অগ্নিবীণা (১৯২২)

অগ্নিবীণা (কাব্যগ্রন্থ) - অগ্নিবীণা বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এটি ১৩২৯ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে (অক্টোবর, ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ) প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে মোট বারোটি কবিতা আছে। কবিতাগুলি হচ্ছে - ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘বিদ্রোহী’, ‘রক্তাম্বর-ধারিণী মা’, ‘আগমণী’, ‘ধূমকেতু’, কামাল পাশা’, ‘আনোয়ার ‘রণভেরী’, ‘শাত-ইল-আরব’, খেয়াপারের তরণী’, কোরবানী’ ও মোহররম’। এছাড়া গ্রন্থটির সর্বাগ্রে বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ-কে উৎসর্গ করে লেখা একটি উৎসর্গ কবিতাও আছে। ‘অগ্নি-বীণা’ প্রচ্ছদপটের পরিকল্পনা ছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং এঁকেছিলেন তরুণ চিত্রশিল্পী বীরেশ্বর সেন।[১] বইটির তৎকালীন মূল্য ছিল ৩ টাকা। ৭ নং প্রতাপ চ্যাটার্জি লেন থেকে গ্রন্থকার কর্তৃক গ্রন্থটি মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। প্রাপ্তিস্থান হিসেবে গ্রন্থে লেখা ছিল: 'আর্য পাবলিশিং হাউস, কলেজ স্ট্রিট, মার্কেট (দোতলায়)'। গ্রন্থটি ছাপা হয় মেটকাফ প্রেস, ৭৯ নং বলরাম দে স্ট্রিট, কলিকাতা থেকে। দাম এক টাকা। গ্রন্থটির উৎসর্গ হচ্ছে- “বাঙলার অগ্নিযুগের আদি পুরোহিত সাগ্নিক বীর শ্রীবারীন্দ্রকুমার ঘোষ শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু”। নিচে লেখা আছে “তোমার অগ্নি-পূজারী -হে- মহিমাম্বিত শিষ্য-কাজী নজরুল ইসলাম”। অরবিন্দ ঘোষের ভ্রাতা বারীন্দ্রকুমার ঘোষ বাংলা তথা ভারতের বিপ্লববাদী আন্দোলনের অন্যতম নায়ক ছিলেন। বিপ্লবে বিশ্বাসী নজরুল তাই নিজেকে বারীন্দ্রকুমারের ‘-হে-মহিমান্বিত শিষ্য’ বলে উল্লেখ করে তাঁকেই তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছিলেন। (উইকি)

আগমনী

একি রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন– ঝন রনরন রন ঝনঝন! সেকি দমকি দমকি ধমকি ধমকি দামা-দ্রিমি-দ্রিমি গমকি গমকি ওঠে চোটে চোটে, ছোটে লোটে ফোটে বহ্নি-ফিনিকি চমকি চমকি ঢাল-তলোয়ারে খনখন! একি রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন রণ ঝনঝন ঝন রণরণ! হৈ হৈ রব ঐ ভৈরব হাঁকে, লাখে লাখে ঝাঁকে ঝাঁকে ঝাঁকে লাল...

আনোয়ার

[স্থান– প্রহরী–বেষ্টিত অন্ধকার কারাগৃহ, কনস্ট্যান্টিনোপ্‌ল্‌। কাল–অমাবস্যার নিশীথ রাত্রি।] [চারিদিকে নিস্তব্ধ নির্বাক। সেই মৌনা নিশীথিনীকে ব্যথা দিতেছিল শুধু কাফ্রি-সাস্ত্রীর পায়চারির বিশ্রী খট্‌খট্ শব্দ। ঐ জিন্দানখানায় মহাবাহু আনোয়ারের জাতীয়-সৈন্যদলের সহকারী এক তরুণ...

কামাল পাশা

[তখন শরৎ-সন্ধ্যা। আস্‌মানের আঙিনা তখন কার্‌বালা ময়দানের মতো খুনখারাবির রঙে রঙিন। সেদিনকার মহা-আহবে গ্রীক-সৈন্য সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হইহা গিয়াছে। তাহাদের অধিকাংশ সৈন্যই রণস্থলে হত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। বাকি সব প্রাণপণে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিতেছে। তুরস্কের জাতীয় সৈন্যদলের...

কোরবানি

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন। দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খাম্‌খা ক্ষুব্ধ মন! ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর,– আজিকার এ খুন কোর্‌বানির! দুম্বা-শির রুম্-বাসীর শহীদের শির-সেরা আজি। –রহমান কি রুদ্র নন? বাস্‍! চুপ খামোশ রোদন! আজ শোর ওঠে জোর 'খুন দে, জান দে, শির দে...

খেয়া-পারের তরণী

যাত্রীরা রাত্তিরে হতে এল খেয়া পার, বজ্রেরি তূর্যে এ গর্জেছে কে আবার? প্রলয়েরি আহ্বান ধ্বনিল কে বিষাণে! ঝন্‌ঝা ও ঘন দেয়া স্বনিল রে ঈশানে! নাচে পাপ-সিন্ধুতে তুঙ্গ তরঙ্গ! মৃত্যুর মহানিশা রুদ্র উলঙ্গ! নিঃশেষে নিশাচর গ্রাসে মহাবিশ্বে, ত্রাসে কাঁপে তরণীর পাপী যত নিঃস্বে।...

ধূমকেতু

আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু! সাত সাতশো নরক-জ্বালা জলে মম ললাটে, মম ধূম-কুণ্ডুলি করেছে শিবের ত্রিনয়ন ঘর ঘোলাটে! আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ, আমি স্রষ্টার বুকে সৃষ্টি-পাপের অনুতাপ-তাপ-হাহাকার– আর মর্তে সাহারা-গোবি-ছাপ, আমি অশিব...

প্রলয়োল্লাস

তোরা সব জয়ধ্বনি কর্! তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!! ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখির ঝড়। তোরা সব জয়ধ্বনি কর্! তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!! আস্‌ছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য-পাগল, সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙ্‌ল আগল। মৃত্যু-গহন অন্ধ-কূপে মহাকালের চণ্ড-রূপে– ধূম্র-ধূপে...

বিদ্রোহী

                  বল        বীর –                বল উন্নত মম শির! শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!                  বল        বীর – বল   মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’        চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’        ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া        খোদার আসন...

মোহর্‌রম

নীল সিয়া আসমা লালে লাল দুনিয়া,– ‘আম্মা ! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া’। কাঁদে কোন্ ক্রদসী কারবালা ফোরাতে, সে কাঁদনে আঁসু আনে সীমারেরও ছোরাতে ! রুদ্র মাতম্ ওঠে দুনিয়া দামেশকে– ‘জয়নালে পরাল এ খুনিয়ারা বেশ কে? ‘হায় হায় হোসেনা’ ওঠে রোল ঝন্‌ঝায়,...

রক্তাম্বরধারিণী মা

রক্তাম্বর পর মা এবার জ্বলে পুড়ে যাক শ্বেত বসন। দেখি ঐ করে সাজে মা কেমন বাজে তরবারি ঝনন-ঝন। সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেল মা গো জ্বাল সেথা জ্বাল কাল্-চিতা। তোমার খড়গ-রক্ত হউক স্রষ্টার বুকে লাল ফিতা। এলোকেশে তব দুলুক ঝন্‌ঝা কাল-বৈশাখী ভীম তুফান, চরণ-আঘাতে উদ্গারে যেন আহত বিশ্ব...

রণ-ভেরী

[গ্রীসের বিরুদ্ধে আঙ্গোরা-তুর্ক-গভর্ণমেন্ট যে যুদ্ধ চালাইতেছিলেন, সেই যুদ্ধে কামাল পাশার সাহায্যের জন্য ভারতবর্ষ হইতে দশ হাজার স্বেচ্ছা-সৈনিক প্রেরণের প্রস্তাব শুনিয়া লিখিত] ওরে আয়! ঐ মহা-সিন্ধুর পার হতে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়– ওরে আয়! ঐ ইস্‌লাম ডুবে যায়! যত শয়তান সারা...

শাত-ইল-আরব

শাতিল্ আরব! শাতিল্ আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর। শহীদের লোহু, দিলিরের খুন ঢেলেছে যেখানে আরব-বীর। যুঝেছে এখানে তুর্কি-সেনানী, য়ুনানি, মিস্‌রি, আর্‌বি, কেনানি– লুটেছে এখানে মুক্ত আজাদ্‌ বেদুঈন্‌দের চাঙ্গা শির! নাঙ্গা-শির্– শম্‌শের হাতে, আঁসু-আঁখে হেথা মূর্তি দেখেছি...

০০ উৎসর্গ | মুখবন্ধ | গ্রন্থ পরিচিতি

উৎসর্গ ভাঙা বাংলার রাঙা যুগের আদি পুরোহিত, সাগ্নিক বীর শ্রীবারীন্দ্রকুমার ঘোষ শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু অগ্নি-ঋষি! অগ্নি-বীণা তোমায় শুধু সাজে। তাই তো তোমার বহ্নি-রাগেও বেদন-বেহাগ বাজে॥ দহন-বনের গহন-চারী– হায় ঋষি– কোন্ বংশীধারী নিঙ্‌ড়ে আগুন আন্‌লে বারি অগ্নি-মরুর মাঝে।...