০৩.বনপর্ব্ব

০০১. পাণ্ডবদিগের বনবাস গমনে প্রজাগণের খেদ

জন্মেজয় বলে, কহ শুনি তপোধন। পূর্ব্ব-পিতামহ কথা অদ্ভূত কথন।। কিরূপে জিনিয়া তাঁর নিল রাজ্য ধন। বহু ক্রোধ করাইল বলি কুচবন।। কলহের পথ কুরু করিল সৃজন। কহ শুনি কি করিল পিতামহগণ।। ইন্দ্রের বৈভব সুখ সকল ত্যজিয়া। কেমনে সহিল দুঃখ বনেতে রহিয়া।। পতিব্রতা মহাদেবী দ্রুপদ নন্দিনী।...

০০২. যুধিষ্ঠিরের সূর্য্য আরাধনা ও বরলাভ

যুধিষ্ঠির মহারাজ সেবেন ভাস্কর। ব্রতী হয়ে নানাপুষ্পে পূজেন বিস্তর।। অষ্টোত্তর শতনাম জপেন ভূপতি। দণ্ডবৎ প্রণমিয়া করে নানা স্তুতি।। তুমি প্রভু লোকপাল লোকের পালন। চতুর্দ্দিকে দীপ্ত দীপ তোমার কিরণ।। অমর কিন্নর নর রাক্ষস মানুষে। সর্ব্বস্দ্ধি হয় দেব তব কৃপাবশে।। ইত্যাদি অনেক...

০০৩. ধৃতরাষ্ট্র কর্ত্তৃক বিদুরের অপমান ও যুধিষ্ঠিরের নিকটে বিদুরের গমন

বনে চলিলেন পঞ্চ পাণ্ডুর নন্দন। চিন্তাকুল অন্ধরাজ, স্থির নহে মন।। মন্ত্রিরাজ বিদুরে আনিল ডাক দিয়া। জিজ্ঞাসিল ধৃতরাষ্ট্র মধুর বলিয়া।। বিচারে বিদুর তুমি ভার্গবের প্রায়। পরম ধরম বুদ্ধি আছয়ে তোমায়।। কুরুবংশ তোমার বচনে সবে স্থিত। কহ শুনি বিচারিয়া যাতে মম হিত।। অরণ্যেতে গেল...

০০৪. ধৃতরাষ্ট্র ও বিদুরের পুনর্মিলন এবং ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি ব্যাসদেবের উপদেশ দান

হস্তিনা ত্যজিয়া ক্ষত্তা গেল বনমাঝ। শুনিয়া আকুল চিত্ত হৈল অন্ধরাজ।। নাহি রুচি অন্ন জল অশন শয়ন। অতিবেগে সভামদ্যে করেন গমন।। নিকটেতে গিয়া মূর্চ্ছা হইয়া পড়িল। সঞ্জয় প্রভৃতি সবে ধরিয়া তুলিল।। চেতন পাইয়া বলে সঞ্জয়ের প্রতি। বিদুর আছয়ে কোথা আন শীঘ্রগতি।। পরম ধার্ম্মিক ভাই মম...

০০৫. মৈত্রেয় মুনির আগমন ও দুর্য্যোধনকে অভিশাপ প্রদান

ধৃতরাষ্ট্র বলে, মুনি করি নিবেদন। মোরে যদি স্নেহ হয়, শুন তপোধন।। আপনি বুঝাও দুষ্টমতি দুর্য্যোধনে। ব্যাস বলে, আমি না কহিব কদাচনে।। এইক্ষণে আসিবে মৈত্রেয় তপোধন। সকল কহিবে হিত শুনহ রাজন।। তব হিত তিনি বুঝাইবেন আপনি। তাঁরে প্রীত না করিলে শাপ দিবে মুনি।। এত বলি ব্যাস চলিলেন...

০০৬. কির্ম্মীর বধোপাখ্যান

ধৃতরাষ্ট্র কহে, কহ বিদুর সুজন। কিরূপে করিল ভীম কির্ম্মীর নিধন।। এত শুনি উঠি গেল দুষ্ট দুর্য্যোধন। ক্ষত্তা বলে, শুন রাজা কির্ম্মীর নিধন।। যে কর্ম্ম করিল রাজা বীর বৃকোদর। করিতে না পারে কেহ সুরাসুর নর।। হেথা হতে পাণ্ডবেরা যবে গেল বন। পাইল তৃতীয় দিনে কাম্যক কানন।। সে...

০০৭. কাম্যকবনে পাণ্ডবদিগের নিকট শ্রীকৃষ্ণের আগমন

বনে যদি গেল পঞ্চ পাণ্ডুর নন্দন। দেশে দেশে এই বার্ত্তা পায় রাজগন।। ভোজ বৃষ্ণি অন্ধকাদি যত নৃপগণ। কৃষ্ণের সহিত গেল কাম্যক কানন।। পাঞ্চাল রাজার পুত্র সহ অনুগত। ধৃষ্টকেতু ধৃষ্টদ্যুন্ন আর বন্ধু যত।। যুধিষ্ঠিরে বেড়ি সবে বসে চতুর্ভিত। পাণ্ডবের বেশ দেখি হইল বিস্মিত।। আত্মদুঃখ...

০০৮. শাল্ব দৈত্যের সহিত কামদেবের যুদ্ধ

মধুর বচনে কহিছেন জগন্নাথ। যুধিষ্ঠির আগে যোড় করি পদ্ম হাত।। দ্বারকা ছাড়িয়া আমি নিকটে থাকিলে। নিবৃত্ত করিতে পারিতাম দ্যূতকালে।। অন্ধেরে নিবৃত্ত করিতাম শাস্ত্রবলে। পাশা-আদি নীচকর্ম্মে বহু দোষ ফলে।। মৃগয়া মদিরাপান পাশা ও স্বৈরিণী। এ চারি অনর্থ হেতু, করে লক্ষ্মীহানি।।...

০০৯. শ্রীকৃষ্ণ কর্ত্তৃক শাল্ব বধ

তব যজ্ঞ সাঙ্গ যবে হল নরপতি। হেথা হতে আমি ত গেলাম দ্বারাবতী।। দেখিলাম দ্বারকা যে লণ্ডভণ্ড প্রায়। বেদধ্বনি উচ্চারে অতি করুণাতায়।। পুষ্পোদ্যানে তরুগণ লণ্ডভণ্ড দেখি। জিজ্ঞাসা করিলাম যে সাত্যকিরে ডাকি।। সকল কহিল তবে হৃদিকা নন্দন। আদ্যোপান্ত যতেক শাল্বে বিবরণ।। শুনিয়া হৃদয়ে...

০১০. শ্রীবৎস রাজার উপাখ্যান

শ্রীকৃষ্ণ বলেন, রাজা করহ শ্রবণ। শ্রীব‍ৎস রাজার কথা অপূর্ব্ব কথন।। চিত্ররথ পূর্ব্বে ছিল পৃথিবীর পতি। তৎপরে শ্রীবৎস হয় তাঁহার সন্ততি।। একচ্ছত্রে ধরণী শাসিল নরপতি। রতিপতি সম রূপে, বুদ্ধে বৃহস্পতি।। সসাগরা বসুন্ধরা শাসি বাহুবলে। সকল করিল রাজা নিজ করতলে।। রাজসূয় অশ্বমেধ...

০১১. শ্রীবৎস রাজার সিংহাসন নির্ম্মাণ ও লক্ষ্মী, শনির সিংহাসনে উপবেশন

প্রভাতে উঠিয়া রাজা,                     লইয়া সকল প্রজা, মন্ত্রণা করেন এই সার। বচন নাহিক কবে,                     অথচ বিচার হবে, ইথে ভার ইষ্টদেবতার।। এত বলি অনুচরে,                     আজ্ঞা দেন নরবরে, আন দুই দিব্য সিংহাসন। এক স্বর্ণে বিনির্ম্মিত,                  ...

০১২. শ্রীবৎস রাজার বিচার ও শনির কোপ

দুই সিংহাসনে তবে বসি দুই জন। কথায় কথায় জিজ্ঞাসিলেন তখন।। কহ ভূপ এ দুয়ের শ্রেষ্ঠ কোন্ জন। শুনিয়া হাসিয়া রাজা বলেন বচন।। আসন ছত্রেতে বিধি বুঝি লহ মনে। বামে বসে সাধারণ, প্রধান দক্ষিণে।। শুনি শনি হয় অতি কোপান্বিত মন। ম্লানমুখ হয়ে শনি করেন গমন।। লক্ষ্মী কহিলেন, তুষ্ট করিলে...

০১৩. শ্রীবৎস ও চিন্তার বনগমন

এইরূপ বিবেচনা করিয়া ভূপতি। ত্রিপক্ষের পর তাঁর স্থির হল মতি।। শনি দুঃখ দিবেন আমারে এইমতে। উপায় ইহার এক, ভাবি জগন্নাথে।। চিন্তাদেবী কর তুমি কিঞ্চিৎ সঞ্চয়। হীরা মুক্তা মণি স্বর্ণ যাহা মনে লয়।। প্রবাল প্রস্তর আর যত জহরত। বহুমূল্য অল্পভার এমত রজত।। সঞ্চয় করিয়া লহ বিচিত্র...

০১৪. শ্রীবৎসের প্রতি শনির বাক্য

অন্তরীক্ষে থাকি শনি,                   কহিছে আকাশ বাণী, শুন শুন শ্রীবৎস নৃপতি। আমি ছোট লক্ষ্মী বড়,                   তুমি কহিয়াছ দড়, তার শাস্তি করিব সম্প্রতি।। সম্পত্তিতে করি গর্ব্ব,                   আমারে করিলে খর্ব্ব, আমি তব কি করিতে ‍পারি। যেই লজ্জা দিলে মোরে,    ...

০১৫. আকাশবাণী শ্রবণে শ্রীবৎস রাজার খেদোক্তি

শুনিয়া আকাশ বাণী শনির ভারতী। ডাকিয়া বলিল রাজা চিন্তাদেবী প্রতি।। যতেক কহিল শনি, প্রত্যক্ষ হইল। রাজ্যনাশ বনবাস সর্ব্বনাশ কৈল।। বিবাদ করিয়া যদি দোঁহে না আসিবে। তবে কেন চিন্তাদেবী এমত হইবে।। আমার কুদিন হল বিধির ঘটনা। নৈলে কেন দ্বন্দ্ব করি আসিবে দুজনা।। ভাবিয়া চিন্তিয়া...

০১৬. শ্রীবৎস রাজার কাঠুরিয়া আলয়ে স্থিতি

শুন শুন ধর্ম্মরাজ অপূর্ব্ব কথন। কাননে বঞ্চেন চিন্তা শ্রীবৎস রাজন।। পূর্ব্বমত ফলমূল না মিলে তথায়। কানন ত্যজিয়া রাজা নগরেতে যায়।। নগর উত্তরভাগে ধনীর বসতি। তথায় বসতি মোর না হয় সঙ্গতি।। দুঃখী হয়ে ধনাঢ্যের নিকটে না যাবে। দরিদ্র দেখিয়া মোরে অবজ্ঞা করিবে।। দুঃখীর সমাজে আকি...

০১৭. বণিক কর্ত্তৃক চিন্তা হরণ

তবে সাধু হর্ষযুত গলে বন্ত্র দিয়া। যথা চিন্তা সতী তথা উত্তরিল গিয়া।। চিন্তাদেবীরে সাধু কহে বিনয় বাণী। আমারে করহ রক্ষা, ওগো ঠাকুরাণি।। সাধুরে দেখিয়া চিন্তা কহে দুঃখ মনে। আমাকে যাইতে মানা করিল রাজনে।। কি কহিবে মহারাজ আসিয়া ভবনে। ভাবিয়া চিন্তিয়া রাণী স্থির কৈল মনে।। কাতর...

০১৮. শ্রীবৎস রাজার রোদন এবং চিন্তার অন্বেষণ

কাতর হৃদয় অতি,                     শ্রীবৎস ধরণীপতি, পড়সীরে জিজ্ঞাসে বারতা। কহ সবে সমাচার,                     কোথা চিন্তা সে আমার, না হেরিয়া পাই মনে ব্যথা।। রাজার বচন শুনি,                     পড়সী কহিছে বাণী, ওহে ধীর পণ্ডিত সুজন। কহি শুন বিবরণ,                     এই...

০১৯. সুরভি আশ্রমে শ্রীবৎস রাজার অবস্থিতি ও সদাগর কর্ত্তৃক নিগ্রহ

সুরভি জিজ্ঞাসা করে, তুমি কোন জন। রাজা বলে, শুন মাতা মোর নিবেদন।। অবনীতে মহীপতি ছিলাম মা আমি। শ্রীবৎস আমার নাম প্রাগদেশস্বামী।। আনন্দেতে করিতাম প্রজার পালন। কত দিনে শুন মাতা দৈবের ঘটন।। একদিন শনি সঙ্গে জলধি তনয়া। মম স্থানে আসে দোঁহে বিরোধ করিয়া।। বিচার করিনু আমি...

০২০. শ্রীবৎস রাজর মালিনী আলয়ে অবস্থিতি

মালিনীর বাণী শুনি,                    আনন্দিত নৃপমণি, তুষ্ট হয়ে গেল তার বাসে। আয়োজন আনি দিল,                     নৃপতি রন্ধন কৈল, বঞ্চে রায় কৌতুক বিমেষে।। এইরূপে নৃপবর,                     রহিল মালিনী ঘর, আছে রায়, কেহ নাহি জানে। শুন ধর্ম্ম মহাশয়,                   ...