২৩২. শার্ঙ্গকগণের অগ্নিস্তব

দ্বাবিংশদধিকদ্বিশততম অধ্যায়।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! প্রজ্বলিত হুতাশন অরণ্যানী দগ্ধ করিতে করিতে ক্রমশঃ মহর্ষি মন্দপালের পুত্র শার্ঙ্গকচতুষ্টয়ের সমীপবর্তী হইলে তাহাদের সর্বজ্যেষ্ঠ জরিতারি পাবকসন্নিধানে ভ্রাতাদিগকে কহিতে লাগিলেন, বিপৎকাল উপস্থিত হইলে বুদ্ধিমান পুরুষ সর্বদা জাগরুক থাকেন, বিপৎকালে নাচ ব্যথিত হন না। যে মূঢ় ব্যক্তি বিপৎকালে কদাচ উপস্থিত হইল সতর্ক না থাকে, সে তৎকালে যৎপরোনান্তি কষ্ট ভোগ করে এবং চরমে মোক্ষ লাভ করিতে পারে না।

তখন সারিসৃক্ক জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে কহিলেন, হে ভ্ৰাতঃ! এক্ষণে আমাদের প্রাণসংশয় উপস্থিত হইয়াছে। তুমি ধ্যানবান ও উহাপোহকুশল; তুমি কোন না কোন উপায়দ্বারা আমাদিগকে রক্ষা কর, যেহেতু এক প্রাজ্ঞ অসংখ্য অপ্রাজ্ঞ লোক অপেক্ষা বলবা।

স্তম্বমিত্র কহিলেন, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পিতৃতুল্য; তিনি কনিষ্ঠদিগকে বিপদ হইতে মুক্ত করেন। যদি জ্যেষ্ঠ স্বীয় প্রজ্ঞাবলে বিপ উদ্ধার না করেন, তবে কনিষ্ঠের কি সাধ্য যে, তাহার প্রতিকার করে।

দ্রোণ কহিলেন,ঐ দেখ, সপ্তাস্য, সপ্তজিহ্ব, ক্রূর হিরণ্যরেতাঃ শিখা বিস্তারপূর্বক আমাদের গৃহে আগমন করিতেছেন।

মহর্ষি মনপালের পুত্রগণ এইরূপে পরস্পর কথোপকথন করত পরিশেষে প্ৰয়ত হইয়া অগ্নির স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন।

জরিতারি কহিলেন, হে জ্বলন! তুমি বায়ুর আত্মা; লতাসমূহের শরীর; পৃথিবী ও জল তোমা হইতেই উৎপন্ন হইয়াছে। হে মহাবীৰ্য্য! তোমার শিখাসমুদায় সূর্যকিরণের ন্যায় উদ্ধাদেশ, অধোদেশ, পূর্বদেশ ও পার্শ্বদেশে বিস্তৃত হইতেছে।

সারিসৃক্ক কহিলেন, হে ধূমকেতো! মাতা আমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করিয়াছেন; পিতা কোথায় আছেন, কিছুই জানি না; আমাদের অদ্যাবধি পক্ষোভেদ হয় নাই; অতএব হে অয়ে! তুমি আমাদিগকে রক্ষা কর; তুমি ভিন্ন এই বালকদিগের আর শরণান্তর নাই। হে অগ্নে! আমরা নিতান্ত কাতর হইয়া: তোমার শরণাপন্ন হইতেছি; তুমি আপন কল্যানমুর্তি ও সপ্তশিখাদ্বারা আমাদিগকে রক্ষা কর। হে জাতবেদঃ! এই ত্রিলোকীমধ্যে তুমিই এক তপস্বী অছি; তোমার তুল্য তপোবলসম্পন্ন আর কেহই নাই। আমরা একে বালক, তাহাতে আবার ঋষিকুমার; তুমি অনুকম্পা প্রদর্শনপূর্বক আমাদিগকে রক্ষা কর।

স্তম্বমিত্র কহিলেন, হে অগ্নে! তুমি এক হইয়াও অনেক, এই নিখিল, ব্ৰহ্মাণ্ড তোমাকে অবলম্বন করিয়া আছে, তুমি সর্বভূত ও ভুবন মরণ করিতেছ; তুমি অগ্নি, তুমি হব্যবাহ এবং তুমিই পরমোৎকৃষ্ট হবিঃ; পণ্ডিতগণ তোমাকে একরূপ এবং তোমাকেই বহুরূপ বলিয়া জানেন। হে হব্যবাহ! তুমি এই ত্ৰিলোক সৃষ্টি কর এবং প্রলয়কালে তুমিই প্রজ্বলিত হইয়া ইহা ধ্বংস কর। হে অগ্নে! তুমি এই ভুবনয়ের প্রসূতি এবং তুমিই ইহার আশ্রয়।

দ্রোণ কহিলেন, হে জগৎপতে! তুমি প্রাণিগণের অন্তর্গত থাকিয়া ভুক্ত অন্ন পরিপাক কর; তোমাতেই সমস্ত জগৎ প্রতিষ্ঠিত আছে। হে বহে! তুমি সূৰ্য্যরূপে পার্থিব রস সমুদায় আকর্ষণ কর এবং মেঘরূপে পরিণত সেই সমুদায় রস যথাকালে বর্ষণ করিয়া পৃথিবীকে সৰ্বশস্যসম্পন্ন কর। হে প্রচণ্ডকিরণ হুতাশন! এই সমুদায় হরিতচ্ছদসম্পন্ন লতা, যাবতীয় পুষ্করিণী এবং বরুণাধিকৃত মহোদধি তোমা হইতেই সমুৎপন্ন হইয়াছে। হে পিঙ্গাক্ষ! হে লোহিতগ্রীব! হে কৃষ্ণবর্ত্মন! হে হুতাশন! তুমি আমাদিগকে রক্ষা কর, দগ্ধ করিও না।

ভগবান্ অনল ব্ৰহ্মবাদী দ্রোণ কর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া, মহর্ষি মন্দপালসন্নিধানে কৃত স্বীয় প্রতিজ্ঞা অনুসরণপূর্বক তাঁহাকে কহিলেন, হে দ্রোণ! তুমি ঋষি বটে; তুমি আমাকে বেদবাক্যে স্তব করিলে; তোমার ভয় নাই। আমি তোমার অভিলাষ পূর্ণ করিব। পূর্বে মহর্ষি মন্দপালও তোমাদের নিমিত্ত আমার নিকট এই প্রার্থনা করিয়াছিলেন যে, আপনি খাণ্ডবারণ্য দাহকালে আমার পুত্রগণকে পরিত্যাগ করিবেন। হে দ্রোণ! মহর্ষি মন্দপালের সেই বাক্য এবং তোমার এই বাক্য উভয়ই আমার পক্ষে গুরুতর, অতএব বল, এক্ষণে তোমার কি হিতসাধন করিতে হইবে। আমি তোমার স্তব শুনিয়া পরম সন্তুষ্ট হইয়াছি।

দ্রোণ কহিলেন, হে হুতাশন! এই বিড়ালগণ আমাদিগকে সর্বদা বিরক্ত করে, আপনি অনুগ্রহ করিয়া উহাদিগকে সবংশে ভস্মীভূত করুন। ভগবান বহ্নি দ্রোণের বাক্যানুসারে বিড়ালগণকে তৎক্ষণাৎ ভস্মসাৎ করিয়া শাক, চতুষ্টয়কে পরিত্যাগপূর্বক প্রবলবেগে খাণ্ডববন দগ্ধ করিতে লাগিলেন।