সন্ধ্যা

অন্ধ স্বদেশ – দেবতা

অন্ধ স্বদেশ – দেবতা ফাঁসির রশ্মি ধরি আসিছে অন্ধ স্বদেশ-দেবতা, পলে পলে অনুসরি মৃত্যু-গহন-যাত্রীদলের লাল পদাঙ্ক-রেখা। যুগযুগান্ত-নির্জিত-ভালে নীল কলঙ্ক-লেখা! নীরন্ধ্র মেঘে অন্ধ আকাশ, অন্ধ তিমির রাতি, কুহেলি-অন্ধ দিগন্তিকার হস্তে নিভেছে বাতি, − চলে পথহারা অন্ধ...

কালবৈশাখী

কালবৈশাখী ১ বারেবারে যথা কালবৈশাখী ব্যর্থ হল রে পুব-হাওয়ায়, দধীচি-হাড়ের বজ্র-বহ্নি বারেবারে যথা নিভিয়া যায়, কে পাগল সেথা যাস হাঁকি – ‘বৈশাখী কালবৈশাখী!’ হেথা বৈশাখী-জ্বালা আছে শুধু, নাই বৈশাখী-ঝড় হেথায়। সে জ্বালায় শুধু নিজে পুড়ে মরি, পোড়াতে কারেও পারি নে, হায়॥ ২...

জাগরণ

জাগরণ জেগে যারা ঘুমিয়ে আছে তাদের দ্বারে আসি ওরে পাগল, আর কতদিন বাজাবি তোর বাঁশি! ঘুমায় যারা মখমলের ওই কোমল শয়ন পাতি অনেক আগেই ভোর হয়েছে তাদের দুখের রাতি। আরাম-সুখের নিদ্রা তাদের; তোর এ জাগার গান ছোঁবে নাকো প্রাণ রে তাদের, যদিই বা ছোঁয় কান! নির্ভয়ের ওই সুখের কূলে...

জীবন-বন্দনা

জীবন-বন্দনা গাহি তাহাদের গান – ধরণির হাতে দিল যারা আনি ফসলের ফরমান। শ্রম-কিণাঙ্ক-কঠিন যাদের নির্দয় মুঠি-তলে ত্রস্তা ধরণি নজরানা দেয় ডালি ভরে ফুলে ফলে। বন্য-শ্বাপদ-সংকুল জরা-মৃত্যু-ভীষণা ধরা যাদের শাসনে হল সুন্দর কুসুমিতা মনোহরা। যারা বর্বর হেথা বাঁধে ঘর পরম অকুতোভয়ে...

তরুণ তাপস

তরুণ তাপস রাঙা পথের ভাঙন-ব্রতী অগ্রপথিক দল ! নাম রে ধুলায়−বর্তমানের মর্তপানে চল॥ ভবিষ্যতের স্বর্গ লাগি শূন্যে চেয়ে আছিস জাগি অতীতকালের রত্ন মাগি নামলি রসাতল। অন্ধ মাতাল! শূন্য পাতাল, হাতালি নিষ্ফল॥ ভোল রে চির-পুরাতনের সনাতনের বোল। তরুণ তাপস! নতুন জগৎ সৃষ্টি করে তোল।...

তর্পণ

তর্পণ (স্বর্গীয় দেশবন্ধুর চতুর্থ বার্ষিক শ্রাদ্ধ উপলক্ষে) − আজিও তেমনই করি আষাঢ়ের মেঘ ঘনায়ে এসেছে ভারত-ভাগ্য ভরি। আকাশ ভাঙিয়া তেমনই বাদল ঝরে সারা দিনমান, দিন না ফুরাতে দিনের সূর্য মেঘে হল অবসান! আকাশে খুঁজিছে বিজলি প্রদীপ, খোঁজে চিতা নদী-কূলে, কার বয়নের মণি হরায়েছে...

দাড়ি-বিলাপ

দাড়ি-বিলাপ হে আমার দাড়ি! একাদশ বর্ষ পরে গেলে আজি ছাড়ি আমারে কাঙাল করি, শূন্য করি বুক! শূন্য এ চোয়াল আজি শূন্য এ চিবুক! তোমার বিরহে বন্ধু, তোমার প্রেয়সী ঝুরিছে শ্যামলী গুম্ফ ওষ্ঠকূলে বসি! কপোল কপাল ঠুকি করে হাহাকার – ‘রে কপটি, রে সেফটি (safety) গিলেট রেজার!’…....

নগদ কথা

নগদ কথা দুন্দুভি তোর বাজল অনেক অনেক শঙ্খ ঘন্টা কাঁসর, মুখস্থ তোর মন্ত্ররোলে মুখর আজি পূজার আসর, − কুম্ভকর্ণ দেবতা ঠাকুর জাগবে কখন সেই ভরসায় যুদ্ধভূমি ত্যাগ করে সব ধন্না দিলি দেব-দরজায়। দেবতা-ঠাকুর স্বর্গবাসী নাক ডাকিয়া ঘুমান সুখে, সুখের মালিক শোনে কি – কে কাঁদছে নীচে...

না–আসা দিনের কবির প্রতি

না–আসা দিনের কবির প্রতি জবা-কুসুম-সংকাশ রাঙা অরুণ রবি তোমরা উঠিছ; না-আসা দিনের তোমরা কবি। যে-রাঙা প্রভাত দেখিবার আশে আমরা জাগি তোমরা জাগিছ দলে দলে পাখি তারই-র লাগি। স্তব-গান গাই আমি তোমাদেরই আসার আশে, তোমরা উদিবে আমার রচিত নীল আকাশে। আমি রেখে যাই আমার নমস্কারের স্মৃতি...

নিশীথ অন্ধকারে

নিশীথ অন্ধকারে (গান) এ কী বেদনার উঠিয়াছে ঢেউ দূর সিন্ধুর পারে, নিশীথ-অন্ধকারে। পুরবের রবি ডুবিল গভীর বাদল-অশ্রু-ধারে, নিশীথ-অন্ধকারে॥ ঘিরিয়াছে দিক ঘন ঘোর মেঘে, পুবালি বাতাস বহিতেছে বেগে, বন্দিনি মাতা একাকিনী জেগে কাঁদিতেছে কারাগারে, শিয়রের দীপ যত সে জ্বালায় নিভে যায়...

পাথেয়

পাথেয় দরদ দিয়ে দেখল না কেউ যাদের জীবন যাদের হিয়া, তাদের তরে ঝড়ের রথে আয় রে পাগল দরদিয়া। শূণ্য তোদের ঝোলা-ঝুলি, তারই তোরা দর্প নিয়ে দর্পীদের ওই প্রাসাদ-চূড়ে রক্ত-নিশান যা টাঙিয়ে। মৃত্যু তোদের হাতের মুঠায়, সেই তো তোদের পরশ-মণি, রবির আলোক ঢের সয়েছি, এবার তোরা আয় রে...

বহ্নিশিখা

বহ্নিশিখা মেলি শতদিকে শতলেলিহান রসনা জাগো বহ্নিশিখা স্বাহা দিগ্-বসনা! জাগো রুদ্রের ললাটের রক্ত-অনল, জাগো বজ্র-জ্বালা বিদ্যুৎ-ঝলমল! জাগো মহেন্দ্র-তপোভঙ্গের অভিশাপ, জাগো অনঙ্গ-দাহন নয়নের তাপ। জাগো ভাগীরথী-কূলে-কূলে চুল্লি-শ্মশান, জাগো অস্ত-গোধূলি-বেলা দিবা-অবসান!   ...

বাংলার “আজীজ”

বাংলার “আজীজ” পোহয়নি রাত, আজান তখনও দেয়নি মুয়াজ্জিন , মুসলমানের রাত্রি তখন আর-সকলের দিন। অঘোর ঘুমে ঘুমায় যখন বঙ্গ-মুসলমান, সবার আগে জাগলে তুমি গাইলে জাগার গান! ফজর বেলার নজর ওগো উঠলে মিনার পর, ঘুম-টুটানো আজান দিলে – ‘আল্লাহো আকবর!’ কোরান শুধু পড়ল সবাই বুঝলে তুমি একা,...

ভোরের পাখি

ভোরের পাখি ওরে ও ভোরের পাখি! আমি চলিলাম তোদের কণ্ঠে আমার কণ্ঠ রাখি। তোদের কিশোর তরুণ গলার সতেজ দৃপ্ত সুরে বাঁধিলাম বীণা, নিলাম সে সুর আমার কণ্ঠে পুরে। উপলে নুড়িতে চুড়ে-কিঙ্কিণি বাজায়ে তোদের নদী যে গান গাহিয়া অকূলে চাহিয়া চলিয়াছে নিরবধি – তারই সে গতির নূপুর বাঁধিয়া...

যৌবন

যৌবন − ওরে ও শীর্ণা নদী, দু-তীরে নিরাশা-বালুচর লয়ে জাগিবি কি নিরবধি? নব-যৌবনজলতরঙ্গ-জোয়ারে কি দুলিবি না? নাচিবে জোয়ারে পদ্মা গঙ্গা, তুই রবি চির-ক্ষীণা? ভরা ভাদরের বরিষন এসে বারে বারে তোর কূলে জানাবে রে তোরে সজল মিনতি, তুই চাহিবি না ভুলে? দুই কূলে বাঁধি প্রস্তর-বাঁধ...

যৌবনজলতরঙ্গ

যৌবনজলতরঙ্গ এই যৌবনজলতরঙ্গ রোধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ? কে রোধিবি এই জোয়ারের টান গগনে যখন উঠেছে চাঁদ? যে সিন্ধু-জলে ডাকিয়াছে বান – তাহারই তরে এ চন্দ্রোদয়, বাঁধ বেঁধে থির আছে নালা ডোবা, চাঁদের উদয় তাদের নয়! যে বান ডেকেছে প্রাণ-দরিয়ায়, মাঠে-ঘাটে-বাটে নেচেছে ঢল, জীর্ণ...

রীফ – সর্দার

রীফ – সর্দার তোমারে আমরা ভুলেছি আজ, হে নবযুগের নেপোলিয়ন, কোন সাগরের কোন সে পার নিবু-নিবু আজ তব জীবন। তোমার পরশে হল মলিন কোন সে দ্বীপের দীপালি-রাত, বন্দিছে পদ সিন্ধুজল, ঊর্ধ্বে শ্বসিছে ঝঞ্ঝাবাত। তব অপমানে, বন্দি-রাজ, লজ্জিত সারা নর-সমাজ, কৃতঘ্নতা ও অবিশ্বাস আজি বীরত্বে...

শরৎচন্দ্র

শরৎচন্দ্র (চণ্ডবৃষ্টি-প্রপাত ছন্দ) নব ঋত্বিক নবযুগের! নমস্কার! নমস্কার! আলোকে তোমার পেনু আভাস নওরোজের নব উষার! তুমি গো বেদনা-সুন্দরের দর্‌দ্-ই-দিল্, নীল মানিক, তোমার তিক্ত কণ্ঠে গো ধ্বনিল সাম বেদনা-ঋক। হে উদীচী উষা চির-রাতের, নরলোকের হে নারায়ণ! মানুষ পারায়ে দেখিলে...

সন্ধ্যা

সন্ধ্যা − সাতশো বছর ধরি পূর্ব-তোরণ-দুয়ারে চাহিয়া জাগিতেছি শর্বরী। লজ্জায় রাঙা ডুবিল যে রবি আমাদের ভীরুতায়, সে মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত করি যুগে যুগে হায় ! মোদের রুধিরে রাঙাইয়া তুলি মৃত্যুরে নিশিদিন, শুধিতেছি মোরা পলে পলে ভীরু পিতা-পিতামহ-ঋণ ! লক্ষ্মী ! ওগো মা...

সুরের দুলাল

সুরের দুলাল পাকা ধানের গন্ধ-বিধুর হেমন্তের এই দিন-শেষে, সুরের দুলাল, আসলে ফিরে দিগ্‌বিজয়ীর বর-বেশে! আজও মালা হয়নি গাঁথা হয়নি আজও গান-রচন, কুহেলিকার পর্দা-ঢাকা আজও ফুলের সিংহাসন। অলস বেলায় হেলাফেলায় ঝিমায় রূপের রংমহল, হয়নিকো সাজ রূপকুমারীর, নিদ টুটেছে এই কেবল। আয়োজনের...