শেষের কবিতা

শেষের কবিতা – অধ্যায় ০১

১ অমিত- চরিত অমিত রায় ব্যারিষ্টার। ইংরেজি ছাঁদে রায় পদবী “রয়” ও “রে” রূপান-র যখন ধারণ করলে তখন তার শ্রী গেল ঘুচে কিন’ সংখ্যা হল বৃদ্ধি। এই কারণে, নামের অসামন্যতা কামনা করে অমিত এমন একটি বানান বানালে যাতে ইংরেজ বন্ধু ও বন্ধুনীদের মুখে তার উচ্চারণ দাঁড়িয়ে গেল-অমিট...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ০২

২ সংঘাত অমিত বেছে বেছে শিলঙ পাহাড়ে গেল। তার কারণ, সেখানে ওর দলের লোক কেই যায় না। আরো একটা কারণ, ওখানে কণ্যাদায়ের বন্যা তেমন প্রবল নয়। অমিতর হৃদয়টার ‘পরে যে দেবতা সর্বদা শরসন্ধান করে ফেরেন তাঁর আনাগোনা ফ্যাশানেবল পাড়ায়। দেশের পাহাড়-পর্বতে যত বিলাসী বসতি আছে তার মধ্যে...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৩

৩ পূর্ব ভূমিকা বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষায় প্রথম পর্যায়ে চন্ডীমন্ডপের হাওয়ার সঙ্গে স্কুল-কলেজের হাওয়ার তাপের বৈষম্য ঘটাতে সমাজবিদ্রোহের যে ঝড় উঠেছিল সেই ঝড়ের চাঞ্চল্যে ধরা দিয়েছিলেন জ্ঞানদাশংকের। তিনি সেকালের লোক, কিন’ তাঁর তারিখটা হঠাৎ পিছলিয়ে সরে এসেছিল অনেকখানি...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৪

৪ লাবণ্য-পুরাবৃত্ত লাবণ্যের বাপ অবনীশ দত্ত এক পশ্চিমি কলেজের অধ্যক্ষ। মাতৃহীন মেয়েকে এমন করে মানুষ করেছেন যে, বহু পরীক্ষা পাসের ঘষাঘষিতেও তার বিদ্যাবুদ্ধিতে লোকসান ঘটাতে পারে নি। এমন কি, এখনো তার পাঠানুরাগ রয়েছে প্রবল। বাপের একমাত্র শখ ছিল বিদ্যায়। মেয়েটির মধ্যে তাঁর...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৫

৫ আলাপের আরম্ভ অতীতের ভগ্নাবশেষ থেকে এবার ফিরে আসা যাক বর্তমানের নতুন সৃষ্টির ক্ষেত্রে। লাবণ্য পড়বার ঘরে অমিতকে বসিয়ে রেখে যোগমায়াকে খবর দিতে গেল। সে ঘরে অমিত বসল যেন পদ্মের মাঝ-খানটাকে ভ্রমরেরমতো। চারিদিকে চায়, সকল জিনিস থেকেই কিসের ছোঁওয়া লাগে, ওর মনটাকে দেয় উদাস...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৬

৬ নুতন পরিচয় অমিত মিশুক মানুষ। প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে তার বেশিক্ষণ চলে না। সর্বদাই নিজে বকাঝকা করা অভ্যাস; গাছপালা পাহাড়পর্বত সঙ্গে হাসিতামাশা চলে না, তাদের সঙ্গে কোনোরকম উলটো ব্যবহার করতে গেলেই ঘা খেয়ে মরতে হয়-তারাও চলে নিয়মে, অন্যের ব্যবহারেও তারা নিয়ম প্রত্যাশা...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৭

৭ ঘটকালি অমিত যোগমায়র কাছে এসে বললে, ‘মাসিমা, ঘটকালি করতে এলেম। বিদায়ের বেলা কৃপণতা করবেন না।’ ‘পছন্দ হবে তবে? আগে নাম ধাম বিবরণটা বলো।’ অমিত বললে, ‘নাম নিয়ে পাত্রটির দাম নয়।’ ‘ তা হলে ঘটক-বিদায়ের হিসাব থেকে কিছু বাদ পড়বে দেখছি। ‘ অন্যায় কথা বললেন। নাম যার বড়ো তার...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৮

৮ লাবণ্য- তর্ক যোগমায়া বললেন, ‘মা লাবণ্য, তুমি ঠিক বুঝেছ?’ ‘ঠিক বুঝেছি মা’। ‘অমিত ভারি চঞ্চল, সে কথা মানি। সেইজন্যেই ওকে এত স্নেহ করি। দেখো-না, ও কেমনতরো এলোমেলো। হাত থেকে সবই যেন পড়ে পড়ে যায়’। লাবণ্য একটু হেসে বললে, ‘ওঁকে সবই যদি ধরে রাখতেই হত, হাত থেকে সবই যদি খসে...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ০৯

৯ বাসা-বদল গোড়ায় সবাই ঠিক করে রেখেছিল, অমিত দিন-পনেরোর মধ্যে কোলকাতায় ফিরবে। নরেন মিত্তির খুব মোটা বাজি রেখেছিল যে, সাত দিন পেরোবে না। এক মাস যায়, দু মাস যায়, ফেরবার নামও নেই। শিলঙের বাসার মেয়াদ ফুরিয়েছে, রংপুরের কোন্‌ জমিদার এসে সেটা দখল করে বসল। অনেক খোঁজ করে...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ১০

১০ দ্বিতীয় সাধনা তখন অমিত ভিজে চৌকির উপরে একতাড়া খবররে কাগজ চাপিয়ে তার উপর বসেছে। টেবিলে এক দিসে- ফুলস্ক্যাপ কাগজ নিয়ে তার চলছে লেখা। সেই সময়েই সে তার বিখ্যাত আত্মাজীবনী শুরু করেছিল। কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলে, সেই সময়েই তার জীবনটা আকস্মাৎ তার নিজের কাছে দেখা দিয়েছিল নান...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ১১

১১ মিলনতত্ত্ব ঠিক হয়ে গেল আগামী অঘ্রান মাসে এদের বিয়ে। যোগমায়া কোলকাতায় গিয়ে সমস- আয়োজন করবেন। লাবণ্য অমিতকে বললে, ‘ তোমার কোলকাতায় ফেরবার দিন অনেক কাল হল পেরিয়ে গেছে। অনিশ্চিতের মধ্যে বাঁধা পড়ে তোমার দিন কেটে যাচ্ছিল। এখন ছুটি নিঃসংশয়ে চলে যাও। বিয়ের ‘ এমন কড়া শাসন...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ১২

১২ শেষ সন্ধ্যা আহার শেষ হলে অমিত বললে, কাল কোলকাতায় যাচ্ছি মাসিমা। আমার আত্মীয়স্বজন সবাই সন্দেহ করছে আমি খাসিয়া হয়ে গেছি।’ ‘আত্মীয়স্বজনরা কি জানে কথায় কথায় তোমার এত বদল সম্ভব?’ ‘ খুব জানে, নইলে আত্মীয়স্বজন কিসের? তাই ব’লে কথায় কথায় নয়, আর খাসিয়া হওয়া নয়; যে বদল...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ১৩

১৩ আশঙ্কা সকালবেলায় কাজে মন দেওয়া আজ লাবণ্যের পক্ষে কঠিন। সে বেড়াতেও যায় নি। অমিত বলেছিল, শিলঙ থেকে যাবার আগে আজ সকালবেলায় সে ওদের সঙ্গে দেখা করতে চায় না। সেই পণটাকে রক্ষা করবার ভার দুজনেই উপর। কেননা, যে রাস-ায় ও বেড়াতে যায় সেই রাস্তা দিয়েই অমিতকে যেতে হবে। মনে তাই...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ১৪

১৪ ধুমকেতু এতদিন পরে অমিত একটা কথা আবিস্কার করেছে যে, লাবণ্যর সঙ্গে তার সম্বন্ধটা শিলঙসুদ্ধ বাঙালি জানে। গভর্মেন্ট অফিসের কেরানিদের প্রধান আলোচ্য বিষয় তাদের জীবিকা ভাগ্যগগনে ‘ কোন গ্রহ রাজার হৈল কেবা মন্ত্রিবর।’ এমন সময় তাদের চোখে পড়ল মানবজীবরেন জ্যোতির্মন্ডলে এক...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ১৫

১৫ ব্যাঘাত দুই সখী যোগমায়ার বাগানে বাইরের দরজা পার হয়ে চাকরদের কাউকে দেখতে পেলে না। গাড়িবারান্ডায় এসে চোখে পড়ল বাড়ির রোযাকে একটি ছোটো টেবিল পেতে একজন শিক্ষায়িত্রী ও ছাত্রীতে মিলে পড়া চলছে। বুঝতে বাকি রইল না। এরই মধ্যে বড়োটি লাবণ্য। কেটি টক্‌ টক্‌ করে উপরে উঠে ইংরেজিতে...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ১৬

১৬ মুক্তি একটি ছোটো চিঠি এল লাবণ্যের হাতে, শোভনলালের লেখা- শিলঙ কাল রাত্রে এসেছি। যদি দেখা করতে অনুমতি দাও তবে দেখতে যাব। না যদি দাও কালই ফিরব। তোমার কাছে শাসি- পেয়েছি, কিন’ কবে কী অপরাধ করেছি আজ পর্যন- স্পষ্ট করে বুঝতে পারি নি। আজ এসছি তোমার কাছে সেই কথাটি...

শেষের কবিতা – অধ্যায় ১৭

১৭ শেষের কবিতা কোলকাতার কলেজে পড়ে যতিশংকর। থাকে কলুটোলা প্রেসিডেনসি কলেজের মেসে। অমিত তাকে প্রায় বাড়িতে নিআয়ে আসে, খাওয়ায়, তার সঙ্গে না না বই পড়ে, না না অদ্ভুত কথায় তার মনটাকে চমকিয়ে দেয়, মোটরে করে তাকে বেড়িয়ে নিয়ে আসে। তার পর কিছুকাল যতিশংকর অমিতর কোনো নিশ্চিত খবর...