০৪.বিরাটপর্ব্ব

০১. পঞ্চ-পাণ্ডবের অজ্ঞাত বাসের মন্ত্রণা

জন্মেজয় বলে, কহ শুনি তপোধন। দুর্য্যোধন ভয়েপূর্ব্ব পিতামহগণ।। বিরাট নগর মধ্যে রহিল অজ্ঞাতে। বৎসরেক যাপন করিল কোন্ মতে।। কহেন বৈশম্পায়ন, শুন মহারাজ। দ্বাদশ বৎসর অন্তে অরণ্যের মাঝ।। পঞ্চ ভাই পাণ্ডবেরা পাঞ্চালী সহিত। বহু দ্বিজগণ সঙ্গে ধৌম্য পুরোহিত।। বলেন সবার প্রতি...

০২. পঞ্চ পাণ্ডবের বিরাট রাজসভায় প্রবেশ

কাঁখেতে দেবন মণি মাণিক্যের সাজ। সভামাঝে প্রথমতঃ যান ধর্ম্মরাজ।। যুধিষ্ঠির রূপ দেখি মুগ্ধ মৎস্যপতি। সভাজন প্রতি চাহি কহে শীঘ্রগতি।। এই যে পুরুষ আসে কন্দর্প আকার। ইহাকে কখন কেহ দেখেছ কি আর।। ইন্দ্র চন্দ্র সূর্য্য সম প্রভা কলেবর। ঐরাবত সম গতি পরম সুন্দর।। কাঞ্চন পর্ব্বত...

০৩. বিরাট-গৃহে দ্রৌপদীর প্রবেশ ও বিরাট-রাণী সুদেষ্ণার সহিত কথোপকথন

তবে কতক্ষণে কৃষ্ণা প্রবেশে নগরে। চতুর্দ্দিকে নরনারী ধায় দেখিবারে।। ক্লেশেতে মলিন মুখ, দীর্ঘ মুক্তকেশ। পিন্ধন মলিন জীর্ণ, সৈরন্ধ্রীর বেশ।। পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসয়ে যত নারীগণ। কে তুমি, একাকী ভ্রম কিসের কারণ।। তোমার রূপের সীমা বর্ণনে না যায়। কিন্নর অপ্সরা তুমি দেবকন্যা...

০৪. দ্রৌপদীর রূপ বর্ণন

কিবা লক্ষ্মী সরস্বতী,                     হরপ্রিয়া হৈমবতী, সাবিত্রী কি ব্রহ্মার গৃহিণী। রোহিণী চন্দ্রের রামা,                     রতি সতী তিলোত্তমা, কিবা হবে ইন্দ্রের ইন্দ্রাণী।। তোমার অঙ্গের আভা,                     ম্লান করিলেক সভা, তারা যেন চন্দ্রের উদয়ে। তোমার...

০৫. সুদেষ্ণার নিকট দ্রৌপদীর নিয়ম কথন ও সুদেষ্ণার দ্রৌপদীকে আশ্রয় প্রদান

রাণী বলে, শুন সতি তব রূপ দেখি। স্ত্রীজাতি হইয়া পালটিতে নারি আঁখি।। নৃপতি দেখিয়া লোভ করিবে তোমারে। না হইবে মম শক্তি নিবারিতে তাঁরে।। তোমা দেখি আদর না করিবেন মোরে। আমি উদাসীনা হব তোমা রাখি ঘরে।। আপনার দ্বারে কাঁটা রোপিব আপনে। কর্কটীর গর্ভ যথা মৃত্যুর লক্ষণে।। রাজ-বাসে...

০৬. শঙ্করযাত্রা ও ভীমের মল্লযুদ্ধ

পূর্ব্বাপার কুলরীতি আছে মৎস্যদেশে। শঙ্কর নামেতে যাত্রা আরাধে মহেশে।। কলির শঙ্করযাত্রা বিরাট রাজন। নানা দেশ হৈতে আসে বহুসংখ্য জন।। দ্বিজ আদি চারি জাতি নরনারীগণ। নৃত্যগীত মহোৎসব করে জনে জন।। পণ্ডিতে পণ্ডিতে কথা শাস্ত্রের বিবাদ। হস্তী হস্তী যুদ্ধ হয় ছাড়ে ঘোর নাদ।। কৌতুক...

০৭. দ্রৌপদীর সহিত কীচকের সাক্ষাৎ ও মিলন বাঞ্ছা

জিজ্ঞাসেন জন্মেজয় কহ মুনিবর। অতঃপর কি করিলা পঞ্চ সহোদর।। মুনি বলে, অবধান কর কুরুনাথ। একাদশ মাস গত হইল অজ্ঞাত।। সুদেষ্ণার সেবা কৃষ্ণা করে অনুক্ষণ। হেনমতে দেখ তথা দৈবের ঘটন।। কীচক নামেতে বিরাটের সেনাপতি। এক দিন দ্রৌপদীরে দেখিল দুর্ম্মতি।। দৃষ্টিমাত্র রূপে তার হৈল...

০৮. ভীমের সহিত দ্রৌপদীর কীচক বধের মন্ত্রণা

বিরাট রন্ধনগৃহে ভীমের শয়ন। নিদ্রা যায় বৃকোদর হয়ে অচেতন।। সঙ্কেতে বলেন দেবী চাপি দুই পায়। উঠ উঠ, কত নিদ্রা যাও মৃতপ্রায়।। হীনজন সাধ্যমত আপন ভার্য্যারে। প্রাণপণে করি রক্ষা সঙ্কটেতে তারে।। সভামধ্যে যত মম অপমান কৈল। সিংহের রমণী লৈতে শৃগাল ইচ্ছিল।। চরণ চাপিতে ভীম হন...

০৯. কীচক বধ

কৃষ্ণা বলে, যা বলিলে সব আমি জানি। আজি রক্ষা পেলে, পিছে হব ঠাকুরাণী।। যদি তুমি কীচকে না দিবে আজি দণ্ড। লোকে কবে, সৈরন্ধ্রী যে কহিয়াছে ভণ্ড।। আমি কহিয়াছি সর্ব্বলোকের গোচর। আমার আছয়ে পঞ্চ গন্ধর্ব্ব-ঈশ্বর।। গন্ধর্ব্বের নাম শুনি করে উপহাস। বলে, লক্ষ গন্ধর্ব্বেরে করিব...

১০. কীচকের ঊনশত ভ্রাতা কর্ত্তৃক দ্রৌপদীর লাঞ্ছন ও ভীমহস্তে তাহাদের নিধন

কীচক মরণে কৃষ্ণা আনন্দিত হয়ে। সভাপাল প্রতি তবে বলিল ডাকিয়ে।। মোরে যত দুঃখ দিল কীচক দুর্ম্মতি। দণ্ড দিল গন্ধর্ব্বেরা, যারা মোর পতি।। অহঙ্কার করি দুষ্ট গন্ধর্ব্বেরা না মানে। গন্ধর্ব্বে পারিবে কোথা মানুষ পরাণে।। এত শুনি ধেয়ে আসে যতেক রক্ষক। মাংসপিণ্ড প্রায় তথা দেখিল...

১১. দ্রৌপদীকে দেখিয়া পুরজনের ভয়

বন্ধন হইতে মুক্ত কৈল বৃকোদর। স্নানান্তে দ্রৌপদী যান আপনার ঘর।। চতুর্দ্দিকে আছিল যতেক লোকজন। কৃষ্ণারে দেখিয়া ভয়ে পলায় তখন।। সিংহে দেখি যথা অজা ধায় দড়বড়ি। একের উপরে ভয়ে কেহ যায় পড়ি।। প্রাচীন অথর্ব্ব লোক যাইতে নারিল। অধোমুখে ভুমি ধরি বস্ত্রে আচ্ছাদিল।। সবে বলে, কেহ নাহি...

১২. পাণ্ডবদিগের অন্বেয়ণার্থ দুর্য্যোধনের চর প্রেরণ

অজ্ঞাতে বঞ্চেন হেথা পাণ্ডুর নন্দন। হস্তিনাপুরেতে তথা রাজা দুর্য্যোধন।। লক্ষ লক্ষ চরগণে ‍পাঠান ত্বরিত। পাণ্ডবের অন্বেয়ণে যায় চতুর্ভিত।। দুর্য্যোধন বলে, যেই পাণ্ডবে দেখিভে। পাণ্ডবে দেখেছি বলি যে আসি বলিবে।। ধন জন রাজ্য দিব,বহুত ভাণ্ডার। রাজ্যভোগ ভুঞ্জিবেক সহিত আমার।। এত...

১৩. নিজ রাজ্যে সুশর্ম্মা যাত্রা ও বিরাটের দক্ষিণ গো-গৃহ আক্রমণ

দুর্য্যোধন আজ্ঞা পেয়ে সুশর্ম্মা নৃপতি। আপন বাহিনী সাজাইল শীঘ্রগতি।। আষাঢ়ের সিতপক্ষে পঞ্চশী দিবসে। সুশর্ম্মা নৃপতি চলি গেল মৎস্যদেশে।। শঙ্খ ভেরী আদি করি নানা বাদ্য বাজে। বাদ্যের শব্দেতে কম্প হৈল মৎস্যরাজে।। প্রবেশিয়া মৎস্যদেশে সুশর্ম্মা নৃপতি। ধরহ গোধনে, আজ্ঞা দিল...

১৪. ভীম কর্ত্তৃক সুশর্ম্মার পরাজয় ও বিরাটের বন্ধন মোচন

হেথায় ত্রিগর্ত্ত রাজা সংগ্রামে জিনিয়া। কৃষ্ণানামে নদীতীরে উত্তরলি গিয়া।। যুদ্ধশ্রমে সর্ব্বসৈন্য ক্ষুধায় আকুল। রন্ধন ভোজন করে নদীর দুকূল।। বসন-গৃহেতে কেহ করিল শয়ন। কেহ স্নানে, কেহ পানে আসন ভোজন।। বিরাটে করিয়া বন্দী সুশর্ম্মা হরিষে। বসিয়া সভার মধ্যে কহে পরিহাসে।। কোথায়...

১৫. উত্তর গো-গৃহে কুরুসৈন্য কর্ত্তৃক গো-হরণ

হেথায় উত্তরভাগে রাজা দুর্য্যোধন। ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ কর্ণ গুরুর নন্দন।। দুর্ম্মুখ দুঃসহ দুঃশাসন মহাবল। রথ রথী গজ বাজী চতুরঙ্গ দল।। বেড়িল আসিয়া মৎস্যরাজের গোধন। যুদ্ধ করি মারি লইলেক গোপগণ।। পলাইল গোপগণ গোধন ছাড়িয়া। ষষ্টি লক্ষ গোধনেরে দিল চালাইয়া।। শীঘ্রগতি গোপগণ রথ আরোহণে।...

১৬. কুরুসৈন্যের সহিত যুদ্ধে অর্জ্জুন সহ উত্তরের গমন

উত্তর কহেন তবে ধনঞ্জয় প্রতি। রথ চালাইয়া তুমি দেহ শীঘ্রগতি।। যথায় কৌরব-সৈন্য, করহ গমন। সাক্ষাতে দেখহ আজি তাদের মরণ।। এত গর্ব্বী হৈল সবে, হরে মম গরু। তার সমুচিত ফল পাবে আজি কুরু।। পুনঃ পুনঃ প্রতিশ্রুতি করি বীর কয়। হাসি রথ চালালেন বীর ধনঞ্জয়।। আকাশে উঠিল রথ চক্ষুর...

১৭. অর্জ্জুন সম্বন্ধে কৌরবদিগের অনুমান

পাছে ধায় রড়ে,                     দীর্ঘ বেণী নড়ে, পৃষ্ঠোপরি শোভে চারু। লোহিত বসন,                     অঙ্গে বিভূষণ, যেন করিবর ঊরু।। আজানুলম্বিত                     অঙ্গম-মণ্ডিত, দ্বিভুজ ভুজঙ্গ সম। দেখিয়া কৌরব,                     বিচারয়ে সব, মনেতে পাইয়া ভ্রম।। একজন...

১৮. উত্তরকে অর্জ্জুনের অভয় ও আশ্বাস প্রদান

এমত বিচার করে কুরু সৈন্যগণ। নির্ণয় করিতে নাহ পারে কোন জন।। পলায় উত্তর, ধনঞ্জয় ধায় পাছে। শত পদ অন্তরে ধরিল গিয়া কাছে।। আর্ত্ত হয়ে রাজসুত বলে গদ গদ। না ‍মারিহ বৃহন্নলা, ধরি তব পদ।। এবার লইয়া যদি ‍যাহ মোরে ঘর। নানা রত্ন তোমা আমি দিব বহুতর।। দিব্য হেম মণি মুক্ত গজ হয় রথ।...

১৯. কৌরবগণের অর্জ্জুন বিষয়ক পরস্পর তর্ক বিতর্ক

রথ চালালেন তবে ধীমান অর্জ্জুন। শমীবৃক্ষ যথা আছে অস্ত্র ধনুর্গুণ।। উত্তরেরে রথে লয়ে করেন গমন। দেখিয়া হাসিয়া বলে কর্ণ দুর্য্যোধন।। হে গুরু, হে কৃপাচার্য্য, কোথা ধনঞ্জয়। স্বপ্নেতে তোমরা দেখ পাণ্ডুর তনয়।। গুরু বলি সঙ্কোচে না কহি কোন কথা। আমার শত্রুর গুণ গাও যথা তথা।।...

২০. অর্জ্জুনের সহিত উত্তরের শমীবৃক্ষ নিকটে গমন ও উত্তরের অস্ত্র বিষয়ে প্রশ্ন

এতেক বিচার করে কুরু সৈন্যগণ। শমী-বৃক্ষতলে যানে ইন্দ্রের নন্দন।। উত্তরে বলেন, তুমি যুদ্ধে যোগ্য নহ। এই দীর্ঘ শমীবৃক্ষ উপরে আরোহ।। ধনুঃশ্রেষ্ঠ গাণ্ডীব যে আছে বৃক্ষোপরে। দিব্য যুগ্ম তূণ আছে পরিপূর্ণ শরে।। বিচিত্র কবচ ছত্র শঙ্খ মনোহর। বৃক্ষ হৈতে নামাইয়া আনহ সত্বর।। পঞ্চ...