ফণি-মনসা (১৯২৭)

ফণী-মনসা (কাব্যগ্রন্থ) - ফণি-মনসা কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ। ফণি-মনসাতে সর্বমোট ২৩টি কবিতা আছে।

অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত

জাগো– জাগো অনশন-বন্দী, ওঠ রে যত       জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত!    যত অত্যাচারে আজি বজ্র হানি’    হাঁকে নিপীড়িত-জন-মন-মথিত বাণী,    নব জনম লভি’ অভিনব ধরণী     ওরে ওই আগত।।    আদি শৃঙ্খলা সনাতন শাস্ত্র-আচার    মূল সর্বনাশের, এরে ভাঙিব এবার!     ভেদি’ দৈত্য-কারা!...

অশ্বিনীকুমার

অশ্বিনীকুমার আজ যবে প্রভাতের নব যাত্রীদল ডেকে গেল রাত্রিশেষে, ‘চল আগে চল’, – ‘চল আগে চল’ গাহে ঘুম-জাগা পাখি, কুয়াশা-মশারি ঠেলে জাগে রক্ত-আঁখি নবারুণ নব আশা। আজি এই সাথে, এই নব জাগরণ-আনা নব প্রাতে তোমারে স্মরিনু বীর প্রাতঃস্মরণীয় ! স্বর্গ হতে এ স্মরণ-প্রীতি অর্ঘ্য নিয়ো...

আশীর্বাদ

আশীর্বাদ কল্যাণীয়া শামসুন নাহার খাতুন জয়যুক্তাসু শত নিষেধের সিন্ধুর মাঝে অন্তরালের অন্তরীপ তারই বুকে নারী বসে আছে জ্বালি বিপদ-বাতির সিন্ধু-দীপ। শাশ্বত সেই দীপান্বিতার দীপ হতে আঁখি-দীপ ভরি আসিয়াছ তুমি অরুণিমা-আলো প্রভাতি তারার টিপ পরি। আপনার তুমি জান পরিচয় – তুমি...

ইন্দু-প্রয়াণ

ইন্দু-প্রয়াণ (কবি শরদিন্দু রায়ের অকালমৃত্যু উপলক্ষ্যে) বাঁশির দেবতা! লভিয়াছ তুমি হাসির অমর-লোক, হেথা মর-লোকে দুঃখী মানব করিতেছি মোরা শোক! অমৃত-পাথারে ডুব দিলে তুমি ক্ষীরোদ-শয়ন লভি, অনৃতের শিশু মোরা কেঁদে বলি, মরিয়াছ তুমি কবি! হাসির ঝঞ্ঝা লুটায়ে পড়েছে নিদাঘের হাহাকারে,...

জাগর-তূর্য

জাগর-তূর্য * ওরে ও শ্রমিক, সব মহিমার উত্তর-অধিকারী! অলিখিত যত গল্প-কাহিনি তোরা যে নায়ক তারই॥ শক্তিময়ী সে এক জননির স্নেহ-সুত সব তোরা যে রে বীর, পরস্পরের আশা যে রে তোরা, মার সন্তাপ-হারী॥ নিদ্রোত্থিত কেশরীর মতো ওঠ ঘুম ছাড়ি নব জাগ্রত! আয় রে অজেয় আয় অগণিত দলে দলে মরুচারী॥...

দিল-দরদি

দিল-দরদি (কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘খাঁচার পাখি’ শীর্ষক করুণ কবিতাটি পড়িয়া) কে ভাই তুমি সজল গলায় গাইলে গজল আপশোশের? ফাগুন-বনের নিবল আগুন, লাগল সেথা ছাপ পোষের। দরদ-ভেজা কান্না-কাতর ছিন্ন তোমার স্বর শুনে ইরান মুলুক বিরান হল এমন বাহার-মরশুমে। সিস্তানের ওই গুল-বাগিচা...

দ্বীপান্তরের বন্দিনী

   আসে নাই ফিরে ভারত-ভারতী      মা’র কতদিন দ্বীপান্তর?    পুণ্য বেদীর শূন্যে ধ্বনিল      ক্রন্দন-‘দেড় শত বছর।’….    সপ্ত সিন্ধু তের নদী পার         দ্বীপান্তরের আন্দামান,    রূপের কমল রূপার কাঠির      কঠিন স্পর্শে যেখানে ম্লান,    শতদল যেথা শতধা ভিন্ন...

পথের দিশা

চারিদিকে এই গুণ্ডা এবং বদমায়েসির আখ্‌ড়া দিয়ে রে অগ্রদূত, চ’লতে কি তুই পারবি আপন প্রাণ বাঁচিয়ে? পারবি যেতে ভেদ ক’রে এই বক্র-পথের চক্রব্যুহ? উঠবি কি তুই পাষাণ ফুঁড়ে বনস্পতি মহীরুহ? আজকে প্রাণের গো-ভাগাড়ে উড়ছে শুধু চিল-শকুনি, এর মাঝে তুই আলোকে-শিশু কোন্‌ অভিযান ক’রবি,...

প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

প্রবর্তকের ঘুর-চাকায় যায় মহাকাল মূর্ছা যায় প্রবর্তকের ঘুর-চাকায় যায় অতীত কৃষ্ণ-কায় যায় অতীত রক্ত-পায়— যায় মহাকাল মূর্ছা যায় প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়! প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়! যায় প্রবীণ চৈতি-বায় আয় নবীন- শক্তি আয়! যায় অতীত যায় পতিত, ‘আয় অতিথ, আয় রে আয় –’ বৈশাখী-ঝড় সুর হাঁকায়...

বাংলার মহাত্মা

বাংলার মহাত্মা (গান) আজ না-চাওয়া পথ দিয়ে কে এলে ওই কংস-কারার দ্বার ঠেলে। আজ শব-শ্মশানে শিব নাচে ওই ফুল-ফুটানো পা ফেলে॥    আজ প্রেম-দ্বারকায় ডেকেছে বান মরুভূমে জাগল তুফান, দিগ্‌বিদিকে উপচে পড়ে প্রাণ রে! তুমি জীবন-দুলাল সব লালে-লাল করলে প্রাণের রং ঢেলে॥    ওই...

বিদায়-মাভৈঃ

বিদায়-মাভৈঃ বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়, বিশ্বাসী! বলো আসবে আবার প্রভাত-রবির জয়! খণ্ড করে দেখছে যারা অসীম জীবনটাই, দুঃখ তারাই করুক বসে, দুঃখ মোদের নাই। আমরা জানি, অস্ত-খেয়ায় আসছে রে উদয়। বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়। হারাই-হারাই ভয় করেই না হারিয়ে দিলি সব!...

মুক্তিকাম

মুক্তিকাম                স্বাগত বঙ্গে মুক্তিকাম! সুপ্ত বঙ্গে জাগুক আবার লুপ্ত স্বাধীন সপ্তগ্রাম! শোনাও সাগর-জাগর সিন্ধু-ভৈরবী গান ভয়-হরণ, – এ যে রে তন্দ্রা, জেগে ওঠ তোরা, জেগে ঘুম দেওয়া নয় মরণ! সপ্ত-কোটি কু-সন্তান তোরা রাখিতে নারিলি সপ্তগ্রাম? খাসনি মায়ের বুকের রুধির?...

যা শত্রু পরে পরে

যা শত্রু পরে পরে রাজ্যে যাদের সূর্য অস্ত যায় না কখনও, শুনিস হায়, মেরে মেরে যারা ভাবিছে অমর, মরিবে না কভু মৃত্যু-ঘায়, তাদের সন্ধ্যা ওই ঘনায়! চেয়ে দেখ ওই ধূম্র-চূড় অসন্তোষের মেঘ-গরুড় সূর্য তাদের গ্রাসিল প্রায়! ডুবেছে যে পথে রোম গ্রিক প্যারি – সেই পথে যায় অস্ত যায় ওদের...

যুগের আলো

যুগের আলো নিদ্রা-দেবীর মিনার-চুড়ে মুয়াজ্জিনের শুনছি আরাব, – পান করে নে প্রাণ-পেয়ালায় যুগের আলোর রৌদ্র-শারাব! উষায় যারা চমকে গেল তরুণ রবির রক্ত-রাগে, যুগের আলো! তাদের বলো, প্রথম উদয় এমনি লাগে! সাতরঙা ওই ইন্দ্রধনুর লাল রংটাই দেখল যারা, তাদের গাঁয়ে মেঘ নামায়ে ভুল করেছে...

রক্ত-পতাকার গান

রক্ত-পতাকার গান ওড়াও ওড়াও লাল নিশান!.... দুলাও মোদের রক্ত-পতাকা ভরিয়া বাতাস জুড়ি বিমান! ওড়াও ওড়াও লাল নিশান॥ শীতের শ্বাসেরে বিদ্রুপ করি ফোটে কুসুম, নব-বসন্ত-সূর্য উঠিছে টুটিয়া ঘুম, অতীতের ওই দশ-সহস্র বছরের হানো মৃত্যু-বাণ ওড়াও ওড়াও লাল নিশান॥ চির বসন্ত যৌবন করে ধরা...

সত্য-কবি

অসত্য যত রহিল পড়িয়া, সত্য যে গেল চ’লে বীরের মতন মরণ-কারারে চরণের তলে দ’লে। যে-ভোরের তারা অরুণ-রবির উদয়-তোরণ-দোরে ঘোষিল বিজয়-কিরণ-শঙ্খ-আবার প্রথম ভোরে, রবির ললাট চুম্বিল যার প্রথম রশ্মি-টীকা, বাদলের বায়ে নিভে গেল হায় দীপ্ত তাহারি শিখা! মধ্য গগনে স্তব্ধ নিশীথ, বিশ্ব...

সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ

সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ আজ আষাঢ়-মেঘের কালো কাফনের আড়ালে মু-খানি ঢাকি আহা কে তুমি জননি কার নাম ধরে বারে বারে যাও ডাকি? মাগো কর হানি দ্বারে দ্বারে তুমি কোন হারামণি খুঁজিতে আসিলে ঘুম-সাগরের পারে? ‘কই রে সত্য, সত্যেন কই’ কাতর কান্না শুধু গগন-মরুর প্রাঙ্গণে হানে সাহারার হাহা...

সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি

    চল-চঞ্চল বাণীর দুলাল এসেছিল পথ ভুলে,    ওগো   এই গঙ্গার কূলে। দিশাহারা মাতা দিশা পেয়ে তাই নিয়ে গেছে কোলে তুলে    ওগো    এই গঙ্গার কূলে।।     চপল চারণ বেণু-বীণে তা’র      সুর বেঁধে শুধু দিল ঝঙ্কার,     শেষ গান গাওয়া হ’ল না ক’ আর,       উঠিল চিত্ত দুলে,...

সব্যসাচী

ওরে   ভয় নাই আর, দুলিয়া উঠেছে হিমালয়-চাপা প্রাচী,        গৌরশিখরে তুহিন ভেদিয়া জাগিছে সব্যসাচী!               দ্বাপর যুগের মৃত্যু ঠেলিয়া               জাগে মহাযোগী নয়ন মেলিয়া, মহাভারতের মহাবীর জাগে, বলে ‘আমি আসিয়াছি।’ নব-যৌবন-জলতরঙ্গে নাচে রে প্রাচীন প্রাচী! বিরাট...

সাবধানী ঘণ্টা

সাবধানী ঘণ্টা রক্তে আমার লেগেছে আবার সর্বনাশের নেশা। রুধির-নদীর পার হতে ওই ডাকে বিপ্লব-হ্রেষা! বন্ধু গো, সখা, আজি এই নব জয়-যাত্রার আগে দ্বেষ-পঙ্কিল হিয়া হতে তব শ্বেত পঙ্কজ মাগে বন্ধু তোমার ; দাও দাদা দাও তব রূপ-মসি ছানি অঞ্জলি ভরি শুধু কুৎসিত কদর্যতার গ্লানি! তোমার...