অনূদিত কবিতা

কবি (ওই যেতেছেন কবি কাননের পথ দিয়া)

ওই যেতেছেন কবি কাননের পথ দিয়া, কভু বা অবাক, কভু ভকতি-বিহ্বল হিয়া। নিজের প্রাণের মাঝে একটি যে বীণা বাজে, সে বাণী শুনিতেছেন হৃদয় মাঝারে গিয়া। বনে যতগুলি ফুল আলো করি ছিল শাখা, কারো কচি তনুখানি নীল বসনেতে ঢাকা, কারো বা সোনার মুখ, কেহ রাঙা টুকটুক, কারো বা শতেক রঙ যেন...

কোনো জাপানি কবিতার ইংরাজি অনুবাদ হইতে (বাতাসে অশথপাতা পড়িছে খসিয়া)

বাতাসে অশথপাতা পড়িছে খসিয়া, বাতাসেতে দেবদারু উঠিছে শ্বসিয়া। দিবসের পরে বসি রাত্রি মুদে আঁখি, নীড়েতে বসিয়া যেন পাহাড়ের পাখি। শ্রান্ত পদে ভ্রমি আমি নগরে নগরে বিজন অরণ্য দিয়া পর্বতে সাগরে। উড়িয়া গিয়াছে সেই পাখিটি আমার, খুঁজিয়া বেড়াই তারে সকল সংসার। দিন রাত্রি চলিয়াছি,...

তারা ও আঁখি (কাল সন্ধ্যাকালে ধীরে সন্ধ্যার বাতাস)

কাল সন্ধ্যাকালে ধীরে সন্ধ্যার বাতাস বহিয়া আনিতেছিল ফুলের সুবাস। রাত্রি হ’ল, আঁধারের ঘনীভূত ছায়ে পাখিগুলি একে একে পড়িল ঘুমায়ে। প্রফুল্ল বসন্ত ছিল ঘেরি চারি ধার আছিল প্রফুল্লতর যৌবন তোমার, তারকা হাসিতেছিল আকাশের মেয়ে, ও আঁখি হাসিতেছিল তাহাদের চেয়ে। দুজনে কহিতেছিনু...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ১ (মধুর সূর্যের আলো, আকাশ বিমল)

মধুর সূর্যের আলো, আকাশ বিমল, সঘনে উঠিছে নাচি তরঙ্গ উজ্জ্বল। মধ্যাহ্নের স্বচ্ছ করে সাজিয়াছে থরে থরে ক্ষুদ্র নীল দ্বীপগুলি, শুভ্র শৈলশির। কাননে কুঁড়িরে ঘিরি পড়িতেছে ধীরি ধীরি পৃথিবীর অতি মৃদু নিশ্বাসসমীর। একই আনন্দে যেন গায় শত প্রাণ– বাতাসের গান আর পাখিদের গান।...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ১০ (কেমনে কী হল পারি নে বলিতে)

কেমনে কী হল পারি নে বলিতে, এইটুকু শুধু জানি– নবীন কিরণে ভাসিছে সে দিন প্রভাতের তনুখানি। বসন্ত তখনো কিশোর কুমার, কুঁড়ি উঠে নাই ফুটি, শাখায় শাখায় বিহগ বিহগী বসে আছে দুটি দুটি। কী যে হয়ে গেল পারি নে বলিতে, এইটুকু শুধু জানি– বসন্তও গেল, তাও চলে গেল একটি না কয়ে...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ১১ (রবির কিরণ হতে আড়াল করিয়া রেখে)

রবির কিরণ হতে আড়াল করিয়া রেখে মনটি আমার আমি গোলাপে রাখিনু ঢেকে– সে বিছানা সুকোমল, বিমল নীহার চেয়ে, তারি মাঝে মনখানি রাখিলাম লুকাইয়ে। একটি ফুল না নড়ে, একটি পাতা না পড়ে– তবু কেন ঘুমায় না, চমকি চমকি চায়– ঘুম কেন পাখা নেড়ে উড়িয়ে পালিয়ে যায়? আর কিছু নয়,...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ১২ (দেখিনু যে এক আশার স্বপন)

দেখিনু যে এক আশার স্বপন শুধু তা স্বপন, স্বপনময়– স্বপন বই সে কিছুই নয়। অবশ হৃদয় অবসাদময় হারাইয়া সুখ শ্রান্ত অতিশয়– আজিকে উঠিনু জাগি কেবল একটি স্বপন লাগি! বীণাটি আমার নীরব হইয়া গেছে গীতগান ভুলি, ছিঁড়িয়া টুটিয়া ফেলেছি তাহার একে একে তারগুলি। নীরব হইয়া রয়েছে...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ১৩ (নহে নহে এ মনে মরণ)

নহে নহে এ মনে মরণ। সহসা এ প্রাণপূর্ণ নিশ্বাসবাতাস নীরবে করে যে পলায়ন, আলোতে ফুটায় আলো এই আঁখিতারা নিবে যায় একদা নিশীথে, বহে না রুধিরনদী, সুকোমল তনু ধূলায় মিলায় ধরণীতে, ভাবনা মিলায় শূন্যে, মৃত্তিকার তলে রুদ্ধ হয় অময় হৃদয়– এই মৃত্যু? এ তো মৃত্যু নয়। কিন্তু রে...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ২ (সারাদিন গিয়েছিনু বনে)

সারাদিন গিয়েছিনু বনে ফুলগুলি তুলেছি যতনে। প্রাতে মধুপানে রত মুগ্ধ মধুপের মতো গান গাহিয়াছি আনমনে। এখন চাহিয়া দেখি, হায়, ফুলগুলি শুকায় শুকায়। যত চাপিলাম মুঠি পাপড়িগুলি গেল টুটি– কান্না ওঠে, গান থেমে যায়। কী বলিছ সখা হে আমার– ফুল নিতে যাব কি আবার। থাক্‌ বঁধু,...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ৩ (আমায় রেখো না ধরে আর)

আমায় রেখো না ধরে আর, আর হেথা ফুল নাহি ফুটে। হেমন্তের পড়িছে নীহার, আমায় রেখো না ধরে আর। যাই হেথা হতে যাই উঠে, আমার স্বপন গেছে টুটে। কঠিন পাষাণপথে যেতে হবে কোনোমতে পা দিয়েছি যবে। একটি বসন্তরাতে ছিলে তুমি মোর সাথে– পোহালো তো, চলে যাও তবে। Ernest Myers শ্রাবণ,...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ৪ (প্রভাতে একটি দীর্ঘশ্বাস)

প্রভাতে একটি দীর্ঘশ্বাস একটি বিরল অশ্রুবারি ধীরে ওঠে, ধীরে ঝরে যায়, শুনিলে তোমার নাম আজ। কেবল একটুখানি লাজ– এই শুধু বাকি আছে হায়। আর সব পেয়েছে বিনাশ। এক কালে ছিল যে আমারি গেছে আজ করি পরিহাস। Aubre De Vere শ্রাবণ,...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ৫ (গোলাপ হাসিয়া বলে, আগে বৃষ্টি যাক চলে)

১ গোলাপ হাসিয়া বলে, “আগে বৃষ্টি যাক চলে, দিক দেখা তরুণ তপন– তখন ফুটাব এ যৌবন।’ গেল মেঘ, এল উষা, আকাশের আঁখি হতে মুছে দিল বৃষ্টিবারিকণা– সে তো রহিল না। কোকিল ভাবিছে মনে, “শীত যাবে কত ক্ষণে, গাছপালা ছাইবে মুকুলে– তখন গাহিব মন...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ৬ (হাসির সময় বড়ো নেই)

হাসির সময় বড়ো নেই, দু দণ্ডের তরে গান গাওয়া। নিমেষের মাঝে চুমো খেয়ে মুহূর্তে ফুরাবে চুমো খাওয়া। বেলা নাই শেষ করিবারে অসম্পূর্ণ প্রেমের মন্ত্রণা– সুখস্বপ্ন পলকে ফুরায়, তার পরে জাগ্রত যন্ত্রণা। কিছু ক্ষণ কথা কয়ে লও, তাড়াতাড়ি দেখে লও মুখ, দু দণ্ডের খোঁজ...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ৭ (বেঁচেছিল, হেসে হেসে)

বেঁচেছিল, হেসে হেসে খেলা করে বেড়াত সে– হে প্রকৃতি, তারে নিয়ে কী হল তোমার! শত রঙ-করা পাখি, তোর কাছে ছিল না কি– কত তারা, বন, সিন্ধু, আকাশ অপার! জননীর কোল হতে কেন তবে কেড়ে নিলি! লুকায়ে ধরার কোলে ফুল দিয়ে ঢেকে দিলি! শত-তারা-পুষ্প-ময়ী মহতী প্রকৃতি অয়ি, নাহয়...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ৮ (নিদাথের শেষ গোলাপ কুসুম)

নিদাথের শেষ গোলাপ কুসুম একা বন আলো করিয়া, রূপসী তাহার সহচরীগণ শুকায়ে পড়েছে ঝরিয়া। একাকিনী আহা, চারি দিকে তার কোনো ফুল নাহি বিকাশে, হাসিতে তাহার মিশাইতে হাসি নিশাস তাহার নিশাসে। বোঁটার উপরে শুকাইতে তোরে রাখিব না একা ফেলিয়া– সবাই ঘুমায়, তুইও ঘুমাগে তাহাদের সাথে...

বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ৯ (ওই আদরের নামে ডেকো সখা মোরে)

ওই আদরের নামে ডেকো সখা মোরে! ছেলেবেলা ওই নামে আমায় ডাকিত– তাড়াতাড়ি খেলাধুলা সব ত্যাগ করে অমনি যেতেম ছুটে, কোলে পড়িতাম লুটে। রাশি-করা ফুলগুলি পড়িয়া থাকিত। নীরব হইয়া গেছে যে স্নেহের স্বর– কেবল স্তব্ধতা বাজে আজি এ শ্মশান-মাঝে কেবল ডাকি গো আমি “ঈশ্বর...

বিসর্জন (যে তোরে বাসেরে ভালো, তারে ভালোবেসে বাছা)

যে তোরে বাসেরে ভালো, তারে ভালোবেসে বাছা, চিরকাল সুখে তুই রোস্‌। বিদায়! মোদের ঘরে রতন আছিলি তুই, এখন তাহারি তুই হোস্‌। আমাদের আশীর্বাদ নিয়ে তুই যা রে এক পরিবার হতে অন্য পরিবারে। সুখ শান্তি নিয়ে যাস্‌ তোর পাছে পাছে, দুঃখ জ্বালা রেখে যাস্‌ আমাদের কাছে। হেথা রাখিতেছি ধরে,...

সম্মিলন (সেথায় কপোত-বধূ লতার আড়ালে)

সেথায় কপোত-বধূ লতার আড়ালে দিবানিশি গাহে শুধু প্রেমের বিলাপ। নবীন চাঁদের করে একটি হরিণী আমাদের গৃহদ্বারে আরামে ঘুমায়। তার শান্ত নিদ্রাকালে নিশ্বাস পতনে প্রহর গণিতে পারি স্তব্ধ রজনীর। সুখের আবাসে সেই কাটাব জীবন, দুজনে উঠিব মোরা, দুজনে বসিব, নীল আকাশের নীচে ভ্রমিব দুজনে,...

সূর্য ও ফুল (মহীয়সী মহিমার আগ্নেয় কুসুম)

মহীয়সী মহিমার আগ্নেয় কুসুম সূর্য, ধায় লভিবারে বিশ্রামের ঘুম। ভাঙা এক ভিত্তি-‘পরে ফুল শুভ্রবাস, চারি দিকে শুভ্রদল করিয়া বিকাশ মাথা তুলে চেয়ে দেখে সুনীল বিমানে অমর আলোকময় তপনের পানে, ছোটো মাথা দুলাইয়া কহে ফুল গাছে– “লাবণ্য-কিরণ ছটা আমারো তো আছে।”...