স্বরবৃত্ত বা দলবৃত্ত বা শ্বাসাঘাতপ্রধান ছন্দ

যেমন অক্ষরবৃত্ত আর মাত্রাবৃত্তের ব্যাপারে নিয়েছি, তেমনি স্বরবৃত্তের ব্যাপারেও নাম-পরিচয়টা আগেই স্পষ্ট করে জেনে নেওয়া যাক। স্বরবৃত্ত নামটিও শ্ৰীপ্ৰবোধচন্দ্র সেনেরই উদভাবিত। তবে লৌকিক ছন্দ নামেও তিনি একেই বোঝাতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ সেক্ষেত্রে এই ছন্দকে বলতেন বাংলা প্রাকৃত’। শ্ৰীঅমূল্যধন মুখোপাধ্যায় বলেন শ্বাসাঘাতপ্রধান ছন্দ। স্বরবৃত্ত নামটি পরে শ্ৰীপ্ৰবোধচন্দ্র সেনের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়। তিনি এর নতুন নাম রাখেন দলবৃত্ত। তবে পুরনো নামটা যখন প্রসিদ্ধি পেয়েই গেছে, তখন আমরা তাকে ছাড়ছিনে, এই আলোচনায় স্বরবৃত্ত নামটাই আমরা ব্যবহার করব।

এবারে সেই স্বরবৃত্তের রাজ্যে ঢোকার পালা। বলা বাহুল্য, মাত্রাবৃত্তের এলাকায় আমরা যেভাবে ঢুকেছিলুম, স্বরবৃত্তের এলাকাতেও ঠিক সেইভাবেই ঢুকব। অর্থাৎ কিনা গোত্তা মেরে দুম করে ঢুকব না। তার চাইতে বরং দূরে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণের জন্য তার চালচলন বেশ উত্তমরূপে নিরীক্ষণ করব; বুঝে নেব, অক্ষরবৃত্ত আর মাত্রাবৃত্তের সঙ্গে তার গতিভঙ্গিমার তফাত কোথায়। সেটা যদি ভালো করে বুঝতে হয়, তাহলে অক্ষরবৃত্ত আর মাত্রাবৃত্তের পাশাপাশি রেখে তাকে দেখা দরকার। তাতে তুলনা করবার সুবিধা মেলে; বুঝতে পারি, কে কোনভাবে পা ফেলে হাঁটছে। ছন্দবিচারে অবশ্য দেখার মূল্য যৎসামান্য, শোনার মূল্যই বেশি। যার চলন দেখতে চাই, আসলে তাকে বাজিয়ে দেখতে হবে। আসুন, অক্ষরবৃত্ত মাত্রাবৃত্ত আর স্বরবৃত্তকে তাহলে পাশাপাশি বাজিয়ে দেখা যাক।

ধরা যাক, আমরা ভোজনপর্ব নিয়ে কিছু লিখতে চাই। দিনকাল যা পড়েছে, তাতে সত্যি তো আর ভোজনের সাধ মেটাবার উপায় নেই, এখন শুধু পদ্য বেঁধেই শখ মেটাতে হবে। তা কথা এই যে, শখটা তিন রকমের ছন্দেই মেটাতে পারি। প্রথমত লিখতে পারি :

দক্ষিণহস্তের ক্রিয়া জমে পরিপাটি
পলান্নের সঙ্গে পেলে কোমা এক বাটি।

বুঝতেই পারছেন, এ হল অক্ষরবৃত্ত ছন্দ। ছন্দ পালটে এবারে আর-এক রকমের দোলা লাগিয়ে এই কথাগুলিকে প্রকাশ করা যাক। লেখা যাক :

দাও যদি পলান্ন, সাথে এক বাটি
কোর্মা দিলেই
ভোজনের পর্বটা জমে পরিপাটি–
সন্দেহ নেই।

এ হল মাত্রাবৃত্ত ছন্দ। (চালটা এক্ষেত্রে ৪-মাত্রার) এবারে পুনশ্চ ছন্দ পালটে এই কথাগুলিতে আমরা আর-এক রকমের দোল লাগাব। লিখব :

আহার জমে পরিপাটি
সত্যি বলি ভাই
পলান্ন আর একটি বাটি
কোর্মা যদি পাই।

এ হল স্বরবৃত্ত। অক্ষরবৃত্ত আর মাত্রাবৃত্তের পাশাপাশি একে পড়ুন। তাহলেই বুঝতে পারবেন যে, এর চলন একেবারে আলাদা।

আবার দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। এবারে কী নিয়ে লিখব? ফুর্তির কথা তো লিখলুম, এবারে অন্য-কিছু লেখা যাক। বক্তব্যকে আর-একটু উঁচুতে উঠিয়ে এনে, আসুন, হৃদয়ঘটিত কিছু লিখি। পর-পর তিন রকমের ছন্দে সে-কথা লেখা হবে।

(১) অক্ষরবৃত্ত

ঘৃণায় বিঁধেছ যাকে,
ঘৃণায় বিঁধেছে যাক, দিয়েছ ধিক্কার
দিয়েছ ধিক্কার আহবান জানালে তাকে মিথ্যে কেন আর?

(২) মাত্রাবৃত্ত (৫-মাত্রা)

ঘৃণাতে যাকে বিধেছ, যাকে
বলেছ শুধু ছি-ছি,
সহসা কেন এখানে তাকে
ডেকেছ মিছিমিছি?

(৩) স্বরবৃত্ত

ঘৃণা করো যে লোকটাকে
শুধুই বলো ছি-ছি,
আবার তুমি কেন তাকে
ডাকলে মিছিমিছি?

দেখতেই পাচ্ছেন, মোটামুটি একই কথাকে আমরা তিন রকমের ছন্দে বাঁধিলুম। পাশাপাশি এদের বারিকয়েক পড়ে দেখুন। পড়তে গেলেই বুঝতে পারবেন, তৃতীয় ছন্দটির অর্থাৎ স্বরবৃত্তের চাল আগের দুটির কোনওটির সঙ্গেই মেলে না। এর পা ফেলবার ভঙ্গি একেবারেই আলাদা।

আবার দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। উদর থেকে যখন হৃদয়ে একবার প্রোমোশন পেয়েছি, তখন বক্তব্য নির্বাচনে আর সহসা আমরা লঘুচিত্ততার পরিচয় দিচ্ছিনে। ধরা যাক, কোনও-এক খণ্ডিতা নায়িকার নিরুদ্ধ বেদনার কথাকে আমরা প্রকাশ করতে চাই। তা তিন রকমের ছন্দেই সে-কথা প্রকাশ করা চলে। যদি অক্ষরবৃত্তে প্ৰকাশ করতে হয়, তো আমরা লিখব :

মুখে তার কথা নেই, শয্যার উপরে
সমস্ত না-বলা কথা অশ্রু হয়ে ঝরে।

চাল পালটে যদি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে এই কথাগুলি জানাতে হয়, তো সেক্ষেত্রে আমরা লিখতে পারি। :

মুখে কথা নেই ভীরু নায়িকার,
বিনিদ্র বিছানায়
না-বলা কথার যন্ত্রণা তার
অশ্রুতে ঝরে যায়।

এ হল ছয়ের চালের মাত্রাবৃত্ত। আবার এই একই কথাকে আমরা স্বরবৃত্তের সুতোতেও গেথে তুলতে পারি। সেক্ষেত্রে আমরা লিখব :

একটি কথা নেই মুখে তার
সঙ্গিবিহীন ঘরে
রুদ্ধ কথার যন্ত্রণাভার
অশ্রু হয়ে ঝরে।

অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত আর স্বরবৃত্তের চাল যে সম্পূর্ণ পৃথক, আশা করি সেটা ইতিমধ্যে নিঃসংশয়ে বুঝে নিয়েছেন। এই পার্থক্যের মূলে রয়েছে এদের নিজস্ব গঠনরীতি। তাকে বিশ্লেষণ করলেই ধরা পড়বে, এদের চলন কেন আলাদা।

অক্ষরবৃত্ত আর মাত্রাবৃত্তের গঠনরীতি ইতিপূর্বেই আমরা বিশ্লেষণ করেছি। করে একটা মোটামুটি নিয়মের হদিস পেয়েছি। সেটা এই যে, ১) অক্ষরবৃত্তে সাধারণত প্রতিটি অক্ষর একটি করে মাত্রার মূল্য পায়, এবং ২) মাত্রাবৃত্তে প্রতিটি অক্ষর তো একটি করে মাত্রার মূল্য পায়ই, প্রতিটি যুক্তাক্ষর (যদি সেই যুক্তাক্ষর শব্দের আদিতে না থাকে, কিংবা শব্দের মধ্যে অথবা অন্তে থাকলেও তার পূর্ববর্তী বর্ণটি যদি হস্‌বৰ্ণ না হয়) পায় দু-মাত্রার মূল্য।

স্বরবৃত্তে সেক্ষেত্রে প্রতিটি সিলেবলকে একটি করে মাত্রার মূল্য চুকিয়ে দিতে হয়।

সিলেবল-এর বাংলা প্রতিশব্দ কী করব? সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত করেছিলেন ‘শব্দ-পাপড়ি’, কালিদাস রায় করেছেন ‘পদাংশ’; প্ৰবোধচন্দ্ৰ ‘দল’-এর পক্ষপাতী। ‘পাপড়ি’ আর দল’-এর অর্থ একই। অনুমান করতে পারি, সত্যেন্দ্রনাথ আর প্ৰবোধচন্দ্ৰ শব্দকে পুষ্প হিসেবে দেখেছেন; সিলেবল তার পাপড়ি কিংবা দল। (কট্টর নৈয়ায়িকেরা সম্ভবত এইটুকু শূনেই ভুকুটি করে বলে বসবেন যে, শব্দকোশে সেক্ষেত্রে আর যে-পুষ্পেরই থাক, শতদলের দৃষ্টান্ত মিলবে না, কেন-না, একশসিলেবল দিয়ে যার অঙ্গ গড়া, এমন শব্দ না ভুতো ন ভবিষ্যতি)

কিন্তু সে-কথা পরে। সিলেবলই বলি, কিংবা পাপড়ি অথবা দলই বলি, বস্তুটা আসলে কী, আগে সেটা বোঝা চাই।

এক কথায় বলতে পারি, কোনও-কিছু উচ্চারণ করতে গিয়ে নূ্যনতম চেষ্টায় যেটুকু আমরা বলতে পারি, তা-ই হচ্ছে একটি সিলেবল। সেই দিক থেকে এক-একটি সিলেবল হচ্ছে আমাদের উচ্চারণের এক-একটি ইউনিট কিংবা একক। এই এককগুলির সমবায়েই আমাদের উচ্চারণের শরীর গড়ে ওঠে। দৃষ্টান্ত দিয়ে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিচ্ছি :

ধরা যাক, কবিকঙ্কণ’ শব্দটাকে আমরা উচ্চারণ করতে চাই। করলুম। করে দেখতে পাচ্ছি, চারটি এককে তার অঙ্গ গড়া। আলাদা করে সেগুলিকে এইভাবে দেখানো যায় :

ক+বি+কং+কণ্‌

অর্থাৎ ‘কবিকঙ্কণ’ শব্দটি মোট চারটি সিলেবল-এর সমবায়ে গড়ে উঠেছে।

এই হিসেবে ছন্দ’ শব্দটিতে আছে দুটি সিলেবল (ছন + দ); আবারঅক্ষরের সংখ্যা যদিও বাড়ল— ‘বন্ধন’ শব্দটিতে দুটির বেশি সিলেবল নেই (বন। + ধন)।

এই পর্যন্ত যা বলেছি, তার থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, সিলেবল দু-রকমের হতে পারে। ইংরেজিতে বলে ‘ওপন সিলেবল ও ‘ক্লোজড্‌ সিলেবল। প্ৰবোধচন্দ্ৰ তো সিলেবল শব্দটার বাংলা করেছেন দল, সেই হিসেবে ‘ওপন সিলেবল ও ‘ক্লোজড্‌ সিলেবলকে তিনি “মুক্তদল” ও “বুদ্ধিদল’ বলেন। ‘কবিকঙ্কণ’ শব্দটার মধ্যে “ক” আর ‘বি’ হচ্ছে মুক্ত সিলেবল; অন্য দিকে কিং’ আর ‘কৰ্ণ হচ্ছে রুদ্ধ। বুদ্ধ’ বলছি। এইজন্যে যে, “ক” আর ‘বি’-র মতো এ-দুটি সিলেবল-এর উচ্চারণকে টেনে নিয়ে যাওয়া যায় না। ‘ভাই’ বউ” “যাও” ইত্যাদিও বুদ্ধ সিলেবল-এর দৃষ্টান্ত। এসব “সিলেবল-এর শেষে যদিও স্বরবর্ণ আছে, তবু— উচ্চারণ যেহেতু তন্মুহুর্তেই ফুরিয়ে যায়, তাই- কাৰ্যত সেই স্বরবর্ণগুলি হসন্ত বর্ণেরই সামিল, ফলে এরাও বুদ্ধ সিলেবল বলে গণ্য হয়। ( যায়’, ‘হায়’ ইত্যাদির ক্ষেত্রে তো সেই এক কথা বটেই, “যাঃ’ বাঃ”, ইত্যাদিও রুদ্ধ সিলেবল।)

ইতিপূর্বে বলেছি, স্বরবৃত্ত ছন্দে সিলেবল-এর হিসেবে মাত্রার মূল্য চুকিয়ে দিতে হয়; ফি সিলেবলকে দিতে হয় একটি করে মাত্রার মূল্য। সেক্ষেত্রে এই রীতিতে দেখা যাচ্ছে মাত্রা-সংখ্যার দিক থেকে ‘ছন্দ” আর ‘বন্ধন” তুল্যমূল্য শব্দ; কেন-না অক্ষর-সংখ্যায় পৃথক হয়েও সিলেবল সংখ্যায় তারা সমান, তাদের দুজনেরই শরীর দুটি করে সিলেবল দিয়ে গঠিত হয়েছে।

অক্ষরবৃত্ত আর মাত্রাবৃত্তের সঙ্গে স্বরবৃত্তের প্রধান পার্থক্য এইখানেই। ধ্বনিটাই অবশ্য প্রধান কথা, অক্ষর নেহাতই গৌণ ব্যাপার। সে-কথা আগেও অনেক বার বলেছি, তবু, প্রথম দুটি ছন্দের ক্ষেত্রে অক্ষরও একেবারে ন-গণ্য নয়। ব্যতিক্রমের কথা যদি ছেড়ে দিই, তবে অক্ষরের ভিত্তিতেও মাত্রার একটা মোটামুটি হিসেব সেখানে রাখা চলে। স্বরবৃত্তে সেটা একেবারেই চলে না। একই শব্দ যে এই তিন রকমের ছন্দে কীভাবে তিন রকমের মাত্রা মূল্য পায়, কবিকঙ্কণের কিঙ্কণ” দিয়েই সেটা বুঝিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

১) অক্ষরবৃত্তে সাধারণত প্রতিটি অক্ষরই একটি করে মাত্রার মূল্য পায়। সুতরাং “কঙ্কণ” সেখানে ৩-মাত্রার শব্দ।

২) মাত্রাবৃত্তে আমরা সাধারণত প্রতিটি অক্ষরকে একটি করে মাত্রার মূল্য দিই কিন্তু শব্দের মধ্যস্থ কিংবা প্রান্তবতী যুক্তাক্ষরকে (যদি না সেই যুক্তাক্ষরের ঠিক পূর্ববর্তী বর্ণটি হয় হস্বৰ্ণ) দিই ২-মাত্রার মূল্য। সুতরাং কঙ্কণ” সেখানে ৪-মাত্রার শব্দ।

৩) স্বরবৃত্তে আমরা প্রতিটি সিলেবলকে একটি করে মাত্রার মূল্য দিই, এবং ‘কঙ্কণ’ শব্দটিতে মোট দুটি সিলেবল (কং+কণ) পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং কঙ্কণ’ সেখানে ২-মাত্রার শব্দ।

অর্থাৎ কিনা একই শব্দ তিন রকমের ছন্দে তিন রকমের মাত্রা মূল্য পাচ্ছে।

পদ্যের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত দিলে কথাটা আরও পরিষ্কার হবে। পরপর তিন রকমের ছন্দে আমরা মোটামুটি একই বক্তব্যকে এখানে উপস্থিত করছি :

১) অক্ষরবৃত্ত

অঙ্কের দাপটে কাব্য নাভিশ্বাস ছাড়ে,
আনন্দের লেশ নেই ছন্দের বিচারে।

২) মাত্রাবৃত্ত (৬-মাত্রা)

অঙ্কের চোখ-রাঙানিতে হায়,
নাড়ি ছাড়ে কাব্যের,
ছন্দ-বিচারে বলো কেবা পায়
স্পর্শ আনন্দের?

৩) স্বরবৃত্ত

অঙ্ক কষে কিছু পেলে?
কাব্য গেল মারে।
আনন্দের কি পরাশ মেলে
ছন্দ-বিচার করে?

কথাটা সত্যি নয়। ছন্দ-বিচারেও আনন্দ মেলে। বইকি। আপাতত লক্ষ করে। দেখুন, “আনন্দের’ শব্দটি তিনটি দৃষ্টান্তেই আছে। কিন্তু তিন জায়গায় তার মাত্রা মূল্য সমান নয়। প্রথম দৃষ্টান্তে (অর্থাৎ অক্ষরবৃত্তে) সে পাচ্ছে ৪-মাত্রার মূল্য; দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে (অর্থাৎ মাত্রাবৃত্তে) সে পাচ্ছে ৫-মাত্রার মূল্য; আবার তৃতীয় দৃষ্টান্তে (অর্থাৎ স্বরবৃত্তে) সে মাত্র ৩-মাত্রার মূল্য পেয়েই খুশি থাকছে।

স্বরবৃত্তে সে মাত্র ৩-মাত্রার মূল্য পাচ্ছে কেন? কারণটা আগেই বলেছি। পাচ্ছে, তার কারণ, স্বরবৃত্তে মাত্রার মূল্য দেওয়া হয় সিলেবল অনুযায়ী, এবং ‘আনন্দের শব্দটিতে (আ+নন°দের) তিনটির বেশি সিলেবল নেই।

এবারে আমরা স্বরবৃত্তের পর্ব-বিভাগ করে দেখাব। সিলেবল অনুযায়ী মাত্রার মূল্য দেবার ব্যাপারটা তাতে আরও স্পষ্ট হবে। কিন্তু পর্ব ভেঙে দেখাবার জন্যে একটা পদ্য চাই। হাতের কাছে পদ্যের বই পাচ্ছিনে; তাই, আসুন, স্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা লাইন-কয়েকের একটা টুকরো পদ্য নিজেরাই বানিয়ে নেওয়া যাক। ভয় পবার কিছু নেই, অক্ষরবৃত্ত আর মাত্রা বৃত্ত ছন্দে তো আর আমরা কম পদ্য বানাইনি, কান যদি ঠিক থাকে তো স্বরবৃত্তেও কয়েকটা লাইন আমরা ঠিকই খাড়া করে ফেলতে পারব।

ধরা যাক, আমাদের বক্তব্য এই হবে যে, রেলের কামরায় অকস্মাৎ এক পুরোনো বন্ধুর (কিংবা বান্ধবীর) সঙ্গে দেখা হয়েছে, খানিক বাদেই আবার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে, দুজনে দু-পথে চলে যাব, কিন্তু সেই বিচ্ছেদের ভাবনাকে আমরা আমল দিতে চাইনে, বরং দু-দণ্ডের এই হঠাৎ-মিলনকে গল্পে-গল্পে ভরিয়ে তুলতে চাই। তা স্বরবৃত্তে সেই কথাটাকে আমরা এইভাবে প্রকাশ করতে পারি :

পথের মধ্যে হঠাৎ দেখা,
ট্রেনের মধ্যে আলাপচারি;
স্টেশন এলেই আবার একা
অন্য পথে দেব পাড়ি।
সেটা সত্যি, কিন্তু অত
ভেবে দেখলে কষ্ট বড়ো;
বরং এসো, আপাতত
হালকা কিছু গল্প করো।

যাক, লাইনগুলি মোটামুটি খাড়া হয়েছে। এবারে একে পর্বে-পর্বে ভাগ করতে হবে। সেক্ষেত্রে এর চেহারা দাঁড়াবে এইরকম :

পথের মধ্যে/হঠাৎ দেখা,/
ট্রেনের মধ্যে/আলাপচারি;/
স্টেশন এলেই/আবার একা/
অন্য পথে/দেব পাড়ি।/
সেটা সত্যি,/কিন্তু অত/
ভেবে দেখলে/কষ্ট বড়ো;/
বরং এসো,/আপাতত/
হালকা কিছু/গল্প করো।/

দেখতে পাচ্ছি, এখানে ফি-লাইনে আছে দুটি করে পর্ব (সংখ্যাটাকে ইচ্ছে করলেই বাড়ানো যেত); লাইনের শেষে ভঙা-পর্ব নেই। (ইচ্ছে করলেই রাখা যেত)।

লাইন তো ভাঙলুম। এখন পর্বকেও যদি ভেঙে দেখি, তাহলে তার মধ্যে চারটি করে সিলেবল-এর সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে। দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রথম লাইনের প্রথম পর্বটিকে ভেঙে দেখছি, প + থেরন্ + মধ্য + ধে- এই চারটি সিলেবল-এ তার শরীর গড়া। অন্য ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হবে না, যে-কোনও পর্ব এখানে ভাঙি না কেন, মোট চারটি করে সিলেবলই তাতে মিলবে।

এবং আপনারা আগেই জেনেছেন যে, স্বরবৃত্ত ছন্দে প্রতিটি সিলেবল একটি করে মাত্রার মূল্য পায়। সেই হিসেবে আমরা বলতে পারি যে, স্বরবৃত্তের চাল ৪-মাত্রার। মাত্রাবৃত্ত অনেক চালে চলে। কিন্তু স্বরবৃত্তের এই একটিই চাল। চারের চাল ছাড়া সে চলে না।

আর-একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। এবারে আমাদের বিষয়বস্তু হবে ভালোবাসা। একটি মেয়ের চাউনিতে আলো জুলেছে, হাসিতে রং ধরেছে, অথচ ভঙ্গিটি সলজ। তার বুকের মধ্যে জেগেছে অসম্ভবকে জয় করবার আশা; অন্য দিকে, দ্বিধা আর ভয়ের শিকলটাকেও সে ছিড়তে পারছে না। অর্থাৎ কিনা সে প্রেমে পড়েছে। তা তার এই অবস্থােটাকে আমরা, স্বরবৃত্ত ছন্দে এইভাবে প্রকাশ করতে পারি :

দুটি চোখে কে ওই আলো জ্বালে,
ঠোঁটে লাগায় হাসি?
ভঙ্গিতে কে আমন করে ঢালে
লজ্জা রাশিরাশি?
বুকের মধ্যে বাজায় গুরুগুরু
অসম্ভবের আশা;
ভয়ে তবু কাঁপে যে তার ভুরু,
সেই তো ভালোবাসা।

ঈশ্বর জানেন, প্রথম-প্রেমের এই বর্ণনাটা সকলের মনঃপূত হল কি না। তবে এ-ও যে স্বরবৃত্তই, তাতে সন্দেহ নেই। পর্ব ভেঙে দেখালে এর চেহারা হবে। এইরকম :

দুটি চোখে/কে ওই আলো/জ্বালে,
ঠোটে লাগায়/হাসি?
ভঙ্গিতে কে/অমন করে/ঢালে
লজ্জা রাশি/রাশি?
বুকের মধ্যে/বাজায় গুরু/গুরু
অসম্ভবের/আশা;
ভয়ে তবু/কাঁপে যে তার/ভুরু,
সেই তো ভালো/বাসা।

দেখতে পাচ্ছি, এর প্রথম, তৃতীয়, পঞম আর সপ্তম লাইনে আছে দুটি করে পর্ব; দ্বিতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ আর অষ্টম লাইনে সেক্ষেত্রে একটি করে পর্ব আছে। ফি-লাইনের শেষে আমরা ভাঙা-পর্ব রেখেছি। প্রতিটি পর্বই ৪-মাত্রায় গড়া (অর্থাৎ প্রতিটি পর্বেই চারটি করে সিলেবল আছে)। ভাঙা-পর্বগুলি ২-মাত্রার।

আরও একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। এবারে আমাদের বিষয়বস্তু হচ্ছে অকৃতজ্ঞতা।

প্রেম-ভালবাসা-প্রকৃতির কথা তো অনেক বললুম, এবারে জীবনের অন্ধকার দিকটার দিকেও একবার তােকানো যাক। যুগপৎ অকৃতজ্ঞ ও নির্বোিধ এমন মানুষের কথা বলা যাক, নিজের ক্ষমতার দৌড় না-বুঝেই যে কিনা উপকারীকে দংশন করতে উদ্যত :

চেহারাটা আজকে তোমার
এক মুহুর্তে পড়ল ধরা।
হাঁড়ির মধ্যে আটকা ছিলে,
যেই না খুলে দিলুম সরা–
অমনি তুমি আমার দেহেই
সমস্ত বিষ ঢালতে চাচ্ছ,
সাপের মতোই ফণা তুলে
দিব্যি তুমি ফোঁসফোঁসাচ্ছ।
কৃতজ্ঞতা কিছু নেই কি?
বুদ্ধি? তা-ও না? আরো ছি-ছি।
বুদ্ধি থাকলে বুঝতে পারতে
ভয় দেখাচ্ছ মিছিমিছি।
সাপের ওষুধ আছে আমার,
কোরো না তাই বাড়াবাড়ি।
তোমার মতন হাজার সাপকে
হাঁড়িতে ফের পুরতে পারি।

এবারে আর পর্ব ভেঙে দেখাচ্ছিনে। নিজেরাই ভেঙে নিন। ভাঙলে দেখতে পাবেন, এর ফি-লাইনে দুটি করে পর্ব আছে (লাইনের শেষে ভঙা-পর্ব নেই)। প্রতি পর্বে, যথারীতি, আছে চারটি করে সিলেবল।

কথা এই যে, স্বরবৃত্ত ছন্দে ৪-সিলেবল-এর পর্বটাই নিয়ম বটে, তবে মাঝে-মাঝে তার ব্যতিক্রমও ঘটে যায়। আমরা তিনটি মুক্ত ও একটি বুদ্ধ সিলেবল-এর সমবায়ে পর্ব গড়তে পারি (দৃষ্টান্ত : “দিনের আলো” = দি/নের/আ/লো), কিংবা চারটি মুক্ত সিলেবল-এর সমবায়ে পর্ব গড়তে পারি (দৃষ্টান্ত : ‘নিভে এলো”= নি/ভে/এ/লো), কিংবা দুটি মুক্ত ও দুটি বুদ্ধ সিলেবল-এর সমবায়েও পর্ব গড়তে পারি (দৃষ্টান্ত : “বাইরে কেবল” = বাই/রে/কে/বল)। এই সবই চার-সিলেবল-সম্পন্ন পর্বের দৃষ্টান্ত। কিন্তু সবগুলি সিলেবলকেই যদি বুদ্ধ রাখতে ইচ্ছা করি, তাহলে পর্বের মধ্যে সাকুল্যে তিনটির বেশি সিলেবল ঢোকাতে গেলে আমাদের ঘাম ছুটে যাবে। (দৃষ্টান্ত দেবার জন্যে এক্ষুনি একটা লাইন বানিয়ে নেওয়া যাক। “শনশন শন ৰাতাস বইছে”— এই যে লাইনটি, এর মধ্যে দুটি পর্ব আছে। “শন শন শন” আর “বাতাস বইছে”। তার মধ্যে প্রথম পর্ব অর্থাৎ “শন শন শন”-এর সব কটি সিলেবলই যেহেতু বুদ্ধ তাই সেই পর্বের মধ্যে সাকুল্যে তিনটির বেশি সিলেক্‌ল-এর জায়গা মেলেনি; মেলানো শাস্তু।) তাহলেই দেখা যাচ্ছে: ৪-মাত্রার নিয়মটা সর্বদা বজায় থাকে না; সিলেবল-এর চরিত্র অনুযায়ী মাত্রার সংখ্যা বাড়ে কমে। এখানে যে-দৃষ্টান্ত দিয়েছি, তা ছাড়া অন্য প্রকারের ব্যতিক্রমের দৃষ্টান্তও এই ছন্দে বিস্তর মেলে। যেমন মাত্রাহাস, তেমনি মাত্রাবৃদ্ধির দৃষ্টান্তও প্রচুর। স্বরবৃত্তের আর-এক নাম ছড়ার ছন্দ। তা চোখ বুলোলেই ধরা পড়বে যে, সেকাল আর একালের অনেক ছড়ারই অনেক পর্বে চারটি করে সিলেবল নেই। কোথাও বেশি আছে, কোথাও কম।

স্বরবৃত্ত ছন্দে একালেও কিছু কম কবিতা লেখা হয়নি। কিন্তু একালের কবিরাই যে পর্বে-পর্বে চারটি করে সিলেবল-এর বরাদ্দ চাপাবার কানুন সর্বদা মান্য করছেন, এমনও বলতে পারিনে। ব্যতিক্রম বিস্তর চোখে পড়ে। আকছার দেখতে পাই, পর্বে কোথাও সিলেবল-এর সংখ্যা চারের বেশি, কোথাও কম। সিলেবল-এর সংখ্যা যখন বাড়ে, তখন পাঁচে, এমনকি এক-আধ ক্ষেত্রে ছয়েও গিয়ে পৌছোয়। (প্রাচীন ছড়ায় ছয়-সিলেবলযুক্ত পর্বের দৃষ্টান্ত : কাজিফুল কুড়োতে কুড়োতে’ পেয়ে গেলাম মালা) যখন কমে, তখন সাধারণত তিনে এসে নামে।

ওঠানামার ব্যাপারটা কি কবিদের ইচ্ছাকৃত? অর্থাৎ চার-সিলেবল দিয়ে স্বরবৃত্তের পর্ব গড়বার যে একটি অলিখিত বিধান রয়েছে, সেইটোকে লঙ্ঘন করবার জন্যেই কি তাঁরা মাঝে-মাঝে সিলেবল-এর সংখ্যা বাড়ােন কিংবা কমান? উত্তরটা কবিরাই দিতে পারবেন। আমরা শুধু এইটুকু বলতে পারি যে, নিয়ম লঙ্ঘন করলেও র্তারা সাধারণত এক-পায়ের বেশি লঙ্ঘন করেন না। চারের সীমানা ছাড়িয়ে যখন তারা ওপরে ওঠেন, তখন বড়োজের এক পা ওঠেন। এবং যখন নামেন, তখন সাধারণত এক পা-ই নামেন। (নামতে নামতে দুয়ে নামবার দৃষ্টান্তও কিছু আছে।)

সীমানা ছাড়িয়ে ওপরে উঠবার দৃষ্টান্ত আগেই দেওয়া যাক। বিখ্যাত কিছু পদ্য কিংবা ছড়া থেকে দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। (হাতের কাছে বই না থাকায় মিলিয়ে নেবার উপায় নেই। উদ্ধৃতিতে যদি একটু-আধটু ভুল ঘটে যায়, সহৃদয় পাঠক আশা করি ক্ষমা করবেন।) নীচের লাইন দুটি লক্ষ করুণ।

“রাত পোহাল, ফরসা হল, ফুটল কত ফুল;
কাঁপিয়ে পাখা নীল পতাকা জুটল। অলিকুল।”

এখানে ফি-লাইনে আছে তিনটি করে পর্ব। লাইনের শেষে ভঙা-পর্বও আছে। প্রতিটি পর্বে চারটি করে সিলেবল থাকবার কথা। আছেও। শুধু দ্বিতীয় লাইনের প্রথম পর্বে ব্যতিক্ৰম ঘটেছে। পর্বটি হল “কাঁপিয়ে পাখা’। হিসেব করে দেখুন, সিলেবল-এর সংখ্যা এক্ষেত্রে চার নয়, পাঁচ।

আর-একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি :

“জাদুর গুণের বালাই নিয়ে মরে যেন সে কাল!”

এটিও আপনাদের চেনা লাইন। এতেও আছে তিনটি পর্ব আর একটি ভাঙা-পর্ব। কিন্তু তৃতীয় পর্বে (‘‘মরে যেন সে) সিলেবল রয়েছে চারের বদলে পাঁচটি।

আর-একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যায় :

“যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে।”

—এ-লাইনটিও আপনারা অনেক বার শুনেছেন। কিন্তু এর প্রথম পর্বে (যমুনাবতী) যে পাঁচটি সিলেবল রয়েছে, তা হয়তো সবাই খেয়াল করে দেখেননি। ঠিক তেমনি, ‘পূজাবাটীতে জোর কাঠিতে যখন ঢাক বাজে, তখনও অনেকেই খেয়াল করে দেখেন না যে, ‘পূজাবাটীতে” পুরো পাঁচটি সিলেবল গিয়ে ঢুকেছে।

ইতিপূর্বে আমরা স্বরবৃত্তের যেসব দৃষ্টান্ত নিজেরা তৈরি করে নিয়েছিলুম, তাতে অবশ্য কুত্ৰাপি কোনও ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু থাকলেই কি তাতে স্বরবৃত্তের পবিত্রতা নষ্ট হত? ট্রেনের মধ্যে হঠাৎ-দেখতে-পাওয়া বন্ধুটির সঙ্গে খানিকবাদেই ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে, এই কথাটা জানিয়ে আমরা লিখেছিলুম :

সেটা সত্যি, কিন্তু অত
ভেবে দেখলে কষ্ট বড়ো।

সেক্ষেত্রে ভেবে না-দেখে আমরা যদি তলিয়ে দেখতুম, এবং লিখতুম :

সেটা সত্যি, কিন্তু অত
তলিয়ে দেখলে কষ্ট বড়ো।

তাহলেই ব্যতিক্ৰম ঘটত, এবং দ্বিতীয় লাইনের প্রথম পর্বে (তালিয়ে দেখলে) পাঁচটি সিলেবল ঢুকে পড়ত। কিন্তু স্বরবৃত্তের চাল যে তাই বলে নষ্ট হত, এমন মনে হয় না।

নষ্ট হয় না সিলেবল-এর সংখ্যা কমে গেলেও। উর্ধ্বগতির কথা তো বললুম। নিম্নগতির ক্ষেত্রেও সেই একই কথা। চারের বদলে তিন সিলেবল দিয়েও মাঝেমাঝে স্বরবৃত্তের পর্ব গড়া হয়েছে, কিন্তু ছন্দের রেলগাড়ি তাতে বেলাইন হয়নি। দৃষ্টান্ত দিচ্ছি :

“আজ রামের অধিবাস কাল রামের বিয়ে।”

এটিও একটি সুপরিচিত লাইন, এবং এ-ও স্বরবৃত্তই। লাইনটিতে মোট তিনটি পর্ব, আর তৎসহ একটি ভাঙা-পর্ব রয়েছে। কিন্তু তিনটি পর্বের প্রত্যেকটিই এখানে তিন-সিলেবল দিয়ে গড়া (আজ রামের/অধিবাস/কাল রামের)।

আর-একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি :

“গুণবতী ভাই আমার মন কেমন করে।”

এটিও একটি পরিচিত ছড়ার লাইন। এরও দ্বিতীয় পর্বে (ভাই আমার) আর তৃতীয় পর্বে (মন কেমন’) আছে তিনটি করে সিলেবল।

আরও একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। এবারে দু-লাইন নিজেরাই বানিয়ে নিচ্ছি :

রাতদিন তুই ছাইভস্ম কী যে
কথা বলিস নিজের সঙ্গে নিজে।

লাইন দুটির প্রত্যেকটিতে আছে দুটি করে পর্ব আর একটি করে ভাঙা-পর্ব। লক্ষ করে দেখুন, প্রথম লাইনের দুটি পর্বই (রাতদিন তুই/ছাইভস্ম), গড়া হয়েছে তিনটি করে সিলেবল দিয়ে।(1) কিন্তু ছন্দ তাতে বেচাল হয়নি।

কেন হয় না? সিলেবল-এর সংখ্যা চারের জায়গায় বেড়ে গিয়ে পাঁচ, কিংবা কমে গিয়ে তিন, হওয়া সত্ত্বেও কী করে ছন্দের চাল ঠিক থাকে?

ব্যাপারটার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ছান্দসিকেরা বলেন, চাল নষ্ট হয় না। আমাদের উচ্চারণের গুণে। (বললুম। ‘গুণ, কিন্তু ব্যাপারটা আসলে উচ্চারণের ‘দোষ” ছাড়া আর কিছু নয়। তবে এক্ষেত্রে সেটা দোষ হৈয়াও গুণ হচ্ছে বটে!)। আমরা লিখি বটে ‘কাঁপিয়ে পাখা’, কিন্তু উচ্চারণে সেটা ‘কাঁপ্‌য়ে পাখা’ হয়ে দাঁড়ায়, ‘তলিয়ে দেখলে’ হয় ‘তলয়ে দেখলে’। ফলে সিলেবলও একটি করে কমে যায়। কাঁপিয়ে পাখায় যেক্ষেত্রে পাঁচটি সিলেবল পাচ্ছি (কঁ+পি+য়ে পাখা), “কাঁপিয়ে পাখায় সেক্ষেত্রে চারটি সিলেবল মিলবে (কাঁপি+য়ে পা খা)। তলিয়ে দেখলে যেক্ষেত্রে পাঁচটি সিলেবল দিয়ে গড়া (ত+লি+য়ে দেখ+লে), তিলয়ে দেখলের সিলেবল সংখ্যা সেক্ষেত্রে চারের বেশি নয়। (তল-য়ে দেখ+লে)।

কিন্তু যমুনাবতীর ব্যাখ্যা কী? ছান্দসিকেরা এক্ষেত্রেও সম্ভবত বলবেন যে, তাড়াতাড়ি বলবার সময়ে আমরা ‘যমুনাবতী’ বলি না, বলি ‘যোম্‌নাবতী’; ফলে সিলেবল-এর সংখ্যা এক্ষেত্রেও চারে এসে দাঁড়ায় (যেমন-না–ব+তী)। এই নিয়ম অনুযায়ী মরে যেন সে’ আর ‘পূজাবাটীতে’র ক্ষেত্রেও সিলেবল-এর সংখ্যা কমে গিয়ে চারে এসে দাঁড়াবার একটা-কিছু ব্যাখ্যা নিশ্চয় মিলবে।

ব্যাখ্যা মেলে সিলেবল-এর সংখ্যা যেখানে চারের কম, সেখানেও। ছান্দসিক বললেন, তিন সিলেবলকেই আমরা সেখানে টেনে উচ্চারণ করে চারে এনে দাঁড় করাই। “আজ রামেরা/অধিবাস/কাল রামের/বিয়ে” এই লাইনটিকে টেনে বলি “আ-জ রামেরা/অধি-ব্যাস/কা-ল রামের/বিয়ে’। ‘গুণবতী ভাই আমার মন কেমন করেীর ক্ষেত্রে প্রথম পর্বটিতে চারটি সিলেবল থাকায় টেনে পড়বার দরকার হয় না, কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে আর তৃতীয় পর্বে সিলেবল-এর ঘাটতি থাকায় টেনে পড়তে হয়। ঘাটতি মেটাবার জন্যে বলতে হয়, “ভা-ই আমার/ম-ন কেমন”।

সিলেবল-এর সংখ্যা, আমরা আগেই আভাস দিয়েছি, তিনে নেমেই সর্বদা ক্ষান্ত হয় না। মাঝে-মাঝে, নামবার ঝোকে, সে দুয়ে গিয়েও নামে। প্ৰবোধচন্দ্র তার ছন্দ-পরিব্রুমা গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে তার দৃষ্টান্ত দিয়েছেন :

“বাইরে কেবল/জলের শব্দ/ঝুপ ঝুপ/ঝুপ
দস্যি ছেলে/গল্প শোনে/একেবারে/চুপ।”

এখানে দুটি লাইনেই আছে তিনটি করে পর্ব ও একটি করে ভাঙা-পর্ব। প্রতি পর্বে আছে চারটি করে সিলেবল।। ব্যতিক্রম ঘটেছে শুধু প্রথম লাইনের তৃতীয় পর্বে। সিলেবল-এর সংখ্যা সেখানে শুধু যে কমেছে তা নয়, কমে একেবারে দুয়ে এসে ঠেকেছে। ছন্দের চাল তবু যে নষ্ট হয়নি, তার ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা অবশ্যই এই যে, ‘ঝুপ ঝুপকে এক্ষেত্রে আমরা টেনে “ঝুউপ-ঝুউপ” করে উচ্চারণ করি; ফলে চারের হিসেবটাও মিলে যায় (ঝু-উপ-কু-উপ), ছন্দের চালও নষ্ট হয় না।

স্বরবৃত্ত ছন্দের নিয়ম কী, আমরা জেনেছি। নিয়মের ব্যতিক্রমের কথাও জানলুম। ব্যতিক্ৰম ঘটা সত্ত্বেও ছন্দের চাল কেন নষ্ট হয় না, সেই ব্যাখ্যাটাও পাওয়া গেল। ব্যাখ্যা র্যােরা দিয়েছেন, তারা প্ৰবীণ ছান্দসিক। ছন্দশাস্ত্রে তারা পারদ্রষ্টা। তাদের পাণ্ডিত্য প্রশ্নাতীত; ধ্বনি ও উচ্চারণের হাড় হদ তারা জানেন। তাদের কথার প্রতিবাদ করব, এত বড়ো ধৃষ্টতা আমাদের নেই।

কিন্তু নিজেদের কথাটাকে জানাবার অধিকার নিশ্চয়ই আছে। আমাদের বক্তব্য আমরা এখানে পেশ করলুম।

১) “কাঁপিয়ে পাখ’, ‘তলিয়ে দেখলে’, ‘যমুনাবতী’, ‘মরে যেন সে, ‘পূজাবাটীতে’-জাতীয় পাঁচ সিলেবল সংবলিত পর্বের ক্ষেত্রে উচ্চারণকে কিছুমাত্র বিকৃত কিংবা সংকুচিত না করে (অর্থাৎ প্রতিটি শব্দকেই যথাবিধি উচ্চারণ করে) দেখেছি, স্বরবৃত্তের চাল তাতেও নষ্ট হয় না। ঠিকই থাকে।

২) তৎসত্ত্বেও যদি ছান্দসিকেরা বলেন যে, না, চাল ঠিক থাকে না, এবং ঠিক রাখবার জন্যেই উচ্চারণকে কোথাও (পর্বে যেখানে সিলেবল-এর সংখ্যা চারের বেশি) গুটিয়ে আনতে হবে, আবার কোথাও (পর্বে যেখানে সিলেবল-এর সংখ্যা চারের কম) ছড়িয়ে দিতে হবে, এবং পর্বের দৈর্ঘ্যে এইভাবে সমতা বিধান করতে ৩বে, তাহলে আমরা বিনীতভাবে প্রশ্ন করব যে, উচ্চারণের এইভাবে হ্রাসবৃদ্ধি ঘটাবার রীতি তো গানের ব্যাপারে চলে, ও-রীতি কি কবিতাতেও চলা উচিত?

কথাটা যখন উঠলই, তখন আরও মূলে গিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। জিজ্ঞেস করা যায়, স্বরবৃত্ত ছন্দে উচ্চারণকে প্রয়োজনবোধে কোথাও গুটিয়ে আনা এবং কোথাও ছড়িয়ে দেওয়া (এবং এইভাবে পর্বের দৈর্ঘ্যে সাম্যবিধান করা) যদি অত্যাবশ্যক ৩য়ই, তবে স্বরবৃত্তকে মূলত কবিতার ছন্দ বলে গণ্য করা চলে কি না।(2)

প্রশ্নটা অকারণ নয়। আমরা সকলেই জানি, সেকালের অনেক ছড়াই গানের সগোত্ৰ। ঘুমপাড়ানি ছড়া তো বটেই। “খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল বগি এল দেশে”— কোলের উপরে ছেলেকে শুইয়ে একালের জননীরাও যখন এই কথাগুলি উচ্চারণ করেন তখন অজান্তেই এই কথাগুলিতে কিছুটা সুরের দোলানি লেগে যায়। (প্রসঙ্গত বলি, “খোকা ঘুমোল’ আর ‘পাড়া জুড়োল’তেও সিলেবল-এর সংখ্যা চারের বেশি।) লাগে আরও অনেক ছড়াতেই। তখন মনে হয়, এই ছড়াগুলি আসলে কবিতা নয়, গান— যা সুর সহযোগে গেয়। কথার ভূমিকা সেখানে যৎসামান্য, সুরই সেখানে ছন্দ ঠিক রাখে। (সেই সুর হয়তো খুবই এলিমেনটারি, কিন্তু তা সুরই।) আর তা-ই যদি হয়, ছড়ার কথাগুলিকে তবে কবিতার ছন্দের কড়া-ইন্ত্রি নিয়মকানুনের ফ্রেমে আঁটাবার চেষ্টা কি কিছুটা অর্থহীন হয়ে পড়ে না? কাব্যছন্দের ব্যাকরণ দিয়ে তো গীতিকা-র শরীরকে আমরা বিশ্লেষণ করতে পারিনে।

ছান্দসিকেরা এ-সম্পর্কে কী বলবেন, আমাদের জানা নেই। তবে স্বরবৃত্তের চালচলন দেখে সন্দেহ না-হয়েই পারে না যে, এই ছন্দ মূলত গানেরই ছন্দ, পরবর্তী কালে কবিতাতেও যার সার্থক ব্যবহার সম্ভব হয়েছে।

—————

1. রাতদিন তুই’-পর্বটির তিনটি সিলেবলই বুদ্ধ, সুতরাং ইচ্ছে করলেও ওখানে অতিরিক্ত কোনও সিলেবল ঢোকানো শক্ত হত। “ছাইভস্ম’ পর্বটি সম্পর্কে কিন্তু সে-কথা খাটে না। ওখানে আছে দুটি বুদ্ধ ও একটি মুক্ত সিলেবল (ছাই+ভস+স)। সুতরাং আর-একটি সিলেবল ওখানে ঢোকানো যেত। কিন্তু তা না-ঢোকানো সত্ত্বেও যে ছন্দ বেচাল হয়নি, এটুকু অবশ্যই লক্ষণীয়।
2. ‘পরিশিষ্ট’ অংশে ড. ভবতোষ দত্তের চিঠি দ্রষ্টব্য।