চন্দ্রবিন্দু (১৯৩১)

চন্দ্রবিন্দু। কাজী নজরুল ইসলামের গান। ১৩৩৮, সেপ্টেম্বর ১৯৩১। উৎসর্গ--'পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীমদ্দাঠাকুর--শ্রীযুক্ত শরচ্চন্দ্র পণ্ডিত মহাশয়ের শ্রীচরণকমলেষু'। বাজেয়াপ্ত ১৪ই অক্টোবর ১৯৩১। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ৩০শে নভেম্বর ১৯৪৫।

আজি শৃঙ্খলে বাজিছে মাভৈঃ – বরাভয়

ইমন – কাওয়ালি আজি শৃঙ্খলে বাজিছে মাভৈঃ – বরাভয়। এ যে আনন্দ-বন্ধন, ক্রন্দন নয়॥ ওরে নাশিতে সবার এই বন্ধন-ত্রাস, মোরা শৃঙ্খল ধরি তারে করি উপহাস, সহি নিপীড়ন – পীড়নের আয়ু করি হ্রাস, এ যে রুদ্র-আশীর্বাদ – লৌহবলয়॥ মোরা অগ্র-পথিক অনাগত দেবতার, এই শৃঙ্খল বন্দিছে চরণ তাহার, শোন...

আজি পূর্ণশশী কেন মেঘে ঢাকা

পিলু বারোয়াঁ – ঠুংরি আজি পূর্ণশশী কেন মেঘে ঢাকা। মোরে স্মরিয়া রাধিকাও হল কি বাঁকা॥ কেন অভিমান-শিশিরে মাখা কমল, কাজল-উজল-চোখে কেন এত জল, লহো মুরলী হরি লহো...

আদি পরম বাণী, ঊর বীণাপাণি

আদি পরম বাণী, ঊর বীণাপাণি। আরতি করে তব কোটি কোবিদ জ্ঞানী।। হিমেল শীত গত, ফাল্গুন মুঞ্জরে, কানন-বীণা বাজে সমীর-মরমরে। গাহিছে মুহু মুহু আগমনী কুহু, প্রকৃতি বন্দিছে নব কুসুম আনি।। মূক ধরণী করে বেদনা-আরতি, বাণী-মুখর তারে করো মা ভারতী! বক্ষে নব আশা, কণ্ঠে নব ভাষা দাও মা,...

আমার সকলই হরেছে হরি

আশাবরি – কাওয়ালি আমার সকলই হরেছে হরি          এবার আমায় হরে নিয়ো। যদি সব হরিলে নিখিল-হরণ  এবার   ওই চরণে শরণ দিয়ো॥ আমায় ছিল যারা আড়াল করে, হরি তুমি নিলে তাদের হরে, ছিল প্রিয় যারা গেল তারা,   হরি   এবার তুমিই হও হে...

আমি তুরগ ভাবিয়া মোরগে চড়িনু

হিতে বিপরীত কীর্তন আমি তুরগ ভাবিয়া মোরগে চড়িনু     সে     লইল মিয়াঁর ঘরে। আমার কালি-মা ছাড়ায়ে কলেমা পড়ায়ে            বুঝি মুসলিম করে! আঁখর : আমায়    বুঝি মুসলিম করে গো!    শেষে     আস্ত ধরিয়া গোস্ত খাওয়ায়ে –           মামদো করিবে গোরা গো! আমার টিকি করি দূর রেখে দেবে...

আমি দেখেছি তোর শ্যামে (প্রতিদ্বন্দ্বী)

প্রতিদ্বন্দ্বী বাউল আমি দেখেছি তোর শ্যামে          দেখেছি কদম-তলা, আমি দেখেছি তোর অষ্টাবক্রের          আঁকাবাঁকা চলা          তার যত ছলাকলা।          দেখেছি কদম-তলা॥    তুই মোর গোয়ালের ছিঁড়ে দড়ি   রাত-বিরেতে বেড়াস চরি, তুই রাখাল পেয়ে ভুলে গেছিস          আয়ান-ঘোষের...

আমি ভাই খ্যাপা বাউল, আমার দেউল

বাউল আমি ভাই খ্যাপা বাউল, আমার দেউল আমারই এই আপন দেহ। আমার এ প্রাণের ঠাকুর নহে সুদূর অন্তরে মন্দির-গেহ। সে থাকে সকল সুখে সকল দুখে আমার বুকে অহরহ, কভু তায় প্রণাম করি, বক্ষে ধরি, কভু তারে বিলাই স্নেহ॥ ভুলাইনি আমারই কুল, ভুলেছে নিজেও সে কুল, ভুলে বৃন্ -দাবন গোকুল (তার)...

এসো এসো তব যাত্রা-পথে

টোরি – কাওয়ালি এসো এসো তব যাত্রা-পথে শুভ বিজয়-রথে ডাকে দূর সাথি। মোরা তোমার লাগি হেথা রহিব জাগি তব সাজায়ে বাসর জ্বালি আশায় বাতি॥ হেরো গো বিকীর্ণ শত শুভ চিহ্ণ পথ-পাশে নগর-বাটে, সবৎসা ধেনু গোখুর-রেণু উড়ায়ে চলে দূর মাঠে। দক্ষিণ-আবর্তবহ্ণি, পূর্ণঘট-কাঁখে তন্বী। দোলে...

ওই পথে চেয়ে থাকি

খাম্বাজ-পিলু – কারফা ওই পথে চেয়ে থাকি আর কত বনমালি! করে কানাকানি লোকে, দেয় ঘরে-পরে গালি॥ মোর কুলের বাঁধন খুলে হায় ভাসালে অকূলে শেষে লুকালে গোকুলে এ কী রীতি...

ওহে রাখাল-রাজ

বাউল ওহে রাখাল-রাজ! কী সাজে সাজালে আমায় আজ। আমার  ঘরের ভূষণ কেড়ে নিয়ে দিলে চির-পথিক সাজ॥ তোমার  পায়ের নূপুর আমায় দিয়ে ঘুরাও পথে ঘাটে নিয়ে, বেড়াই বাউল একতারা বাজিয়ে হে, তোমার  ভুবন-নাটে নেচে বেড়াই ভুলে শরম ভরম লাজ॥ তোমার  নিত্য-খেলার নৃত্য-সাথি আনন্দেরই গোঠে হে,...

কারা-পাষাণ ভেদি জাগো নারায়ণ

দরবারি কানাড়া – গীতাঙ্গী কারা-পাষাণ ভেদি জাগো নারায়ণ। কাঁদিছে বেদি-তলে আর্ত জনগণ, বন্ধ-ছেদন জাগো নারায়ণ॥ হত্যা-যূপে আজি শিশুর বলিদান, অমৃত-পুত্রেরা মৃত্যু-ম্রিয়মাণ! শোণিত-লেখা জাগে – নাহি কি ভগবান? মৃত্যুক্ষুধা জাগে শিয়রে লেলিহান! শঙ্কানাশন জাগো...

কুসুম-সুকুমার শ্যামল-তনু

সিন্ধু-কাফি – কারফা কুসুম-সুকুমার শ্যামল-তনু হে বন-দেবতা, লহো প্রণাম। বিটপী লতায় চিকন পাতায় ছিটাও হাসি কিশোর শ্যাম॥ ঘনায় মায়া তোমার কায়া কাজল-কালো ছায়া-শীতল, পরিমল-সুরভিত কুন্তল ময়ূর কুরঙ্গে হয়ে খেলো সঙ্গে, চরণ-ভঙ্গে ফোটে শাখে ফুলদল। কুহরে কোকিল পাগল গো নয়নাভিরাম হে...

কে যাবি পারে আয় ত্বরা করি

পিলু – কাহারবা কে যাবি পারে আয় ত্বরা করি, তোর খেয়া-ঘাটে এল পুণ্য-তরি॥ আবু-বকর, উমর, উসমান, আলি হাইদর, দাঁড়ি এ সোনার তরণির, পাপী সব নাই নাই আর ডর, এ তরির কান্ডারি আহমদ, পাকা সব মাঝি ও মাল্লা, মাঝিদের মুখে সারিগান শোন ওই–লাশরীক্ আল্লাহ্! মোরা নরক-আগুনে আর নাহি ডরি॥...

কেঁদে যায় দখিন-হাওয়া ফিরে ফুল-বনের গলি

সিন্ধু-কাফি – ঠুংরি কেঁদে যায় দখিন-হাওয়া ফিরে ফুল-বনের গলি, ‘ফিরে যাও চপল পথিক’, দুলে কয় কুসুম-কলি। দুলে দুলে কয় কুসুম কলি॥ ফেলিছে সমীর দীরঘশ্বাস – আসিবে না আর এ মধুমাস, কহে ফুল, ‘জনম জনম এমনই গিয়াছ ছলি। জনম জনম গিয়াছ ছলি’॥ কহে বায়, ‘রজনি-ভোরে বাসি ফুল পড়িবে ঝরে’, কহে...

কেন আসে কেন তারা চলে যায়

খাম্বাজ – মধ্যমান কেন আসে কেন তারা চলে যায় – ক্ষণেক তরে॥ কুসুম না ফুটিতে কেন ফুল-মালী ছিঁড়িয়া সাজি ভরে কানন করে খালি, কাঁটার স্মৃতি বেঁধে লতার বুকে হায়, ব্যথা-ভরে॥ ছাড়িয়া স্নেহ-নীড় সুদূর বন-ছায় বিহগশিশু কেন সহসা উড়ে যায়, কাঁদে জননি তার ঝরা পালকখানি বুকে...

কেন করুণ সুরে হৃদয়-পুরে

দেশ-সুরাট – একতালা কেন করুণ সুরে হৃদয়-পুরে         বাজিছে বাঁশরি।   ঘনায় গহন নীরদ সঘন         নয়ন মন ভরি॥   বিজলি চমকে পবন দমকে         পরাণ কাঁপে রে,   বুকের বঁধুরে বুকে বেঁধে ঝুরে         বিধুরা...

ঘোর ঘনঘটা ছাইল গগন

কাজরি –হোরি-ঠেকা ঘোর ঘনঘটা ছাইল গগন। ভুবন গভীর বিষাদ-মগন॥ বারিধারে কাঁদে চারিধার আজি, শ্বসিয়া শ্বসিয়া ঝুরিছে পবন॥ নাহি রবি-শশী নাহি গ্রহ-তারা, নিখিল নয়নে শ্রাবণের ধারা, বিশ্ব ডুবাল গো শোকের...

চলো মন আনন্দধাম

ভৈরবী ভজন – দাদরা চলো মন আনন্দধাম! চলো মন আনন্দধাম রে             চলো আনন্দধাম॥   লীলাবিহার প্রেমলোক   নাই রে সেথা দুঃখ-শোক, সেথা বিহারে চির-ব্রজবালক            বনশিওয়ালা শ্যাম রে             চলো আনন্দধাম॥     আবাঙ‍্‍মনস-গোচরম‍্ –   নাহি চরাচর নাহি রে ব্যোম, ...

ছুঁচোর কীর্তন

ছুঁচোর কীর্তন কীর্তন গায় ছুচুন্দর, হুতুম প্যাঁচা বাজায় খোল। ছাতার পাখি দোহার গায় গোলেমালে হরিবোল॥ কিচির-মিচির কিচির-কিচ ইঁদুর বাজায় মন্দিরা, তানপুরা ওই বাজায় ব্যাং ওস্তাদের সম্বন্ধীরা। শালিক বায়স ভক্তদল হরিবোলের লাগায় গোল॥ হুলো বেড়াল মিয়াঁও ম্যাঁও করছে শুরু খেয়াল-গান,...

জন্তুর মাঝে ভাই উট – খিচুড়ি

খিচুড়ি জন্তু মালবশ্রী – কাওয়ালি জন্তুর মাঝে ভাই উট – খিচুড়ি! মদ খেয়ে সৃজিয়াছে স্রষ্টা-শুঁড়ি॥ দো-তালার উঁচু আর তে-তালার ফাঁক – ঢিমে তে-তলার ফাঁক, অষ্টাবক্রীয় দশটা বাঁক, হামা দিয়ে চলে যেন তাড়কা খুড়ি॥ জিরাফের গলা তার ঘোটকিনী মুখ, আগাগোড়া গোঁজামিল বাঁদুরে ভালুক, গাড়িকে এ...