চৈতালি

অজ্ঞাত বিশ্ব

জন্মেছি তোমার মাঝে ক্ষণিকের তরে অসীম প্রকৃতি! সরল বিশ্বাসভরে তবু তোরে গৃহ ব’লে মাতা ব’লে মানি। আজ সন্ধ্যাবেলা তোর নখদন্ত হানি প্রচন্ড পিশাচরূপে ছুটিয়া গর্জিয়া, আপনার মাতৃবেশ শূন্যে বিসর্জিয়া কুটি কুটি ছিন্ন করি বৈশাখের ঝড়ে ধেয়ে এলি ভয়ংকরী ধূলিপক্ষ-’পরে, তৃণসম করিবারে...

অনন্ত পথে

বাতায়নে বসি ওরে হেরি প্রতিদিন ছোটো মেয়ে খেলাহীন, চপলতাহীন, গম্ভীর কর্তব্যরত, তৎপরচরণে আসে যায় নিত্যকাজে; অশ্রুভরা মনে ওর মুখপানে চেয়ে হাসি স্নেহভরে। আজি আমি তরী খুলি যাব দেশান্তরে; বালিকাও যাবে কবে কর্ম-অবসানে আপন স্বদেশে; ও আমারে নাহি জানে, আমিও জানি নে ওরে—দেখিবারে...

অনাবৃষ্টি

শুনেছিনু পুরাকালে মানবীর প্রেমে দেবতারা স্বর্গ হতে আসিতেন নেমে। সেকাল গিয়েছে। আজি এই বৃষ্টিহীন শুষ্কনদী দগ্ধক্ষেত্র বৈশাখের দিন কাতরে কৃষককন্যা অনুনয়বাণী কহিতেছে বারম্বার—আয় বৃষ্টি হানি। ব্যাকুল প্রত্যাশাভরে গগনের পানে চাহিতেছে থেকে থেকে করুণ নয়ানে। তবু বৃষ্টি নাহি...

অভিমান

কারে দিব দোষ বন্ধু, কারে দিব দোষ! বৃথা কর আস্ফালন, বৃথা কর রোষ। যারা শুধু মরে কিন্তু নাহি দেয় প্রাণ, কেহ কভু তাহাদের করে নি সম্মান। যতই কাগজে কাঁদি, যত দিই গালি, কালামুখে পড়ে তত কলঙ্কের কালি। যে তোমারে অপমান করে অহর্নিশ তারি কাছে তারি ‘পরে তোমার নালিশ! নিজের বিচার যদি...

অভয়

আজি বর্ষশেষ-দিনে, গুরুমহাশয়, কারে দেখাইছ বসে অন্তিমের ভয়? অনন্ত আশ্বাস আজি জাগিছে আকাশে, অনন্ত জীবনধারা বহিছে বাতাসে, জগৎ উঠেছে হেসে জাগরণসুখে, ভয় শুধু লেগে আছে তব শুষ্ক মুখে। দেবতা রাক্ষস নহে মেলি মৃত্যুগ্রাস— প্রবঞ্চনা করি তুমি দেখাইছ ত্রাস। বরঞ্চ ঈশ্বরে ভুলি স্বল্প...

অসময়

বৃথা চেষ্টা রাখি দাও। স্তব্ধ নীরবতা আপনি গড়িবে তুলি আপনার কথা। আজি সে রয়েছে ধ্যানে—এ হৃদয় মম তপোভঙ্গভয়ভীত তপোবনসম। এমন সময়ে হেথা বৃথা তুমি প্রিয়া বসন্তকুসুমমালা এসেছ পরিয়া, এনেছ অঞ্চল ভরি যৌবনের স্মৃতি— নিভৃত নিকুঞ্জে আজি নাই কোনো গীতি। শুধু এ মর্মরহীন বনপথ-’পরি...

আশার সীমা

সকল আকাশ , সকল বাতাস , সকল শ্যামল ধরা , সকল কান্তি , সকল শান্তি সন্ধ্যাগগন - ভরা , যত - কিছু সুখ যত সুধামুখ , যত মধুমাখা হাসি , যত নব নব বিলাসবিভব , প্রমোদমদিরারাশি , সকল পৃথ্বী , সকল কীর্তি , সকল অর্ঘ্যভার , বিশ্বমথন সকল যতন , সকল রতনহার , সব পাই যদি তবু নিরবধি আরো...

আশিষ-গ্রহণ

চলিয়াছি রণক্ষেত্রে সংগ্রামের পথে। সংসারবিপ্লবধ্বনি আসে দূর হতে। বিদায় নেবার আগে, পারি যতক্ষণ পরিপূর্ণ করি লই মোর প্রাণমন নিত্য-উচ্চারিত তব কলকণ্ঠস্বরে উদার মঙ্গলমন্ত্রে—হৃদয়ের ‘পরে লই তব শুভস্পর্শ, কল্যাণসঞ্চয়। এই আশীর্বাদ করো, জয়পরাজয় ধরি যেন নম্রচিত্তে করি শির নত...

ইছামতী নদী

অয়ি তন্বী ইছামতী, তব তীরে তীরে শান্তি চিরকাল থাক কুটিরে কুটিরে— শস্যে পূর্ণ হোক ক্ষেত্র তব তটদেশে। বর্ষে বর্ষে বরষায় আনন্দিত বেশে ঘনঘোরঘটা-সাথে বজ্রবাদ্যরবে পূর্ববায়ুকল্লোলিত তরঙ্গ-উৎসবে তুলিয়া আনন্দধ্বনি দক্ষিণে ও বামে আশ্রিত পালিত তব দুই-তট-গ্রামে সমারোহে চলে এসো...

উৎসর্গ

আজি মোর দ্রাক্ষাকুঞ্জবনে গুচ্ছ গুচ্ছ ধরিয়াছে ফল। পরিপূর্ণ বেদনার ভরে মুহূর্তেই বুঝি ফেটে পড়ে, বসন্তের দুরন্ত বাতাসে নুয়ে বুঝি নমিবে ভূতল— রসভরে অসহ উচ্ছ্বাসে থরে থরে ফলিয়াছে ফল। তুমি এসো নিকুঞ্জনিবাসে, এসো মোর সার্থকসাধন। লুটে লও ভরিয়া অঞ্চল জীবনের সকল সম্বল, নীরবে...

ঋতুসংহার

হে কবীন্দ্র কালিদাস, কল্পকুঞ্জবনে নিভৃতে বসিয়া আছ প্রেয়সীর সনে যৌবনের যৌবরাজ্যসিংহাসন-’পরে। মরকতপাদপীঠ-বহনের তরে রয়েছে সমস্ত ধরা, সমস্ত গগন স্বর্ণরাজছত্র ঊর্ধ্বে করেছে ধারণ শুধু তোমাদের-’পরে; ছয় সেবাদাসী ছয় ঋতু ফিরে ফিরে নৃত্য করে আসি; নব নব পাত্র ভরি ঢালি দেয় তারা নব...

ঐশ্বর্য

ক্ষুদ্র এই তৃণদল ব্রহ্মান্ডের মাঝে সরল মাহাত্ম্য লয়ে সহজে বিরাজে। পূরবের নবসূর্য, নিশীথের শশী, তৃণটি তাদেরি সাথে একাসনে বসি। আমার এ গান এও জগতের গানে মিশে যায় নিখিলের মর্মমাঝখানে; শ্রাবণের ধারাপাত, বনের মর্মর সকলের মাঝে তার আপনার ঘর। কিন্তু, হে বিলাসী, তব ঐশ্বর্যের...

করুণা

অপরাহ্নে ধূলিচ্ছন্ন নগরীর পথে বিষম লোকের ভিড়; কর্মশালা হতে ফিরে চলিয়াছে ঘরে পরিশ্রান্ত জন বাঁধমুক্ত তটিনীর স্রোতের মতন। ঊর্ধ্বশ্বাসে রথ-অশ্ব চলিয়াছে ধেয়ে ক্ষুধা আর সারথির কশাঘাত খেয়ে। হেনকালে দোকানির খেলামুগ্ধ ছেলে কাটা ঘুড়ি ধরিবারে চলে বাহু মেলে। অকস্মাৎ শকটের তলে...

কর্ম

ভৃত্যের না পাই দেখা প্রাতে । দুয়ার রয়েছে খোলা , স্নানজল নাই তোলা , মূর্খাধম আসে নাই রাতে । মোর ধৌত বস্ত্রখানি কোথা আছে নাহি জানি , কোথা আহারের আয়োজন ! বাজিয়া যেতেছে ঘড়ি বসে আছি রাগ করি — দেখা পেলে করিব শাসন । বেলা হলে অবশেষে প্রণাম করিল এসে , দাঁড়াইল করি করজোড় । আমি...

কাব্য

তবু কি ছিল না তব সুখদুঃখ যত, আশা নৈরাশ্যের দ্বন্দ্ব আমাদেরি মতো, হে অমর কবি! ছিল না কি অনুক্ষণ রাজসভা-ষড়্‌চক্র, আঘাত গোপন? কখনো কি সহ নাই অপমানভার, অনাদর, অবিশ্বাস, অন্যায় বিচার, অভাব কঠোর ক্রূর—নিদ্রাহীন রাতি কখনো কি কাটে নাই বক্ষে শেল গাঁথি? তবু সে সবার ঊর্ধ্বে...

কালিদাসের প্রতি

আজ তুমি কবি শুধু, নহ আর কেহ— কোথা তব রাজসভা, কোথা তব গেহ, কোথা সেই উজ্জয়িনী—কোথা গেল আজ প্রভু তব, কালিদাস, রাজ-অধিরাজ। কোনো চিহ্ন নাহি কারো। আজ মনে হয় ছিলে তুমি চিরদিন চিরানন্দময় অলকার অধিবাসী। সন্ধ্যাভ্রশিখরে ধ্যান ভাঙি উমাপতি ভূমানন্দভরে নৃত্য করিতেন যবে, জলদ সজল...

কুমারসম্ভবগান

যখন শুনালে, কবি, দেবদম্পতিরে কুমারসম্ভবগান, চারি দিকে ঘিরে দাঁড়ালো প্রমথগণ—শিখরের ‘পর নামিল মন্থর শান্ত সন্ধ্যামেঘস্তর স্থগিত-বিদ্যুৎ-লীলা, গর্জনবিরত, কুমারের শিখী করি পুচ্ছ অবনত স্থির হয়ে দাঁড়াইল পার্বতীর পাশে বাঁকায়ে উন্নত গ্রীবা। কভু স্মিতহাসে কাঁপিল দেবীর ওষ্ঠ,...

ক্ষণমিলন

পরম আত্মীয় বলে যারে মনে মানি তারে আমি কতদিন কতটুকু জানি! অসীম কালের মাঝে তিলেক মিলনে পরশে জীবন তার আমার জীবনে। যতটুকু লেশমাত্র চিনি দুজনায়, তাহার অনন্তগুণ চিনি নাকো হায়। দুজনের এক জন এক দিন যবে বারেক ফিরাবে মুখ, এ নিখিল ভবে আর কভু ফিরিবে না মুখোমুখি পথে, কে কার পাইবে...

খেয়া

খেয়া নৌকা পারাপার করে নদীস্রোতে, কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হতে। দুই তীরে দুই গ্রাম আছে জানাশোনা, সকাল হইতে সন্ধ্যা করে আনাগোনা। পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব কত সর্বনাশ, নূতন নূতন কত গড়ে ইতিহাস, রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া উঠে সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে, সভ্যতার নব নব কত তৃষ্ণা...

গান

তুমি পড়িতেছ হেসে তরঙ্গের মতো এসে হৃদয়ে আমার । যৌবনসমুদ্রমাঝে কোন্‌ পূর্ণিমায় আজি এসেছে জোয়ার ! উচ্ছল পাগল নীরে তালে তালে ফিরে ফিরে এ মোর নির্জন তীরে কী খেলা তোমার ! মোর সর্ব বক্ষ জুড়ে কত নৃত্যে কত সুরে এসো কাছে যাও দূরে শতলক্ষবার । তুমি পড়িতেছ হেসে তরঙ্গের মতো এসে...