মানসী

অনন্ত প্রেম

তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শত বার জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার। চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার, কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার। যত শুনি সেই অতীত কাহিনী, প্রাচীন প্রেমের ব্যথা, অতি পুরাতন বিরহমিলনকথা, অসীম অতীতে চাহিতে...

অপেক্ষা

সকল বেলা কাটিয়া গেল বিকাল নাহি যায়। দিনের শেষে শ্রান্তছবি কিছুতে যেতে চায় না রবি, চাহিয়া থাকে ধরণী-পানে, বিদায় নাহি চায়। মেঘেতে দিন জড়ায়ে থাকে, মিলায়ে থাকে মাঠে— পড়িয়া থাকে তরুর শিরে, কাঁপিতে থাকে নদীর নীরে, দাঁড়ায়ে থেকে দীর্ঘ ছায়া মেলিয়া ঘাটে বাটে। এখনো ঘুঘু ডাকিছে...

অহল্যার প্রতি

কী স্বপ্নে কাটালে তুমি দীর্ঘ দিবানিশি, অহল্যা, পাষাণরূপে ধরাতলে মিশি, নির্বাপিত-হোম-অগ্নি তাপসবিহীন শূন্য তপোবনচ্ছায়ে? আছিলে বিলীন বৃহৎ পৃথ্বীর সাথে হয়ে এক-দেহ, তখন কি জেনেছিলে তার মহাস্নেহ? ছিল কি পাষাণতলে অস্পষ্ট চেতনা? জীবধাত্রী জননীর বিপুল বেদনা, মাতৃধৈর্যে মৌন...

আকাঙ্ক্ষা

আর্দ্র তীব্র পূর্ববায়ু বহিতেছে বেগে, ঢেকেছে উদয়পথ ঘননীল মেঘে। দূরে গঙ্গা, নৌকা নাই, বালু উড়ে যায়, বসে বসে ভাবিতেছি— আজি কে কোথায়! শুষ্ক পাতা উড়ে পড়ে জনহীন পথে, বনের উতল রোল আসে দূর হতে। নীরব প্রভাত-পাখি, কম্পিত কুলায়, মনে জাগিতেছে সদা— আজি সে কোথায়! কত কাল ছিল কাছে,...

আগন্তুক

ওগো সুখী প্রাণ, তোমাদের এই ভব-উৎসব-ঘরে অচেনা অজানা পাগল অতিথি এসেছিল ক্ষণতরে। ক্ষণেকের তরে বিস্ময়-ভরে চেয়েছিল চারি দিকে বেদনা-বাসনা-ব্যাকুলতা-ভরা তৃষাতুর অনিমিখে। উৎসববেশ ছিল না তাহার, কন্ঠে ছিল না মালা, কেশপাশ দিয়ে বাহিরিতেছিল দীপ্ত অনলজ্বালা। তোমাদের হাসি তোমাদের...

আত্মসমর্পণ

আমি এ কেবল মিছে বলি, শুধু আপনার মন ছলি। কঠিন বচন শুনায়ে তোমারে আপন মর্মে জ্বলি। থাক্‌ তবে থাক্‌ ক্ষীণ প্রতারণা, কী হবে লুকায়ে বাসনা বেদনা, যেমন আমার হৃদয়-পরান তেমনি দেখাব খুলি। আমি মনে করি যাই দূরে, তুমি রয়েছ বিশ্ব জুড়ে। যত দূরে যাই ততই তোমার কাছাকাছি ফিরি ঘুরে। চোখে...

আমার সুখ

ভালোবাসা-ঘেরা ঘরে কোমল শয়নে তুমি যে সুখেই থাকো, যে মাধুরী এ জীবনে আমি পাইয়াছি তাহা তুমি পেলে নাকো। এই-যে অলস বেলা, অলস মেঘের মেলা, জলেতে আলোতে খেলা সারা দিনমান, এরই মাঝে চারি পাশে কোথা হতে ভেসে আসে ওই মুখ, ওই হাসি, ওই দু’নয়ান। সদা শুনি কাছে দূরে মধুর কোমল সুরে তুমি...

আশঙ্কা

কে জানে এ কি ভালো! আকাশ-ভরা কিরণধারা আছিল মোর তপন-তারা, আজিকে শুধু একেলা তুমি আমার আঁখি-আলো— কে জানে এ কি ভালো! কত-না শোভা, কত-না সুখ, কত-না ছিল অমিয়-মুখ, নিত্য-নব পুষ্পরাশি ফুটিত মোর দ্বারে— ক্ষুদ্র আশা ক্ষুদ্র স্নেহ মনের ছিল শতেক গেহ, আকাশ ছিল, ধরণী ছিল আমার চারি...

উচ্ছৃঙ্খল

এ মুখের পানে চাহিয়া রয়েছ কেন গো অমন করে? তুমি চিনিতে নারিবে, বুঝিতে নারিবে মোরে। আমি কেঁদেছি হেসেছি, ভালো যে বেসেছি এসেছি যেতেছি সরে কী জানি কিসের ঘোরে। কোথা হতে এত বেদনা বহিয়া এসেছে পরান মম। বিধাতার এক অর্থবিহীন প্রলাপবচন-সম। প্রতিদিন যারা আছে সুখে দুখে আমি তাহাদের...

উপহার

নিভৃত এ চিত্তমাঝে নিমেষে নিমেষে বাজে জগতের তরঙ্গ-আঘাত, ধ্বনিত হৃদয়ে তাই মুহূর্ত বিরাম নাই নিদ্রাহীন সারা দিনরাত। সুখ দুঃখ গীতস্বর ফুটিতেছে নিরন্তর— ধ্বনি শুধু, সাথে নাই ভাষা। বিচিত্র সে কলরোলে ব্যাকুল করিয়া তোলে জাগাইয়া বিচিত্র দুরাশা। এ চিরজীবন তাই আর কিছু কাজ নাই...

একাল ও সেকাল

বর্ষা এলায়েছে তার মেঘময় বেণী। গাঢ় ছায়া সারাদিন, মধ্যাহ্ন তপনহীন, দেখায় শ্যামলতর শ্যাম বনশ্রেণী। আজিকে এমন দিনে শুধু পড়ে মনে সেই দিবা-অভিসার পাগলিনী রাধিকার, না জানি সে কবেকার দূর বৃন্দাবনে। সেদিনও এমনি বায়ু রহিয়া রহিয়া। এমনি অশ্রান্ত বৃষ্টি, তড়িৎচকিত দৃষ্টি, এমনি কাতর...

কবির প্রতি নিবেদন

হেথা কেন দাঁড়ায়েছ, কবি, যেন কাষ্ঠপুত্তলছবি? চারি দিকে লোকজন চলিতেছে সারাখন, আকাশে উঠিছে খর রবি। কোথা তব বিজন ভবন, কোথা তব মানসভুবন? তোমারে ঘেরিয়া ফেলি কোথা সেই করে কেলি কল্পনা, মুক্ত পবন? নিখিলের আনন্দধাম কোথা সেই গভীর বিরাম? জগতের গীতধার কেমনে শুনিবে আর? শুনিতেছ...

কুহুধ্বনি

প্রখর মধ্যাহ্নতাপে প্রান্তর ব্যাপিয়া কাঁপে বাষ্পশিখা অনলশ্বসনা, অম্বেষিয়া দশ দিশা যেন ধরণীর তৃষা মেলিয়াছে লেলিহা রসনা। ছায়া মেলি সারি সারি স্তব্ধ আছে তিন-চারি সিসু গাছ পাণ্ডুকিশলয়, নিম্ববৃক্ষ ঘনশাখা গুচ্ছ গুচ্ছ পুষ্পে ঢাকা, আম্রবন তাম্রফলময়। গোলক-চাঁপার ফুলে গন্ধের...

ক্ষণিক মিলন

একদা এলোচুলে কোন্‌ ভুলে ভুলিয়া আসিল সে আমার ভাঙা দ্বার খুলিয়া। জ্যোৎস্না অনিমিখ, চারি দিক সুবিজন, চাহিল একবার আঁখি তার তুলিয়া। দখিনবায়ুভরে থরথরে কাঁপে বন, উঠিল প্রাণ মম তারি সম দুলিয়া। আবার ধীরে ধীরে গেল ফিরে আলসে, আমার সব হিয়া মাড়াইয়া গেল সে। আমার যাহা ছিল সব নিল...

গুপ্ত প্রেম

তবে পরানে ভালোবাসা কেন গো দিলে রূপ না দিলে যদি বিধি হে! পূজার তরে হিয়া উঠে যে ব্যাকুলিয়া, পূজিব তারে গিয়া কী দিয়ে! মনে গোপনে থাকে প্রেম, যায় না দেখা, কুসুম দেয় তাই দেবতায়। দাঁড়ায়ে থাকি দ্বারে, চাহিয়া দেখি তারে, কী ব’লে আপনারে দিব তায়? ভালো বাসিলে ভালো যারে দেখিতে হয়...

গোধূলি

অন্ধকার তরুশাখা দিয়ে সন্ধ্যার বাতাস বহে যায়। আয়, নিদ্রা, আয় ঘনাইয়ে শ্রান্ত এই আঁখির পাতায়। কিছু আর নাহি যায় দেখা, কেহ নাই, আমি শুধু একা— মিশে যাক জীবনের রেখা বিস্মৃতির পশ্চিমসীমায়। নিষ্ফল দিবস অবসান— কোথা আশা, কোথা গীতগান! শুয়ে আছে সঙ্গীহীন প্রাণ জীবনের তটবালুকায়।...

জীবনমধ্যাহ্ণ

জীবন আছিল লঘু প্রথম বয়সে, চলেছিনু আপনার বলে, সুদীর্ঘ জীবনযাত্রা নবীন প্রভাতে আরম্ভিনু খেলিবার ছলে। অশ্রুতে ছিল না তাপ, হাস্যে উপহাস, বচনে ছিল না বিষানল— ভাবনাভ্রূকুটিহীন সরল ললাট সুপ্রশান্ত আনন্দ-উজ্জ্বল। কুটিল হইল পথ, জটিল জীবন, বেড়ে গেল জীবনের ভার— ধরণীর ধূলি-মাঝে...

তবু

তবু মনে রেখো, যদি দূরে যাই চলি, সেই পুরাতন প্রেম যদি এক কালে হয়ে আসে দূরস্মৃত কাহিনী কেবলি— ঢাকা পড়ে নব নব জীবনের জালে। তবু মনে রেখো, যদি বড়ো কাছে থাকি, নূতন এ প্রেম যদি হয় পুরাতন, দেখে না দেখিতে পায় যদি শ্রান্ত আঁখি— পিছনে পড়িয়া থাকি ছায়ার মতন। তবু মনে রেখো, যদি তাহে...

দুরন্ত আশা

মর্মে যবে মত্ত আশা সর্পসম ফোঁসে, অদৃষ্টের বন্ধনেতে দাপিয়া বৃথা রোষে, তখনো ভালোমানুষ সেজে বাঁধানো হুঁকা যতনে মেজে মলিন তাস সজোরে ভেঁজে খেলিতে হবে কষে! অন্নপায়ী বঙ্গবাসী স্তন্যপায়ী জীব জন-দশেকে জটলা করি তক্তপোশে ব’সে। ভদ্র মোরা, শান্ত বড়ো, পোষ-মানা এ প্রাণ বোতাম-আঁটা...

দেশের উন্নতি

বক্তৃতাটা লেগেছে বেশ, রয়েছে রেশ কানে— কী যেন করা উচিত ছিল, কী করি কে তা জানে! অন্ধকারে ওই রে শোন্‌ ভারতমাতা করেন ‘গ্রোন’ এ হেন কালে ভীষ্ম দ্রোণ গেলেন কোন্‌খানে! দেশের দুখে সতত দহি মনের ব্যথা সবারে কহি, এস তো করি নামটা সহি লম্বা পিটিশানে। আয় রে ভাই, সবাই মাতি যতটা পারি...