শিশু

অপযশ

বাছা রে, তোর চক্ষে কেন জল। কে তোরে যে কী বলেছে আমায় খুলে বল্‌। লিখতে গিয়ে হাতে মুখে মেখেছ সব কালি, নোংরা ব ' লে তাই দিয়েছে গালি? ছি ছি, উচিত এ কি। পূর্ণশশী মাখে মসী— নোংরা বলুক দেখি। বাছা রে, তোর সবাই ধরে দোষ। আমি দেখি সকল-তাতে এদের অসন্তোষ। খেলতে গিয়ে কাপড়খানা ছিঁড়ে...

অস্তসখী

রজনী একাদশী পোহায় ধীরে ধীরে, রঙিন মেঘমালা উষারে বাঁধে ঘিরে। আকাশে ক্ষীণ শশী আড়ালে যেতে চায়, দাঁড়ায়ে মাঝখানে কিনারা নাহি পায়। এ-হেন কালে যেন মায়ের পানে মেয়ে রয়েছে শুকতারা চাঁদের মুখে চেয়ে। কে তুমি মরি মরি একটুখানি প্রাণ। এনেছ কী না জানি করিতে ওরে দান। মহিমা যত ছিল...

আকুল আহ্বান

সন্ধে হল, গৃহ অন্ধকার— মা গো, হেথায় প্রদীপ জ্বলে না। একে একে সবাই ঘরে এল, আমায় যে মা, ‘মা' কেউ বলে না। সময় হল, বেঁধে দেব চুল, পরিয়ে দেব রাঙা কাপড়খানি। সাঁঝের তারা সাঁঝের গগনে— কোথায় গেল রানী আমার রানী। রাত্রি হল, আঁধার করে আসে, ঘরে ঘরে প্রদীপ নিবে যায়। আমার ঘরে ঘুম...

আশীর্বাদ

ইহাদের করো আশীর্বাদ। ধরায় উঠেছে ফুটি শুভ্র প্রাণগুলি, নন্দনের এনেছে সম্বাদ, ইহাদের করো আশীর্বাদ। ছোটো ছোটো হাসিমুখ জানে না ধরার দুখ, হেসে আসে তোমাদের দ্বারে। নবীন নয়ন তুলিকৌতুকেতে দুলি দুলি চেয়ে চেয়ে দেখে চারি ধারে। সোনার রবির আলো কত তার লাগে ভালো, ভালো লাগে মায়ের...

উপহার

স্নেহ-উপহার এনে দিতে চাই, কী যে দেব তাই ভাবনা— যত দিতে সাধ করি মনে মনে খুঁজে - পেতে সে তো পাব না। আমার যা ছিল ফাঁকি দিয়ে নিতে সবাই করেছে একতা, বাকি যে এখন আছে কত ধন না তোলাই ভালো সে কথা। সোনা রুপো আর হীরে জহরত পোঁতা ছিল সব মাটিতে, জহরি যে যত সন্ধান পেয়ে নে গেছে যে যার...

কাগজের নৌকা

ছুটি হলে রোজ ভাসাই জলে কাগজ-নৌকাখানি। লিখে রাখি তাতে আপনার নাম লিখি আমাদের বাড়ি কোন্‌ গ্রাম বড়ো বড়ো করে মোটা অক্ষরে, যতনে লাইন টানি। যদি সে নৌকা আর-কোনো দেশে আর-কারো হাতে পড়ে গিয়ে শেষে আমার লিখন পড়িয়া তখন বুঝিবে সে অনুমানি কার কাছ হতে ভেসে এল স্রোতে কাগজ-নৌকাখানি।...

কেন মধুর

রঙিন খেলেনা দিলে ও রাঙা হাতে তখন বুঝি রে বাছা, কেন যে প্রাতে এত রঙ খেলে মেঘে জলে রঙ ওঠে জেগে, কেন এত রঙ লেগে ফুলের পাতে— রাঙা খেলা দেখি যবে ও রাঙা হাতে। গান গেয়ে তোরে আমি নাচাই যবে আপন হৃদয়-মাঝে বুঝি রে তবে, পাতায় পাতায় বনে ধ্বনি এত কী কারণে, ঢেউ বহে নিজমনে তরল রবে,...

খেলা

তোমার কটি - তটের ধটি কে দিল রাঙিয়া । কোমল গায়ে দিল পরায়ে রঙিন আঙিয়া । বিহানবেলা আঙিনাতলে এসেছ তুমি কী খেলাছলে , চরণ দুটি চলিতে ছুটি পড়িছে ভাঙিয়া । তোমার কটি - তটের ধটি কে দিল রাঙিয়া । কিসের সুখে সহাস মুখে নাচিছ বাছনি , দুয়ার - পাশে জননী হাসে হেরিয়া নাচনি । তাথেই থেই...

খোকা

খোকার চোখে যে ঘুম আসে সকল - তাপ - নাশা — জান কি কেউ কোথা হতে যে করে সে যাওয়া - আসা । শুনেছি রূপকথার গাঁয়ে জোনাকি - জ্বলা বনের ছায়ে দুলিছে দুটি পারুল - কুঁড়ি , তাহারি মাঝে বাসা — সেখান থেকে খোকার চোখে করে সে যাওয়া - আসা । খোকার ঠোঁটে যে হাসিখানি চমকে ঘুমঘোরে — কোন্‌...

খোকার রাজ্য

খোকার মনের ঠিক মাঝখানটিতে আমি যদি পারি বাসা নিতে— তবে আমি একবার জগতের পানে তার চেয়ে দেখি বসি সে নিভৃতে। তার রবি শশী তারা জানি নে কেমনধারা সভা করে আকাশের তলে, আমার খোকার সাথে গোপনে দিবসে রাতে শুনেছি তাদের কথা চলে। শুনেছি আকাশ তারে নামিয়া মাঠের পারে লোভায় রঙিন ধনু হাতে,...

ঘুমচোরা

কে নিল খোকার ঘুম হরিয়া। মা তখন জল নিতে ও পাড়ার দিঘিটিতে গিয়াছিল ঘট কাঁখে করিয়া।— তখন রোদের বেলা সবাই ছেড়েছে খেলা, ও পারে নীরব চখা-চখীরা; শালিক থেমেছে ঝোপে, শুধু পায়রার খোপে বকাবকি করে সখা-সখীরা; তখন রাখাল ছেলে পাঁচনি ধুলায় ফেলে ঘুমিয়ে পড়েছে বটতলাতে; বাঁশ-বাগানের ছায়ে...

চাতুরী

আমার খোকা করে গো যদি মনে এখনি উড়ে পারে সে যেতে পারিজাতের বনে । যায় না সে কি সাধে। মায়ের বুকে মাথাটি থুয়ে সে ভালোবাসে থাকিতে শুয়ে, মায়ের মুখ না দেখে যদি পরান তার কাঁদে। আমার খোকা সকল কথা জানে। কিন্তু তার এমন ভাষা, কে বোঝে তার মানে। মৌন থাকে সাধে ? মায়ের মুখে মায়ের কথা...

ছুটির দিনে

ওই দেখো মা, আকাশ ছেয়ে মিলিয়ে এল আলো, আজকে আমার ছুটোছুটি লাগল না আর ভালো। ঘণ্টা বেজে গেল কখন, অনেক হল বেলা। তোমায় মনে পড়ে গেল, ফেলে এলেম খেলা। আজকে আমার ছুটি, আমার শনিবারের ছুটি। কাজ যা আছে সব রেখে আয় মা তোর পায়ে লুটি। দ্বারের কাছে এইখানে বোস, এই হেথা চোকাঠ— বল্‌ আমারে...

ছোটোবড়ো

এখনো তো বড়ো হই নি আমি, ছোটো আছি ছেলেমানুষ বলে। দাদার চেয়ে অনেক মস্ত হব বড়ো হয়ে বাবার মতো হলে। দাদা তখন পড়তে যদি না চায়, পাখির ছানা পোষে কেবল খাঁচায়, তখন তারে এমনি বকে দেব! বলব, ‘তুমি চুপটি করে পড়ো। ' বলব, ‘তুমি ভারি দুষ্টু ছেলে'— যখন হব বাবার মতো বড়ো। তখন নিয়ে দাদার...

জন্মকথা

খোকা মাকে শুধায় ডেকে — ‘ এলেম আমি কোথা থেকে , কোন্‌খানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে । ' মা শুনে কয় হেসে কেঁদে খোকারে তার বুকে বেঁধে — ‘ ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে । ছিলি আমার পুতুল - খেলায় , প্রভাতে শিবপূজার বেলায় তোরে আমি ভেঙেছি আর গড়েছি । তুই আমার ঠাকুরের সনে ছিলি পূজার...

জ্যোতিষ-শাস্ত্র

আমি শুধু বলেছিলেম— ‘কদম গাছের ডালে পূর্ণিমা-চাঁদ আটকা পড়ে যখন সন্ধেকালে তখন কি কেউ তারে ধরে আনতে পারে। ' শুনে দাদা হেসে কেন বললে আমায়, ‘ খোকা, তোর মতো আর দেখি নাইকো বোকা। চাঁদ যে থাকে অনেক দূরে কেমন করে ছুঁই; আমি বলি, ‘দাদা, তুমি জান না কিচ্ছুই। মা আমাদের হাসে যখন ওই...

দুঃখহারী

মনে করো, তুমি থাকবে ঘরে, আমি যেন যাব দেশান্তরে। ঘাটে আমার বাঁধা আছে তরী, জিনিসপত্র নিয়েছি সব ভরি— ভালো করে দেখ্‌ তো মনে করি কী এনে মা, দেব তোমার তরে। চাস কি মা, তুই এত এত সোনা— সোনার দেশে করব আনাগোনা। সোনামতী নদীতীরের কাছে সোনার ফসল মাঠে ফ'লে আছে, সোনার চাঁপা ফোটে...

নবীন অতিথি

গান ওহে নবীন অতিথি, তুমি নূতন কি তুমি চিরন্তন। যুগে যুগে কোথা তুমি ছিলে সংগোপন। যতনে কত কী আনি বেঁধেছিনু গৃহখানি, হেথা কে তোমারে বলো করেছিল নিমন্ত্রণ। কত আশা ভালোবাসা গভীর হৃদয়তলে ঢেকে রেখেছিনু বুকে, কত হাসি অশ্রুজলে! একটি না কহি বাণী তুমি এলে মহারানী, কেমনে গোপনে মনে...

নির্লিপ্ত

বাছা রে মোর বাছা, ধূলির ‘পরে হরষভরে লইয়া তৃণগাছা আপন মনে খেলিছ কোণে, কাটিছে সারা বেলা। হাসি গো দেখে এ ধূলি মেখে এ তৃণ লয়ে খেলা। আমি যে কাজে রত, লইয়া খাতা ঘুরাই মাথা হিসাব কষি কত, আঁকের সারি হতেছে ভারী কাটিয়া যায় বেলা— ভাবিছ দেখি মিথ্যা একি সময় নিয়ে খেলা। বাছা রে মোর...

নৌকাযাত্রা

মধু মাঝির ওই যে নৌকোখানা বাঁধা আছে রাজগঞ্জের ঘাটে , কারো কোনো কাজে লাগছে না তো , বোঝাই করা আছে কেবল পাটে । আমায় যদি দেয় তারা নৌকাটি আমি তবে একশোটা দাঁড় আঁটি , পাল তুলে দিই চারটে পাঁচটা ছটা — মিথ্যে ঘুরে বেড়াই নাকো হাটে । আমি কেবল যাই একটিবার সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার ।...