উৎসর্গ

অচির বসন্ত হায় এল, গেল চলে

অচির বসন্ত হায় এল, গেল চলে– এবার কিছু কি, কবি করেছ সঞ্চয়। ভরেছ কি কল্পনার কনক-অঞ্চলে চঞ্চলপবনক্লিষ্ট শ্যাম কিশলয়, ক্লান্ত করবীর গুচ্ছ। তপ্ত রৌদ্র হতে নিয়েছ কি গলাইয়া যৌবনের সুরা– ঢেলেছ কি উচ্ছলিত তব ছন্দঃস্রোতে, রেখেছ কি করি তারে অনন্তমধুরা। এ বসন্তে...

অত চুপি চুপি কেন কথা কও

অত চুপি চুপি কেন কথা কও ওগো মরণ, হে মোর মরণ। অতি ধীরে এসে কেন চেয়ে রও, ওগো একি প্রণয়েরি ধরন। যবে সন্ধ্যাবেলায় ফুলদল পড়ে ক্লান্ত বৃন্তে নমিয়া, যবে ফিরে আসে গোঠে গাভীদল সারা দিনমান মাঠে ভ্রমিয়া, তুমি পাশে আসি বস অচপল ওগো অতি মৃদুগতি-চরণ। আমি বুঝি না যে কী যে কথা কও ওগো...

আকাশ-সিন্ধু-মাঝে এক ঠাঁই

আকাশ-সিন্ধু-মাঝে এক ঠাঁই কিসের বাতাস লেগেছে– জগৎ-ঘূর্ণি জেগেছে। ঝলকি উঠেছে রবি-শশাঙ্ক, ঝলকি ছুটেছে তারা, অযুত চক্র ঘুরিয়া উঠেছে অবিরাম মাতোয়ারা। স্থির আছে শুধু একটি বিন্দু ঘূর্ণির মাঝখানে– সেইখান হতে স্বর্ণকমল উঠেছে শূন্যপানে। সুন্দরী, ওগো সুন্দরী, শতদলদলে...

আছি আমি বিন্দুরূপে, হে অন্তরযামী

আছি আমি বিন্দুরূপে, হে অন্তরযামী আছি আমি বিশ্বকেন্দ্রস্থলে। “আছি আমি’ এ কথা স্মরিলে মনে মহান্‌ বিস্ময় আকুল করিয়া দেয়,স্তব্ধ এ হৃদয় প্রকাণ্ড রহস্যভারে। “আছি আর আছে’ অন্তহীন আদি প্রহেলিকা, কার কাছে শুধাইব অর্থ এর! তত্ত্ববিদ্‌ তাই কহিতেছে,”এ...

আজ মনে হয় সকলেরই মাঝে

আজ মনে হয় সকলেরই মাঝে তোমারেই ভালোবেসেছি। জনতা বাহিয়া চিরদিন ধরে শুধু তুমি আমি এসেছি। দেখি চারি দিক-পানে কী যে জেগে ওঠে প্রাণে– তোমার আমার অসীম মিলন যেন গো সকল খানে। কত যুগ এই আকাশে যাপিনু সে কথা অনেক ভুলেছি। তারায় তারায় যে আলো কাঁপিছে সে আলোকে দোঁহে দুলেছি।...

আজি হেরিতেছি আমি

আজি হেরিতেছি আমি, হে হিমাদ্রি, গভীর নির্জনে পাঠকের মতো তুমি বসে আছ অচল আসনে, সনাতন পুঁথিখানি তুলিয়া লয়েছ অঙ্ক’পরে। পাষাণের পত্রগুলি খুলিয়া গিয়াছে থরে থরে, পড়িতেছ একমনে। ভাঙিল গড়িল কত দেশ, গেল এল কত যুগ– পড়া তব হইল না শেষ। আলোকের দৃষ্টিপথে এই-যে সহস্র খোলা...

আজিকে গহন কালিমা লেগেছে গগনে

আজিকে গহন কালিমা লেগেছে গগনে, ওগো, দিক্‌-দিগন্ত ঢাকি। আজিকে আমরা কাঁদিয়া শুধাই সঘনে, ওগো, আমরা খাঁচার পাখি– হৃদয়বন্ধু, শুন গো বন্ধু মোর, আজি কি আসিল প্রলয়রাত্রি ঘোর। চিরদিবসের আলোক গেল কি মুছিয়া। চিরদিবসের আশ্বাস গেল ঘুচিয়া? দেবতার কৃপা আকাশের তলে কোথা কিছু নাহি...

আপনারে তুমি করিবে গোপন

আপনারে তুমি করিবে গোপন কী করি। হৃদয় তোমার আঁখির পাতায় থেকে থেকে পড়ে ঠিকরি। আজ আসিয়াছ কৌতুকবেশে, মানিকের হার পরি এলোকেশে, নয়নের কোণে আধো হাসি হেসে এসেছ হৃদয়পুলিনে। ভুলি নে তোমার বাঁকা কটাক্ষে, ভুলি নে চতুর নিঠুর বাক্যে ভুলি নে। করপল্লবে দিলে যে আঘাত করিব কি তাহে...

আমাদের এই পল্লিখানি পাহাড় দিয়ে ঘেরা

আমাদের এই পল্লিখানি পাহাড় দিয়ে ঘেরা, দেবদারুর কুঞ্জে ধেনু চরায় রাখালেরা। কোথা হতে চৈত্রমাসে হাঁসের শ্রেণী উড়ে আসে, অঘ্রানেতে আকাশপথে যায় যে তারা কোথা আমরা কিছুই জানি নেকো সেই সুদূরের কথা। আমরা জানি গ্রাম ক’খানি, চিনি দশটি গিরি– মা ধরণী রাখেন মোদের কোলের...

আমার খোলা জানালাতে

আমার খোলা জানালাতে শব্দবিহীন চরণপাতে কে এলে গো, কে গো তুমি এলে। একলা আমি বসে আছি অস্তলোকের কাছাকাছি পশ্চিমেতে দুটি নয়ন মেলে। অতিসুদূর দীর্ঘ পথে আকুল তব আঁচল হতে আঁধারতলে গন্ধরেখা রাখি জোনাক-জ্বালা বনের শেষে কখন এলে দুয়ারদেশে শিথিল কেশে ললাটখানি ঢাকি। তোমার সাথে আমার...

আমার মাঝারে যে আছে কে গো সে

আমার মাঝারে যে আছে কে গো সে কোন্‌ বিরহিণী নারী? আপন করিতে চাহিনু তাহারে, কিছুতেই নাহি পারি। রমণীরে কে বা জানে– মন তার কোন্‌খানে। সেবা করিলাম দিবানিশি তার, গাঁথি দিনু গলে কত ফুলহার, মনে হল সুখে প্রসন্নমুখে চাহিল সে মোর পানে। কিছু দিন যায়,একদিন হায় ফেলিল...

আমি চঞ্চল হে

আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসি। দিন চলে যায়, আমি আনমনে তারি আশা চেয়ে থাকি বাতায়নে, ওগো প্রাণে মনে আমি যে তাহার পরশ পাবার প্রয়াসী। আমি সুদূরের পিয়াসি। ওগো সুদূর,বিপুল সুদূর, তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি। মোর ডানা নাই, আছি এক ঠাঁই, সে কথা যে যাই পাসরি। আমি উৎসুক হে,...

আমি যারে ভালোবাসি সে ছিল এই গাঁয়ে

আমি যারে ভালোবাসি সে ছিল এই গাঁয়ে, বাঁকা পথের ডাহিন পাশে, ভাঙা ঘাটের বাঁয়ে। কে জানে এই গ্রাম, কে জানে এর নাম, খেতের ধারে মাঠের পারে বনের ঘন ছায়ে– শুধু আমার হৃদয় জানে সে ছিল এই গাঁয়ে। বেণুশাখারা আড়াল দিয়ে চেয়ে আকাশ-পানে কত সাঁঝের চাঁদ-ওঠা সে দেখেছে এইখানে। কত...

আলো নাই, দিন শেষ হল, ওরে

আলো নাই, দিন শেষ হল, ওরে পান্থ, বিদেশী পান্থ। ঘন্টা বাজিল দূরে ও পারের রাজপুরে, এখনো যে পথে চলেছিস তুই হায় রে পথশ্রান্ত পান্থ, বিদেশী পান্থ। দেখ্‌ সবে ঘরে ফিরে এল, ওরে পান্থ, বিদেশী পান্থ। পূজা সারি দেবালয়ে প্রসাদী কুসুম লয়ে, এখন ঘুমের কর্‌ আয়োজন হায় রে পথশ্রান্ত...

আলোকে আসিয়া এরা লীলা করে যায়

আলোকে আসিয়া এরা লীলা করে যায়, আঁধারেতে চলে যায় বাহিরে। ভাবে মনে, বৃথা এই আসা আর যাওয়া, অর্থ কিছুই এর নাহি রে। কেন আসি, কেন হাসি, কেন আঁখিজলে ভাসি, কার কথা বলে যাই, কার গান গাহি রে– অর্থ কিছুই তার নাহি রে। ওরে মন, আয় তুই সাজ ফেলে আয়, মিছে কী করিস নাট-বেদীতে।...

উৎসর্গ (উৎসর্গ)

বিজ্ঞানাচার্য শ্রীযুক্ত জগদীশচন্দ্র বসু করকমলেষু বন্ধু, এ যে আমার লজ্জাবতী লতা কী পেয়েছে আকাশ হতে কী এসেছে বায়ুর স্রোতে পাতার ভাঁজে লুকিয়ে আছে সে যে প্রাণের কথা। যত্নভরে খুঁজে খুঁজে তোমায় নিতে হবে বুঝে, ভেঙে দিতে হবে যে তার নীরব ব্যাকুলতা। আমার লজ্জাবতী লতা। বন্ধু,...

ওরে আমার কর্মহারা, ওরে আমার সৃষ্টিছাড়া

ওরে আমার কর্মহারা, ওরে আমার সৃষ্টিছাড়া, ওরে আমার মন রে, আমার মন। জানি নে তুই কিসের লাগিকোন্‌ জগতে আছিস জাগি– কোন্‌ সেকালের বিলুপ্ত ভুবন। কোন্‌ পুরানো যুগের বাণী অর্থ যাহার নাহি জানি তোমার মুখে উঠছে আজি ফুটে। অনন্ত তোর প্রাচীন স্মৃতি কোন্‌ ভাষাতে গাঁথছে গীতি,...

ওরে পদ্মা, ওরে মোর রাক্ষসী প্রেয়সী

ওরে পদ্মা, ওরে মোর রাক্ষসী প্রেয়সী, লুব্ধ বাহু বাড়াইয়া উচ্ছ্বসি উল্লসি আমারে কি পেতে চাস চির আলিঙ্গনে। শুধু এক মুহূর্তের উন্মত্ত মিলনে তোর বক্ষোমাঝে চাস করিতে বিলয় আমার বক্ষের যত সুখ দুঃখ ভয়? আমিও তো কতদিন ভাবিয়াছি মনে বসি তোর তটোপান্তে প্রশান্ত নির্জনে, বাহিরে চঞ্চলা...

কত দিবা কত বিভাবরী

কত দিবা কত বিভাবরী কত নদী নদে লক্ষ স্রোতের মাঝখানে এক পথ ধরি, কত ঘাটে ঘাটে লাগায়ে, কত সারিগান জাগায়ে, কত অঘ্রানে নব নব ধানে কতবার কত বোঝা ভরি কর্ণধার হে কর্ণধার, বেচে কিনে কত স্বর্ণভার কোন্‌ গ্রামে আজ সাধিতে কী কাজ বাঁধিয়া ধরিলে তব তরী। হেথা বিকিকিনি কার হাটে। কেন এত...

কাল যবে সন্ধ্যাকালে বন্ধুসভাতলে

কাল যবে সন্ধ্যাকালে বন্ধুসভাতলে গাহিতে তোমার গান কহিল সকলে সহসা রুধিয়া গেল হৃদয়ের দ্বার– যেথায় আসন তব, গোপন আগার। স্থানভেদে তব গান– মূর্তি নব নব– সখাসনে হাস্যোচ্ছ্বাস সেও গান তব, প্রিয়াসনে প্রিয়ালাপ, শিশুসনে খেলা– জগতে যেথায় যত আনন্দের মেলা...