শিশু ভোলানাথ

অন্য মা

আমার মা না হয়ে তুমি আর - কারো মা হলে ভাবছ তোমায় চিনতেম না , যেতেম না ঐ কোলে ? মজা আরো হত ভারি , দুই জায়গায় থাকত বাড়ি , আমি থাকতেম এই গাঁয়েতে , তুমি পারের গাঁয়ে । এইখানেতেই দিনের বেলা যা - কিছু সব হত খেলা দিন ফুরোলেই তোমার কাছে পেরিয়ে যেতেম নায়ে । হঠাৎ এসে পিছন দিকে...

ইচ্ছামতী

যখন যেমন মনে করি তাই হতে পাই যদি আমি তবে একখানি হই ইচ্ছামতী নদী । রইবে আমার দখিন ধারে সূর্য ওঠার পার , বাঁয়ের ধারে সন্ধেবেলায় নামবে অন্ধকার । আমি কইব মনের কথা দুই পারেরই সাথে , আধেক কথা দিনের বেলায় , আধেক কথা রাতে । যখন ঘুরে ঘুরে বেড়াই আপন গাঁয়ের ঘাটে ঠিক তখনি গান...

খেলা-ভোলা

তুই কি ভাবিস , দিনরাত্তির খেলতে আমার মন ? কক্‌খনো তা সত্যি না মা — আমার কথা শোন্‌ । সেদিন ভোরে দেখি উঠে বৃষ্টিবাদল গেছে ছুটে , রোদ উঠেছে ঝিলমিলিয়ে বাঁশের ডালে ডালে ; ছুটির দিনে কেমন সুরে পুজোর সানাই বাজছে দূরে , তিনটে শালিখ ঝগড়া করে রান্নাঘরের চালে — খেলনাগুলো সামনে...

ঘুমের তত্ব

জাগার থেকে ঘুমোই , আবার ঘুমের থেকে জাগি — অনেক সময় ভাবি মনে কেন , কিসের লাগি ? আমাকে , মা , যখন তুমি ঘুম পাড়িয়ে রাখ তখন তুমি হারিয়ে গিয়ে তবু হারাও নাকো । রাতে সূর্য , দিনে তারা পাই নে , হাজার খুঁজি । তখন তা'রা ঘুমের সূর্য , ঘুমের তারা বুঝি ? শীতের দিনে কনকচাঁপা যায় না...

জ্যোতিষী

ওই যে রাতের তারা জানিস কি , মা , কারা ? সারাটিখন ঘুম না জানে চেয়ে থাকে মাটির পানে যেন কেমনধারা! আমার যেমন নেইকো ডানা , আকাশ - পানে উড়তে মানা , মনটা কেমন করে , তেমনি ওদের পা নেই বলে পারে না যে আসতে চলে এই পৃথিবীর ‘পরে । সকালে যে নদীর বাঁকে জল নিতে যাস কলসী কাঁখে...

তালগাছ

তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে । মনে সাধ , কালো মেঘ ফুঁড়ে যায় একেবারে উড়ে যায় ; কোথা পাবে পাখা সে ? তাই তো সে ঠিক তার মাথাতে গোল গোল পাতাতে ইচ্ছাটি মেলে তার , মনে মনে ভাবে , বুঝি ডানা এই , উড়ে যেতে মানা নেই বাসাখানি ফেলে তার । সারাদিন ঝরঝর থত্থর...

দুই আমি

বৃষ্টি কোথায় নুকিয়ে বেড়ায় উড়ো মেঘের দল হয়ে , সেই দেখা দেয় আর - এক ধারায় শ্রাবণ - ধারার জল হয়ে । আমি ভাবি চুপটি করে মোর দশা হয় ওই যদি ! কেই বা জানে আমি আবার আর - একজনও হই যদি ! একজনারেই তোমরা চেন আর - এক আমি কারোই না । কেমনতরো ভাবখানা তার মনে আনতে পারোই না । হয়তো বা ওই...

দুষ্টু

তোমার কাছে আমিই দুষ্টু ভালো যে আর সবাই । মিত্তিরদের কালু নিলু ভারি ঠাণ্ডা ক - ভাই ! যতীশ ভালো , সতীশ ভালো , ন্যাড়া নবীন ভালো , তুমি বল ওরাই কেমন ঘর করে রয় আলো । মাখন বাবুর দুটি ছেলে দুষ্টু তো নয় কেউ — গেটে তাদের কুকুর বাঁধা করতেছে ঘেউ ঘেউ । পাঁচকড়ি ঘোষ লক্ষ্মী ছেলে ,...

দুয়োরানী

ইচ্ছে করে , মা , যদি তুই হতিস দুয়োরানী ! ছেড়ে দিতে এমনি কি ভয় তোমার এ ঘরখানি । ওইখানে ওই পুকুরপারে জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে ও যেন ঘোর বনের মধ্যে কেউ কোত্থাও নেই । ওইখানে ঝাউতলা জুড়ে বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে , শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে থাকব দুজনেই । বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে , আসবে...

দূর

পুজোর ছুটি আসে যখন বকসারেতে যাবার পথে — দূরের দেশে যাচ্ছি ভেবে ঘুম হয় না কোনোমতে । সেখানে যেই নতুন বাসায় হপ্তা দুয়েক খেলায় কাটে দূর কি আবার পালিয়ে আসে আমাদেরই বাড়ির ঘাটে ! দূরের সঙ্গে কাছের কেবল কেনই যে এই লুকোচুরি , দূর কেন যে করে এমন দিনরাত্তির ঘোরাঘুরি । আমরা যেমন...

পথহারা

আজকে আমি কতদূর যে গিয়েছিলেম চলে ! যত তুমি ভাবতে পারো তার চেয়ে সে অনেক আরো , শেষ করতে পারব না তা তোমায় ব'লে ব'লে । অনেক দূর সে , আরো দূর সে , আরো অনেক দূর । মাঝখানেতে কত যে বেত , কত যে বাঁশ , কত যে খেত , ছাড়িয়ে ওদের ঠাকুরবাড়ি ছাড়িয়ে তালিমপুর । পেরিয়ে গেলেম যেতে যেতে...

পুতুল ভাঙা

' সাত - আটটে সাতাশ ', আমি বলেছিলাম বলে গুরুমশায় আমার ‘পরে উঠল রাগে জ্বলে । মা গো , তুমি পাঁচ পয়সায় এবার রথের দিনে সেই যে রঙিন পুতুলখানি আপনি দিলে কিনে খাতার নিচে ছিল ঢাকা ; দেখালে এক ছেলে , গুরুমশায় রেগেমেগে ভেঙে দিলেন ফেলে । বললেন , ' তোর দিনরাত্তির কেবল যত খেলা ।...

বাউল

দূরে অশথতলায় পুঁতির কণ্ঠিখানি গলায় বাউল দাঁড়িয়ে কেন আছ ? সামনে আঙিনাতে তোমার একতারাটি হাতে তুমি সুর লাগিয়ে নাচো ! পথে করতে খেলা আমার কখন হল বেলা আমায় শাস্তি দিল তাই । ইচ্ছে হোথায় নাবি কিন্তু ঘরে বন্ধ চাবি আমার বেরোতে পথ নাই । বাড়ি ফেরার তরে তোমায় কেউ না তাড়া করে তোমার...

বাণী-বিনিময়

মা , যদি তুই আকাশ হতিস , আমি চাঁপার গাছ , তোর সাথে মোর বিনি - কথায় হত কথার নাচ । তোর হাওয়া মোর ডালে ডালে কেবল থেকে থেকে কত রকম নাচন দিয়ে আমায় যেত ডেকে । মা ব'লে তার সাড়া দেব কথা কোথায় পাই , পাতায় পাতায় সাড়া আমার নেচে উঠত তাই । তোর আলো মোর শিশির - ফোঁটায় আমার কানে কানে...

বুড়ি

এক যে ছিল চাঁদের কোণায় চরকা - কাটা বুড়ি পুরাণে তার বয়স লেখে সাতশো হাজার কুড়ি । সাদা সুতোয় জাল বোনে সে হয় না বুনন সারা পণ ছিল তার ধরবে জালে লক্ষ কোটি তারা । হেনকালে কখন আঁখি পড়ল ঘুমে ঢুলে , স্বপনে তার বয়সখানা বেবাক গেল ভুলে । ঘুমের পথে পথ হারিয়ে , মায়ের কোলে এসে পূর্ণ...

বৃষ্টি রৌদ্র

ঝুঁটি - বাঁধা ডাকাত সেজে দল বেঁধে মেঘ চলেছে যে আজকে সারাবেলা । কালো ঝাঁপির মধ্যে ভরে সুর্যিকে নেয় চুরি করে , ভয় - দেখাবার খেলা । বাতাস তাদের ধরতে মিছে হাঁপিয়ে ছোটে পিছে পিছে , যায় না তাদের ধরা । আজ যেন ওই জড়োসড়ো আকাশ জুড়ে মস্ত বড়ো মন - কেমন - করা । বটের ডালে ডানা -...

মনে পড়া

মাকে আমার পড়ে না মনে । শুধু কখন খেলতে গিয়ে হঠাৎ অকারণে একটা কী সুর গুনগুনিয়ে কানে আমার বাজে , মায়ের কথা মিলায় যেন আমার খেলার মাঝে । মা বুঝি গান গাইত , আমার দোলনা ঠেলে ঠেলে ; মা গিয়েছে , যেতে যেতে গানটি গেছে ফেলে । মাকে আমার পড়ে না মনে । শুধু যখন আশ্বিনেতে ভোরে...

মর্তবাসী

কাকা বলেন , সময় হলে সবাই চ ' লে যায় কোথা সেই স্বর্গ - পারে । বল্‌ তো কাকী সত্যি তা কি একেবারে ? তিনি বলেন , যাবার আগে তন্দ্রা লাগে ঘণ্টা কখন ওঠে বাজি , দ্বারের পাশে তখন আসে ঘাটের মাঝি । বাবা গেছেন এমনি করে কখন ভোরে তখন আমি বিছানাতে । তেমনি মাখন গেল কখন অনেক রাতে ।...

মুর্খু

নেই বা হলেম যেমন তোমার অম্বিকে গোঁসাই । আমি তো , মা , চাই নে হতে পণ্ডিতমশাই । নাই যদি হই ভালো ছেলে , কেবল যদি বেড়াই খেলে তুঁতের ডালে খুঁজে বেড়াই গুটিপোকার গুটি , মুর্খু হয়ে রইব তবে ? আমার তাতে কীই বা হবে , মুর্খু যারা তাদেরই তো সমস্তখন ছুটি । তারাই তো সব রাখাল ছেলে...

রবিবার

সোম মঙ্গল বুধ এরা সব আসে তাড়াতাড়ি , এদের ঘরে আছে বুঝি মস্ত হাওয়া - গাড়ি ? রবিবার সে কেন , মা গো , এমন দেরি করে ? ধীরে ধীরে পৌঁছয় সে সকল বারের পরে । আকাশ - পারে তার বাড়িটি দূর কি সবার চেয়ে ? সে বুঝি মা তোমার মতো গরিব - ঘরের মেয়ে ? সোম মঙ্গল বুধের খেয়াল থাকবারই জন্যেই ,...