প্রজাপতির নির্বন্ধ

প্রজাপতির নির্বন্ধ ০১

প্রথম পরিচ্ছেদ অক্ষয়কুমারের শ্বশুর হিন্দুসমাজে ছিলেন, কিন্তু তাঁহার চালচলন অত্যন্ত নব্য ছিল। মেয়েদের তিনি দীর্ঘকাল অবিবাহিত রাখিয়া লেখাপড়া শিখাইতেছিলেন। লোকে আপত্তি করিলে বলিতেন, আমরা কুলীন, আমাদের ঘরে তো চিরকালই এইরূপ প্রথা। তাঁহার মৃত্যুর পর বিধবা জগত্তারিণীর ইচ্ছা,...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ০২

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শ্রীশ ও বিপিন শ্রীশ। তা যাই বল, অক্ষয়বাবু যখন আমাদের সভাপতি ছিলেন তখন আমাদের চিরকুমার-সভা জমেছিল ভালো। হাল সভাপতি চন্দ্রবাবু কিছু কড়া। বিপিন। তিনি থাকতে রস কিছু বেশি জমে উঠেছিল। চিরকৌমার্যব্রতের পক্ষে রসাধিক্যটা ভালো নয় আমার তো এই মত। শ্রীশ। আমার মত...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ০৩

তৃতীয় পরিচ্ছেদ “মুখুজ্যেমশায়!” অক্ষয় বলিলেন, “আজ্ঞে করো।” শৈল কহিল, “কুলীনের ছেলে দুটোকে কোনো ফিকিরে তাড়াতে হবে।” অক্ষয় উৎসাহপূর্বক কহিলেন, “তা তো হবেই।” বলিয়া রামপ্রসাদী সুরে গান জুড়িয়া দিলেন– দেখব কে তোর কাছে...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ০৪

চতুর্থ পরিচ্ছেদ আহারের পর শৈলবালা ডাকিল, “মুখুজ্যেমশায়।” অক্ষয় অত্যন্ত ত্রস্তভাব দেখাইয়া কহিলেন, “আবার মুখুজ্যেমশায়! এই বালখিল্য মুনিদের ধ্যানভঙ্গ-ব্যাপারের মধ্যে আমি নেই।” শৈলবালা। ধ্যানভঙ্গ আমরা করব। কেবল মুনিকুমারগুলিকে এই বাড়িতে আনা চাই।...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ০৫

পঞ্চম পরিচ্ছেদ অক্ষয় বলিলেন, “স্বামীই স্ত্রীর একমাত্র তীর্থ। মান কি না?” পুরবালা। আমি কী পণ্ডিতমশায়ের কাছে শাস্ত্রের বিধান নিতে এসেছি? আমি মার সঙ্গে আজ কাশী চলেছি এই খবরটি দিয়ে গেলুম। অক্ষয়। খবরটি সুখবর নয়– শোনবামাত্র তোমাকে শাল-দোশালা বকশিশ দিয়ে...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ০৬

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ শ্রীশ তাহার বাসায় দক্ষিণের বারান্দায় একখানা বড়োহাতাওআলা কেদারায় দুই হাতার উপর দুই পা তুলিয়া দিয়া শুক্লসন্ধ্যায় চুপচাপ বসিয়া সিগারেট ফুঁকিতেছিল। পাশে টিপায়ের উপর রেকাবিতে একটি গ্লাস বরফ-দেওয়া লেমনেড ও স্তূপাকার কুন্দফুলের মালা। বিপিন পশ্চাৎ হইতে প্রবেশ...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ০৭

সপ্তম পরিচ্ছেদ চন্দ্রমাধববাবু যখন ডাকিলেন– “নির্মল”, তখন একটা উত্তর পাইলেন বটে “কী মামা”, কিন্তু সুরটা ঠিক বাজিল না। চন্দ্রবাবু ছাড়া আর যে-কেহ হইলে বুঝিতে পারিত সে অঞ্চলে অল্প একটুখানি গোল আছে। “নির্মল, আমার গলার বোতামটা খুঁজে...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ০৮

অষ্টম পরিচ্ছেদ নৃপবালা। আজকাল তুই মাঝে মাঝে কেন অমন গম্ভীর হচ্ছিস বল্‌ তো নীরু। নীরবালা। আমাদের বাড়ির যত কিছু গাম্ভীর্য সব বুঝি তোর একলার? আমার খুশি আমি গম্ভীর হব। নৃপবালা। তুই কী ভাবছিস আমি বেশ জানি। নীরবালা। তোর অত আন্দাজ করবার দরকার কী ভাই? এখন তোর নিজের ভাবনা...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ০৯

নবম পরিচ্ছেদ অক্ষয়। হল কী বল দেখি! আমার যে ঘরটি এতকাল কেবল ঝড়ু বেহারার ঝাড়নের তাড়নে নির্মল ছিল, সেই ঘরের হাওয়া দু-বেলা তোমাদের দুই বোনের অঞ্চলবীজনে চঞ্চল হয়ে উঠছে যে! নীরবালা। দিদি নেই, তুমি একলা পড়ে আছ বলে দয়া করে মাঝে মাঝে দেখা দিয়ে যাই, তার উপরে আবার জবাবদিহি?...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ১০

দশম পরিচ্ছেদ পথে বাহির হইয়াই শ্রীশ কহিল, “ওহে বিপিন, আজ মাঘের শেষে প্রথম বসন্তের বাতাস দিয়েছে, জ্যোৎস্নাও দিব্যি, আজ যদি এখনই ঘুমোতে কিম্বা পড়া মুখস্থ করতে যাওয়া যায় তা হলে দেবতারা ধিক্‌কার দেবেন।” বিপিন। তাঁদের ধিক্‌কার খুব সহজে সহ্য হয়, কিন্তু ব্যামোর...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ১১

একাদশ পরিচ্ছেদ রসিক। ভাই শৈল! শৈল। কী রসিকদাদা! রসিক। এ কি আমার কাজ? মহাদেবের তপোভঙ্গের জন্যে স্বয়ং কন্দর্পদেব ছিলেন, আর আমি বৃদ্ধ– শৈল। তুমি তো বৃদ্ধ, তেমনি যুবক দুটিও তো যুগল মহাদেব নন! রসিক। তা নন, সে আমি বেশ ঠাহর করেই দেখেছি। সেইজন্যই তো নির্ভয়ে এসেছিলুম।...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ১২

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ পূর্বদিনে পূরবালা তাহার মাতার সহিত কাশী হইতে ফিরিয়া আসিয়াছে। অক্ষয় কহিলেন, “দেবী, যদি অভয় দাও তো একটি প্রশ্ন আছে।” পুরবালা। কী শুনি। অক্ষয়। শ্রীঅঙ্গে কৃশতায় তো কোনো লক্ষণ দেখছি নে। পুরবালা। শ্রীঅঙ্গ তো কৃশ হবার জন্যে পশ্চিমে বেড়াতে যায় নি।...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ১৩

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ ওস্তাদ আসীন। তানপুরা-হস্তে বিপিন অত্যন্ত বেসুরা গলায় সা রে গা মা সাধিতেছেন। ভৃত্য আসিয়া খবর দিল, “একটি বাবু এসেছেন।” বিপিন। বাবু? কিরকম বাবু রে? ভৃত্য। বুড়ো লোকটি। বিপিন। মাথায় টাক আছে? ভৃত্য। আছে। বিপিন। (তানপুরা রাখিয়া) নিয়ে আয়, এখনই...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ১৪

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ নির্মলা বাতায়নতলে আসীন। চন্দ্রের প্রবেশ চন্দ্র। (স্বগত) বেচারা নির্মল বড়ো কঠিন ব্রত গ্রহণ করেছে। আমি দেখছি কদিন ধরে ও চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে রয়েছে। স্ত্রীলোক, মনের উপর এতটা ভার কি সহ্য করতে পারবে? (প্রকাশ্যে) নির্মল! নির্মলা। (চমকিয়া) কী মামা! চন্দ্র। সেই...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ১৫

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ জগত্তারিণী। বাবা অক্ষয়! দেখো তো, মেয়েদের নিয়ে আমি কী করি! নেপ বসে বসে কাঁদছে, নীর রেগে অস্থির, সে বলে সে কোনোমতেই বেরোবে না। ভদ্রলোকের ছেলেরা আজ এখনই আসবে, তাদের এখন কী বলে ফেরাব। তুমিই বাপু, ওদের শিখিয়ে পড়িয়ে বিবি করে তুলেছ, এখন তুমিই ওদের সামলাও।...

প্রজাপতির নির্বন্ধ ১৬

ষোড়শ পরিচ্ছেদ অক্ষয়। ব্যাপারটা কী? রসিকদা, আজকাল তো খুব খাওয়াচ্ছ দেখছি। প্রত্যহ যাকে দু বেলা দেখছ তাকে হঠাৎ ভুলে গেলে? রসিক। এঁদের নূতন আদর, পাতে যা পড়ছে তাতেই খুশি হচ্ছেন। তোমার আদর পুরোনো হয়ে এল, তোমাকে নতুন করে খুশি করি এমন সাধ্য নেই ভাই! অক্ষয়। কিন্তু শুনেছিলেম,...