চক্রবাক (১৯২৯)

চক্রবাক (কাব্যগ্রন্থ) - চক্রবাক কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ। ১৯২৯ খৃষ্টাব্দে এই গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে মোট কবিতার সংখ্যা ১৯টি।

অপরাধ শুধু মনে থাক

অপরাধ শুধু মনে থাক মোর অপরাধ শুধু মনে থাক! আমি হাসি, তার আগুনে আমারই অন্তর হোক পুড়ে খাক! অপরাধ শুধু মনে থাক! নিশীথের মোর অশ্রুর রেখা প্রভাতে কপোলে যদি যায় দেখা, তুমি পড়িয়ো না সে গোপন লেখা গোপনে সে লেখা মুছে যাক অপরাধ শুধু মনে থাক! এ উপগ্রহ কলঙ্ক-ভরা তবু ঘুরে ঘিরি...

আড়াল

আড়াল আমি কি আড়াল করিয়া রেখেছি তব বন্ধুর মুখ? না জানিয়া আমি না জানি কতই দিয়াছি তোমায় দুখ। তোমার কাননে দখিনা পবন এনেছিল ফুল পূজা-আয়োজন, আমি এনু ঝড় বিধাতার ভুল – ভণ্ডুল করি সব, আমার অশ্রু-মেঘে ভেসে গেল তব ফুল-উৎসব। মম উৎপাতে ছিঁড়েছে কি প্রিয়, বক্ষের মণিহার? আমি কি এসেছি...

কর্ণফুলী

কর্ণফুলী ওগো ও কর্ণফুলী, উজাড় করিয়া দিনু তব জলে আমার অশ্রুগুলি। যে লোনা জলের সিন্ধু-সিকতে নিতি তব আনাগোনা, আমার অশ্রু লাগিবে না সখী তার চেয়ে বেশি লোনা! তুমি শুধু জল করো টলমল ; নাই তব প্রয়োজন আমার দু-ফোঁটা অশ্রুজলের এ গোপন আবেদন। যুগ যুগ ধরি বাড়াইয়া বাহু তব দু-ধারের...

কুহেলিকা

তোমরা আমায় দেখ্‌তে কি পাও আমার গানের নদী-পারে? নিত্য কথায় কুহেলিকায় আড়াল করি আপনারে। সবাই যখন মত্ত হেথায় পান ক’রে মোর সুরের সুরা সব-চেয়ে মোর আপন যে জন স-ই কাঁদে গো তৃষ্ণাতুরা। আমার বাদল-মেঘের জলে ভর্‌ল নদী সপ্ত পাথার, ফটিক-জলের কণ্ঠে কাঁদে তৃপ্তি-হারা সেই...

গানের আড়াল

তোমার কন্ঠে রাখিয়া এসেছি মোর কন্ঠের গান -- এইটুকু শুধু রবে পরিচয় ? আর সব অবসান ? অন্তরতলে অন্তরতর যে ব্যথা লুকায়ে রয়, গানের আড়ালে পাও নাই তার কোনদিন পরিচয় ? হয়তো কেবলি গাহিয়াছি গান, হয়ত কহিনি কথা, গানের বানী সে শুধু কি বিলাস, মিছে তার আকুলতা ? হৃদয়ে কখন...

চক্রবাক

চক্রবাক এপার ওপার জুড়িয়া অন্ধকার মধ্যে অকূল রহস্য-পারাবার, তারই এই কূলে নিশি নিশি কাঁদে জাগি চক্রবাক সে চক্রবাকীর লাগি। ভুলে যাওয়া কোন জন্মান্তর পারে কোন সুখ-দিনে এই সে নদীর ধারে পেয়েছিল তারে সারা দিবসের সাথি, তারপর এল বিরহের চির-রাতি, – আজিও তাহার বুকের ব্যথার কাছে,...

তুমি মোরে ভুলিয়াছ

তুমি মোরে ভুলিয়াছ তুমি মোরে ভুলিয়াছ তাই সত্য হোক! – সেদিন যে জ্বলেছিল দীপালি-আলোক তোমার দেউল জুড়ি – ভুল তাহা ভুল! সেদিন ফুটিয়াছিল ভুল করে ফুল তোমার অঙ্গনে প্রিয়! সেদিন সন্ধ্যায় ভুলে পেরেছিলে ফুল নোটন-খোঁপায়! ভুল করে তুলি ফুল গাঁথি বর-মালা বেলাশেষে বারে বারে হয়েছ উতলা...

তোমারে পড়িছে মনে

তোমারে পড়িছে মনে তোমারে পড়িছে মনে আজি নীপ-বালিকার ভীরু-শিহরণে, যুথিকার অশ্রুসিক্ত ছলছল মুখে কেতকী-বধূর অবগুন্ঠিত ও বুকে- তোমারে পড়িছে মনে। হয়তো তেমনি আজি দূর বাতায়নে ঝিলিমিলি-তলে ম্লান লুলিত অঞ্ছলে চাহিয়া বসিয়া আছ একা, বারে বারে মুছে যায় আঁখি-জল-লেখা। বারে...

নদীপারের মেয়ে

নদীপারের মেয়ে নদীপারের মেয়ে! ভাসাই আমার গানের কমল তোমার পানে চেয়ে। আলতা-রাঙা পা দুখানি ছুপিয়ে নদী-জলে ঘাটে বসে চেয়ে আছ আঁধার অস্তাচলে। নিরুদ্দেশে ভাসিয়ে-দেওয়া আমার কমলখানি ছোঁয় কি গিয়ে নিত্য সাঁঝে তোমার চরণ, রানি? নদীপারের মেয়ে! গানের গাঙে খুঁজি তোমায় সুরের তরি বেয়ে।...

পথচারী

কে জানে কোথায় চলিয়াছি ভাই মুসাফির পথচারি, দু'ধারে দু'কুল দুঃখ-সুখের--মাঝে আমি স্রোত-বারি! আপনার বেগে আপনি ছুটেছি জন্ম-শিখর হ'তে বিরাম-বিহীন রাত্রি ও দিন পথ হ'তে আন পথে! নিজ বাস হ'ল চির-পরবাস, জন্মের ক্ষন পরে বাহিরিনি পথে গিরি-পর্বতে--ফিরি নাই আর ঘরে। পলাতকা শিশু...

বর্ষা-বিদায়

ওগো বাদলের পরী! যাবে কোন্‌ দূরে, ঘাটে বাঁধা তব কেতকী পাতার তরী! ওগো ও ক্ষণিকা, পুব-অভিসার ফুরাল কি আজি তব? পহিল্‌ ভাদরে পড়িয়াছে মনে কোন্‌ দেশ অভিনব? তোমার কপোল-পরশ না পেয়ে পান্ডুর কেয়া-রেণু, তোমারে স্মরিয়া ভাদরের ভরা নদীতটে কাঁদে বেণু। কুমারীর ভীরু বেদনা-বিধুর...

বাতায়ন-পাশে গুবাক-তরুর সারি

বিদায়, হে মোর বাতায়ন-পাশে নিশীথ জাগার সাথী! ওগো বন্ধুরা, পান্ডুর হয়ে এল বিদায়ের রাতি! আজ হ'তে হ'ল বন্ধ আমার জানালার ঝিলিমিলি, আজ হ'তে হ'ল বন্ধ মোদের আলাপন নিরিবিলি।... অস্ত-আকাশ-অলিন্দে তার শীর্ণ কপোল রাখি’ কাঁদিতেছে চাঁদ, "মুসাফির জাগো, নিশি আর নাই বাকি।" নিশীথিনী...

বাদল-রাতের পাখি

বাদল-রাতের পাখি                                               বাদল-রাতের পাখি! কবে পোহায়েছে বাদলের রাতি, তবে কেন থাকি থাকি কাঁদিছ আজিও ‘বউ কথা কও’শেফালির বনে একা, শাওনে যাহারে পেলে না, তারে কি ভাদরে পাইবে দেখা?… তুমি কাঁদিয়াছ ‘বউ কথা কও’সে-কাঁদনে তব সাথে ভাঙিয়া...

মিলন-মোহনায়

মিলন-মোহনায় হায় হাবা মেয়ে, সব ভুলে গেলি দয়িতের কাছে এসে! এত অভিমান এত ক্রন্দন সব গেল জলে ভেসে ! কূলে কূলে এত ভুলে ফুলে কাঁদা আছড়ি পিছাড়ি তোর, সব ফুলে গেলি যেই বুকে তোরে টেনে নিল মনোচোর! সিন্ধুর বুকে লুকাইলি মুখ এমনই নিবিড় করে, এমনই করিয়া হারাইলি তুই আপনারে চিরতরে – যে...

শীতের সিন্ধু

শীতের সিন্ধু ভুলি নাই পুনঃ তাই আসিয়াছি ফিরে ওগো বন্ধু, ওগো প্রিয়, তব সেই তীরে! কূল-হারা কূলে তব নিমেষের লাগি খেলিতে আসিয়া হায় যে কবি বিবাগি সকলই হারায়ে গেল তব বালুচরে, – ঝিনুক কুড়াতে এসে – গেল আঁখি ভরে তব লোনা জল লয়ে, –তব স্রোত-টানে ভাসিয়া যে গেল দূর নিরুদ্দেশে পানে!...

সাজিয়াছি বর মৃত্যুর উৎসবে

সাজিয়াছি বর মৃত্যুর উৎসবে দেখা দিলে রাঙা মৃত্যুর রূপে এতদিনের কি গো রানি? মিলন-গোধূলি-লগনে শুনালে চির-বিদায়ের বাণী। যে ধূলিতে ফুল ঝরায় পবন রচিলে সেথায় বাসর-শয়ন, বারেক কপোলে রাখিয়া কপোল, ললাটে কাঁকন হানি, দিলে মোর পরে সকরুণ করে কৃষ্ণ কাফন টানি। নিশি না পোহাতে জাগায়ে...

স্তব্ধ-রাতে

স্তব্ধ-রাতে থেমে আসে রজনির গীত-কোলাহল, ওরে মোর সাথি আঁখি-জল, এইবার তুই নেমে আয় – অতন্দ্র এ নয়ন-পাতায়। আকাশে শিশির ঝরে, বনে ঝরে ফুল, রূপের পালঙ্ক বেয়ে ঝরে এলোচুল ; কোন গ্রহে কে জড়ায়ে ধরিছে প্রিয়ায়, উল্কার মানিক ছিঁড়ে ঝরে পড়ে যায়। আঁখি-জল, তুই নেমে আয় - বুক ছেড়ে...

হিংসাতুর

হিংসাতুর হিংসাই শুধু দেখেছ এ চোখে? দেখ নাই আর কিছু? সম্মুখে শুধু রহিলে তাকায়ে, চেয়ে দেখিলে না পিছু! সম্মুখ হতে আঘাত হানিয়া চলে গেল যে-পথিক তার আঘাতেরই ব্যথা বুকে ধরে জাগ আজও অনিমিখ? তুমি বুঝিলে না, হায়, কত অভিমানে বুকের বন্ধু ব্যথা হেনে চলে যায়! আঘাত তাহার মনে আছে...

১৪০০ সাল

১৪০০ সাল [কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “আজি হতে শতবর্ষ পরে” পড়িয়া] আজি হ’তে শত বর্ষ আগে! কে কবি, স্মরণ তুমি ক’রেছিলে আমাদেরে শত আনুরাগে, আজি হ’তে শত বর্ষ আগে। ধেয়ানী গো, রহস্য-দুলাল! উতারি’ ঘোমটাখানি তোমার আঁখির আগে কবে এল সুদূর আড়াল? আনাগত আমাদের...