রাঙা জবা – শ্যামাসংগীত (১৯৬৬)

১০০টি শ্যামাসঙ্গীতে সমৃদ্ধ রাঙা-জবা গ্রন্থটি প্রকাশ করেন ২৪ পরগনার রাজীবপুরের বেগম মরিয়ম আজিজ। গ্রন্থটির প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৭৩ শুক্রবার ( এপ্রিল, ১৯৬৬ )। মূল্য তিন টাকা। নজরুল নিজের জীবনে তন্ত্র ও যোগাসাধনা করেছেন। শক্তিপূজায় তাঁর ভক্তহৃদয়ের অকৃত্রিম আকুলতা ও আর্তি এইসব গানের মধ্যে রূপায়িত।

আঁধার-ভীত এ চিতে যাচে মা গো আলো আলো

আঁধার-ভীত এ চিতে যাচে মা গো আলো আলো । বিশ্ববিধাত্রী আলোকদাত্রী নিরাশ পরানে আশার সবিতা জ্বালো জ্বালো আলো আলো॥ হারিয়েছি পথ গভীর তিমিরে, লহো হাতে ধরে প্রভাতের তীরে, পাপ তাপ মুছি করো মাগো শুচি আশিস অমৃত ঢালো॥ দশপ্রহরণধারিণী দুর্গতিহারিনী দুর্গে মা অগতির গতি সিদ্ধিবিধায়িনী...

আজও মা তোর পাইনি প্রসাদ

আজও মা তোর পাইনি প্রসাদ আজও মুক্ত নহি। আজও অন্যে আঘাত দিয়ে কঠোর ভাষা কহি॥ মোর আচরণ, আমার কথা আজও অন্যে দেয় মা ব্যথা, আজও আমার দাহন দিয়ে শতজনে দহি॥ শত্রু-মিত্র মন্দ-ভালোর যায়নি আজও ভেদ, কেহ পীড়া দিলে, প্রাণে আজও জাগে খেদ। আজও জাগে দুঃখশোকে অশ্রু ঝরে আমার চোখে আমার আমার...

আদরিণী মোর শ্যামা মেয়েরে কেমনে কোথায় রাখি

আদরিণী মোর শ্যামা মেয়েরে কেমনে কোথায় রাখি। রাখিলে চোখে বাজে ব্যথা বুকে (তারে) বুকে রাখিলে দুখে ঝুরে আঁখি॥ শিরে তারে রাখি যদি মন কাঁদে নিরবধি, (সে) চলতে পায়ে দলবে বলে পথে হৃদয় পেতে থাকি॥ কাঙাল যেমন পাইলে রতন লুকাতে ঠাঁই নাহি পায়। তেমনি আমার শ্যামা মেয়েরে জানি না রাখিব...

আমার ভবের অভাব লয় হয়েছে শ্যামা-ভাবসমাধিতে

আমার ভবের অভাব লয় হয়েছে শ্যামা-ভাবসমাধিতে। শ্যামা-রসে যে-মন আছে ডুবে কাজ কীরে তার যশ-খ্যাতিতে॥ মধু যে পায় শ্যামা-পদে কাজ কী রে তার বিষয়-মদে, মুক্তি যে-মন যোগমায়াতে ভাবনা কী তার রোগ-ব্যাধিতে॥ কাজ কী রে তার লক্ষ টাকায়, মোক্ষ-লক্ষ্মী যাহার ঘরে; কত, রাজার রাজা প্রসাদ মাগে...

আমার হৃদয় অধিক রাঙা মাগো

আমার হৃদয় অধিক রাঙা মাগো রাঙা জবার চেয়ে। আমিসেই জবাতে ভবানী তোর চরণ দিলাম ছেয়ে॥ মোর বেদনার বেদির পরে বিগ্রহ তোর রাখব ধরে, পাষাণ-দেউল সাজে না তোর আদরিণী মেয়ে॥ স্নেহ-পূজার ভোগ দেব মা, অশ্রু-পূজাঞ্জলি, অনুরাগের থালায় দেব ভক্তি-কুসুমকলি। অনিমেষ আঁখির বাতি রাখব জ্বেলে...

আমার আনন্দিনী উমা আজও এল না তার মায়ের কাছে

(আমার) আনন্দিনী উমা আজও এল না তার মায়ের কাছে। হে গিরিরাজ দেখে এসো কৈলাসে মা কেমন আছে॥ মোর মা যে প্রতি আশ্বিন মাসে মা মা বলে ছুটে আসে; মা আসেনি বলে আজও ফুল ফোটেনি লতায় গাছে॥ তত্ত্ব-তালাশ নিইনি মায়ের তাই বুঝি মা অভিমানে না এসে তার মায়ের কোলে ফিরিছে শ্মশানে মশানে। ক্ষীর...

আমার উমা কই, গিরিরাজ, কোথায় আমার নন্দিনী

আমার উমা কই, গিরিরাজ, কোথায় আমার নন্দিনী? এ যে দেখি দশভুজা এ কোন রণরঙ্গিণী॥ মোর লীলাময়ী চঞ্চলারে ফেলে, এ কোন দেবীমূর্তি নিয়ে এলে। এ যেমহীয়সী মহামায়া বামা মহিষমর্দিনী॥ মোর মধুর স্নেহে জ্বালাতে আগুন আনলে কারে ভুল করে, এরে কোলে নিতে হয় না সাহস, ডাকতে নারি নাম ধরে।মা, কে...

আমার কালো মেয়ে পালিয়ে বেড়ায়

(আমার) কালো মেয়ে পালিয়ে বেড়ায় কে দেবে তায় ধরে। (তারে) যেই ধরেছি মনে করি অমনি সে যায় সরে॥ বনের ফাঁকে দেখা দিয়ে চঞ্চলা মোর যায় পালিয়ে, (দেখি) ফুল হয়ে মা-র নূপুরগুলি পথে আছে ঝরে। তার কন্ঠহারের মুক্তাগুলি আকাশ-আঙিনাতে তারা হয়ে ছড়িয়ে আছে, দেখি আধেক রাতে। আমি কেঁদে বেড়াই,...

আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে, কে দিয়েছে গালি

আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে, কে দিয়েছে গালি (তারে) কে দিয়েছে গালি। রাগ করে সে সারা গায়ে মেখেছে তাই কালি॥ যখন রাগ করে মোর অভিমানী মেয়ে আরও মধুর লাগে তাহার হাসিমুখের চেয়ে। কে কালো দেউল করল আলো অনুরাগের প্রদীপ জ্বালি॥ পরেনি সে বসন-ভূষণ, বাঁধেনি সে কেশ, তারই কাছে হার মানে রে...

আমার মা আছে রে সকল নামে

আমার মা আছে রে সকল নামে, মা যে আমার সর্বনাম।যেনামে ডাক শ্যামা মাকে পুরবে তাতেই মনস্কাম॥ ভালোবেসে আমার শ্যামা মাকে যার যাহা সাধ সেই নামে সে ডাকে, সেই নামে মা দেয় রে ধরা কেউ শ্যামা কয়, কেহ শ্যাম। এক সাগরে মিশে গিয়ে সকল নামের নদী সেই হরিহর কৃষ্ণ ও রাম, দেখিস তাঁকে যদি,...

আমার মানস-বনে ফুটেছে রে শ্যামা-লতার মঞ্জরী

আমার মানস-বনে ফুটেছে রে শ্যামা-লতার মঞ্জরী। সেই মঞ্জুবনে ফিরছে রে তাই ভক্তি-ভ্রমর গুঞ্জরি॥ সেথা আনন্দে দেয় করতালি প্রেমের কিশোর বনমালী সেই লতামূলে শিবের জটায় গঙ্গা ঝরে ঝরঝরি॥ কোটি তরু শাখা মেলি এই সে লতার পরশ চায়, শিরে ধরে ধন্য হতে এই শ্যামারই শ্যাম শোভায়। এই লতারই...

আমার মুক্তি নিয়ে কী হবে মা

(আমার) মুক্তি নিয়ে কী হবে মা, আমি তোরে চাই। স্বর্গ আমি চাই না মা গো কোল যদি তোর পাই। মা কী হবে সে মুক্তি নিয়ে কী হবে সে স্বর্গে গিয়ে, যেথায় গিয়ে তোকে ডাকার কোল যদি তোর পাই আর প্রয়োজন নাই॥ যুগে যুগে যে লোকে মা প্রকাশ হবে তোর, পুত্র হয়ে দেখব লীলা, এই কামনা মোর। তুই...

আমার শ্যামা বড়ো লাজুক মেয়ে

আমার শ্যামা বড়ো লাজুক মেয়ে কেবলই সে লুকাতে চায়। আলো-আঁধার পর্দা টেনে (ভীরু) বালিকা সে পালিয়ে বেড়ায়॥ নিখিল ভুবন আছে তারে ঘিরে, (আমার) মেয়ে তবু বসন খুঁজে ফিরে; তারেযে দেখে সে এক নিমেষে তারই মাঝে লয় হয়ে যায়॥ কোটি শিব ব্রহ্মা হরি অনন্তকাল গভীর ধ্যানে তার সে লুকোচুরি খেলায়...

আমার হৃদয় হবে রাঙাজবা, দেহ বিল্বদল

আমার হৃদয় হবে রাঙাজবা, দেহ বিল্বদল। মুক্তি পাব ছুঁয়ে মুক্তকেশীর চরণতল॥   মোর     বলির পশু হবে সর্বকাম,   মোর     পূজার মন্ত্র হবে মায়ের নাম, মোর অশ্রু দেব মা-র চরণে, সেই তো গঙ্গাজল॥   মোর আনন্দ মাকে দেব তাই হবে চন্দন,   মোর পুষ্পাঞ্জলি হবে আমার প্রাণ মন। মোর জীবন হবে...

আমায় আর কতদিন মহামায়া

(আমায়) আর কতদিন মহামায়া রাখবি মায়ার ঘোরে। মোরে কেন মায়ার ঘুর্ণিপাকে ফেললি এমন করে॥ ও মা কত জনম করেছি পাপ কত লোকের কুড়িয়েছি শাপ, তবু মা তোর নাই কি গো মাফ ভুগব চিরতরে॥ এমনি করে সন্তানে তোর ফেললি মা অকূলে, তোর নাম যে জপমালা তাও যাই হায় ভুলে। পাছে মা তোর কাছে আসি তাই...

আমায় যারা দেয় মা ব্যথা, আমায় যারা আঘাত করে

আমায় যারা দেয় মা ব্যথা, আমায় যারা আঘাত করে, তোরই ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী। আমায় যারা ভালোবাসে বন্ধু বলে বক্ষে ধরে, তোরই ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী॥ আমায় অপমান করে যে মা গো তোরই ইচ্ছা সে যে, আমায় যারা যায় মা ত্যেজে, যারা আমার আসে ঘরে তোরই ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী॥ আমার ক্ষতি করতে পারে অন্য লোকের...

আমি নামের নেশায় শিশুর মতো ডাকি গো মা বলে

আমি নামের নেশায় শিশুর মতো           ডাকি গো মা বলে।  নাই দিলি তুই সাড়া মা গো           নাই নিলি তুই কোলে॥   শুনলে ‘মা’ নাম জেগে উঠি,   ব্যাকুল হয়ে বাইরে ছুটি,   ওই নামে মোর নয়ন দুটি           ভরে উঠে জলে॥ ও নাম আমার মুখের বুলি, ও নাম খেলার সাথি, ও নাম বুকে জড়িয়ে ধরে...

আমি মুক্তা নিতে আসিনি মা ওমা, তোর মুক্তি-সাগর কূলে

আমি মুক্তা নিতে আসিনি মা           ওমা, তোর মুক্তি-সাগর কূলে। মোর, ভিক্ষা ঝুলি হতে মায়ার   মুক্তামানিক নে মা তুলে॥ মা তুই,         সবই জানিস অন্তর্যামী, সেই        চরণ-প্রসাদ ভিক্ষু আমি, শবেরও হয় শিবত্ব লাভ, মা, তোর যে চরণ ছুঁলে॥ তুই,        অর্থ দিয়ে কেন ভুলাস...

আমি সাধ করে মোর গৌরী মেয়ের                 নাম রেখেছি কালী

আমি সাধ করে মোর গৌরী মেয়ের                 নাম রেখেছি কালী।   পাছে লোকের দৃষ্টি লাগে                 মাখিয়ে দিলাম কালি তার, সোনার আঙ্গে মাখিয়ে দিলাম কালি॥           হাড়ের মালা গলায় দিয়ে          দিয়েছি তার কেশ এলিয়ে, তবু, আনন্দিনী নন্দিনী মোর দেয় রে করতালি।  ...

আমি সুন্দর নহি জানি হে বন্ধু জানি

বেহাগ দাদরা আমি সুন্দর নহি জানি হে বন্ধু জানি। তুমি সুন্দর, তব গান গেয়ে নিজেরে ধন্য মানি॥ আসিয়াছি সুন্দর ধরণিতে সুন্দর যারা তাদেরে দেখিতে রূপ-সুন্দর দেবতার পায়ে অঞ্জলি দিই বাণী॥ রূপের তীর্থে তীর্থ-পথিক যুগে যুগে আমি আসি ওগো সুন্দর, বাজাইয়া যাই তোমার নামের বাঁশি। পরিয়া...