পলাতকা

আসল

বয়স ছিল আট , পড়ার ঘরে বসে বসে ভুলে যেতেম পাঠ । জানলা দিয়ে দেখা যেত মুখুজ্যেদের বাড়ির পাশে একটুখানি প ো ড়ো জমি , শুকনো শীর্ণ ঘাসে দেখায় যেন উপবাসীর মতো । পাড়ার আবর্জনা যত ওই খানেতেই উঠছে জমে , একধারেতে ক্রমে পাহাড়-সমান উঁচু হল প্রতিবেশীর রান্নাঘরের ছাই ; গোটাকয়েক...

কালো মেয়ে

মরচে-পড়া গরাদে ওই , ভাঙা জানলাখানি ; পাশের বাড়ির কালো মেয়ে নন্দরানী ওই খানেতে বসে থাকে একা , শুকনো নদীর ঘাটে যেন বিনা কাজে নৌকোখানি ঠেকা । বছর বছর করে ক্রমে বয়স উঠছে জমে । বর জোটে না , চিন্তিত তার বাপ ; সমস্ত এই পরিবারের নিত্য মমস্তাপ দীর্ঘশ্বাসের ঘূর্ণি হাওয়ায় আছে...

চিরদিনের দাগা

ওপার হতে এপার পানে খেয়া-নৌকো বেয়ে ভাগ্য নেয়ে দলে দলে আনছে ছেলে মেয়ে । সবাই সমান তারা এক সাজিতে ভরে-আনা চাঁপা ফুলের পারা । তাহার পরে অন্ধকারে কোন্‌ ঘরে সে পৌঁছিয়ে দেয় কারে! তখন তাদের আরম্ভ হয় নব নব কাহিনী-জাল বোনা — দুঃখে সুখে দিনমুহূর্ত গোনা । একে একে তিনটি মেয়ের পরে...

ছিন্ন পত্র

কর্ম যখন দেবতা হয়ে জুড়ে বসে পূজার বেদী , মন্দিরে তার পাষাণ-প্রাচীর অভ্রভেদী চতুর্দিকেই থাকে ঘিরে ; তারই মধ্যে জীবন যখন শুকিয়ে আসে ধীরে ধীরে পায় না আলো , পায় না বাতাস , পায় না ফাঁকা , পায় না কোনো রস , কেবল টাকা , কেবল সে পায় যশ , তখন সে কোন্‌ মোহের পাকে মরণ - দশা ঘটেছে...

ঠাকুরদাদার ছুটি

তোমার ছুটি নীল আকাশে , তোমার ছুটি মাঠে , তোমার ছুটি থইহারা ওই দিঘির ঘাটে ঘাটে । তোমার ছুটি তেঁতুলতলায় , গোলাবাড়ির কোণে , তোমার ছুটি ঝোপেঝাপে পারুলডাঙার বনে । তোমার ছুটির আশা কাঁপে কাঁচা ধানের খেতে , তোমার ছুটির খুশি নাচে নদীর তরঙ্গেতে । আমি তোমার চশমা - পরা বুড়ো...

নিষ্কৃতি

মা কেঁদে কয় , “ মঞ্জুলী মোর ওই তো কচি মেয়ে , ওর ই সঙ্গে বিয়ে দেবে ?— বয়সে ওর চেয়ে পাঁচগুনো সে বড়ো ; তাকে দেখে বাছা আমার ভয়েই জড়সড় । এমন বিয়ে ঘটতে দেব নাকো । ” বাপ বললে , “ কান্না তোমার রাখো! পঞ্চাননকে পাওয়া গেছে অনেক দিনের খোঁজে , জান না কি মস্ত কুলীন ও যে । সমাজে তো...

পলাতকা

ওই যেখানে শিরীষ গাছে ঝুরু-ঝুরু কচি পাতার নাচে ঘাসের ‘ পরে ছায়াখানি কাঁপায় থরথর ঝরা ফুলের গন্ধে ভরভর — ওই খানে মোর পোষা হরিণ চরত আপন মনে হেনা-বেড়ার কোণে শীতের রোদে সারা সকালবেলা । তার ই সঙ্গে করত খেলা পাহাড়-থেকে-আনা ঘন রাঙা রোঁয়ায় ঢাকা একটি কুকুর - ছানা । যেন তারা দুই...

ফাঁকি

বিনুর বয়স তেইশ তখন , রোগে ধরল তারে । ওষুধে ডাক্তারে ব্যাধির চেয়ে আধি হল বড়ো ; নানা ছাপের জমল শিশি , নানা মাপের কৌটো হল জড়ো । বছর দেড়েক চিকিৎসাতে করলে যখন অস্থি জরজর তখন বললে , “ হাওয়া বদল করো । ” এই সুযোগে বিনু এবার চাপল প্রথম রেলের গাড়ি , বিয়ের পরে ছাড়ল প্রথম...

ভোলা

হঠাৎ আমার হল মনে শিবের জটার গঙ্গা যেন শুকিয়ে গেল অকারণে ; থামল তাহার হাস্য-উছল বাণী ; থামল তাহার নৃত্য-নূপুর ঝরঝরানি ; সূর্য-আলোর সঙ্গে তাহার ফেনার কোলাকুলি , হাওয়ার সঙ্গে ঢেউয়ের দোলাদুলি স্তব্ধ হল এক নিমেষে বিজু যখন চলে গেল মরণপারের দেশে বাপের বাহুর বাঁধন কেটে । মনে...

মালা

মালা আমি যেদিন সভায় গেলেম প্রাতে , সিংহাসনে রানীর হাতে ছিল সোনার থালা , তার ই ‘ পরে একটি শুধু ছিল মণির মালা । কাশী কাঞ্চী কানোজ কোশল অঙ্গ বঙ্গ মদ্র মগধ হতে বহুমুখী জনধারার স্রোতে দলে দলে যাত্রী আসে ব্যগ্র কলোচ্ছ্বাসে । যারে শুধাই “ কোথায় যাবে ?” সে-ই তখনি বলে “ রানীর...

মায়ের সম্মান

অপূর্বদের বাড়ি অনেক ছিল চৌকি টেবিল , পাঁচটা-সাতটা গাড়ি ; ছিল কুকুর ; ছিল বেড়াল ; নানান রঙের ঘোড়া কিছু না হয় ছিল ছ-সাতজোড়া ; দেউরি-ভরা দোবে - চোবে , ছিল চাকর দাসী , ছিল সহিস বেহারা চাপরাসি । — আর ছিল এক মাসি । স্বামীটি তার সংসারে বৈরাগী , কেউ জানে না গেছেন কোথায় মোক্ষ...

মুক্তি

ডাক্তারে যা বলে বলুক নাকো , রাখো রাখো খুলে রাখো , শিয়রের ওই জানলা দুটো — গায়ে লাগুক হাওয়া । ওষুধ ? আমার ফুরিয়ে গেছে ওষুধ খাওয়া । তিতো কড়া কত ওষুধ খেলেম এ জীবনে , দিনে দিনে ক্ষণে ক্ষণে । বেঁচে থাকা , সেই যেন এক রোগ ; কত রকম কবিরাজি , কতই মুষ্টিযোগ , একটুমাত্র অসাবধানেই...

শেষ গান

যারা আমার সাঁঝ – সকালের গানের দীপে জ্বালিয়ে দিলে আলো আপন হিয়ার পরশ দিয়ে ; এই জীবনের সকল সাদা কালো যাদের আলোক-ছায়ার লীলা ; মনের মানুষ বাইরে বেড়ায় যারা তাদের প্রাণের ঝর্ না-স্রোতে আমার পরান হয়ে হাজার ধারা চলছে বয়ে চতুর্দিকে । নয় তো কেবল কালের যোগে আয়ু , নয় সে কেবল...

শেষ প্রতিষ্ঠা

এই কথা সদা শুনি , “ গেছে চলে ”, “ গেছে চলে । ” তবু রাখি বলে বলো না , “ সে নাই । ” সে-কথাটা মিথ্যা , তাই কিছুতেই সহে না যে , মর্মে গিয়ে বাজে । মানুষের কাছে যাওয়া-আসা ভাগ হয়ে আছে । তাই তার ভাষা বহে শুধু আধখানা আশা । আমি চাই সেইখানে মিলাইতে প্রাণ যে-সমুদ্রে ‘ আছে ' ‘ নাই...

হারিয়ে-যাওয়া

ছোট্ট আমার মেয়ে সঙ্গিনীদের ডাক শুনতে পেয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচের তলায় যাচ্ছিল সে নেমে অন্ধকারে ভয়ে ভয়ে থেমে থেমে । হাতে ছিল প্রদীপখানি , আঁচল দিয়ে আড়াল করে চলছিল সাবধানী । আমি ছিলাম ছাতে তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে । হঠাৎ মেয়ের কান্না শুনে , উঠে দেখতে গেলেম ছুটে । সিঁড়ির...