নৈবেদ্য

অচিন্ত্য এ ব্রহ্মান্ডের লোকলোকান্তরে

অচিন্ত্য এ ব্রহ্মান্ডের লোকলোকান্তরে অনন্ত শাসন যাঁর চিরকালতরে প্রত্যেক অণুর মাঝে হতেছে প্রকাশ, যুগে যুগে মানবের মহা ইতিহাস বহিয়া চলেছে সদা ধরণীর ‘পর যাঁর তর্জনীর ছায়া, সেই মহেশ্বর আমার চৈতন্যমাঝে প্রত্যেক পলকে করিছেন অধিষ্ঠান; তাঁহারি আলোকে চক্ষু মোর...

অন্তরের সে সম্পদ ফেলেছি হারায়ে

অন্তরের সে সম্পদ ফেলেছি হারায়ে। তাই মোরা লজ্জানত; তাই সর্ব গায়ে ক্ষুধার্ত দুর্ভর দৈন্য করিছে দংশন; তাই আজি ব্রাহ্মণের বিরল বসন সম্মান বহে না আর; নাহি ধ্যানবল, শুধু জপমাত্র আছে; শুচিত্ব কেবল চিত্তহীন অর্থহীন অভ্যস্ত আচার। সন্তোষের অন্তরেতে বীর্য নাহি আর, কেবল...

অন্ধকার গর্তে থাকে অন্ধ সরীসৃপ

অন্ধকার গর্তে থাকে অন্ধ সরীসৃপ; আপনার ললাটের রতনপ্রদীপ নাহি জানে, নাহি জানে সূর্যালোকলেশ। তেমনি আঁধারে আছে এই অন্ধ দেশ হে দণ্ডবিধাতা রাজা– যে দীপ্ত রতন পরায়ে দিয়েছ ভালে তাহার যতন নাহি জানে, নাহি জানে তোমার আলোক। নিত্য বহে আপনার অস্তিত্বের শোক, জনমের গ্লানি। তব...

অমল কমল সহজে জলের কোলে

অমল কমল সহজে জলের কোলে আনন্দে রহে ফুটিয়া– ফিরিতে না হয় আলয় কোথায় ব’লে ধুলায় ধুলায় লুটিয়া। তেমনি সহজে আনন্দে হরষিত তোমার মাঝারে রব নিমগ্নচিত, পূজাশতদল আপনি সে বিকশিত সব সংশয় টুটিয়া। কোথা আছ তুমি পথ না খুঁজিব কভু, শুধাব না কোনো পথিকে। তোমারি মাঝারে ভ্রমিব...

অল্প লইয়া থাকি তাই মোর

অল্প লইয়া থাকি, তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়– কণাটুকু যদি হারায় তা লয়ে প্রাণ করে হায়-হায়। নদীতটসম কেবলি বৃথাই প্রবাহ আঁকড়ি রাখিবারে চাই, একে একে বুকে আঘাত করিয়া ঢেউগুলি কোথা ধায়। অল্প লইয়া থাকি,তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়। যাহা যায় আর যাহা-কিছু থাকে সব যদি দিই সঁপিয়া...

আঁধার আসিতে রজনীর দীপ

আঁধার আসিতে রজনীর দীপ জ্বেলেছিনু যতগুলি নিবাও রে মন, আজি সে নিবাও সকল দুয়ার খুলি। আজি মোর ঘরে জানি না কখন প্রভাত করেছে রবির কিরণ, মাটির প্রদীপে নাই প্রয়োজন– ধুলায় হোক সে ধূলি। নিবাও, রে মন, রজনীর দীপ সকল দুয়ার খুলি। রাখো রাখো, আজ তুলিয়ো না সুর ছিন্ন বীণার তারে।...

আঁধারে আবৃত ঘন সংশয়

আঁধারে আবৃত ঘন সংশয় বিশ্ব করিছে গ্রাস, তারি মাঝখানে সংশয়াতীত প্রত্যয় করে বাস। বাক্যের ঝড় তর্কের ধূলি অন্ধবুদ্ধি ফিরিছে আকুলি; প্রত্যয় আছে আপনার মাঝে– নাহি তার কোনো ত্রাস। সংসারপথে শত সংকট ঘুরিছে ঘূর্ণবায়ে, তারি মাঝখানে অচলা শান্তি অমরতরুচ্ছায়ে। নিন্দা ও ক্ষতি...

আঘাতসংঘাত-মাঝে দাঁড়াইনু আসি

আঘাতসংঘাত-মাঝে দাঁড়াইনু আসি। অঙ্গদ কুণ্ডল কণ্ঠী অলংকাররাশি খুলিয়া ফেলেছি দূরে। দাও হস্তে তুলি নিজহাতে তোমার অমোঘ শরগুলি, তোমার অক্ষয় তূণ। অস্ত্রে দীক্ষা দেহো রণগুরু। তোমার প্রবল পিতৃস্নেহ ধ্বনিয়া উঠুক আজি কঠিন আদেশে। করো মোরে সম্মানিত নববীরবেশে, দুরূহ কর্তব্যভারে,...

আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে

আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে। জনশূন্য ক্ষেত্র-মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার রয়েছে পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্তপ্রসার স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি। ক্ষীণ নদীরেখা নাহি করে গান আজি, নাহি লেখে লেখা বালুকার তটে। দূরে দূরে পল্লী যত মুদ্রিতনয়নে রৌদ্র পোহাইতে রত...

আবার আমার হাতে বীণা দাও তুলি

আবার আমার হাতে বীণা দাও তুলি, আবার আসুক ফিরে হারা গানগুলি। সহসা কঠিন শীতে মানসের জলে পদ্মবন মরে যায়, হংস দলে দলে সারি বেঁধে উড়ে যায় সুদূর দক্ষিণে জনহীন কাশফুল্ল নদীর পুলিনে; আবার বসন্তে তারা ফিরে আসে যথা বহি লয়ে আনন্দের কলমুখরতা– তেমনি আমার যত উড়ে-যাওয়া গান আবার...

আমরা কোথায় আছি, কোথায় সুদূরে

আমরা কোথায় আছি, কোথায় সুদূরে দীপহীন জীর্ণভিত্তি অবসাদপুরে ভগ্নগৃহে, সহস্রের ভ্রূকুটির নীচে কুব্জপৃষ্ঠে নতশিরে, সহস্রের পিছে চলিয়াছি প্রভুত্বের তর্জনী-সংকেতে কটাক্ষে কাঁপিয়া–লইয়াছি শির পেতে সহস্রশাসনশাস্ত্র। সংকুচিত-কায়া কাঁপিতেছে রচি নিজ কল্পনার ছায়া। সন্ধ্যার...

আমার এ ঘরে আপনার করে

আমার এ ঘরে আপনার করে গৃহদীপখানি জ্বালো। সব দুখশোক সার্থক হোক লভিয়া তোমারি আলো। কোণে কোণে যত লুকানো আঁধার মরুক ধন্য হয়ে, তোমারি পুণ্য আলোকে বসিয়া প্রিয়জনে বাসি ভালো। আমার এ ঘরে আপনার করে গৃহদীপখানি জ্বালো। পরশমণির প্রদীপ তোমার অচপল তার জ্যোতি, সোনা করে নিক পলকে আমার সব...

আমার এ মানসের কানন কাঙাল

আমার এ মানসের কানন কাঙাল শীর্ণ শুষ্ক বাহু মেলি বহু দীর্ঘকাল আছে ক্রুদ্ধ ঊর্ধ্ব-পানে চাহি। ওহে নাথ, এ রুদ্র মধ্যাহ্ন-মাঝে কবে অকস্মাৎ পথিক পবন কোন্‌ দূর হতে এসে ব্যগ্র শাখাপ্রশাখায় চক্ষের নিমেষে কানে কানে রটাইবে আনন্দমর্মর, প্রতীক্ষায় পুলকিয়া বনবনান্তর। গম্ভীর...

আমার সকল অঙ্গে তোমার পরশ

আমার সকল অঙ্গে তোমার পরশ লগ্ন হয়ে রহিয়াছে রজনী-দিবস প্রাণেশ্বর, এই কথা নিত্য মনে আনি রাখিব পবিত্র করি মোর তনুখানি। মনে তুমি বিরাজিছ, হে পরম জ্ঞান, এই কথা সদা স্মরি মোর সর্বধ্যান সর্বচিন্তা হতে আমি সর্বচেষ্টা করি সর্বমিথ্যা রাখি দিব দূরে পরিহরি। হৃদয়ে রয়েছে তব অচল আসন...

আমারে সৃজন করি যে মহাসম্মান

আমারে সৃজন করি যে মহাসম্মান দিয়েছ আপন হস্তে, রহিতে পরান তার অপমান যেন সহ্য নাহি করি। যে আলোক জ্বালায়েছ দিবস-শর্বরী তার ঊর্ধ্বশিখা যেন সর্ব-উচ্চে রাখি, অনাদর হতে তারে প্রাণ দিয়া ঢাকি। মোর মনুষ্যত্ব সে যে তোমারি প্রতিমা, আত্মার মহত্ত্বে মম তোমারি মহিমা মহেশ্বর! সেথায় যে...

আমি ভালোবাসি, দেব, এই বাঙালার

আমি ভালোবাসি, দেব, এই বাঙালার দিগন্তপ্রসার ক্ষেত্রে যে শান্তি উদার বিরাজ করিছে নিত্য, মুক্ত নীলাম্বরে অচ্ছায় আলোকে গাহে বৈরাগ্যের স্বরে যে ভৈরবীগান, যে মাধুরী একাকিনী নদীর নির্জন তটে বাজায় কিঙ্কিণী তরল কল্লোলরোলে, যে সরল স্নেহ তরুচ্ছায়া-সাথে মিশি স্নিগ্ধপল্লীগেহ...

এ আমার শরীরের শিরায় শিরায়

এ আমার শরীরের শিরায় শিরায় যে প্রাণ-তরঙ্গমালা রাত্রিদিন ধায় সেই প্রাণ ছুটিয়াছে বিশ্বদিগ্‌বিজয়ে, সেই প্রাণ অপরূপ ছন্দে তালে লয়ে নাচিছে ভুবনে; সেই প্রাণ চুপে চুপে বসুধার মৃত্তিকার প্রতি রোমকূপে লক্ষ লক্ষ তৃণে তৃণে সঞ্চারে হরষে, বিকাশে পল্লবে পুষ্পে– বরষে বরষে...

এ কথা মানিব আমি, এক হতে দুই

এ কথা মানিব আমি, এক হতে দুই কেমনে যে হতে পারে জানি না কিছুই। কেমনে যে কিছু হয়, কেহ হয় কেহ, কিছু থাকে কোনোরূপে, কারে বলে দেহ, কারে বলে আত্মা মন, বুঝিতে না পেরে চিরকাল নিরখিব বিশ্বজগতেরে নিস্তব্ধ নির্বাক্‌ চিত্তে। বাহিরে যাহার কিছুতে নারিব যেতে আদি অন্ত তার, অর্থ তার,...

এ কথা স্মরণে রাখা কেন গো কঠিন

এ কথা স্মরণে রাখা কেন গো কঠিন তুমি আছ সব চেয়ে, আছ নিশিদিন, আছ প্রতি ক্ষণে–আছ দূরে, আছ কাছে, যাহা-কিছু আছে, তুমি আছ ব’লে আছে। যেমনি প্রবেশ আমি করি লোকালয়ে, যখনি মানুষ আসে স্তুতিনিন্দা লয়ে– লয়ে রাগ, লয়ে দ্বেষ, লয়ে গর্ব তার অমনি সংসার ধরে পর্বত-আকার...

এ দুর্ভাগ্য দেশ হতে হে মঙ্গলময়

এ দুর্ভাগ্য দেশ হতে হে মঙ্গলময়, দূর করে দাও তুমি সর্ব তুচ্ছ ভয়– লোকভয়, রাজভয়, মৃত্যুভয় আর। দীনপ্রাণ দুর্বলের এ পাষাণভার, এই চিরপেষণযন্ত্রণা, ধূলিতলে এই নিত্য অবনতি, দণ্ডে পলে পলে এই আত্ম-অবমান,অন্তরে বাহিরে এই দাসত্বের রজ্জু, ত্রস্ত নতশিরে সহস্রের পদপ্রান্ততলে...