মরুভাস্কর (১৯৫১)

মরুভাস্কর কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে। হজরত মোহাম্মদ সঃ এর জীবনী নিয়ে চারটি সর্গে ১৮ টি খণ্ড-কবিতা নিয়ে এই কাব্যগ্রন্থ।

০১. অবতরণিকা

অবতরণিকা জেগে ওঠ তুই রে ভোরের পাখি নিশি-প্রভাতের কবি! লোহিত সাগরে সিনান করিয়া উদিল আরব-রবি। ওরে ওঠ তুই, নূতন করিয়া বেঁধে তোল তোর বীণ! ঘন আঁধারের মিনারে ফুকারে আজান মুয়াজ্জিন । কাঁপিয়া উঠিল সে ডাকের ঘোরে গ্রহ, রবি, শশী, ব্যোম, ওই শোন শোন ‘সালাতের’ ধ্বনি...

০২. অনাগত

অনাগত বিশ্ব তখনও ছিল গো স্বপ্নে, বিশ্বের বনমালী আপনাতে ছিল আপনি মগন। তখনও বিশ্ব-ডালি ভরিয়া ওঠেনি শস্যে কুসুমে ; তখনও গগন-থালা পূর্ণ করেনি চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারকার মালা। আপন জ্যোতির সুধায় বিভোর আপনি জ্যোতির্ময় একাকী আছিল – ছিল এ নিখিল শূন্যে শূন্যে লয়। অপ্রকাশ সে...

০৩. অভ্যুদয়

অভ্যুদয় আঁধার কেন গো ঘনতম হয় উদয়-উষার আগে? পাতা ঝরে যায় কাননে, যখন ফাগুন-আবেশ লাগে তরু ও লতার তনুতে তনুতে, কেন কে বলিতে পারে? সুর বাঁধিবার আগে কেন গুণী ব্যথা হানে বীণা-তারে? টানিয়া টানিয়া না বাঁধিলে তারে ছিঁড়িয়া যাবার মতো ফোটে না কি বাণী, না করিলে তারে সদা অঙ্গুলি...

০৪. স্বপ্ন

স্বপ্ন প্রভাত-রবির স্বপ্ন হেরে গো যেমন নিশীথ একা গর্ভে ধরিয়া নতুন দিনের নতুন অরুণ-লেখা। তেমনই হেরিছে স্বপ্ন আমিনা – যেদিন নিশীথ শেষে স্বর্গের রবি উদিবে জননী আমিনার কোলে এসে। যেন গো তাহার নিরালা আঁধার সূতিকা-আগার হতে বাহিরিল এক অপরূপ জ্যোতি, সে বিপুল জ্যোতি-স্রোতে দেখা...

০৫. আলো-আঁধারি

                            আলো-আঁধারি বাদলের নিশি অবসানে মেঘ-আবরণ অপসারি ওঠে যে সূর্য – প্রদীপ্ততর রূপ তার মনোহারী। সিক্তশাখায় মেঘ-বাদলের ফাঁকে ‘বউ কথা কও’ পাপিয়া যখন ডাকে– সে গান শোনায় মধুরতর গো সজল জলদচারী! বর্ষায়-ধোয়া ফুলের সুষমা বর্ণিতে নাহি পারি! কান্নার চোখ-ভরা...

০৬. দাদা

‘দাদা’ সব-কনিষ্ঠ পুত্র সে প্রিয় আবদুল্লার শোকে, সেদিন নিশীথে ঘুম নাকো মুত্তালিবের চোখে! পঁচিশ বছর ছিল যে পুত্র আঁখির পুতলা হয়ে, বৃদ্ধ পিতারে রাখিয়া মৃত্যু তারেই গেল কি লয়ে! হয়ে আঁখিজল ঝরে অবিরল পঁচিশ-বছরি স্মৃতি, সে স্মৃতির ব্যথা যতদিন যায় তত বাড়ে হায় নিতি! বাহিরে ও...

০৭. পরভৃত

পরভৃত পালিত বলিয়া অপর পাখির নীড়ে পিকের কন্ঠে এত গান ফোটে কি রে? মেঘ-শিশু ছাড়ি সাগর-মাতার নীড় উড়ে যায় হায় দূর হিমাদ্রি-শির, তাই কি সে নামি বর্ষাধারার রূপে ফুলের ফসল ফলায় মাটির স্তূপে? জননী গিরির কোল ফেলে নির্ঝর পলাইয়া যায় দূর বন-প্রান্তর, তাই কি সে শেষে হয়ে নদী...

০৮. শৈশবলীলা

                                     শৈশবলীলা খেলে গো ফুল্লশিশু ফুল-কাননের বন্ধু প্রিয় পড়ে গো উপচে তনু জ্যোৎস্না চাঁদের রূপ অমিয়। সে বেড়ায়, হীরক নড়ে, আলো তার ঠিকরে পড়ে! ঘোরে সে মুক্ত মাঠে পল্লিবাটে ধরার শশী, সে বেড়ায় – শুষ্ক মরুর শুক্লা তিথি চতুর্দশী। অদূরে স্তব্ধগিরি...

০৯. প্রত্যাবর্তন

প্রত্যাবর্তন সেবার দূষিত ছিল বড়ো বায়ু মক্কাপুরীর, নিশ্বাসে ছিল বিষের আমেজ হাওয়ায় সুরীর। কহিলেন দাদা মুত্তালিব, ‘গো হালিমা শুনো, মরু-প্রান্তরে লয়ে যাও মোর চাঁদেরে পুন! আবার যেদিন ডাকিব, আনিবে ফিরায়ে এরে, মাঝে মাঝে এনে দেখাইয়া যেয়ো মোর চাঁদেরে!’ আমিনার চোখে ফুরাল শুক্ল...

১০. শাককুস সাদর

‘শাককুস সাদর’ হৃদয়-উন্মোচন এমনি করিয়া চরাইয়া মেষ, বংশী বাজায়ে গাহিয়া গান, খেলে শিশু নবি রাখালের রাজা মরুর সচল মরূদ্যান। চন্দ্র তারার ঝাড় লন্ঠন ঝুলানো গগন চাঁদোয়া-তল, নিম্নে তাহার ধরণির চাঁদ খেলিয়া বেড়ায় চল-চপল। ঘন কুঞ্চিত কালো কেশদাম কলঙ্ক শুধু এই চাঁদের, ঘুমালে এ...

১১. সর্বহারা (সকলের তরে এসেছে যে-জন)

          সর্বহারা সকলের তরে এসেছে যে-জন, তার তরে ‌‌পিতার মাতার স্নেহ নাই, ঠাঁই নাই ঘরে। নিখিল ব্যথিত জনের বেদনা বুঝিবে সে, তাই তারে লীলা-রসিক পাঠাল দীন বেশে! আশ্রয়হারা সম্বলহীন জনগণে – সে দেখিবে চির-আপন করিয়া কায়মনে – বেদনার পর বেদনা হানিয়া তাই তারে ভিখারি সাজায়ে...

১২. কৈশোর

কৈশোর বিশ্ব-মনের সোনার স্বপনে কিশোর তনু বেড়ায় ওই তন্দ্রা ঘোরে অন্ধ আঁখি নিখিল খোঁজে কই সে কই। বাজিয়ে বাঁশি চড়ায় উট, নিরুদ্দেশে দেয় সে ছুট, ‘হেরার’ গুহায় লুকিয়ে ভাবে – এ আমি তো আমি নই! অতল জলে বিম্বসম ফুটেই কেন বিলীন হই। রূপ ধরে ওই বেড়ায় খেলে দাহন-বিহীন অগ্নিশিখ পথিক...

১৩. সত্যাগ্রহী মোহাম্মদ

সত্যাগ্রহী মোহাম্মদ আঁধার ধরণি চকিতে দেখিল স্বপ্নে রবি, মক্কায় পুন ফিরিয়া আসিল কিশোর নবি। ছাগ মেষ লয়ে চলিল কিশোর আবার মাঠে, দূর নিরালায় পাহাড়তলির একলা বাটে। কী মনে পড়িত চলিতে চলিতে বিজন পুরে, কে যেন তাহারে কেবলই ডাকিছে অনেক দূরে। আশমানি তার তাম্বু টাঙানো মাথার পরে,...

১৪. শাদি মোবারক

শাদি মোবারক [গজল-গান] মোদের নবি আল-আরবি সাজল নওশার নওল সাজে ; সে রূপ হেরি নীল নভেরই কোলে রবি লুকায় লাজে॥ আরাস্তা আজ জমিন আশমান হুরপরি সব গাহে গান, পূর্ণ চাঁদের চাঁদোয়া দোলে, কাবাতে নৌবত বাজে॥ কয় ‘শাদি মোবারক বাদি’ আউলিয়া আর আম্বিয়ার, ফেরেশতা সব সওদা খুশির বিলায় নিখিল...

১৫. খদিজা

খদিজা সদাগর-জাদি বিবি খদিজার সোনার তরি ফেরে দেশে দেশে মণি-মাণিক্য বোঝাই করি। সচ্ছলতার বান ডেকে যায় বাহিরে ঘরে, তবু কেন সব শুনো-শুনো লাগে কাহার তরে। কী যে অভাব রিক্ততা কোন চিত্ততলে মরু-ভিখারিনি কী যেন ভিক্ষা মাগিয়া চলে! ‘সাদিক’ সত্যব্রতী আহমদ জানিত সবে ‘আমিন’...

১৬. সম্প্রদান

সম্প্রদান বাজিল বেহেশতে বীণ আসিল সে শুভদিন মুক্তি-নাট-নটবর সাজে বর-বেশে সুন্দর সুন্দরতর হল আজ ধরা পর সন্ধ্যারানি বধূবেশে নামিল গো হেসে। হায় কে দেখেছে কবে দুই চাঁদ এক নভে, সেহেলি সখীরা সবে মূক বাণীহারা, কাহারে ছাড়িয়া কারে দেখিবে, বুঝিতে নারে, স্তব্ধ অচপল-গতি তাই...

১৭. নও কাবা

নও কাবা হিয়ায় মিলিল হিয়া, নদীস্রোত হল খরতর আরও পেয়ে উপনদী-প্রিয়া। স্রোতোবেগে আর রুধিতে পারে না, ছুটে অসীমের পানে, ভরে দুই কূল অসীম-পিয়াসি কুলু কুলু কুলু গানে। কোথা সে সাগর কত দূর পথ, কোন দিকে হবে যেতে, জানে না কিছুই, তবু ছুটে যায় অজানার দিশা পেতে। কত মরু-পথ গিরি-পর্বত...

২০. সাম্যবাদী (আদি উপাসনালয়)

সাম্যবাদী (আদি উপাসনালয়) আদি উপাসনালয় -- উঠিল আবার নূতন করিয়া -- ভূত প্রেত সমুদয় তিনি শত ষাট বিগ্রহ আর মূর্তি নূতন করি' বসিল সোনার বেদীতে যে হায় আল্লার ঘর ভরি। সহিতে না পারি এ দৃশ্য, এই স্রষ্টার অপমান, ধেয়ানে মুক্তি-পথ খোঁজে নবী, কাঁদিয়া ওঠে পরান। খদিজারে কন--...