ছায়ানট

ছায়ানট / কাব্যগ্রন্থ /  কাজী নজরুল ইসলাম

উৎসর্গ

আমার শ্রেয়তম রাজলাঞ্ছিত বন্ধু
মুজফ্‌ফর আহমদ

কুতুবউদ্দীন আহমদ
করকমলে –

অ-কেজোর গান

অ-কেজোর গান   ওই      ঘাসের ফুলে মটরশুটির ক্ষেতে             আমার এ-মন-মৌমাছি ভাই উঠেছে আজ মেতে।      ওই         রোদ-সোহাগী পউষ-প্রাতে            অথির প্রজাপতির সাথে            বেড়াই কুঁড়ির পাতে পাতে                      পুষ্পল মৌ খেতে। আমি  আমন ধানের বিদায়-কাঁদন শুনি...

অ-বেলায়

অ-বেলায় বৃথাই ওগো কেঁদে আমার কাটল যামিনী। অবেলাতেই পড়ল ঝরে কোলের কামিনী – ও সে শিথিল কামিনী। খেলার জীবন কাটিয়ে হেলায় দিন না যেতেই সন্ধেবেলায় মলিন হেসে চড়ল ভেলায় মরণ-গামিনী। আহা একটু আগে তোমার দ্বারে কেন নামিনি। আমার অভিমানিনী। ঝরার আগে যে কুসুমে দেখেও দেখি নাই ও যে...

অকরুণ পিয়া

অকরুণ পিয়া আমার পিয়াল বনের শ্যামল পিয়ার ওই বাজে গো বিদায়বাঁশি,  পথ-ঘুরানো সুর হেনে সে আবার হাসে নিদয় হাসি। পথিক বলে পথের গেহ বিলিয়েছিল একটু স্নেহ, তাই দেখে তার ঈর্ষাভরা কান্নাতে চোখ গেল ভাসি।    তখন মোদের কিশোর বয়স যেদিন হঠাৎ টুটল বাঁধন, সেই হতে কার বিদায়-বেণুর জগৎ...

অনাদৃতা

অনাদৃতা ওরে অভিমানিনী! এমন করে বিদায় নিবি ভুলেও জানিনি। পথ ভুলে তুই আমার ঘরে দু-দিন এসেছিলি, সকল সহা! সকল সয়ে কেবল হেসেছিলি। হেলায় বিদায় দিনু যারে ভেবেছিনু ভুলব তারে হায়! ভোলা কি তা যায়? ওরে হারা-মণি! এখন কাঁদি দিবস-যামিনী। অভাগি রে! হাসতে এসে কাঁদিয়ে গেলি, নিজেও শেষে...

অমর-কানন

অমর-কানন* অমর কানন মোদের অমর-কানন! বন কে বলে রে ভাই, আমাদের তপোবন, আমাদের তপোবন। এর দক্ষিণে ‘শালী’ নদী কুলুকুলু বয়, তার কূলে কূলে শালবীথি ফুলে ফুলময়, হেথা ভেসে আসে জলে-ভেজা দখিনা মলয়, হেথা মহুয়ার মউ খেয়ে মন উচাটন। দূর প্রান্তর-ঘেরা আমাদের বাস, দুধহাসি হাসে হেথা কচি...

আপন-পিয়াসী

    আমার    আপনার চেয়ে আপন যে জন       খুঁজি তারে আমি আপনার,     আমি    শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি       আমারি তিয়াসী বাসনায়।।     আমারই মনের তৃষিত আকাশে কাঁদে সে চাতক আকুল পিয়াসে, কভু সে চকোর সুধা-চোর আসে  নিশীথে স্বপনে জোছনায়।। আমার মনের পিয়াল তমালে হেরি তারে...

আলতা-স্মৃতি

আলতা-স্মৃতি ওই রাঙা পায়ে রাঙা আলতা প্রথম যেদিন পরেছিলে, সেদিন তুমি আমায় কি গো ভুলেও মনে করেছিলে – আলতা যেদিন পরেছিলে? জানি, তোমার নারীর মনে নিত্য-নূতন পাওয়ার পিয়াস হঠাৎ কেন জাগল সেদিন, কণ্ঠ ফেটে কাঁদল তিয়াস! মোর আসনে সেদিন রানি নূতন রাজায় বরলে আনি, আমার রক্তে চরণ রেখে...

আশা

    হয়ত তোমার পাব’ দেখা, যেখানে ঐ নত আকাশ চুমছে বনের সবুজ রেখা।।     ঐ সুদূরের গাঁয়ের মাঠে,     আ’লের পথে বিজন ঘাটে;     হয়ত এসে মুচকি হেসে      ধ’রবে আমার হাতটি একা।। ঐ নীলের ঐ গহন-পারে ঘোম্‌টা-হারা তোমার চাওয়া, আনলে খবর গোপন দূতী দিক্‌পারের ঐ দখিনা হাওয়া।।     বনের...

কমল-কাঁটা

আজকে দেখি হিংসা-মদের মত্ত-বারণ-রণে জাগ্‌ছে শুধু মৃণাল-কাঁটা আমার কমল-বনে।     উঠল কখন ভীম কোলাহল,     আমার বুকের রক্ত-কমল     কে ছিঁড়িল-বাঁধ-ভরা জল                শুধায় ক্ষণে ক্ষণে। ঢেউ-এর দোলায় মরাল-তরী নাচ্‌বে না আন্‌মনে।। কাঁটাও আমার যায় না কেন, কমল গেল যদি!...

কার বাঁশি বাজিল?

কার বাঁশি বাজিল? কার বাঁশি বাজিল নদীপারে আজি লো? নীপে নীপে শিহরণ কম্পন রাজিল – কার বাঁশি বাজিল? বনে বনে দূরে দূরে ছল করে সুরে সুরে এত করে ঝুরে ঝুরে কে আমায় যাচিল? পুলকে এ-তনুমন ঘন ঘন নাচিল। ক্ষণে ক্ষণে আজি লো কার বাঁশি বাজিল? কার হেন বুক ফাটে মুখ নাহি ফোটে লো! না-কওয়া...

চাঁদমুকুর

চাঁদমুকুর চাঁদ হেরিতেছে চাঁদমুখ তার সরসীর আরশিতে। ছুটে তরঙ্গ বাসনাভঙ্গ সে অঙ্গ পরশিতে। হেরিছে রজনি রজনি জাগিয়া চকোর উতলা চাঁদের লাগিয়া, কাঁহা পিউ কাঁহা ডাকিছে পাপিয়া কুমুদীরে কাঁদাইতে। না জানি সজনি কত সে রজনি কেঁদেছে চকোরী পাপিয়া, হেরেছে শশীরে সরসী-মুকুরে ভীরু ছায়াতরু...

চির-চেনা

চির-চেনা নামহারা ওই গাঙের পারে বনের কিনারে বেতস-বেণুর বনে কে ওই বাজায় বীণা রে। লতায়-পাতায় সুনীল রাগে সে-সুর সোহাগ-পুলক লাগে, সে সুর ঘুমায় দিগঙ্গনার শয়নলীনা রে। আমি কাঁদি, এ সুর আমার চিরচেনা রে। ফাগুন-মাঠে শিস দিয়ে যায় উদাসী তার সুর, শিউরে ওঠে আমের মুকুল ব্যথায়...

চিরন্তনী প্রিয়া

চিরন্তনী প্রিয়া এসো এসো এসো আমার চির-পুরানো! বুক জুড়ে আজ বসবে এসো হৃদয়-জুড়ানো! আমার চির-পুরানো! পথ বিপথে কতই আমার নিত্য নূতন বাঁধন এসে যাচে, কাছে এসেই অমনি তারা পুড়ে মরে আমার আগুন আঁচে। তারা এসে ভালোবাসার আশায় একটুকুতেই কেঁদে ভাসায়, ভীরু তাদের ভালোবাসা কেঁদেই ফুরানো।...

চিরশিশু

নাম-হারা তুই পথিক-শিশু এলি অচিন দেশ পারায়ে। কোন্‌ নামের আজ প’রলি কাঁকনম বাঁধনহারায় কোন্‌ কারা এ।।      আবার মনের মতন ক’রে      কোন্‌ নামে বল ডাক্‌ব তোরে!      পথ-ভোলা তুই এই সে ঘরে           ছিলি ওরে এলি ওরে           বারে বারে নাম হারায়ে।। ওরে যাদু ওরে মাণিক, আঁধার...

চৈতী হাওয়া

হারিয়ে গেছ অন্ধকারে-পাইনি খুঁজে আর, আজ্‌কে তোমার আমার মাঝে সপ্ত পারাবার!     আজ্‌কে তোমার জন্মদিন-     স্মরণ-বেলায় নিদ্রাহীন হাত্‌ড়ে ফিরি হারিয়ে-যাওয়ার অকূল অন্ধকার! এই -সে হেথাই হারিয়ে গেছে কুড়িয়ে-পাওয়া হার! শূন্য ছিল নিতল দীঘির শীতল কালো জল, কেন তুমি ফুটলে সেথা...

ছলকুমারী

ছলকুমারী কত ছল করে সে বারে বারে দেখতে আসে আমায়। কত বিনা-কাজের কাজের ছলে চরণ দুটি আমার দোরেই থামায়। জানলা-আড়ে চিকের পাশে দাঁড়ায় এসে কীসের আশে, আমায় দেখেই সলাজ ত্রাসে অনামিকায় জড়িয়ে আঁচল গাল দুটিকে ঘামায়। সবাই যখন ঘুমে মগন দুরুদুরু বুকে তখন আমায় চুপে চুপে দেখতে এসেই মল...

দহনমালা

দহনমালা হায় অভাগি! আমায় দেবে তোমার মোহন মালা? বদল দিয়ে মালা, নেবে আমার দহন-জ্বালা? কোন ঘরে আজ প্রদীপ জ্বেলে ঘরছাড়াকে সাধতে এলে গগনঘন শান্তি মেলে, হায়! দু-হাত পুরে আনলে ও কি সোহাগ-ক্ষীরের থালা আহা দুখের বরণ ডালা? পথহারা এই লক্ষ্মীছাড়ার পথের ব্যথা পারবে নিতে? করবে বহন,...

দুপুর-অভিসার

দুপুর-অভিসার যাস কোথা সই একলা ও তুই অলস বৈশাখে? জল নিতে যে যাবি ওলো কলস কই কাঁখে? সাঁঝ ভেবে তুই ভর-দুপুরেই দু-কূল নাচায়ে পুকুরপানে ঝুমুর ঝুমুর নূপুর বাজায়ে যাসনে একা হাবা ছুঁড়ি, অফুট জবা চাঁপা-কুঁড়ি তুই! দ্যাখ্ রং দেখে তোর লাল গালে যায় দিগ্‌বধূ ফাগ থাবা থাবা ছুঁড়ি,...

দূরের বন্ধু

বন্ধু আমার! থেকে থেকে কোন্‌ সুদূরের বিজন পুরে        ডাক দিয়ে যাও ব্যথার সুরে? আমার অনেক দুখের পথের বাসা বারে বারে ঝড়ে উড়ে,        ঘর-ছাড়া তাই বেড়াই ঘুরে।।      তোমার বাঁশীর উদাস কাঁদন        শিথিল করে সকল বাঁধন      কাজ হ’ল তাই পথিক সাধন,        খুঁজে ফেরা পথ-বঁধরে,...

নিরুদ্দেশের যাত্রী

নিরুদ্দেশের যাত্রী নিরুদ্দেশের পথে যেদিন প্রথম আমার যাত্রা হল শুরু। নিবিড় সে-কোন্ বেদনাতে ভয়-আতুর এ বুক কাঁপল দুরু-দুরু। মিটল না ভাই চেনার দেনা, অমনি মু্হুর্মুহু ঘরছাড়া ডাক করলে শুরু অথির বিদায়-কুহু উহু উহু উহু! হাতছানি দেয় রাতের শাঙন, অমনি বাঁধে ধরল ভাঙন – ফেলিয়ে...