গানের মালা (১৯৩৪)

অয়ি চঞ্চল-লীলায়িত-দেহা চিরচেনা

সাহানা-বাহার কাওয়ালি অয়ি চঞ্চল-লীলায়িত-দেহা, চিরচেনা! ফোটাও মনের বনে তুমি বকুল হেনা চিরচেনা॥ যৌবন-মদগর্বিতা তন্বী আননে জ্যোৎস্না, নয়নে বহ্নি, তব চরণের পরশ বিনা অশোক তরু মুঞ্জরে না, চিরচেনা॥ নন্দন-নন্দিনী তুমি দয়িতা চির-আনন্দিতা, প্রথম কবির প্রথম লেখা তুমি কবিতা।...

আঁখি তোলো দানো করুণা

ভৈরবী কাহারবা আঁখি তোলো দানো করুণা ওগো অরুণা! মেলি নয়ন জীর্ণ কানন করো তরুণা॥ আঁখি যে তোমার বনের পাখি ঘুম সে ভাঙায় আঁধারে ডাকি, আলোক-সাগর জাগাও বরুণা॥ তব আনত আঁখির পাতার কোলে তরুণ আলোর মুকুল দোলে। রঙের কুমার দুয়ারে জাগে তোমার আঁখির প্রসাদ মাগে, পাণ্ডুর ভোর হোক...

আঁধার রাতের তিমির দুলে আমার মনে

জয়জয়ন্তী মিশ্র দাদরা আঁধার রাতের তিমির দুলে আমার মনে। দুলে গো আমার ঘুমে জাগরণে॥ হুতাশ-ভরা বাতাস বহে আমার কানে কী কথা কহে, দিনগুলি মোর যায় যে ঝরে ঝরা পাতার সনে॥ গিয়াছে চলি, সুখের যাহারা ছিল গো সাথি, গিয়াছে নিভে জ্বলিতেছিল যে শিয়রে বাতি। স্মৃতির মালার ফুল শুকাইয়া একে...

আগের মতো আমের ডালে বোল ধরেছে বউ

বসন্ত মিশ্র দাদরা আগের মতো আমের ডালে বোল ধরেছে বউ। তুমিই শুধু বদলে গেছ আগের মানুষ নও॥ তেমনি আজও তোমার নামে উথলে মধু গোলাপ-জামে, উঠল পুরে জামরুলে রস মহুল ফুলে মউ। তুমিই শুধু বদলে গেছ, আগের মানুষ নও॥ ডালিম-দানায় রং লেগেছে, ডাঁসায় নোনা আতা, তোমার পথে বিছায় ছায়া ছাতিম...

আজ নিশীথে অভিসার তোমার পথে প্রিয়তম

পিলু — খাম্বাজ কাহারবা   আজ নিশীথে অভিসার               তোমার পথে, প্রিয়তম।   বনের পারে নিরালায়               দিয়ো হে দেখা, নিরূপম॥   সুদূর নদীর ধারে জনহীন বালুচরে –  চখার তরে যথা একা চখি কেঁদে মরে,   সেথা সহসা আসিয়ো গোপন প্রিয়                     স্বপনসম॥   তোমার...

আধখানা চাঁদ হাসিছে আকাশে

বেহাগ মিশ্র দাদরা আধখানা চাঁদ হাসিছে আকাশে, আধখানা চাঁদ নীচে প্রিয়া তব মুখে ঝলকিছে। গগনে জ্বলিছে অগণন তারা দুটি তারা ধরণিতে প্রিয়া তব চোখে চমকিছে॥ তড়িৎ-লতার ছিঁড়িয়া আধেকখানি জড়িত তোমার জরিন ফিতায়, রানি। অঝোরে ঝরিছে নীল নভে বারি, দুইটি বিন্দু তারই প্রিয়া তব আঁখি...

আমার প্রাণের দ্বারে ডাক দিয়ে কে যায়

বাউল লোফা আমার প্রাণের দ্বারে ডাক দিয়ে কে যায়           বারেবারে। তার নূপুর-ধ্বনি রিনিঝিনি বাজে           বন-পারে॥   নিঝুম রাতে ঘুমাই যবে সে ডাকে আমায় বেণুর রবে,   স্বপন-কুমার আসে স্বপন-অভিসারে॥ যবে জল নিতে যাই নদীতটে একলা           নাম ধরে সে ডাকে,   ধরতে গেলে পালিয়ে...

আমি অলস উদাস আনমনা

মিশ্র মালবশ্রী দাদরা আমি অলস উদাস আনমনা। আমি সাঁঝ-আকাশে শান্ত নিথর রঙিন মেঘের আলপনা॥ অলস যেমন বনের ছায়া, নীড়ের পাখি শ্রান্ত-কায়া, যেমন অলস তৃণের মুখে ভোরের শিশির হিম-কণা॥ নদীর তীরে অলস রাখাল একলা বসে রয় যেমন, তেমনি অলস উদাস আমি রই বসে রই অকারণ॥ যেমন অলস দিঘির জলে থির...

আমি সুন্দর নহি জানি হে বন্ধু জানি

বেহাগ দাদরা আমি সুন্দর নহি জানি হে বন্ধু জানি। তুমি সুন্দর, তব গান গেয়ে নিজেরে ধন্য মানি॥ আসিয়াছি সুন্দর ধরণিতে সুন্দর যারা তাদেরে দেখিতে রূপ-সুন্দর দেবতার পায়ে অঞ্জলি দিই বাণী॥ রূপের তীর্থে তীর্থ-পথিক যুগে যুগে আমি আসি ওগো সুন্দর, বাজাইয়া যাই তোমার নামের বাঁশি। পরিয়া...

আমি ময়নামতীর শাড়ি দেব চলো আমার বাড়ি

ভাটিয়ালি কাহারবা   আমি    ময়নামতীর শাড়ি দেব                         চলো আমার বাড়ি।                         ওগো ভিনগেরামের নারী॥   সোনার ফুলের বাজু দেব চুড়ি বেলোয়ারি।                         ওগো ভিনগেরামের নারী॥   বৈঁচি ফলের পৈঁচি দেব, কলমিলতার বালা,   গলায় দেব...

উত্তরীয় লুটায় আমার

হৈমন্তী তেওড়া উত্তরীয় লুটায় আমার – ধানের খেতে হিমেল হাওয়ায়। আমার চাওয়া জড়িয়ে আছে নীল আকাশের সুনীল চাওয়ায়॥ ভাঁটির শীর্ণা নদীর কূলে আমার রবি-ফসল দুলে, নবান্নেরই সুঘ্রাণে মোর চাষির মুখে টপ্পা...

এ কী অপরূপ রূপে মা তোমায়

বেহাগ মিশ্র কাওয়ালি এ কী অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লি-জননী। ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবণি॥ রৌদ্রতপ্ত বৈশাখে তুমি চাতকের সাথে চাহ জল, আম-কাঁঠালের মধুর গন্ধে জ্যৈষ্ঠে মাতাও তরুতল। ঝঞ্ঝার সাথে প্রান্তরে মাঠে কভু খেল লয়ে অশনি॥ কেতকী কদম যূথিকা কুসুমে বর্ষায়...

এল ওই বনান্তে পাগল বসন্ত

পরজ–বসন্ত তেতালা এল ওই বনান্তে পাগল বসন্ত। বনে বনে মনে মনে রং সে ছড়ায় রে, চঞ্চল তরুণ দুরন্ত॥ বাঁশিতে বাজায় সে বিধুর পরজ-বসন্তের সুর, পাণ্ডু-কপোলে জাগে রং নব অনুরাগে রাঙা হল ধূসর দিগন্ত॥ কিশলয়-পর্ণে অশান্ত ওড়ে তার অঞ্চল-প্রান্ত, পলাশ-কলিতে তার ফুলধনু লঘুভার ফুলে ফুলে...

এল এল রে বৈশাখী ঝড়

ইমন মিশ্র কাহারবা এল এল রে বৈশাখী ঝড়। ওই বৈশাখী ঝড় এল এল মহীয়ান সুন্দর। পাংশু মলিন ভীত কাঁপে অম্বর, চরাচর, থরথর॥ ঘন বন-কুন্তলা বসুমতী সভয়ে করে প্রণতি, সভয়ে নত চরণে ভীতা বসুমতী। সাগর-তরঙ্গ-মাঝে তারই মঞ্জীর যেন বাজে, বাজে রে পায়ে গিরি-নির্ঝর – ঝরঝর ঝরঝর॥ ধূলি-গৈরিক...

এল ফুল-দোল ওরে এল ফুল-দোল

ভৈরবী – পিলু কাওয়ালি এল ফুল-দোল ওরে এল ফুল-দোল আনো রং-ঝারি। পলাশ-মঞ্জরি পরি অলকে এসো গোপ-নারী॥ ঝরিছে আকাশে রঙের ঝরনা, শ্যামা ধরণি হল আবির-বরনা, ত্যজি গৃহ-কাজ এসো চল-চরণা ডাকে গিরিধারী॥ পরাগ-আবির হানে বনবালা সুরের পিচকারি হানিছে কুহু, রঙিন স্বপন ঝরে রাতের ঘুমে...

এল শ্যামল কিশোর

কাজরি লাউনি এল শ্যামল কিশোর, তমাল-ডালে বাঁধো ঝুলনা। সুনীল শাড়ি পরো ব্রজনারী পরো নব নীপ-মালা অতুলনা। তমাল-ডালে বাঁধো ঝুলনা॥ ডাগর চোখে কাজল দিয়ো, আকাশি-রং পোরো উত্তরীয়, নব-ঘন-শ্যামের বসিয়া বামে – দুলে দুলে বোলো, ‘বঁধু, ভুলো না!’ তমাল-ডালে বাঁধো ঝুলনা॥ নৃত্য-মুখর আজি...

এসো কল্যাণী চির-আয়ুষ্মতী

ভজন এসো   কল্যাণী, চির-আয়ুষ্মতী! তব  নির্মল করে জ্বালো ভবন-প্রদীপ    জ্বালো জ্বালো জ্বালো সতী॥      মঙ্গল-শঙ্খ বাজাও বাজাও অয়ি সুমঙ্গলা!      সকল অকল্যাণ সকল অমঙ্গল করো দূর শুভ-সমুজ্জ্বলা! এসো  মাটির কুটিরে দূর আকাশের অরুন্ধতী॥ এসো  লক্ষ্মী গৃহের, আঁকো অঙ্গনে সুমঙ্গল...

ও কালো বউ যেয়ো না আর যেয়ো না আর

পাহাড়ি কাহারবা ও কালো বউ! যেয়ো না আর যেয়ো না আর জল আনিতে বাজিয়ে মল। তোমায় দেখে শিউরে ওঠে কাজলা দিঘির কালো জল॥ দেখে তোমার কালো আঁখি কালো কোকিল ওঠে ডাকি, তোমার চোখের কাজল মাখি হয় সজল ওই মেঘ-দল॥ তোমার কালো রূপের মায়া দুপুর রোদে শীতল ছায়া, কচি অশথ পাতায় টলে ওই কালো রূপ...

ওই কাজল-কালো চোখ

বেহাগ–খাম্বাজ দাদরা ওই কাজল-কালো চোখ আদি কবির আদি রসের যেন দুটি শ্লোক। ওই কাজল-কালো চোখ॥ পুষ্প-লতার পত্রপুটে দুটি কুসুম আছে ফুটে, সেই আলোকে রেঙে ওঠে বনের গহন লোক (গো) আমার মনের গহন লোক॥ রূপের সায়র সাঁতরে বেড়ায় পানকৌড়ি পাখি ওই কাজল-কালো আঁখি। মদির আঁখির নীল পেয়ালায়...

ওরে ও স্রোতের ফুল

যোগিয়া একতালা ওরে ও স্রোতের ফুল! ভেসে ভেসে হায় এলি অসহায় কোথায় পথ-বেভুল॥ কোল খালি করে কোন লতিকার নিভাইয়া নয়নের জ্যোতি কার, বনের কুসুম অকূল পাথারে খুঁজিয়া ফিরিস কূল॥ ভবনের স্নেহ নারিল রাখিতে ঠেলে ফেলে দিল যারে, সারা ভুবনের স্নেহ কি কখনও তাহারে ধরিতে পারে? জল নয়, তোর...