কাব্য-নাটক

চিত্রাঙ্গদা – ০

উৎসর্গ স্নেহাস্পদ শ্রীমান অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ পরমকল্যাণীয়েষু বৎস, তুমি আমাকে তোমার যত্নরচিত চিত্রগুলি উপহার দিয়াছ, আমি তোমাকে আমার কাব্য এবং স্নেহ-আশীর্বাদ দিলাম। ১৫ শ্রাবণ ১২৯৯ মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সূচনা অনেক বছর আগে রেলগাড়িতে যাচ্ছিলুম...

চিত্রাঙ্গদা – ০১

১ অনঙ্গ-আশ্রম চিত্রাঙ্গদা মদন ও বসন্ত চিত্রাঙ্গদা।       তুমি পঞ্চশর? মদন।                            আমি সেই মনসিজ, টেনে আনি নিখিলের নরনারী-হিয়া বেদনাবন্ধনে। চিত্রাঙ্গদা।                                কী বেদনা কী বন্ধন জানে তাহা দাসী। প্রণমি তোমার পদে।...

চিত্রাঙ্গদা – ০২

২ মণিপুর। অরণ্যে শিবালয় অর্জুন অর্জুন।                 কাহারে হেরিনু? সে কি সত্য, কিম্বা মায়া? নিবিড় নির্জন বনে নির্মল সরসী– এমনি নিভৃত নিরালয়, মনে হয়, নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নে সেথা বনলক্ষীগণ স্নান করে যায়, গভীর পূর্ণিমারাত্রে সেই সুপ্ত সরসীর স্নিগ্ধ শষ্পতটে...

চিত্রাঙ্গদা – ০৩

৩ তরুতলে চিত্রাঙ্গদা চিত্রাঙ্গদা।                    হায়, হায়, সে কি ফিরাইতে পারি! সেই থরথর ব্যাকুলতা বীরহৃদয়ের তৃষার্ত কম্পিত এক ষ্ফুলিঙ্গনিশ্বাসী হোমাগ্নিশিখার মতো; সেই, নয়নের দৃষ্টি যেন অন্তরের বাহু হয়ে কেড়ে নিতে আসিছে আমায়; উত্তপ্ত হৃদয়...

চিত্রাঙ্গদা – ০৪

৪ অর্জুন ও চিত্রাঙ্গদা চিত্রাঙ্গদা।       কী দেখিছ বীর। অর্জুন।                             দেখিতেছি পুষ্পবৃন্ত ধরি, কোমল অঙ্গুলিগুলি রচিতেছে মালা; নিপুণতা চারুতায় দুই বোনে মিলি, খেলা করিতেছে যেন সারাবেলা চঞ্চল উল্লাসে, অঙ্গুলির আগে আগে। দেখিতেছি আর ভাবিতেছি।...

চিত্রাঙ্গদা – ০৫

৫ মদন ও বসন্ত মদন।                   আমি পঞ্চশর, সখা; এক শরে হাসি, অশ্রু এক শরে; এক শরে আশা, অন্য শরে ভয়, এক শরে বিরহ-মিলন- আশা-ভয়-দুঃখ-সুখ এক নিমেষেই। বসন্ত।                   শ্রান্ত আমি, ক্ষান্ত দাও সখা! হে অনঙ্গ, সাঙ্গ করো রণরঙ্গ তব; রাত্রিদিন...

চিত্রাঙ্গদা – ০৬

৬ অরণ্যে অর্জুন অর্জুন।                    আমি যেন পাইয়াছি, প্রভাতে জাগিয়া ঘুম হতে, স্বপ্নলব্ধ অমূল্য রতন। রাখিবার স্থান তার নাহি এ ধরায়; ধরে রাখে এমন কিরীট নাই কোথা, গেঁথে রাখে হেন সূত্র নাই, ফেলে যাই হেন নরাধম নহি; তারে লয়ে তাই চিররাত্রি চিরদিন ক্ষত্রিয়ের বাহু...

চিত্রাঙ্গদা – ০৭

৭ মদন ও চিত্রাঙ্গদা চিত্রাঙ্গদা।  হে মন্মথ, কী জানি কী দিয়েছ মাখায়ে সর্বদেহে মোর। তীব্র মদিরার মতো রক্তসাথে মিশে, উন্মাদ করেছে মোরে। আপনার গতিগর্বে মত্ত মৃগী আমি ধাইতেছি মুক্তকেশে, উচ্ছ্বসিত বেশে পৃথিবী লঙ্ঘিয়া। ধনুর্ধর ঘনশ্যাম ব্যাধেরে আমার করিয়াছি পরিশ্রান্ত...

চিত্রাঙ্গদা – ০৮

৮ অর্জুন ও চিত্রাঙ্গদা অর্জুন।                    কোনো গৃহ নাই তব, প্রিয়ে, যে ভবনে কাঁদিছে বিরহে তব প্রিয়পরিজন? নিত্য স্নেহসেবা দিয়ে যে আনন্দপুরী রেখেছিলে সুধামগ্ন করে, যেথাকার প্রদীপ নিবায়ে দিয়ে এসেছ চলিয়া অরণ্যের মাঝে? আপন শৈশবস্মৃতি যেথায় কাঁদিতে যায় হেন স্থান নাই?...

চিত্রাঙ্গদা – ০৯

৯ বনচরগণ ও অর্জুন বনচর।          হায় হায়, কে রক্ষা করিবে। অর্জুন।                                         কী হয়েছে। বনচর।                    উত্তর-পর্বত হতে আসিছে ছুটিয়া দস্যুদল, বরষার পার্বত্য বন্যার মতো বেগে, বিনাশ করিতে লোকালয়। অর্জুন।...

চিত্রাঙ্গদা – ১০

১০ মদন বসন্ত ও চিত্রাঙ্গদা মদন।  শেষ রাত্রি আজি। বসন্ত।  আজ রাত্রি-অবসানে তব অঙ্গশোভা ফিরে যাবে বসন্তের অক্ষয় ভাণ্ডারে। পার্থের চুম্বনস্মৃতি ভুলে গিয়ে তব ওষ্ঠরাগ, দুটি নব কিশলয়ে মঞ্জরি উঠিবে লতিকায়। অঙ্গের বরন তব, শত শ্বেত ফুলে ধরিয়া নূতন তনু গতজন্মকথা...

চিত্রাঙ্গদা – ১১ (শেষ)

১১ শেষ রাত্রি অর্জুন ও চিত্রাঙ্গদা চিত্রাঙ্গদা।                    প্রভু, মিটিয়াছে সাধ? এই সুললিত সুগঠিত নবনীকোমল সৌন্দর্যের যত গন্ধ যত মধু ছিল সকলি কি করিয়াছ পান। আর-কিছু বাকি আছে? আর-কিছু চাও? আমার যা-কিছু ছিল সব হয়ে গেছে শেষ? হয় নাই প্রভু!...

বিসর্জন – ০

নাটকের পাত্রগণ গোবিন্দমাণিক্য – ত্রিপুরার রাজা; নক্ষত্ররায় – গোবিন্দমাণিক্যের কনিষ্ট ভ্রাতা; রঘুপতি – রাজপুরোহিত; জয়সিংহ – রঘুপতির পালিত রাজপুত যুবক, রাজমন্দিরের সেবক; চাঁদপাল – দেওয়ান; নয়নরায় – সেনাপতি; ধ্রুব – রাজপালিত বালক;...

বিসর্জন – ১

প্রথম অঙ্ক প্রথম দৃশ্য মন্দির গুণবতী গুণবতী। মার কাছে কী করেছি দোষ! ভিখারি যে সন্তান বিক্রয় করে উদরের দায়ে, তারে দাও শিশু–পাপিষ্ঠা যে লোকলাজে সন্তানেরে বধ করে, তার গর্ভে দাও পাঠাইয়া অসহায় জীব। আমি হেথা সোনার পালঙ্কে মহারানী, শত শত...

বিসর্জন – ২

দ্বিতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য   মন্দির রঘুপতি জয়সিংহ ও নক্ষত্ররায় নক্ষত্ররায়।              কী জন্য ডেকেছ গুরুদেব? রঘুপতি।                                           কাল রাত্রে স্বপন দিয়েছে দেবী, তুমি হবে রাজা নক্ষত্ররায়।               আমি হব রাজা! হা হা! বল কী ঠাকুর...

বিসর্জন – ৩

তৃতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য মন্দির রঘুপতি।                তোরা এখানে সব কী করতে এলি? সকলে।               আমরা ঠাকরুন দর্শন করতে এসেছি। রঘুপতি।...

বিসর্জন – ৪

চতুর্থ অঙ্ক প্রথম দৃশ্য বিচারসভা গোবিন্দমাণিক্য রঘুপতি নক্ষত্ররায় সভাসদ্‌গণ ও প্রহরীগণ রঘুপতিকে   গোবিন্দমাণিক্য।              আর কিছু বলিবার আছে?রঘুপতি।                                            কিছু নাই।   গোবিন্দমাণিক্য।              অপরাধ করিছ স্বীকার?   রঘুপতি।...

বিসর্জন – ৫

পঞ্চম অঙ্ক প্রথম দৃশ্য মন্দির। বাহিরে ঝড় রঘুপতি পুজোপকরণ লইয়া রঘুপতি।             এতদিনে আজ বুঝি জাগিয়াছে দেবী! ওই রোষহুহুংকার! অভিশাপ হাঁকি নগরের ‘পর দিয়া ধেয়ে চলিয়াছ তিমিররূপিণী! ওই বুঝি তোর প্রলয়-সঙ্গিণীগণ দারুণ ক্ষুধায় প্রাণপণে নাড়া দেয় বিশ্বমহাতরু!...

মালিনী – ০ সূচনা

মালিনী নাটিকার উৎপত্তির একটা বিশেষ ইতিহাস আছে, সে স্বপ্নঘটিত। কবিকঙ্কণকে দেবী স্বপ্নে আদেশ করেছিলেন তাঁর গুণকীর্তন করতে। আমার স্বপ্নে দেবীর আবির্ভাব ছিল না, ছিল হঠাৎ মনের একটা গভীর আত্মপ্রকাশ ঘুমন্ত বুদ্ধির সুযোগ নিয়ে। তখন ছিলুম লণ্ডনে। নিমন্ত্রণ ছিল প্রিমরোজ হিলে...

মালিনী – ১

প্রথম দৃশ্য রাজান্তঃপুর মালিনী ও কাশ্যপ < কাশ্যপ। ত্যাগ করো, বৎসে, ত্যাগ করো সুখ-আশা দুঃখভয় ;  দূর করো  বিষয়পিপাসা ; ছিন্ন করো সংসারবন্ধন ; পরিহর প্রমোদপ্রলাপ চঞ্চলতা ;  চিত্তে ধরো ধ্রুবশান্ত সুনির্মল প্রজ্ঞার আলোক রাত্রিদিন– মোহশোক পরাভূত হোক। মালিনী।...