   মরণ হতে যেন জাগি              গানের সুরে॥ যেমনি নয়ন মেলি যেন    মাতার স্তন্যসুধা-হেন নবীন জীবন দেয় গো পুরে   গানের সুরে॥            সেথায় তরু তৃণ যত মাটির বাঁশি হতে ওঠে গানের মতো। আলোক সেথা দেয় গো আনি আকাশের আনন্দবাণী, হৃদয়্মাঝে বেড়ায় ঘুরে   গানের সুরে॥

তোমার বীণা আমার মনোমাঝে

তোমার বীণা আমার মনোমাঝে কখনো শুনি, কখনো ভুলি, কখনো শুনি না যে॥ আকাশ যবে শিহরি উঠে গানে গোপন কথা কহিতে থাকে ধরার কানে কানে— তাহার মাঝে সহসা মাতে বিষম কোলাহলে আমার মনে বাঁধনহারা স্বপন দলে দলে। হে বীণাপাণি, তোমার সভাতলে আকুল হিয়া উন্মাদিয়া বেসুর হয়ে বাজে॥ চলিতেছিনু তব কমলবনে, পথের মাঝে ভুলালো পথ উতলা সমীরণে। তোমার সুর ফাগুনরাতে জাগে, তোমার সুর অশোকশাখে অরুণরেণুরাগে। সে সুর বাহি চলিতে চাহি আপন-ভোলা মনে গুঞ্জরিত-ত্বরিত-পাখা মধুকরের সনে। কুহেলী কেন জড়ায় আবরণে— আঁধারে আলো আবিল করে, আঁখি যে মরে লাজে॥

তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায় তারি পারে

তোমার  সুরের ধারা ঝরে যেথায় তারি পারে দেবে কি গো বাসা আমায় একটি ধারে?।  আমি  শুনব ধ্বনি কানে,  আমি  ভরব ধ্বনি প্রানে,  সেই ধ্বনিতে চিত্তবীণায় তার বাঁধিব বারে বারে॥ আমার  নীরব বেলা সেই তোমারি সুরে সুরে  ফুলের ভিতর মধুর মতো উঠবে পুরে।  আমার  দিন ফুরাবে যবে,  যখন  রাত্রি আঁধার হবে,  হৃদয়ে মোর গানের তারা উঠবে ফুটে সারে সারে॥

তোমার সোনার থালায় সাজাব আজ দুখের অশ্রুধার

তোমার   সোনার থালায় সাজাব আজ দুখের অশ্রুধার।     জননী গো, গাঁথব তোমার গলার মুক্তাহার॥       চন্দ্র সূর্য পায়ের কাছে   মালা হয়ে জড়িয়ে আছে, তোমার  বুকে শোভা পাবে আমার দুখের অলঙ্কার॥       ধন ধান্য তোমারি ধন কী করবে তা কও।       দিতে চাও তো দিয়ো আমায়, নিতে চাও তো লও।     দুঃখ আমার ঘরের জিনিস,   খাঁটি রতন তুই তো চিনিস— তোর    প্রসাদ দিয়ে তারে কিনিস এ মোর অহঙ্কার॥

তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে

          তোর   আপন জনে ছাড়বে তোরে,               তা ব’লে    ভাবনা করা চলবে না।           ও তোর          আশালতা পড়বে ছিঁড়ে,               হয়তো রে ফল ফলবে না॥ আসবে পথে আঁধার নেমে,       তাই ব’লেই কি রইবি থেমে—           ও তুই      বারে বারে জ্বালবি বাতি,               হয়তো বাতি জ্বলবে না॥ শুনে তোমার মুখের বাণী         আসবে ঘিরে বনের প্রাণী—           হয়তো তোমার আপন ঘরে               পাষাণ হিয়া গলবে না। বদ্ধ দুয়ার দেখলি ব’লে  অমনি কি তুই আসবি চলে—           তোরে       বারে বারে ঠেলতে হবে,               হয়তো দুয়ার টলবে না॥