কুহেলিকা (১৯৩১)

কুহেলিকা উপন্যাস, কাজী নজরুল ইসলাম।

কুহেলিকা – ০১

কুহেলিকা – ০১ নারী লইয়া আলোচনা চলিতেছিল। … তরুণ কবি হারুণ তাহার হরিণ-চোখ তুলিয়া কপোত-কূজনের মতো মিষ্টি করিয়া বলিল, ‘নারী কুহেলিকা’। যেস্থানে আলোচনা চলিতেছিল, তাহা আসলে ‘মেস’ হইলেও, হইয়া দাঁড়াইয়াছে একটি পুরোমাত্রায় আড্ডা। দুই তিনটি চতুষ্পায়া জুড়িয়া বসিয়া...

কুহেলিকা – ০২

কুহেলিকা – ০২ মেসে যা-ই বলিয়া ডাকুক, আমরা উলঝলুলকে জাহাঙ্গীর বলিয়াই ডাকিব। জাহাঙ্গীরের পৈতৃক বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তবে সে কলিকাতায় থাকিয়াই মানুষ হইয়াছে। তাহার পিতা ছিলেন কুমিল্লার একজন বিখ্যাত জমিদার ও মানীলোক। বৎসর চারেক হইল, তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে। সে-ই এখন তাঁহার...

কুহেলিকা – ০৩

কুহেলিকা – ০৩ তখন স্বদেশযুগের বান ডাকিয়াছে। ইংরেজ তাহার রাজত্ব ভাসিয়া যাওয়ার ভয় না করিলেও ডুবিয়া যাওয়ার আশঙ্কা একটু অতিরিক্ত করিয়াই করিতেছিল। ঘরের ঘটিবাটি সে সামলাইতেছিল না বটে, কিন্তু বাঁধ সে ভালো করিয়াই বাঁধিতেছিল। জাহাঙ্গীর তখনও বালক, – স্কুলে পড়ে। এমনই দিনে...

কুহেলিকা – ০৪

কুহেলিকা – ০৪ স্বদেশমন্ত্রে দীক্ষা লওয়ার কয়েক মাস পরেই জাহাঙ্গীরের পিতা খান বাহাদুর ফররোখ সাহেবের হৃদরোগে মৃত্যু হইল। জাহাঙ্গীর তখন পঞ্চদশ বর্ষীয় বালক, সবেমাত্র সেকেন্ড ক্লাস হইতে ফার্স্ট ক্লাসে প্রমোশন পাইয়াছে। এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় তাহার মনে হইল, সে যেন পথ...

কুহেলিকা – ০৫

কুহেলিকা – ০৫ গ্রীষ্মের ছুটি হইয়া গিয়াছে। ছাত্রদের যৌবনোন্মুখ মন অকারণ সুখে কানায় কানায় পুরিয়া উঠিয়াছে। তাহারা আজ তাহাদের সুদূর পল্লির নব-মুকুলিত আম্রবীথির গন্ধস্বপন দেখিতেছে। হারুণ বাড়ি যাইবার জন্য সমস্ত গুছাইয়া তাহার খালি তক্তপোশের উপর শুইয়া কী যেন চিন্তা...

কুহেলিকা – ০৬

কুহেলিকা – ০৬ শিউড়ি যখন তাহারা পঁহুছিল, তখন রাত্রি বেশ ঘনাইয়া আসিয়াছে। হারুণ বলিল, ‘এখন, কী করা যায় বলো তো? এখানেই রাত্রিটা কাটিয়ে দেবে না শহরে যাবে! শহরে আমার এক দূর-সম্পর্কীয় আত্মীয় আছেন, যদি তোমার মত হয় সেখানেও যেতে পারি।’ জাহাঙ্গীর হাসিয়া বলিল, ‘দূর...

কুহেলিকা – ০৭

কুহেলিকা – ০৭ ভোর না হইতেই একটা দুরন্ত কোকিলের ডাকে হারুণের ঘুম ভাঙিয়া গেল। সারারাত্রি সে নেশাখোরের মতো ঘুমাইয়াছে, পাশ পর্যন্ত ফিরে নাই। কত সুখের, কত বেদনার যেসব স্বপন সে সারারাত্রি ভরিয়া দেখিয়াছে, তাহার আবেশ যেন তখনও তাহার আঁখিপাতায় জড়াইয়া আছে। উন্মত্ত যৌবনের...

কুহেলিকা – ০৮

কুহেলিকা – ০৮ পরদিন অসহ্য গরমে অতি প্রত্যুষেই জাহাঙ্গীরের ঘুম ভাঙিয়া গেল। সে উঠিয়াই বাহিরবাটী হইতে হারুণকে চিৎকার করিয়া ডাকাডাকি আরম্ভ করিয়া দিল। হারুণ ঘুম-বিজড়িত চক্ষে উঠিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘কী হয়েছে জাহাঙ্গীর? কিছু হয়েছে নাকি?’ জাহাঙ্গীর বলিল, ‘আরে তৌবা,...

কুহেলিকা – ০৯

কুহেলিকা – ০৯ কালবৈশাখীর মেঘ এমনি করিয়াই দেখা দেয়। যেখানে দুঃখের বরষা, বজ্রপাতও হয় সেইখানেই। শান্ত নদীতীরে তারও চেয়ে শান্ত ভগ্নকুটির এমনি করিয়াই কোনো এক দুর্যোগের নিশীথে ভাসিয়া যায়! দুঃখ যে কত বড়ো বন্ধুর রূপ ধরিয়া আসে, হারুণ তাহাই ভাবিতেছিল – একাকী দাওয়ায় বসিয়া।...

কুহেলিকা – ১০

কুহেলিকা – ১০ সন্ধ্যার পূর্বেই জাহাঙ্গীর গোরুর গাড়িতে চড়িয়া শিউড়ি চলিয়া গেল। সন্ধ্যার বিষণ্ণতা এমন করিয়া বুঝি আর কখনও নামে নাই হারুণদের বাড়িতে। ভূণীর যখন জ্ঞান হইল, তখন তাহার সর্বপ্রথম এই প্রার্থনাই অন্তর ভরিয়া গুমরিয়া ফিরিতে লাগিল, ‘ধরণি দ্বিধা হও! এ মুখ যেন আর...

কুহেলিকা – ১১

কুহেলিকা – ১১ জাহাঙ্গীরের জীবনে এই প্রথম গোরুর গাড়ির অভিজ্ঞতা। জাহাঙ্গীর যখন বলিল, সে কিছুতেই তাহার বোঝা আর এক জন মানুষের অর্থাৎ কুলির মাথায় চড়াইয়া দিয়া তাহার অবমাননা করিবে না, বরং সে তাহার এই আভিজাত্যের অভিশাপ নিজেরই মাথায় তুলিয়া বাহির হইয়া যাইবে, তখন হারুণ...

কুহেলিকা – ১২

কুহেলিকা – ১২ জাহাঙ্গীর কলিকাতা ফিরিয়া আসিয়াই দেখে দুই তিনখানা টেলিগ্রাম আসিয়া পড়িয়া আছে। একখানা দেওয়ানজির, দুইখানা তাহার মায়ের প্রেরিত। পর পর দুইখানা টেলিগ্রাম করিয়াও তাহার উত্তর না পাইয়া স্নেহবৎসলা জননী আবার ‘রিপ্লাই-পেড’ টেলিগ্রাম করিয়াছেন। এইবার উত্তর না...

কুহেলিকা – ১৩

কুহেলিকা – ১৩ জাহাঙ্গীর আসিয়া পৌঁছাইতেই তাহার মাতা একেবারে তাহাকে বুকে জড়াইয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন, ‘খোকা, এ কী চেহারা হয়েছে তোর?’ জাহাঙ্গীর কিছু না বলিয়া মায়ের কোলে মাথা রাখিয়া শুইয়া পড়িল। জননী উদ্‌গত অশ্রু সংবরণ করিতে করিতে নীরবে ছেলের মাথায় মুখে হাত বুলাইয়া দিতে...

কুহেলিকা – ১৪

কুহেলিকা – ১৪ জাহাঙ্গীর সুখ ও দুঃখের নানা স্বপ্ন দেখিতে দেখিতে কখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। জাগিয়া দেখিল, তাহার মাতা শিয়রে বসিয়া অতন্দ্রনয়নে তাহার পানে চাহিয়া আছেন। সে চোখ মেলিতেই মা বলিয়া উঠিলেন, ‘জেগে উঠলি খোকা? ঘুমো আরও খানিক।’ জাহাঙ্গীর উঠিয়া বসিয়া বলিল, ‘না মা, আর...

কুহেলিকা – ১৫

কুহেলিকা – ১৫ বর্ধমান স্টেশনে নামিয়া জাহাঙ্গীর মউলবি সাহেবকে লইয়া ‘রিফ্রেশমেন্ট রুমে’ ঢুকিয়া পড়িল। সৌভাগ্যবশত তাহারা দুই জন ছাড়া আর কেহ সেখানে ছিল না। মউলবি সাহেব বলিলেন, ‘মামারা এখনও মুসলমানকে সন্দেহের চক্ষে দেখে না, তাই আজও দিনের আলোকে কোনোরকমে মউলবি সাহেব...

কুহেলিকা – ১৬

কুহেলিকা – ১৬ সকালে উঠিয়া ভূণীর মনে হইল, তাহার সকল দর্পের অবসান হইয়াছে। আজ সে পথের ভিখারিনি। দুই হাত পাতিয়া এখন তাহাকে ভিক্ষার তণ্ডুলকণা গ্রহণ করিতে হইবে। কালও সে মনে করিয়াছিল, যত বড়ো দরিদ্র হোক তাহারা, তবু সে দেখাইয়া দিবে – আত্মসম্মান শুধু ধনীরই একচেটিয়া নয়।...

কুহেলিকা – ১৭

কুহেলিকা – ১৭ স্টেশনে পঁহুছিয়াই জাহাঙ্গীর দেখিল, সারা গায়ে ভস্ম-বিভূতি মাখা জটাজূটধারী এক পৌনে-ষোলো-আনা নাগা সন্ন্যাসী তাহার চিমটার ইঙ্গিতে তাহাকে যেন আহ্বান করিল। জাহাঙ্গীর দেখিল সন্ন্যাসী ইঙ্গিত করিয়াই রেললাইনের অপর পারে এক বৃক্ষনিম্নে গিয়া বসিলেন। সেখানে আরও...

কুহেলিকা – ১৮

কুহেলিকা – ১৮ গাড়ি বর্ধমানে আসিয়া পঁহুচিতেই কাহাদের চঞ্চল স-বুট পদশব্দে জাহাঙ্গীরের ঘুম ভাঙিয়া গেল। জাহাঙ্গীর উঠিয়া দেখিল, সকলে ঘুমাইয়া গিয়াছে। রাত্রি কতটা হইবে তাহা সে আন্দাজ করিতে পারিল না। কেবল হারুণ একাকী জাগিয়া এক মনে বোধ হয় কবিতা লিখিতেছে। একদল সশস্ত্র...

কুহেলিকা – ১৯

কুহেলিকা – ১৯ এদিকে জাহাঙ্গীরের মাতা হাওড়া স্টেশনে পঁহুছিয়া জাহাঙ্গীর ও চম্পাকে দেখিতে না পাইয়া এবং হারুণের কাছে সমস্ত শুনিয়া মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন। ভূণীর মুখে কে যেন কালি ঢালিয়া দিল। হারুণ কিন্তু যে ভয় করিতেছিল, তাহার কিছুই হইল না। কেহ তাহাদের গাড়ি সার্চ...

কুহেলিকা – ২০ (শেষ)

কুহেলিকা – ২০ (শেষ) বজ্রপাণি, প্রমত্ত প্রভৃতির সাথে জাহাঙ্গীরেরও দ্বীপান্তর হইল। তাহার সত্যকার নাম প্রকাশ পাইল না। জাহাঙ্গীর তাহার নাম বলিয়াছিল স্বদেশকুমার। সেই নামেই তাহার শাস্তি হইয়া গেল। ফিরদৌস বেগম ও দেওয়ান সাহেব লক্ষাধিক টাকা খরচ করিয়াও তাহাকে বাঁচাইতে...