ছন্দ

গদ্যছন্দ

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত কথা যখন খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে তখন সে কেবলমাত্র আপন অর্থটুকু নিবেদন করে। যখন তাকে ছন্দের আঘাতে নাড়া দেওয়া যায় তখন তার কাছে অর্থের বেশি আরো কিছু বেরিয়ে পড়ে। সেটা জানার জিনিস নয়, বেদনার জিনিস। সেটাতে পদার্থের পরিচয় নয়, রসের সম্ভোগ। আবেগকে প্রকাশ...

চিঠিপত্র – ১ (জে, ডি, এণ্ডার্সন্‌কে লিখিত)

আপনি বলিয়াছেন, আমাদের উচ্চারণের ঝোঁকটা বাক্যের আরম্ভে পড়ে। ইহা আমি অনেক দিন পূর্বে লক্ষ্য করিয়াছি। ইংরেজিতে প্রত্যেক শব্দেরই একটি নিজস্ব ঝোঁক আছে। সেই বিচিত্র ঝোঁকগুলিকে নিপুণভাবে ব্যবহার করার দ্বারাই আপনাদের ছন্দ সংগীতে মুখরিত হইয়া উঠে। সংস্কৃত ভাষার ঝোঁক নাই কিন্তু...

চিঠিপত্র – ১০ (শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত)

শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত – ৬ ছন্দ নিয়ে যে-কথাটা তুলেছ সে সম্বন্ধে আমার বক্তব্যটা বলি। বাংলার উচ্চারণে হ্রস্বদীর্ঘ উচ্চারণভেদ নেই, সেইজন্যে বাংলাছন্দে সেটা চালাতে গেলে কৃত্রিমতা আসেই। ॥ ॥ ॥ হেসে হেসে হল যে অস্থির, ॥। । । মেয়েটা বুঝি ব্রাহ্মণবস্তির। এটা...

চিঠিপত্র – ১১ (শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত)

শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত – ৭ দীর্ঘহ্রস্ব ছন্দ সম্বন্ধে আর-একবার বলি। ও এক বিশেষ ধরনের লেখায় বিশেষ ভাষারীতিতেই চলতে পারে। আকবর বাদশার যোধপুরী মহিষীর জন্যে তিনি মহল বানিয়েছিলেন স্বতন্ত্র, সমগ্র প্রাসাদের মধ্যে সে আপন জাত বাঁচিয়ে নির্লিপ্ত ছিল। বাংলার...

চিঠিপত্র – ১২ (শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত)

শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত – ৮ বাংলায় প্রাক্‌হসন্ত স্বর দীর্ঘায়িত হয় এ কথা বলেছি। জল এবং জলা, এই দুটো শব্দের মাত্রাসংখ্যা সমান নয়। এই জন্যেই “টুমুস্‌ টুমুস্‌ বাদ্যি বাজে’ পদটাকে ত্রৈমাত্রিক বলেছি। টু-মু দুই সিলেব্‌ল্‌, পরবর্তী হসন্ত স্‌-ও এক...

চিঠিপত্র – ১৩ (শ্রীধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত)

শ্রীধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত যখন কবিতাগুলি পড়বে তখন পূর্বাভ্যাস-মতো মনে কোরো না ওগুলো পদ্য। অনেকে সেই চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে রুষ্ট হয়ে ওঠে। গদ্যের প্রতি গদ্যের সম্মানরক্ষা করে চলা উচিত। পুরুষকে সুন্দরী রমণীর মতো ব্যবহার করলে তার মর্যাদাহানি হয়। পুরুষেরও...

চিঠিপত্র – ১৪ (শ্রীধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত)

শ্রীধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত – ২ “পুনশ্চ’র কবিতাগুলোকে কোন্‌ সংজ্ঞা দেবে। পদ্য নয়, কারণ পদ নেই। গদ্য বললে, অতিব্যাপ্তি দোষ ঘটে। পক্ষিরাজ ঘোড়াকে পাখি বলবে না, ঘোড়া বলবে? গদ্যের পাখা উঠেছে এ কথা যদি বলি, তবে শত্রুপক্ষ বলে বসবে, “পিঁপিড়ার...

চিঠিপত্র – ১৫ (শ্রীধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত)

শ্রীধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত – ৩ গানের আলাপের সঙ্গে “পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের গদ্যিকারীতির যে তুলনা করেছ সেটা মন্দ হয় নি। কেননা আলাপের মধ্যে তালটা বাঁধনছাড়া হয়েও আত্মবিস্মৃত হয় না। অর্থাৎ, বাইরে থাকে না মৃদঙ্গের বোল, কিন্তু নিজের অঙ্গের মধ্যেই...

চিঠিপত্র – ১৬ (শ্রীধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত)

শ্রীধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত – ৪ সম্প্রতি কতকগুলো গদ্যকবিতা জড়ো করে “শেষসপ্তক’ নাম দিয়ে একখানি বই বের করেছি। সমালোচকরা ভেবে পাচ্ছেন না ঠিক কী বলবেন। একটা কিছু সংজ্ঞা দিতে হবে, তাই বলছেন আত্মজৈবনিক। অসম্ভব নয়, কিন্তু তাতে বলা হল না, এগুলো...

চিঠিপত্র – ১৭ (শ্রীধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত)

শ্রীধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত – ৫ অন্তরে যে ভাবটা অনির্বচনীয় তাকে প্রেয়সী নারী প্রকাশ করবে গানে নাচে, এটাকে লিরিক বলে স্বীকার করা হয়। এর ভঙ্গিগুলিকে ছন্দের বন্ধনে বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তারা সেই ছন্দের শাসনে পরস্পরকে যথাযথভাবে মেনে চলে ব’লেই তাদের...

চিঠিপত্র – ১৮ (শ্রীশৈলেন্দ্রনাথ ঘোষকে লিখিত)

শ্রীশৈলেন্দ্রনাথ ঘোষকে লিখিত – ১ গদ্যের চালটা পথে চলার চাল, পদ্যের চাল নাচের। এই নাচের গতির প্রত্যেক অংশের মধ্যে সুসংগতি থাকা চাই। যদি কোনো গতির মধ্যে নাচের ধরনটা থাকে অথচ সুসংগতি না থাকে তবে সেটা চলাও হবে না, নাচও হবে না, হবে খোঁড়ার চাল অথবা লম্ফঝম্প। কোনো...

চিঠিপত্র – ১৯ (শ্রীশৈলেন্দ্রনাথ ঘোষকে লিখিত)

শ্রীশৈলেন্দ্রনাথ ঘোষকে লিখিত – ২ গদ্যকে গদ্য বলে স্বীকার করেও তাকে কাব্যের পঙ্‌ক্তিতে বসিয়ে দিলে আচারবিরুদ্ধ হলেও সুবিচারবিরুদ্ধ না হতেও পারে, যদি তাতে কবিত্ব থাকে। ইদানীং দেখছি, গদ্য আর রাস মানছে না, অনেক সময় দেখি তার পিঠের উপর সেই সওয়ারটিই নেই যার জন্যে তার...

চিঠিপত্র – ২ (জে, ডি, এণ্ডার্সন্‌কে লিখিত)

সম্মুখসমরে পড়ি বীরচূড়ামণি বীরবাহু– এই বাক্যটি আবৃত্তি করিবার সময়ে আমরা “সম্মুখ’ শব্দটার উপর ঝোঁক দিয়া সেই এক ঝোঁকে একেবারে “বীরবাহু’ পর্যন্ত গড় গড় করিয়া চলিয়া যাইতে পারি। আমরা নিশ্বাসটার বাজে-খরচ করিতে নারাজ, এক নিশ্বাসে যতগুলা শব্দ...

চিঠিপত্র – ৩ (শ্রীপ্রমথ চৌধুরীকে লিখিত)

চলতি কথায় একটা লম্বা ছন্দের কবিতা লিখেছি। এটা কি পড়া যায় কিম্বা বোঝা যায় কিম্বা ছাপানো যেতে পারে। নাম-রূপের মধ্যে রূপটা আমি দিলুম, নাম দিতে হয় তুমি দিয়ো। … যারা আমার সাঁঝ-সকালের গানের দীপে জ্বালিয়ে দিলে আলো আপন হিয়ার পরশ দিয়ে, এই জীবনের সকল সাদা-কালো যাদের...

চিঠিপত্র – ৪ (শ্রীপ্যারীমোহন সেনগুপ্তকে লিখিত)

সংস্কৃত কাব্য-অনুবাদ সম্বন্ধে আমার মত এই যে, কাব্যধ্বনিময় গদ্যে ছাড়া বাংলা পদ্যচ্ছন্দে তার গাম্ভীর্য ও রস রক্ষা করা সহজ নয়। দুটি-চারটি শ্লোক কোনোমতে বানানো যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ কাব্যের অনুবাদকে সুখপাঠ্য ও সহজবোধ্য করা দুঃসাধ্য। নিতান্ত সরল পয়ারে তার অর্থটিকে...

চিঠিপত্র – ৫ (শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত)

গীতাঞ্জলির কয়েকটি গানের ছন্দ সম্বন্ধে কৈফিয়ত চেয়েছ। গোড়াতেই বলে রাখা দরকার গীতাঞ্জলিতে এমন অনেক কবিতা আছে যার ছন্দোরক্ষার বরাত দেওয়া হয়েছে গানের সুরের ‘পরে। অতএব, যে-পাঠকের ছন্দের কান আছে তিনি গানের খাতিরে এর মাত্রা কম-বেশি নিজেই দুরন্ত করে নিয়ে পড়তে পারেন, যাঁর...

চিঠিপত্র – ৬ (শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত)

তুমি এমন করে সব প্রশ্ন ফাঁদ যে দুচার কথায় সেরে দেওয়া অসম্ভব হয়, তোমার সম্বন্ধে আমার এই নালিশ। ১। “আবার এরা ঘিরেছে মোর মন’– এই পঙ্‌ক্তির ছন্দোমাত্রার সঙ্গে “দাহ আবার বেড়ে ওঠে ক্রমে’র মাত্রার অসাম্য ঘটেছে এই তোমার মত। “ক্রমে’...

চিঠিপত্র – ৭ (শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত)

তুমি যে “ম্লান’ শব্দটিকে হসন্তভাবে উচ্চারণ কর এ আমার কাছে নতুন লাগল। আমি কখনই “ম্লান্‌’ বলি নে। প্রকৃত-বাংলায় যে-সব শব্দ অতিপ্রচলিত তাদেরই উচ্চারণে এইরকম স্বরলুপ্তি সহ্য করা চলে। “ম্লান’ শব্দটা সে-জাতের নয় এবং ওটা অতি সুন্দর শব্দ,...

চিঠিপত্র – ৮ (শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত)

“তোমারই’ কথাটাকে সাধুভাষার ছন্দেও আমরা “তোমারি’ বলে গণ্য করি। এমন একদিন ছিল যখন করা হত না। আমিই প্রথমে এটা চালাই। “একটি’ শব্দকে সাধুভাষায় তিনমাত্রার মর্যাদা যদি দেও তবে ওর হসন্ত হরণ করে অত্যাচারের দ্বারা সেটা সম্ভব হয়। যদি হসন্ত রাখ...

চিঠিপত্র – ৯ (শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত)

শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত – ৫ ছন্দ সম্বন্ধে তুমি অতিমাত্র সচেতন হয়ে উঠেছ। শুধু তাই নয়, কোনোমতে নতুন ছন্দ তৈরি করাকে তুমি বিশেষ সার্থকতা বলে কল্পনা কর। আশা করি, এই অবস্থা একদিন তুমি কাটিয়ে উঠবে এবং ছন্দ সম্বন্ধে একেবারেই সহজ হবে তোমার মন। আজ তুমি ভাগবিভাগ করে...