বুলবুল (প্রথম খণ্ড) (১৯২৮)

বুলবুল । কাজী নজরুল ইসলামের গানের বই। কার্তিক১৩৩৫, ১৫ই নভেম্বর, ১৯২৮। উৎসর্গ--'সুর-শিল্পী, বন্ধু দিলীপকুমার রায় করকমলেষু'।

অধীর অম্বরে গুরু গরজন মৃদঙ বাজে

হাম্বীর — কাওয়ালি অধীর অম্বরে গুরু গরজন মৃদঙ বাজে। রুমু রুমু ঝুম মঞ্জীর-মালা চরণে আজ উতলা যে॥ এলোচুলে দুলে দুলে বন-পথে চল আলি মরা গাঙে বালুচরে কাঁদে যথা বন-মরালী। উগারি গাগরি ঝারি দে লো দে করুণা ডারি, ঘুঙট উতারি বারি, ছিটা লো গুমোট সাঁঝে। তালীবন হানে তালি, ময়ূরী ইশারা...

আজি এ কুসুম-হার সহি কেমনে ঝরিল যে ধুলায় চির অবহেলায়

সিন্ধু কাফি-খাম্বাজ — যৎ আজি এ কুসুম-হার সহি কেমনে ঝরিল যে ধুলায় চির অবহেলায় কেন এ অবেলায় পড়ে তারে মনে॥ তব তরে মালা গেঁথেছি নিরালা সে ভরেছে ডালা নিতি নব ফুলে। (আজি) তুমি এলে যবে বিপুল গরবে সে শুধু নীরবে মিলাইল বনে॥ আঁখি-জলে ভাসি গাহিত উদাসী আমি শুধু হাসি আসিয়াছি ফিরে।...

আজি দোল পূর্ণিমাতে দুলবি তোরা আয়

কালাংড়া-বসন্ত-হিন্দোল — দাদরা আজি দোল পূর্ণিমাতে দুলবি তোরা আয়। দখিনার দোল লেগেছে দোলন-চাঁপায়॥ দোলে আজ দোল-ফাগুনে ফুল-বাণ আঁখির তূণে, দুলে আজ বিধুর হিয়া মধুর ব্যথায়॥ দুলে আজ শিথিল বেণি, দুলে বধূর মেখলা, দুলে গো মালার পলা জড়াতে বঁধুর গলা। মাধবীর দোলন-লতায় দোয়েলা দোল...

আমারে চোখ ইশারায় ডাক দিলে হায় কে গো দরদি

আমারে চোখ-ইশারায় ডাক দিলে হায় কে গো দরদি। খুলে দাও রঙ-মহলার তিমির-দুয়ার ডাকিলে যদি।। গোপনে চৈতী হাওয়ায় গুল্‌-বাগিচায় পাঠালে লিপি, দেখে তাই ডাকছে ডালে কু কু বলে কোয়েলা ননদী।। পাঠালে ঘূর্ণি-দূতী ঝড়-কপোতী বৈশাখে সখি, বরষায় সেই ভরসায় মোর পানে চায় জল-ভরা নদী।। তোমারি অশ্রু...

আসিলে এ ভাঙা ঘরে কে মোর রাঙা অতিথি

পিলু-ভৈরবী — কাহারবা আসিলে এ ভাঙা ঘরে কে মোর রাঙা অতিথি। হরষে বরিষে বারি শাওন-গগন তিতি॥ বকুল-বনের সাকি নটিন পুবালি হাওয়া বিলায় সুরভি-সুরা, মাতায় কানন-বীথি॥ বনের বেশর গাঁথে কদম-কেশর ঝুরি, শিশির-চুনির হারে উজল উশীর-সিঁথি॥ তিতির শিখীর সাথে নোটন-কপোতী নাচে, ঝিঁঝির ঝিয়ারি...

আসে বসন্ত ফুলবনে সাজে বনভূমি সুন্দরী

ভীমপলশ্রী — দাদরা আসে বসন্ত ফুলবনে সাজে বনভূমি সুন্দরী। চরণে পায়েলা রুমুঝুমু মধুপ উঠিছে গুঞ্জরি॥ ফুলরেণু-মাখা দখিনা বায় বাতাস করিছে বনবালায়, বনকরবী-নিকুঞ্জছায় মুকুলিকা ওঠে মুঞ্জরি॥ কুহু আজি ডাকে মুহুমুহু, ‘পিউ কাঁহা’ কাঁদে উহু উহু পাখায় পাখায় দোঁহে দুহুঁ বাঁধে...

এ আঁখি-জল মোছো পিয়া ভোলো ভোলো আমারে

ভৈরবী — কাওয়ালি এ আঁখি-জল মোছো পিয়া ভোলো ভোলো আমারে। মনে কে গো রাখে তারে ঝরে যে ফুল আঁধারে॥ ফোটা ফুলে ভরি ডালা গাঁথো বালা মালিকা, দলিত এ ফুল লয়ে দেবে গো বলো কারে॥ স্বপনের স্মৃতি প্রিয় জাগরণে ভুলিয়ো, ভুলে যেয়ো দিবালোকে রাতের আলেয়ারে॥ ঝুরিয়া গেল যে মেঘ রাতে তব আঙিনায়,...

এ নহে বিলাস বন্ধু, ফুটেছি জলে কমল

মান্দ্ — কাহারবা এ নহে বিলাস বন্ধু, ফুটেছি জলে কমল। এ যে ব্যথা-রাঙা হৃদয় আঁখি-জলে-টলমল॥ কোমল মৃণাল-দেহ ভরেছে কণ্টক-ঘায়, শরণ লয়েছি গো তাই শীতল দিঘির জল॥ ডুবেছি এ কালো নীরে কত যে জ্বালা সয়ে, শত ব্যথা ক্ষত লয়ে হইয়াছি শতদল॥ আমার বুকের কাঁদন তুমি বল ফুল-বাস, ফিরে যাও, ফেলো...

এ বাসি বাসরে আসিলে কে গো ছলিতে

বৃন্দাবনী সারঙ — মিশ্র দাদরা এ বাসি বাসরে আসিলে কে গো ছলিতে। কেন পুন বাঁশি বাজালে কাফি-ললিতে॥ নিশীথ গভীরে কেন আঁখি-নীরে এলে ফিরে ফিরে গোপনকথা বলিতে॥ দলিত কুসুম-দলে রচিয়াছি শয়ন অন্ধ তিমির রাতি, নিবু-নিবু নয়ন! মরণ-বেলায় প্রিয় আনিলে কি অমিয় এলে কি গো নিঠুর ঝরা ফুল...

এত জল ও-কাজল-চোখে পাষাণী, আনলে বল কে

মান্দ্ — কাওয়ালি এত জল ও-কাজল-চোখে পাষাণী, আনলে বল কে। টলমল জল-মোতির মালা দুলিছে ঝালর-পলকে॥ দিল কি পুব-হাওয়াতে দোল, বুকে কি বিঁধিল কেয়া? কাঁদিয়া কুটিলে গগন এলায়ে ঝামর-অলকে॥ চলিতে পৈচি কি হাতের বাধিল বৈঁচি-কাঁটাতে? ছাড়াতে কাঁচুলির কাঁটা বিঁধিল হিয়ার ফলকে॥ যে দিনে মোর...

করুণ কেন অরুণ আঁখি দাও গো সাকি দাও শারাব

সিন্ধু — কাওয়ালি করুণ কেন অরুণ আঁখি দাও গো সাকি দাও শারাব। হায় সাকি এ আঙ্গুরি খুন, নয় ও হিয়ার খুন-খারাব॥ দুর্দিনের এই দারুণ দিনে শরণ নিলাম পানশালায়, হায় শাহারার প্রখর তাপে পরান কাঁপে দিল্-কাবাব॥ আর সহে না দিল্ নিয়ে এই দিল্-দরদির দিল্‌লগি তাই তো চালাই নীল পিয়ালায় লাল...

কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে আসলে প্রাতে পুষ্পচোর

গারা-ভৈরবী — কাহারবা কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে আসলে প্রাতে পুষ্পচোর। ডাকছে পাখি, ‘বউ গো জাগো, আর ঘুমায় না, রাত্রি ভোর’॥ জুঁই-কুঁড়িরা চোখ মেলে চায়, চুমকুড়ি দেয় মৌমাছি। শাপলা-বনে চাঁদ ডুবে যায় ম্লান চোখে হায় চায় চকোর॥ ঘোমটা ঠেলি কয় চামেলি, গোল কোরো না গুল-ডাকাত, ঢুলছে...

কী হবে জানিয়া বলো কেন জল নয়নে

ভৈরবী — পোস্তা কী হবে জানিয়া বলো কেন জল নয়নে। তুমি তো ঘুমায়ে আছ সুখে ফুল-শয়নে। তুমি বুঝিবে বালা কুসুমে কীটের জ্বালা, কারো গলে দোলে মালা কেহ ঝরে পবনে॥ আকাশের আঁখি ভরি কে জানে কেমন করি শিশির পড়ে গো ঝরি ঝরে বারি শাওনে। নিশীথে পাপিয়া পাখি এমনই তো ওঠে ডাকি, তেমনই ঝুরিছে...

কে বিদেশি মন-উদাসী

ভৈরবী-আশাবরী — কাহারবা কে বিদেশি মন-উদাসী বাঁশির বাঁশি বাজাও বনে। সুর-সোহাগে তন্দ্রা লাগে কুসুম-বাগের গুল্-বদনে॥ ঝিমিয়ে আসে ভোমরা-পাখা, যূথীর চোখে আবেশ মাখা, কাতর ঘুমে চাঁদিমা রাকা (ভোর গগনের দর-দালানে) দর-দালানে ভোর গগনে॥ লজ্জাবতীর লুলিত লতায় শিহর লাগে পুলক-ব্যথায়,...

কে শিব সুন্দর শরৎ-চাঁদ চূড়

দেশ — গীতঙ্গী কে শিব সুন্দর শরৎ-চাঁদ চূড় দাঁড়ালে আসিয়া এ অঙ্গনে, পীড়িত নরনারী আসিল গেহ ছাড়ি ভরিল নভতল-ক্রন্দনে॥ বেদনা-মন্দিরে আরতি বাজে তব, কে তুমি সুন্দর শ্মশানচারী নব, দিগদিগন্তরে জীবন-উৎসব- শঙ্খ শুনি তব আগমনে॥ মৃত্যু-জয়ী তুমি হওনি সুধা পিয়ে, দুখেরে দহিয়াছ বিষের দাহ...

কেন আন ফুল-ডোর       আজি বিদায় বেলা

ভীমপলশ্রী — কাহারবা কেন আন ফুল-ডোর       আজি বিদায় বেলা। মোছো মোছো আঁখি-লোর        যদি ভাঙিল মেলা॥ কেন মেঘের স্বপন        আন মরুর চোখে, ভুলে দিয়ো না কুসুম        যারে দিয়েছ হেলা॥ আছে বাহুর বাঁধন        তব শয়ন-সাথি, আমি এসেছি একা       আমি চলি একেলা॥ যবে শুকাল কানন  ...

কেন আসিলে যদি যাবে চলি

(দিনের) দুর্গা — আদ্ধা কাওয়ালি কেন আসিলে যদি যাবে চলি গাঁথিলে না মালা ছিঁড়ে ফুল-কলি॥ কেন বারেবারে আসিয়া দুয়ারে ফিরে গেলে পারে কথা নাহি বলি॥ কী কথা বলিতে আসিয়া নিশীথে শুধু ব্যথা-গীতে গেলে মোরে ছলি॥ প্রভাতের বায়ে কুসুম ফুটায়ে নিশীথে লুকায়ে উড়ে গেল অলি॥ কবি শুধু জানে,...

কেন উচাটন মন পরান এমন করে

বেহাগ-খাম্বাজ — দাদরা কেন উচাটন মন পরান এমন করে কেন কাঁদে গো বধূ বঁধুর বুকে বাসরে॥ কেন মিলন-রাতে সলিল আঁখি-পাতে, কেন ফাগুন-প্রাতে সহসা বাদল ঝরে॥ ডাকিলে অনুরাগে কেন বিদায় মাগে, (কেন) মরিতে সাধ জাগে পিয়ার বুকের পরে॥ ডাকিয়া ফুলবনে থাকে সে আনমনে, কাঁদায়ে নিরজনে কাঁদে সে...

কেন কাঁদে পরান কী বেদনায় কারে কহি

কেন কাঁদে পরান কী বেদনায় কারে কহি। সদা কাঁপে ভীরু হিয়া রহি রহি।। সে থাকে নীল নভে আমি নয়ন-জল-সায়রে সাতাশ তারার সতিন-সাথে সে যে ঘুরে মরে, কেমনে ধরি সে চাঁদে রাহু নহি ।। কাজল করি যারে রাখি গো আঁখি-পাতে, স্বপনে যায় সে ধুয়ে গোপন অশ্রু সাথে! বুকে তায় মালা করি রাখিলে...

কেন দিলে এ কাঁটা যদি গো কুসুম দিলে

বেহাগ — দাদরা কেন দিলে এ কাঁটা যদি গো কুসুম দিলে ফুটিত না কি কমল ও কাঁটা না বিঁধিলে॥ কেন এ আঁখি-কূলে বিধুর অশ্রু দুলে, কেন দিলে এ হৃদি যদি না হৃদয় মিলে॥ শীতল মেঘ-নীরে ডাকিয়া চাতকীরে নীর ঢালিতে শিরে বাজ কেন হানিলে॥ যদি ফুটালে মুকুল কেন শুকাইলে ফুল, কেন কলঙ্ক-টিপে...