প্রেম ও প্রকৃতি

অনন্তসাগরমাঝে দাও তরী ভাসাইয়া

অনন্তসাগরমাঝে দাও তরী ভাসাইয়া। গেছে সুখ, গেছে দুখ, গেছে আশা ফুরাইয়া॥ সম্মুখে অনন্ত রাত্রি, আমরা দুজনে যাত্রী, সম্মুখে শয়ান সিন্ধু দিগ্‌বিদিক হারাইয়া॥ জলধি রয়েছে স্থির, ধূ-ধূ করে সিন্ধুতীর, প্রশান্ত সুনীল নীর নীল শূণ্যে মিশাইয়া। নাহি সাড়া, নাহি শব্দ, মন্ত্রে যেন সব...

অবেলায় যদি এসেছ আমার বনে

অবেলায় যদি এসেছ আমার বনে দিনের বিদায়ক্ষণে গেয়ো না, গেয়ো না চঞ্চল গান ক্লান্ত এ সমীরণে ঘন বকুলের ম্লান বীথিকায় শীর্ণ যে ফুল ঝ'রে ঝ'রে যায় তাই দিয়ে হার কেন গাঁথ হায়, লাজ বাসি তায় মনে। চেয়ো না, চেয়ো না মোর দীনতায় হেলায় নয়ন-কোণে॥ এসো এসো কাল রজনীর অবসানে প্রভাত-আলোর...

অসীম সংসারে যার কেহ নাহি কাঁদিবার

অসীম সংসারে যার কেহ নাহি কাঁদিবার সে কেন গো কাঁদিছে! অশ্রুজল মুছিবার নাহি রে অঞ্চল যার সেও কেন কাঁদিছে! কেহ যার দুঃখগান শুনিতে পাতে না কান, বিমুখ সে হয় যারে শুনাইতে চায়, সে আর কিসের আশে রয়েছে সংসারপাশে-- জ্বলন্ত পরান বহে কিসের...

আজ বুকের বসন ছিঁড়ে ফেলে দাঁড়িয়েছে

আজ বুকের বসন ছিঁড়ে ফেলে দাঁড়িয়েছে এই প্রভাতখানি। আকাশেতে সোনার আলোয় ছড়িয়ে গেল তাহার বাণী। ওরে মন, খুলে দে মন, যা আছে তোর খুলে দে– অন্তরে যা ডুবে আছে আলোক-পানে তুলে দে। আনন্দে সব বাধা টুটে সবার সাথে ওঠ্‌ রে ফুটে– চোখের ‘পরে আলস-ভরে রাখিস নে আর আঁচল...

আজি কোন্‌ সুরে বাঁধিব

আজি কোন্‌ সুরে বাঁধিব দিন-অবসান-বেলারে দীর্ঘ ধূসর অবকাশে সঙ্গীজনবিহীন শূন্য ভবনে।-- সে কি মূক বিরহস্মৃতি গুঞ্জরণে তন্দ্রাহারা ঝিল্লিরবে। সে কি বিচ্ছেদরজনীর যাত্রী বিহঙ্গের পক্ষধ্বনিতে। সে কি অবগুণ্ঠিত প্রেমের কুণ্ঠিত বেদনায় সম্‌বৃত দীর্ঘশ্বাসে। সে কি উদ্ধত অভিমানে...

আপনহারা মাতোয়ারা আছি তোমার আশা ধরে

আপনহারা মাতোয়ারা আছি তোমার আশা ধরে-- ওগো সাকী, দেবে না কি পেয়ালা মোর ভ'রে ভ'রে॥ রসের ধারা সুধায় ছাঁকা, মৃগনাভির আভাস মাখা গো, বাতাস বেয়ে সুবাস তারি দূরের থেকে মাতায় মোরে॥ মুখ তুলে চাও ওগো প্রিয়ে-- তোমার হাতের প্রসাদ দিয়ে এক রজনীর মতো এবার দাও না আমায় অমর ক'রে।...

আবার মোরে পাগল করে দিবে কে

আবার মোরে পাগল করে দিবে কে। হৃদয় যেন পাষাণ-হেন বিরাগ-ভরা বিবেকে॥ আবার প্রাণে নূতন টানে প্রেমের নদী পাষাণ হতে উছল স্রোতে বহায় যদি– আবার দুটি নয়নে লুটি হৃদয় হ’রে নিবে কে! আবার মোরে পাগল করে দিবে কে॥ আবার কবে ধরণী হবে তরুণা। কাহার প্রেমে আসিবে নেমে স্বরগ হতে...

আমরা ঝ’রে-পড়া ফুলদল

আমরা ঝ'রে-পড়া ফুলদল ছেড়ে এসেছি ছায়া-করা বনতল-- ভুলায়ে নিয়ে এল মায়াবী সমীরণে। মাধবীবল্লরী করুণ কল্লোলে পিছন-পানে ডাকে কেন ক্ষণে ক্ষণে। মেঘের ছায়া ভেসে চলে চির উদাসী স্রোতের জলে-- দিশাহারা পথিক তারা মিলায় অকূল...

আমাকে যে বাঁধবে ধরে

আমাকে যে বাঁধবে ধরে, এই হবে যার সাধন-- সে কি অমনি হবে। আমার কাছে পড়লে বাঁধা সেই হবে মোর বাঁধন-- সে কি অমনি হবে॥ কে আমারে ভরসা করে আনতে আপন বশে-- সে কি অমনি হবে। আপনাকে সে করুক-না বশ, মজুক প্রেমের রসে-- সে কি অমনি হবে। আমাকে যে কাঁদাবে তার ভাগ্যে আছে কাঁদন-- সে কি অমনি...

আমার কী বেদনা সে কি জানো

আমার কী বেদনা সে কি জানো ওগো মিতা, সুদূরের মিতা। বর্ষণনিবিড় তিমিরে যামিনী বিজুলি-সচকিতা॥ বাদল-বাতাস ব্যেপে আমার হৃদয় উঠিছে কেঁপে-- সে কি জানো তুমি জানো। উৎসুক এই দুখজাগরণ এ কি হবে বৃথা ওগো মিতা, সুদূরের মিতা, আমার ভবনদ্বারে বোপিলে যারে সেই মালতী আজি বিকশিতা--সে কি...

আমার হারিয়ে যাওয়া দিন

আমার হারিয়ে যাওয়া দিন আর কি খুঁজে পাব তারে বাদল-দিনের আকাশ-পারে-- ছায়ায় হল লীন। কোন্‌ করুণ মুখের ছবি পুবেন হাওয়ায় মেলে দিল সজল ভৈরবী। এই গহন বনচ্ছায় অনেক কালের স্তব্ধবাণী কাহার অপেক্ষায় আছে...

আমি স্বপনে রয়েছি ভোর

আমি স্বপনে রয়েছি ভোর, সখী, আমারে জাগায়ো না। আমার সাধের পাখি যারে নয়নে নয়নে রাখি তারি স্বপনে রয়েছি ভোর, আমার স্বপন ভাঙায়ো না। কাল ফুটিবে রবির হাসি, কাল ছুটিবে তিমিররাশি-- কাল আসিবে আমার পাখি, ধীরে বসিবে আমার পাশ। ধীরে গাহিবে সুখের গান, ধীরে ডাকিবে আমার নাম। ধীরে বয়ান...

আয় তোরা আয় আয় গো

আয় তোরা আয় আয় গো-- গাবার বেলা যায় পাছে তোর যায় গো। শিশিরকণা ঘাসে ঘাসে শুকিয়ে আসে, নীড়ের পাখি নীল আকাশে চায় গো। সুর দিয়ে যে সুর ধরা যায়, গান দিয়ে পাই গান, প্রাণ দিয়ে পাই প্রাণ--তোর আপন বাঁশি আন্‌, তবেই যে তুই শুনতে পাবি কে বাঁশি বাজায় গো। শুকনো দিনের তাপ তোর বসন্তকে...

উদাসিনী সে বিদেশিনী কে নাই বা তারে জানি

উদাসিনী সে বিদেশিনী কে নাই বা তারে জানি মনে জাগে নব নব রাগে তারি মরীচিকা-ছবিখানি॥ পুবের হাওয়ায় তরীখানি তার ভাঙা এ ঘাট কবে হল পার, রঙিন মেঘে আর রঙিন পালে তার করে গেল কানাকানি॥ একা আলসে গণি বসে পলাতকা যত ঢেউ। যায় তারা যায়, ফেরে না, চায় না পিছু-পানে আর কেউ। জানি তার...

এ কী হরষ হেরি কাননে

এ কী হরষ হেরি কাননে। পরান আকুল, স্বপন বিকশিত মোহমদিরাময় নয়নে॥ ফলে ফুলে করিছে কোলাকুলি, বনে বনে বহিছে সমীরণ নবপল্লবে হিল্লোল তুলিয়ে– বসন্তপরশে বন শিহরে। কী জানি কোথা পরান মন ধাইছে বসন্তসমীরণে॥ ফুলেতে শুয়ে জোছনা হাসিতে হাসি মিলাইছে। মেঘ ঘুমায়ে ঘুমায়ে ভেসে যায়...

এ ভালোবাসার যদি দিতে প্রতিদান

এ ভালোবাসার যদি দিতে প্রতিদান-- একবার মুখ তুলে চাহিয়া দেখিতে যদি যখন দুখের জল বর্ষিত নয়ান-- শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে যবে ছুটে আসিতাম, সখী, ওই মধুময় কোলে দিতে যদি স্থান-- তা হলে, তা হলে, সখী, চিরজীবনের তরে দারুণযাতনাময় হ'ত না পরান। একটি কথায় তব একটু স্নেহের স্বরে যদি যায়...

একবার বলো সখী ভালোবাস মোরে

একবার বলো, সখী, ভালোবাস মোরে– রেখো না ফেলিয়া আর সন্দেহের ঘোরে। সখী, ছেলেবেলা হতে সংসারের পথে পথে মিথ্যা মরীচিকা লয়ে যেপেছি সময়। পারি নে, পারি নে আর– এসেছি তোমার দ্বার– একবার বলো, সখী, দিবে কি আশ্রয়। সহেছি ছলনা এত, ভয় হয় তাই সত্যকার সুখ বুঝি এ কপালে...

এতদিন পরে সখী সত্য সে কি হেথা ফিরে এল

এতদিন পরে, সখী, সত্য সে কি হেথা ফিরে এল। দীনবেশে ম্লানমুকে কেমনে অভাগিনী যাবে তার কাছে সখী রে। শরীর হয়েছে ক্ষীণ, নয়ন জ্যোতিহীন– সবই গেছে কিছু নাই– রূপ নাই, হাসি নাই– সুখ নাই, আশা নাই — সে আমি আর আমি নাই– না যদি চেনে সে মোরে তা হলে কী...

এবার বুঝি ভোলার বেলা হল

এবার বুঝি ভোলার বেলা হল– ক্ষতি কী তাহে যদি বা তুমি ভোলো॥ যাবার রাতি ভরিল গানে সেই কথাটি রহিল প্রাণে, ক্ষণেক-তরে আমার পানে করুণ আঁখি তোলো॥ সন্ধ্যাতারা এমনি ভরা সাঁঝে উঠিবে দূরে বিরহাকাশমাঝে। এই-যে সুর বাজে বীণাতে যেখানে যাব রহিবে সাথে, আজিকে তবে আপন হাতে...