কবিতা

অবসাদ

অবসাদ দয়াময়ি, বাণি, বীণাপাণি, জাগাও — জাগাও, দেবি, উঠাও আমারে দীন হীন। ঢালো এ হৃদয়মাঝে জ্বলন্ত অনলময় বল। দিনে দিনে অবসাদে হইতেছি অবশ মলিন; নির্জীব এ হৃদয়ের দাঁড়াবার নাই যেন বল। নিদাঘ-তপন-শুষ্ক ম্রিয়মাণ লতার মতন ক্রমে অবসন্ন হয়ে পড়িতেছি ভূমিতে লুটায়ে, চারিদিকে...

অভিলাষ

১ জনমনোমুগ্ধকর উচ্চ অভিলাষ! তোমার বন্ধুর পথ অনন্ত অপার । অতিক্রম করা যায় যত পান্থশালা, তত যেন অগ্রসর হতে ইচ্ছা হয়। ২ তোমার বাঁশরি স্বরে বিমোহিত মন– মানবেরা, ওই স্বর লক্ষ্য করি হায়, যত অগ্রসর হয় ততই যেমন কোথায় বাজিছে তাহা বুঝিতে না পারে। ৩ চলিল মানব দেখো বিমোহিত...

আকুল আহ্বান

আকুল আহ্বান অভিমান ক’রে কোথায় গেলি, আয় মা ফিরে, আয় মা ফিরে আয়। দিন রাত কেঁদে কেঁদে ডাকি আয় মা ফিরে, আয় মা ফিরে আয়। সন্ধে হল, গৃহ অন্ধকার, মা গো, হেথায় প্রদীপ জ্বলে না। একে একে সবাই ঘরে এল, আমায় যে মা, “মা’ কেউ বলে না। সময় হল বেঁধে দেব চুল, পরিয়ে দেব...

আগমনী

আগমনী সুধীরে নিশার আঁধার ভেদিয়া ফুটিল প্রভাততারা। হেথা হোথা হতে পাখিরা গাহিল ঢালিয়া সুধার ধারা। মৃদুল প্রভাতসমীর পরশে কমল নয়ন খুলিল হরষে, হিমালয় শিরে অমল আভায় শোভিল ধবল তুষারজটা। খুলি গেল ধীরে পূরবদ্বার, ঝরিল কনককিরণধার, শিখরে শিখরে জ্বলিয়া উঠিল, রবির বিমল কিরণছটা।...

আমার এ মনোজ্বালা

আমার এ মনোজ্বালা আমার এ মনোজ্বালা কে বুঝিবে সরলে কেন যে এমন করে, ম্রিয়মাণ হয়ে থাকি কেন যে নীরবে হেন বসে থাকি বিরলে। এ যাতনা কেহ যদি বুঝিতে পারিত দেবি, তবে কি সে আর কভু পারিত গো হাসিতে? হৃদয় আছয়ে যার সঁপিতে পারে সে প্রাণ এ জ্বলন্ত যন্ত্রণার এক তিল নাশিতে! হে সখী হে...

উপহার-গীতি

উপহার-গীতি ছেলেবেলা হতে বালা, যত গাঁথিয়াছি মালা যত বনফুল আমি তুলেছি যতনে ছুটিয়া তোমারি কোলে, ধরিয়া তোমারি গলে পরায়ে দিয়াছি সখি তোমারি চরণে। আজো গাঁথিয়াছি মালা, তুলিয়া বনের ফুল তোমারি চরণে সখি দিব গো পরায়ে — না-হয় ঘৃণার ভরে, দলিয়ো চরণতলে হৃদয় যেমন করে দলেছ...

এ হতভাগারে ভালো কে বাসিতে চায়

এ হতভাগারে ভালো কে বাসিতে চায় এ হতভাগারে ভালো কে বাসিতে চায়? সুখ-আশা থাকে যদি বেসো না আমায়! এ জীবন, অভাগার — নয়ন সলিলধার বলো সখি কে সহিতে পারিবে তা হায়! এ ভগ্নপ্রাণের অতি বিষাদের গান বলো সখি কে শুনিতে পারে সারা প্রাণ গেছি ভুলে ভালোবাসা — ছাড়িয়াছি সুখ-আশা...

এসো আজি সখা

এসো আজি সখা এসো আজি সখা বিজন পুলিনে বলিব মনের কথা; মরমের তলে যা-কিছু রয়েছে লুকানো মরম-ব্যথা। সুচারু রজনী, মেঘের আঁচল চাপিয়া অধরে হাসিছে শশি, বিমল জোছনা সলিলে মজিয়া আঁধার মুছিয়া ফেলেছে নিশি, কুসুম কাননে বিনত আননে মুচকিয়া হাসে গোলাপবালা, বিষাদে মলিনা, শরমে নিলীনা, সলিলে...

ও কথা বোলো না সখি

ও কথা বোলো না সখি ও কথা বোলো না সখি — প্রাণে লাগে ব্যথা — আমি ভালোবাসি নাকো এ কিরূপ কথা! কী জানি কী মোর দশা কহিব কেমনে প্রকাশ করিতে নারি রয়েছে যা মনে — পৃথিবী আমারে সখি চিনিল না তাই — পৃথিবী না চিনে মোরে তাহে ক্ষতি নাই — তুমিও কি বুঝিলে...

কী হবে বলো গো সখি

কী হবে বলো গো সখি কী হবে বলো গো সখি ভালোবাসি অভাগারে যদি ভালোবেসে থাক ভুলে যাও একেবারে — একদিন এ হৃদয় — আছিল কুসুমময় চরাচর পূর্ণ ছিল সুখের অমৃতধারে সেদিন গিয়েছে সখি আর কিছু নাই ভেঙে পুড়ে সব যেন হয়ে গেছে ছাই হৃদয়-কবরে শুধু মৃত ঘটনার …[র]য়েছে পড়ে...

ছেলেবেলাকার আহা, ঘুমঘোরে দেখেছিনু

ছেলেবেলাকার আহা, ঘুমঘোরে দেখেছিনু ছেলেবেলাকার আহা, ঘুমঘোরে দেখেছিনু মূরতি দেবতাসম অপরূপ স্বজনি, ভেবেছিনু মনে মনে, প্রণয়ের চন্দ্রলোকে খেলিব দুজনে মিলি দিবস ও রজনী, আজ সখি একেবারে, ভেঙেছে সে ঘুমঘোর ভেঙেছে সাধের ভুল মাখানো যা মরমে, দেবতা ভাবিনু যারে, তার কলঙ্কের কথা...

জানি সখা অভাগীরে ভালো তুমি বাস না

জানি সখা অভাগীরে ভালো তুমি বাস না জানি সখা অভাগীরে ভালো তুমি বাস না ছেড়েছি ছেড়েছি নাথ তব প্রেম-কামনা — এক ভিক্ষা মাগি হায় — নিরাশ কোরো না তায় শেষ ভিক্ষা শেষ আশা — অন্তিম বাসনা — এ জন্মের তরে সখা — আর তো হবে না দেখা তুমি সুখে থেকো নাথ কী...

জ্বল্‌ জ্বল্‌ চিতা! দ্বিগুণ, দ্বিগুণ

জ্বল্‌ জ্বল্‌ চিতা! দ্বিগুণ, দ্বিগুণ, পরাণ সঁপিবে বিধবা-বালা। জ্বলুক্‌ জ্বলুক্‌ চিতার আগুন, জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা॥ শোন্‌ রে যবন!– শোন্‌ রে তোরা, যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবে, সাক্ষী র’লেন দেবতা তার এর প্রতিফল ভুগিতে হবে॥ ওই যে সবাই পশিল চিতায়, একে একে...

দিল্লি দরবার

দেখিছ না অয়ি ভারত-সাগর,অয়ি গো হিমাদ্রি দেখিছ চেয়ে, প্রলয়-কালের নিবিড় আঁধার, ভারতের ভাল ফেলেছে ছেয়ে। অনন্ত সমুদ্র তোমারই বুকে, সমুচ্চ হিমাদ্রি তোমারি সম্মুখে, নিবিড় আঁধারে, এ ঘোর দুর্দিনে, ভারত কাঁপিছে হরষ-রবে! শুনিতেছি নাকি শত কোটি দাস, মুছি অশ্রুজল, নিবারিয়া শ্বাস,...

পার কি বলিতে কেহ

পার কি বলিতে কেহ পার কি বলিতে কেহ কী হল এ বুকে যখনি শুনি গো ধীর সংগীতের ধ্বনি যখনি দেখি গো ধীর প্রশান্ত রজনী কত কী যে কথা আর কত কী যে ভাব উচ্ছ্বসিয়া উথলিয়া আলোড়িয়া উঠে! দূরাগত রাখালের বাঁশরির মতো আধভোলা কালিকার স্বপ্নের মতন — কী যে কথা কী যে ভাব ধরি ধরি করি তবুও...

পাষাণ-হৃদয়ে কেন সঁপিনু হৃদয়

পাষাণ-হৃদয়ে কেন সঁপিনু হৃদয় পাষাণ-হৃদয়ে কেন সঁপিনু হৃদয়? মর্মভেদী যন্ত্রণায়, ফিরেও যে নাহি চায় বুক ফেটে গেলেও যে কথা নাহি কয় প্রাণ দিয়ে সাধিলেও, পায়ে ধরে কাঁদিলেও এক তিল এক বিন্দু দয়া নাহি হয় হেরিলে গো অশ্রুরাশি, বরষে ঘৃণার হাসি, বিরক্তির তিরস্কার তীব্র বিষময়। এত যদি...

প্রকৃতির খেদ – দ্বিতীয় পাঠ

[দ্বিতীয় পাঠ] বিস্তারিয়া ঊর্মিমালা, সুকুমারী শৈলবালা অমল সলিলা গঙ্গা অই বহি যায় রে। প্রদীপ্ত তুষাররাশি, শুভ্র বিভা পরকাশি ঘুমাইছে স্তব্ধভাবে গোমুখীর শিখরে। ফুটিয়াছে কমলিনী অরুণের কিরণে। নির্ঝরের এক ধারে, দুলিছে তরঙ্গ-ভরে ঢুলে ঢুলে পড়ে জলে প্রভাত পবনে। হেলিয়া নলিনী-দলে...

প্রকৃতির খেদ – প্রথম পাঠ

[প্রথম পাঠ] ১ বিস্তারিয়া ঊর্মিমালা, বিধির মানস-বালা, মানস-সরসী ওই নাচিছে হরষে। প্রদীপ্ত তুষাররাশি, শুভ্র বিভা পরকাশি, ঘুমাইছে স্তব্ধভাবে হিমাদ্রি উরসে। ২ অদূরেতে দেখা যায়, উজল রজত কায়, গোমুখী হইতে গঙ্গা ওই বহে যায়। ঢালিয়া পবিত্র ধারা, ভূমি করি উরবরা, চঞ্চল চরণে সতী...

প্রলাপ ২

ঢাল্‌! ঢাল্‌ চাঁদ! আরো আরো ঢাল্! সুনীল আকাশে রজতধারা! হৃদয় আজিকে উঠেছে মাতিয়া পরাণ হয়েছে পাগলপারা! গাইব রে আজ হৃদয় খুলিয়া জাগিয়া উঠিবে নীরব রাতি! দেখাব জগতে হৃদয় খুলিয়া পরাণ আজিকে উঠেছে মাতি! হাসুক পৃথিবী, হাসুক জগৎ, হাসুক হাসুক চাঁদিমা তারা! হৃদয় খুলিয়া করিব রে গান...

প্রলাপ ১

১ গিরির উরসে নবীন নিঝর, ছুটে ছুটে অই হতেছে সারা। তলে তলে তলে নেচে নেচে চলে, পাগল তটিনী পাগলপারা। ২ হৃদি প্রাণ খুলে ফুলে ফুলে ফুলে, মলয় কত কী করিছে গান। হেতা হোতা ছুটি ফুল-বাস লুটি, হেসে হেসে হেসে আকুল প্রাণ। ৩ কামিনী পাপড়ি ছিঁড়ি ছিঁড়ি ছিঁড়ি, উড়িয়ে উড়িয়ে ছিঁড়িয়ে ফেলে।...